Collected একটু উষ্ণতার জন্য - বুদ্ধদেব গুহ

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
443
Messages
6,994
Reaction score
5,011
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
একটু উষ্ণতার জন্য

মূল লেখকঃ বুদ্ধদেব গুহ






পর্ব - ১
দিনের শেষ গাড়ি মরা বিকেলের হলুদ অন্ধকারে একটু আগে চলে গেছে।
এখন প্লাটফর্মটা ফাঁকা।
এখানে ওখানে দু-একজন ওঁরাও মেয়ে-পুরুষ ছড়িয়ে আছে। কার্নি মেমসাহেবের চায়ের দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গেছে। আসন্ন সন্ধ্যার অস্তমিত আলোয় প্লাটফর্মের ওপারের শালবনকে এক অদ্ভুত রহস্যময় রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। চারদিক থেকে বেলাশেষের গান শোনা যাচ্ছে।
স্টেশানের মাস্টারমশাই বললেন, আপনাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসি।
আমি বললাম, কি দরকার?
আরে তাতে কি? আপনি এখানের বাসিন্দা ত নন, নতুন এসেছেন–জঙ্গলের পথঘাট ভাল জানা নেই। চলুন, চলুন, আমার কোনো কষ্ট হবে না, তাছাড়া আমি ত হাঁটতে বেরোতামই–এ বয়সে একটু হাঁটা দরকার।
বললাম, বেশ, চলুন তাহলে।
স্টেশান থেকে বেরিয়ে শেঠ মুঙ্গালালের দোকান পেরিয়ে হালুইকরের দোকানের সামনে দিয়ে পোস্টাফিসের গা-ঘেঁষে পেছনের মাঠটায় এসে পড়লাম আমরা।
মাঠের ওপারে দীপচাঁদের দোকানের আলো জ্বলে উঠেছে।
বেশ অনেকখানি হাঁটতে হবে।
মাস্টারমশাই বললেন, শরীর কেমন বোধ করছেন আজকাল? এইসব পাকদণ্ডী পথ দিয়ে যাওয়া আসা করা কি আপনার উচিত হচ্ছে?
আমি হাসলাম, বললাম, মান্দারের হাসপাতালের সাহেব ডাক্তার ত বললেন, যতখানি পারি হেঁটে বেড়াতে, শরীর যে খারাপ হয়েছিল, কখনো বড় অসুখে পড়েছিলাম, এসব কথা একেবারে ভুলে যেতে।
ওঃ-। তাই বুঝি। তাহলে ভাল। তারপর আবার বললেন, এখানে সব উঁচু নীচু পাহাড়ি রাস্তা ত, তাই-ই বলছিলাম।
দেখতে দেখতে আমরা দীপচাঁদের দোকানের সামনে এসে পড়লাম, তারপর একটা ছোট বস্তী পেরিয়ে মোড়ের পোড়ো বাড়ির পাশ কাটিয়ে গ্রামের পাকদণ্ডীতে এলাম।
সামনে একটা বড় ঝাঁকড়া মহুয়াগাছ। মাঝে মাঝে পিটিস্ এবং ঝাঁটি জঙ্গল। পশ্চিমের পাহাড়ের কাঁধ বরাবর সন্ধ্যাতারাটা উঠেছে। সমস্ত আকাশ সেই একটি তারার আলোয় উজ্জ্বল।
হাতের লাঠি ঠকঠক করতে করতে আগে আগে চলতে চলতে মাস্টারমশাই বললেন, আপনি তখন নিশ্চয়ই কিছু মনে করলেন না? কি বলেন?
আমি অবাক হয়ে বললাম, কই? কখন?
ঐ যখন ঘোষকে ধমক লাগালাম আমি।
আমি বললাম, ঘোষ মানে? শৈলেন ঘোষ?
