Collected হাঁটার সঙ্গী একজোড়া হাত

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
415
Messages
6,023
Reaction score
2,753
Points
3,963
Age
40
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
হাঁটার সঙ্গী একজোড়া হাত

মূল লেখকঃ মুস্তাকিম বিল্লাহ






শারমিন অনেকদিন পরে বাসা থেকে বের হয়েছে, প্রায় দুই বসন্ত চলে গেছে। দুই বসন্ত সময় কম না। তখন সে স্কুলে পড়ে, আফরোজা আপা মেয়েদের জিজ্ঞেস করলো তোমরা বড় হয়ে কি হবে? একে একে সবাই উত্তর দিলো কেউ ডাক্তার হবে, কেউ বড় অফিসার হবে কেউ আফরোজা ম্যামের মতো মিস হবে। শারমিনের কাছে জিজ্ঞেস করতেই হেসে বললো, ম্যাম আমি পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরবো।

সবাই শারমিনের উত্তর শুনে অবাক হয়। এই মেয়ে কিনা পাহাড়ে ঘুরবো।

শারমিনের স্কুলের দিনের সেই কথা মনে উঠতেই নিজ মনে হেসে ফেলে। স্কুলের বান্ধবী মিলি, চয়নিকা, আছমার সাথে বহুদিন যোগাযোগ নেই। অবশ্য ওরা কেউ এখন ঢাকাতে থাকে না, আছমা থাকে রাজশাহী বাকি দুজনে দেশের বাইরে।

রেস্টুরেন্টের বারান্দা দিয়ে বিকালের রোদ গায়ে লাগছে। শারমিন গায়ের চাদরটা হাল্কা সরিয়ে রাখে। একবার বড় আপার দিকে তাকায়, বড় আপা শারমিনের দিকে ভরসার চোখে তাকায়। শারমিন গায়ে রোদ মাখে। পাশেই কিছু অপরাজিতা লতা, লতায় কিছু বেগুনী ফুল।

শারমিন আপার দিকে তাকিয়ে বলে, আর কতোক্ষণ লাগবে আসতে?

রুবিনা বলে এইতো আসছে, মাত্রই কথা হলো ওরা জ্যামে আটকে আছে। মিনিট বিশেকের ভিতরেই এসে যাবে। তোর জন্যে কিছু ওর্ডার দিবো?

শারমিন বলে, কিছু দিতে হবে না তুই একটা চেয়ার টেনে পাশে বস।

আপার ফোনে তখনই সাজিদের বাবা কল দেয়, সে ফোন নিয়ে অন্যপাশে চলে যায়।

শারমিন একা বসে রোদ মাখে। ইচ্ছা করছে উঠে দাঁড়িয়ে অন্য পাশে যেতে, কিন্তু আপাকে ছাড়া তো সে আর উঠতে পারবে না। শারমিন চুপচাপ বসে থাকে।

কিছু সময় পরেই একজন লোক এসে শারমিনের পাশে দাঁড়ায়। হ্যালো আমি রেজাউল করিম, চিনছেন? শারমিন মৃদু হেসে বলে, হ্যাঁ চিনবো না কেন? আপা যে বললো আপনার আসতে এখনো বিশ মিনিটের মতো লাগবে, এতো তাড়াতাড়ি চলে আসলেন।

রেজাউল বলে, ভাবছিলাম জ্যাম এতো সহজে ছাড়বে না। কপাল ভালো জ্যাম ছাড়লো তাই তাড়াতাড়ি চলে আসলাম।

শারমিন একপাশে একটা চেয়ারে বসে ছিলো, উঠে যাবে সে সুযোগ নেই। এদিকে আপার যে কি হলো, ফোন নিয়ে যে চলে গেলো আর আসবার নাম নেই।

রেজাউল বললো, চলেন আমরা যেয়ে বসি। শারমিন বলে, আপা আসুক না।

তখনই রেজাউল বলে, আপার নাকি কি জরুরী কাজ আছে তাই তিনি বাসায় লে গেছেন। আমাকে বললো আমি যেনো আপনাকে বাসায় পৌছে দেই।

শারমিনের আপার প্রতি রাগ হয়। ইচ্ছা করছে আপাকে কল দিয়ে কিছু কথা শুনাতে। এটা কোনো কথা হলো। শারমিনকে একজন অপরিচিত লোকের কাছে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো। শারমিন হাঁটতে পারে না, হুইলচেয়ারে হাঁটতে হয়। হুইলচেয়ার নিচে রেখে আসছে। আপাই তাকে ধরে উপরে তুলছে। এখন সে নিচে নামবে কিভাবে? আপার জীবনে বুদ্ধি হলো না, মা ঠিকই বলতো আপা সত্যি বুদ্ধিহীন প্রাণী।

রেজাউল আবার বলে, চলেন আমরা ওইদিকটায় বসি। আমি ধরছি আপনাকে। রেজাউল শারমিনের হাত ধরে। রেজাউল হাত ধরায় শারমিন কিছুটা লজ্জা পায়।

রেজাউলকে সে এবার নিয়ে দুবার দেখেছে। সেবার বড় আপার শ্বশুরবাড়িতে একটা বিয়ের দাওয়াতে শারমিনদের পরিবার যায়, সেখানেই রেজাউলের সাথে পরিচয়। রেজাউল শারমিনের দুলাভাইর ভার্সিটির ছোটো ভাই। বড় আপাদের পরিবারের সাথে রেজাউলের সম্পর্ক খুব ভালো।

সেখানে বসেই রেজাউলের সাথে পরিচয় হয়। শারিমনের কাছাকাছি যেনো একটু বেশিই রেজাউল আসে।

বড় আপা দুদিন পরে শারমিনকে কল করে বলেন, শারমিন তোর জন্যে একটা ভালো খবর আছে। শারমিন বিদ্রুপের হাসি হাসে। তার জীবনে ভালো খবর বলতে এখন কিছু নেই। যখন থেকে শারমিনের সঙ্গী হুইলচেয়ার হলো তখন থেকে তার জীবনের সব ভালো খবর হারিয়ে গেছে। শারিমেনর বিয়ে হয়, বেশ উৎসবের ভিতরে বিয়ে হয়। শারমিন একটা কোম্পানিতে চাকরি করতো। বেশ ভালোই বেতন ছিলো। বিয়ের তখন চারমাস চলে, অফিসে যাচ্ছে, তখনই রিক্সার সাথে একটা গাড়ির ধাক্কা লাগে। শারমিন গুরুতর আহত হয়। সেই থেকে তার সঙ্গী হুইলচেয়ার। দুর্ঘটনার দুই মাস যেতেই একদিন শারমিনের কাছে ডিভোর্স পেপার আসে। একটা দুঃস্বপ্নের রাতের মতো শারমিনের জীবন হুট করে বদলে যায়। এখন হাঁটতে গেলে কারো হাত ধরতে হয়, হুইলচেয়ার নিয়ে পাহাড়ে যাওয়া যায় না, সমুদ্রের কাছে যাওয়া যায় না।

বড় আপা বলেন, তুইতো রেজাউলের সাথে পরিচয় হইলি। রেজাউল তোর সাথে দেখা করতে চায়। আমাকে বলছে যেনো তোর সাথে দেখা করিয়ে দেই। যতদূর বুঝলাম ছেলেটা তোকে পছন্দ করে। এখন তোর সম্মতি থাকলে আমি বাবা মায়ের সাথে কথা বলবো, তোর দুলাভাই বললো রেজাউল ছেলে হিসেবে ভালো পরিবারও অনেক ভালো। এখন তোর মতামত জানা।

শারমিন বলে, আপা তোর যা ইচ্ছা হয় কর।

বড় আপা বলে, তাহলে আগামী সোমবারে রেজাউলকে আসতে বলি কেমন?

শারমিন আপার কথাতে রাজি হয়। আজকে সোমবার। আপা শারমিনকে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে, গায়ে একটা বাদামি রঙের চাদর।

শারমিন মুখ নিচু করে বসে আছে। রেজাউল নিরবতা ভেঙে বলে আপা চলে যাওয়াতে কি বিরক্ত অনুভব করছেন? আমার কি মনে হয় জানেন, আপনার আপার কোনো কাজ নেই তিনি আসলে আমাদের দুজনকে সময় কাটানোর জন্যেই এখানে ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন। আপনার চিন্তা নেই আমি বাসায় পৌছে দিবো।