উনি বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ।
আমি বললাম, না, না, মনে করব কেন? তাছাড়া আপনাদের নিজেদের মধ্যের কথায় আমার মনে করার কি আছে?
মাস্টারমশাই উত্তপ্ত গলায় বললেন, নাঃ এ ছাওয়াল-পাওয়ালগুলোকে শুধরানো যাইব না–যা মাইনা পাইতাছে তা এই জাগায় খাইয়া পইড়া থাকার পক্ষে যথেষ্ট। অথচ এই চেঞ্জারদের দেইখ্যা দেইখ্যা ওদেরও কমপিটিশনে নামন লাগব। জব্বর জব্বর জামাকাপড়, লটর-পটর জুতা, কান ঝালাপালা ট্রানজিস্টর সবই ওদেরও চাই। কিছুই না অইলে নয়। নাই, নাই কইরাই এগো পরানডা গেল।
আমি জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকলাম।
মাস্টারমশাই ফরিদপুরের লোক। কালীভক্ত, হোমিওপ্যাথী করেন; ব্যাচেলর।
চেঞ্জারদের উপর ওঁর খুব রাগ। এখানের এই নির্লিপ্ত খুশি জীবনে, চেঞ্জাররা এসে চাহিদার জ্বালা জুগিয়ে যায়। একথা তিনি প্রায়ই বলেন।
এবার সামনে সেই নালাটা এসে গেল। নালাটা পেরিয়ে অনেকখানি খাড়া উঠতে হয়। ও জায়গাটাতে এসে এখনও বুকে বেশ হাঁপ ধরে। এখানে এলে বুঝতে পাই যে, এখনো পুরোপুরি ভাল হইনি আমি, এখনও রাজরোগের রেশ ছাড়েনি আমাকে।
চড়াইটা উঠে এসেই সেই সাদা পোড়ো বাড়িটা। সন্ধ্যার অন্ধকারে দারুণ দেখায়। এখানের অনেকে বলেন যে, এটা ভূতের বাড়ি। মাস্টারমশাই হাতের লাঠিটা উঁচু করে ওদিকে দেখিয়ে বললেন, এই যে সেই বাড়ি।
মাস্টারমশাইকে শুধোলাম, এখান দিয়ে রাতে একা যেতে আপনার ভয় করে না মাস্টারমশাই?
মাস্টারমশাই সায়ান্ধকারে কাঁচা-পাকা চুলেভরা প্রকাণ্ড মাথাটা আমার দিকে ঘুরিয়ে জোরে হেসে উঠলেন, বললেন, বুঝলেন কিনা ভাই, আমি হইলাম গিয়া কালীভক্ত লোক মায়ের পূজা করি–ভূতপেত্নী লইয়াই আমাগো কারবার।
সাদা পোড়োবাড়ি পেরুনোর পর পথটা সোজা চলে গেছে খোয়াই-ভরা টীড়ের মধ্যে দিয়ে। বাঁদিকে অনেকগুলো বড় বড় মহুয়া গাছ। সামনেতে এখন সর্ষে বুনেছে ওঁরাওরা। অন্ধকারে সব সমান মাঠ বলে মনে হচ্ছে।
পথের ডানদিকে চার-পাঁচ ঘর লোকের বাস। ওরাও সকলে ওঁরাও। ওদের পোষা শুয়োর বাড়ির সামনের গোবর লেপা উঠোনে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে! ফারিয়া কুকুরের বাচ্চা হয়েছে, বারান্দার খড়ের মধ্যে শুয়ে বাচ্চাগুলো কুঁই কুঁই করে ডাকছে। অন্ধকারে সর্ষে ক্ষেতের গন্ধ আর এই টুকরো টুকরো শব্দসমষ্টি দারুণ লাগছে।
সর্ষে ক্ষেত পেরিয়ে, অন্ধ জারু ওঁরাও-এর ঘরের পাশ দিয়ে আবার ঝটি জঙ্গল ভেদ করে বাড়ির পেছনের গেট দিয়ে এসে উঠলাম। মাস্টারমশাই চা না খেয়েই ফিরে যাচ্ছিলেন, আমি জোর করে ধরে আনলাম, বললাম, চা না খেয়ে যাওয়া চলবে না।