শারমিন মৃদ হাসে। রেজাউল অতিরিক্ত কথা বলে। অবশ্য তার কথায় কেউ বিরক্ত হয় না। কথা দিয়ে কিছু মানুষ মানুষকে মুগ্ধ করে রাখতে পারে রেজাউল তেমনই মানুষ, তার কথায় বিরক্ত লাগে না। এইতো সেদিন বিয়ে বাড়িতে তার কথা দিয়ে আসর জমিয়ে রেখেছিলো, বাচ্চারা থেকে শুরু করে বড়রা সবাই তার কথা মুগ্ধ হয়ে শুনেছে, কখনো হেসে উঠেছে।

শারমিনও এখন হাসছে রেজাউলের কথা শুনে। মনেই হচ্ছে না রেজাউলের সাথে তার প্রথম পরিচয়, মনে হচ্ছে তাদের দীর্ঘসময় ধরে পরিচয়।

রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার খাওয়া শেষে শারমিন বলে, আপনি চলে যান আমি কিছু সময় এখানে বসি। আপা এসে আমাকে নিয়ে যাবে।

রেজাউল শারমিনের এখানে বসে থাকবার কারণ বুঝতে পারে। রেজাউল বলে, আপনার কি আমার হাত ধরে হাঁটতে অসুবিধা? তাহলে সমস্যা নেই আমি মেয়ে ওয়েটারদের ডেকে নিয়ে আসছি ওরা নিচে দিয়ে আসবে।

শারমিন বলে, তেমন কিছু না আসলে...

রেজাউল শারমিনকে পুরো কথা শেষ করতে দেয় না। শারমিনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে হাতটা ধরুন। শারমিন একবার রেজাউলের দিকে তাকায়, তারপর নিচু হয়ে হাতটা ধরে। রেজাউল বসা থেকে শারমিনকে ধরে তুলে দাঁড় করায়

হাত ধরে শারমিন হাঁটতে পারছে না, হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। শারমিন বলে আপনি কোমরের পাশ থেকে ধরেন নয়তো আমি পরে যাবো। রেজাউল শারমিনকে কোমরের পাশে হাত দিয়ে ধরে।

নিচে এসে হুইলচেয়ারে বসিয়ে গাড়ির কাছে নিয়ে যায়। গাড়িতে করেই শারমিনকে বাসায় পৌছে দেয়।

আবার হাত ধরে শারমিনকে রেজাউল নামায়। গেটের সামনে অবশ্য আপাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। আপার প্রতি শারমিনের রাগ হয় আবার মনে হয় আপা চলে এসে ভালোই করেছে। রেজাউল গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে শারমিনকে হুইলচেয়া বসায় তারপর মৃদু সুরে বলে আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। যদি আপনি রাজি থাকেন আপার থেকে নাম্বার নিয়ে রাতে কল দিবেন কেমন? শারমিনের হাতে ছোট্ট একটা গিফটবক্স দেয় সাথে কিছু ফুল।

শারমিন কিছুই বলতে পারছে না, শুধু অবাক হয়ে রেজাউলকে দেখে। এভাবেও ভালোবাসা যায়?

শারমিনের হাতটা সেদিন যে রেজাউল ধরলো আর ছাড়েনি। কখনো পার্কের পাশে একটা হুইলচেয়ার রাখা থাকে, তারপর রেজাউলের হাত ধরে শারমিন ঘুরে আসে মাঠের পর মাঠ পথের পথ।

শারমিন পাহাড় দেখেছে, সমুদ্র দেখেছে শহর থেকে গ্রাম ঘুরেছে একজোড়া হাত ধরে, একটা মানুষের সঙ্গে। কখনো নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে এভাবেও তাকে কেউ ভালোবাসতে পারে। জীবন নিয়ে আপসোস ছিলো সব আপসোস এখন ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে গেছে। বরফরে ভিতরে যখন রেজাউল হাতটা শক্ত করে ধরে রাখে তখন মনে হয় এক জীবনে আর কিচ্ছু চাইনি। সেই গানের মতো করে শারমিন গুনগুন করে রেজাউলের দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় ভেজা চোখে গায় “কিচ্ছু চাইনি আমি আজীবন ভালোবাসা ছাড়া”।
 
Back
Top