তারপর কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে মাস্টারমশাই উঠে পড়লেন। লাঠি ঠঠকিয়ে জঙ্গলের পথে মিলিয়ে গেলেন। চলতে চলতে, মাঝে মাঝে বলতে লাগলেন, জয়, তোর জয়।
এখানে সন্ধ্যে হয়ে গেলে আর কিছুই করার নেই। আমার প্রতিবেশী যাঁরা, তাঁরা সকলেই বেশী বয়সী। মানে নিকট প্রতিবেশীরা। তাঁরা প্রায় সকলেই হয় এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, নয় বিদেশী। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে সাপার খেয়ে শুয়ে পড়েন।
লালি রেঁধেবেড়ে দেয়। আমিও সকাল সকাল খেয়েদেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ি। বইপত্র এখানে পাওয়ার উপায় নেই। কর্নেল ম্যাকফারসনের লাইব্রেরী আছে, খুবই ভালো। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আলাপ এমন ঘনিষ্ঠ হয়নি যে বই চেয়ে পড়ি। কলকাতা থেকে যেগুলো এনেছিলাম সেগুলো বহুবার পড়া হয়ে গেছে। এখন সন্ধ্যে হলেই নিজেকে অভিশপ্ত বলে মনে হয়। যার শরীর অসুস্থ, অসুস্থ মানে বহু দিন ধরে অসুস্থ, যার মনে কোনো আনন্দের আভাস মাত্র অবশিষ্ট নেই, তার পক্ষে এরকম নির্জন জায়গায় একা একা সন্ধ্যে কাটানো শাস্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।
মাঝে মাঝে ভাবি, ভাল হয়ে গিয়েই বা কি করব। ভাল হয়ে কোলকাতায় ফিরে আবার ত সেই জীবনেই প্রবেশ করব। যাদের সঙ্গে আমার কোনো আত্মিক যোগ নেই, কোনো সত্যিকারের সখ্যতা নেই, তাদের মধ্যে থেকে, তাদের জন্যে আবার সেই দাসত্ব করব, করব রোজগার, রোজকার দস্তুরের দাগা বুলোব। সেও ত আরেক মৃত্যু। আমার সামনে বোধহয় শুধু বহু মৃত্যুর দ্বারই খোলা আছে। আমার শুধু এখন পথ বেছে নিতে হবে কোন্ মৃত্যু আমার পক্ষে সহনীয় এবং বরণীয়।
.
০২.
এ জায়গাটায় সকাল হয় না, সকাল আসে। অনেক শিশিরঝরানো ঘাসে ভেজা পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে অনেক শঙ্খিনী নদী পেরিয়ে সোনা-গলানো পোশাক পরে সকাল আসে এখানে।
কম্বলের নীচে শুয়ে আমার ঘরের টালির ছাদের ফাঁকে ফাঁকে আলোর আভাস দেখা যায়। চতুর্দিক থেকে পাখি ডেকে ওঠে। বাড়ির পেছনের পিটিস্ ঝোপে ভরা টাঁড়ে তিতিরের আড্ডা। ঝগড়াটি তিতিরগুলোর গলা সবচেয়ে আগে শোনা যায়। তারপর টিয়া, ঘুঘু, বুলবুলি, টুনটুনি, মৌটুসী আরো কত রকম পাখি এসে পেয়ারা গাছে, আতা গাছে, ফলসা গাছে, চেরী গাছে এমন কি বাবুর্চিখানার পাশের কারিপাতা গাছে বসেও ঝাঁপাঝাঁপি করে।
সেই প্রচণ্ড সুস্থ ও আনন্দিত প্রাণতরঙ্গের মধ্যে, দিগ্বিদিকে শিহরিত ও আলোকিত শব্দলহরীর মধ্যে এই অসুস্থ আমি চোখ মেলি। শাল গায়ে দিয়ে বেরিয়ে এসে রোদে দাঁড়াই।
ম্যাকলাস্কিগঞ্জের প্রতিটি সকাল আমার জন্যে যেন কী এক আনন্দের পসরা সাজিয়ে আনে। প্রতিদিন এই ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে পুবের ও পশ্চিমের পাহাড়ের রোঁয়া-রোঁয়া সবুজের দিকে তাকিয়ে আমি বারে বারে নিজেকে ভুলে যাই।
রোজ প্রাতঃকৃত্য সেরে এসে পেয়ারাতলায় বেতের চেয়ারে বসি। মালি ঐখানেই চা এনে দেয়। রোদে পিঠ দিয়ে বসে থাকি। রোদটা একটু চড়লে, গ্রীবায় রোদ পড়লে আরামে চোখ বুজে আসে–তখন ইচ্ছে করে আরেকবার ঘুমাই।
মালু মালির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে গাছগাছালির তদারকি করি। বাড়ির সবুজ হাতার মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে মনে হয় পৃথিবীতে এই একমাত্র জায়গা–। এই গাছগুলি, এই পুরানো, খসে-পড়া টালির ছাদের ভাড়া বাড়ি, এই পাখিদের জমিদারী এইটুকুই একান্ত করে আমার। আমার ক্ষণকালের একার। এছাড়া আমার জীবনে নিজের বলতে কিছুই নেই; না কোনো জিনিস, না কোনো জন।
আমগাছগুলোর তলায় একটা দোলনা টাঙানো আছে। কখনো কখনো সেখানে গিয়ে বসি একা একা। এই দোলনায় যে বা যারা এসে বসলে আমি ভীষণ খুশি হতাম তারা কেউ আসেনি এখানে। হয়ত আসবেও না। তাদের ভালো লাগে না জঙ্গল। ভালো লাগে না এই জংলী পরিবেশ, আরো বেশি করে ভালো লাগে না হয়ত আমার সঙ্গ।
দোলনায় বসে হল্যান্ড সাহেবের কাছ থেকে চেয়ে-আনা বাসি খবরের কাগজ পড়ছি, এমন সময় কুয়োতলার দিক থেকে কাদের যেন একটা গরু ঢুকলো হাতার মধ্যে।
ওদিকে মালু বেগুন আর টোম্যাটো লাগিয়েছিল। মালুকে ডাকতেই, মালু দৌড়ে গিয়ে তাড়িয়ে দিল গরুটাকে।
গরুটা কাঁটাতারের বেড়া পেরুনোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তারের পাশে একটি ছোট ছেলে এসে দাঁড়াল।
মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, চিরুনি ও তেল পড়েনি বহু বছর প্রায়–পরনে ছেঁড়া জামা–কোনো প্রমাণ সাইজের ফুলপ্যান্ট গুটিয়ে পরেছে। সমস্ত চেহারার মধ্যে এমন একটা রুক্ষতা যে কি বলব।
মালুকে শুধোলাম, এ ছেলেটি কে?
মালু বলল, লাবুবাবু।
লাবুবাবু কে?
লাবুবাবু, ডাবুবাবুর ভাই।
মালুর উত্তরে কিছুই পরিষ্কার হলো না, বললাম, ডাকো ত লাবুবাবুকে।
প্রথমে লাবুবাবু আসতে চাইল না, শেষকালে যখন এসে আমার সামনে দাঁড়াল তখন দেখলাম তার দু চোখে ভয়ের ছায়া।
বয়স দশ-এগারো হবে, হাতে গরু তাড়াবার ছোট একটি লাঠি। নীচের ঠোঁটটি ফেটে দু-ফাঁক হয়ে গেছে। রক্তাক্ত দেখাচ্ছে ঠোঁটটা। চোখ দুটো কটা কটা। সমস্ত শরীর এখানের প্রচণ্ড শীতে শীতার্ত।
শুধোলাম, তোমার নাম কি?
লাবু।
কোথায় থাক?
ঐখানে। কর্নেল সাহেবের বাড়ির পাশে।
বাড়িতে কে কে আছেন?
মা, আর দাদা।
বাবা নেই?
না। বাবা অনেক দিন আগে মারা গেছেন।
লাবু ভাঙা ভাঙা বাংলা বলছিল। বাংলা শুনে মনে হয় না যে বাঙালি। লাবু বলল, ওর ভার গরু চরানো, গরমের সময় মহুয়াও কুড়োয়। ওদের অনেক জমি আছে। নিজেরা লাঙল দেয়, নিজেরাই গরু দোয়ায়, চাষ করে। লাবুর দাদা ডাবু খিলারির স্কুলে পড়ে। লাবু চুরি করে একদিন আচার খেয়েছিল, তাই তার দাদা তাকে শানবাঁধানো বারান্দায় আছাড় দেওয়াতে তার ঠোঁট কেটে যায়। ঠাণ্ডায় তাই ঠোঁটখানির অমন বীভৎস অবস্থা।
লাবুকে শুধোলাম, তুমি আসছিলে না কেন? তোমাকে যখন ডাকছিলাম?
লাবু স্বীকারোক্তি করল, গরু ঢুকেছে বলে আমি যদি মারধোর করি সেই ভয়ে ও আসতে চাইছিল না। গরুগুলো ধরে খোঁয়াড়ে দিলেও বিপদ হত।
লাবুকে বিস্কিট খাওয়ালাম। বললাম, তুমি কি কি খেতে ভালোবাস?
ও বলল, কিছু না। তারপর অনেক পীড়াপীড়ি করাতে বলল, ছোলার ডাল আর রসগোল্লা।
আমি হেসে বললাম, আচ্ছা তোমাকে আমি ছোলার ডাল আর রসগোল্লা খাওয়াব।
লাবুকে বললাম, আমি তোমার দাদার মত। যখনি ইচ্ছে করে চলে এসো, তোমার সঙ্গে গল্প করব, আমাকে ভয় পেও না, বুঝলে?
লাবুর কথাটা বিশ্বাস হলো না। দুই ছেঁড়া পকেটে দুহাত গলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, আমার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে তারপর বলল, আসি, কেমন?
লাবু চলে যাওয়ার পর দুখন মাহাতো কঙ্কা বস্তী থেকে মাটির হাঁড়িতে দুধ নিয়ে এল। কার্নি মেমসাহেবের লোক কালো টিনের বাক্স মাথায় করে পাঁউরুটি আর খাস্তা বিস্কুট দিয়ে গেল। কসাই হানিফ; সব্জীওয়ালা রহমান এল। রহমান পাকদণ্ডী পথে এগারো মাইল পায়ে হেঁটে প্রতি সোমবার সঁসের হাটে যায়, সেখান থেকে সব্জী কিনে বাঁকে করে ম্যাকলাস্কিগঞ্জের বাড়ি বাড়ি সব্জী বিক্রি করে।
ম্যাকলাস্কিতেও হাট বসে–শুক্রবারে, হেসালঙে।
হেসালঙ, লাপরা এবং কঙ্কা এই তিনটি বস্তী নিয়ে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ। আমি যে অঞ্চলে বাড়ি ভাড়া নিয়েছি, সে অঞ্চলের নাম কঙ্কা।
স্টেশান, বেশির ভাগ দোকানপাট যেখানে সেদিকটার নাম লাপরা। আর খিলাড়ির দিকের রাস্তার গাঁয়ের নাম হেসালঙ।
হেসালঙের বসতির দিকটা ফাঁকা ফাঁকা–জঙ্গল ওদিকে গভীর নয়। লাপরার দিকে ত জঙ্গল নেই বললেই চলে।
জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে লালমাটি ও পাথর ভরা যে অসমান পথটা চামার দিকে চলে গেছে সেই রাস্তার দুপাশে লাল টালির ছাদওয়ালা সব বাংলো। এ বাড়িতে আসতে সেই কাঁচা রাস্তা ছেড়ে আরো ভিতরে ঢুকতে হয়।
চতুর্দিকে শাল সেগুনের জঙ্গল। আর পিটিস এবং নানারকম জংলী ফুল। এখানে এখন একরকম জংলী হলুদ ফুল হয়, সানফ্লাওয়ারের মত। বাড়ির পেছনদিকটা সেই ফুলে ছেয়ে গেছে। হাজার হাজার ফুল পাকদণ্ডী পথটার দুপাশে ভরে আছে। চোখ চাইলে চোখে হলুদ নেশা ধরে।
পৃথিবীতে এখনো যে এমন জায়গা আছে, যেখানে স্টেশানে নেমে, নিজের মাল হাতে করে যার যার বাড়ি হেঁটে আসতে হয়–সে ছ মাইলই হোক কি চার মাইলই হোক, তা ভাবা যায় না। এখানে ভাড়ার জন্যে কোনো ট্যাকসি, রিক্সা, গরুগাড়ি অথবা ঘোড়াগাড়িও নেই।
লালি পেয়ারাতলায় বেতের চেয়ার-টেবল পেতে নাস্তা লাগিয়ে দিয়েছিল। নাস্তা শেষ করে বাড়ির পিছনটা ঘুরে দেখছি। ধনেপাতা আর কাঁচালঙ্কা লাগানো হয়েছে। এদিকে–আদাও আছে কুয়োতলার পাশে পাশে পুদিনার ঝাড় লেগেছে। ধান লাগাতে দেরি হয়ে গেছিল, নীচু জমিতে–তাই ধান ভাল হয়নি এবার। বৃষ্টিও এবারে খুব কম হয়েছে।
কুয়োতলার পাশ দিয়ে পাহাড়ি নালাটা গেছে এঁকেবেঁকে। বাড়ির এই-ই সীমানা। বাড়ির তিন পাশ দিয়ে নালাটা ঘুরে গেছে।
আজ থেকে দশ বছর আগে এ নালা দিয়ে প্রতিরাতে বড় বাঘ যাওয়া-আসা করত।
এখনো হায়না যায়, গরমের দিনে মহুয়ালোভী একলা ভালুক। আর চুপি চুপি আসে লুমরীরা। পা টিপে টিপে আসে, পা টিপে টিপে শুকনো পাতা মচমচিয়ে পালিয়ে যায়।
রাতে শুয়ে শুয়ে তাদের আসা-যাওয়ার শব্দ শুনি। কখনো কখনো নেকড়ে বাঘ আসে মুরগী ও ছাগল ধরতে। দেঁহাতীরা বলে রাতেরবেলা এই নালা দিয়ে ভূতেরাও যাওয়া-আসা করে। নানারকম ভূত।
মাঝে লালির অসুখ করেছিল; একটি ছেলেকে পেয়েছিলাম রান্না করার জন্যে। তাকে শুতে বলা হয়েছিল রান্নাঘরে;–শীতের রাতে উনুনের গরমে আরামে শোবে বলে।
প্রথম দিন কাজ করল, তারপর প্রথম রাত পোয়ালে দেখি সে আর ওঠে না।
সকাল আটটা বাজল, চা দেওয়ার নাম নেই। দরজা ধাক্কিয়ে তাকে জাগাতেই সে কাঁদতে আরম্ভ করল, বলল, আমাকে এক্ষুনি ছুটি দিন বাবু, আমি এখানে এই জঙ্গলে কাজ করতে পারব না।
কি হয়েছে শুধোতে সে বলল, সারা রাত ভূতেরা এই নালায় ধমর-ধামর করে শুকনো পাতায় নেচেছে, নানা রকম আওয়াজ করেছে, একশ টাকা মাইনে দিলেও সে এখানে চাকরি করবে না।
অতএব তাকে তক্ষুনি ছুটি দিতে হয়েছিল।
কুয়োর পাশে পাশে অনেকগুলো জংলী জাম এবং আমলকিগাছ গজিয়েছে। একদল টিয়া এসে তাতে ঝাঁপাঝাঁপি করছে। আমলকির ডালে-বসা টিয়ার ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় মালু বলল, বাবু খত আয়া।
মালু পোস্টাফিসে গেছিল খত্ আনতে। এখানে ডাকপিওন নেই। সকাল এগারোটায় যখন গাড়ি আসে আপ-ডাউনের, তখন প্রত্যেককে যেতে হয় পোস্টাফিসে।
পোস্টমাস্টার একে একে নাম পড়ে যান–যে যার চিঠি নিয়ে বাড়ি ফেরে। এখানের হাট এবং পোস্টাফিস হচ্ছে ক্লাবের মত–সকলের দেখা-হওয়ার জায়গা।
খামের চিঠি, হাতের লেখাটা দেখেই অবাক হলাম। অবাক নয়, বলা উচিত উত্তেজিত হলাম। এ চিঠি এমন একজন লিখেছে যার কাছ থেকে চিঠি এলে আমার স্বাভাবিক কারণেই উত্তেজিত হবার কথা।
চেয়ারে বসে চিঠিটা খুললাম। ছুটি লিখেছে। রাঁচী থেকে।
রাঁচী
১০/১১/৭২
সুকুদা,
আপনি নিশ্চয়ই আমার চিঠি পেয়ে অবাক হয়ে যাবেন, কিন্তু অবাক হওয়ার মত কিছু আছে বলে আমি ত জানি না।
বহু দিন হল আপনার কোনো চিঠি পাই না। কিছু দিন আগে কোলকাতায় গেছিলাম।
অনেকদিন আপনাকে দেখিনি–তাই খুব দেখতে ইচ্ছে হওয়ায় সমস্ত ঝুঁকি নিয়েই আপনাদের কেয়াতলার বাড়িতে গেছিলাম। বৌদি ছিলেন না।
অবশ্য না-দেখা হয়ে ভালই হয়েছে, দেখা হলে আমি খুবই এমবারাসড ফিল করতাম। যে দোষে আমি দোষী নই, দোষী ছিলাম না কোনো দিনও, সেই দোষের জন্যে মনে মনে উনি আমাকে অনেক শাস্তি দিয়েছেন। অবশ্য একথাও জানি যে, সেই শাস্তির বোঝা বইতে হয়েছে আপনাকে, কখনো প্রতিবাদের সঙ্গে, কখনো বিনা প্রতিবাদে।
এমন অসুখ কি করে বাধিয়েছিলেন জানি না।
ভগবানের দয়ায় আপনার কোনো কিছুরই অভাব ছিল না, নিজেকে সুখী করার সমস্ত রকম উপাদান আপনার মধ্যে ছিল, একজন পুরুষমানুষ জীবনে যা চাইতে পারে তার সব কিছুই আপনি পেয়েছিলেন অথচ তবু সব জেনে-শুনে আপনি এমন নিজেকে নির্দয়ভাবে নিপীড়নের পথ বেছে নিলেন।
কার উপর অভিমানে আপনি এমন করে নিজের প্রতি অযত্ন করে এই অসুখ বাধালেন?
আপনার সঙ্গে দেখা হলে খুব ঝগড়া করব।
আপনাদের বাড়িতে শুনলাম আপনি আরো মাস ছয়েক ওখানে থাকবেন। আপনার উপর কতখানি রাগ করে আছি তা আমার সঙ্গে দেখা হলে বুঝবেন। আপনি রাঁচী হয়ে গেলেন, অথচ আমাকে একটা খবর পর্যন্ত দিলেন না। ওখানে এত দিন হল আছেন, রাঁচী থেকে মাত্র পঁয়ত্রিশ মাইল পথ, অথচ আমাকে ওখান থেকেও জানালেন না যাতে একদিন আপনার সঙ্গে দেখা করে আসতে পারি।
আপনি নিজেকে কি ভাবেন জানি না। আপনি আমাকেও কি ভাবেন তাও জানি না। আপনাকে কি আজ মনে করিয়ে দিতে হবে যে, আপনার অশান্তি যাতে না বাড়ে, আপনি যাতে বেশি করে দুঃখ না পান, শুধু সেই জন্যেই কোলকাতার বন্ধু বান্ধবী, আত্মীয়স্বজন সব ছেড়ে একজন সদ্য এম-এ পাশ-করা অল্পবয়সী অবিবাহিতা মেয়ে একা এখানে চলে এসেছিলো?
এক সময় আপনি আমাকে একদিন না দেখতে পেলে পাগলের মত করতেন, অথচ আমাকে শুধু একবার চোখের-দেখা দেখার জন্যে আপনাকে যে কষ্ট ও অনেক সময় অপমানও সহ্য করতে হত তা আর কেউই না জানুক, আমি জানতাম।
সে কষ্ট আমার পক্ষে অসহ্য ছিল। আমার প্রতি আপনার এক অদ্ভুত আচ্ছন্ন, আবেগময় এবং মাঝে মাঝে এখন মনে হয়, হয়ত অন্তঃসারশূন্য ভালোবাসার দাম দিতে গিয়ে আমার সমস্ত সখের জীবনটাই প্রায় দিতে বসেছি–অথচ আপনি এমন নিষ্ঠুর যে আমার এত কাছে থেকেও আজ আমাকে একবার দেখতেও ইচ্ছে করল না আপনার। একবার দেখা দিতেও না।
আপনি বলতেন, মেয়েরা ভালোবাসার কিছু বোঝে না। এমন ভাব করতেন, যেন পৃথিবীতে কাউকে ভালোবাসার মানে কি তা একমাত্র আপনিই বুঝতেন।
অন্য পুরুষদের কথা জানি না, কিন্তু আপনাকে দেখে যদি ছেলেদের ভালোবাসার সংজ্ঞা স্থির করতে হয় তবে তা সমস্ত পুরুষ জাতির পক্ষে বড় কলঙ্কের হবে।
রাঁচীর রাতু বাস স্ট্যান্ডে আমি খোঁজ নিয়েছি–বিকেলে ম্যাকলাস্কিগঞ্জের বাস ছাড়ে এখান থেকে। সন্ধ্যের পর সেখানে পৌঁছয়। আপনার বাড়ি আমি চিনি না, শুনেছি খুব জংলী জায়গা।
এ পর্যন্ত অনেক কিছুই একা একা খুঁজে নিয়েছি, চিনে নিয়েছি, তাই চিনে নিতে পারব না এমন ভয় নেই। একদিন লক্ষ লোকের মাঝ থেকে আপনাকে চিনতে যখন ভুল হয়নি, আজ অন্ধকার জঙ্গলে আপনার বাড়ি চিনতেও কষ্ট হবে না আশা করি।
আপনি কেমন আছেন? এখনো কতখানি অসুস্থ আছেন জানতে ভীষণ ইচ্ছা করে। এখনো কি সত্যিই অসুস্থ আছেন?
আমি আগামী শনিবার আপনার ওখানে যাচ্ছি। শনিবার রাত ও রবিবার আপনার ওখানে থেকে সোমবার ভোরের বাসে রাঁচী ফিরে আসব।
আমাকে আটকে রাখার চেষ্টা করবেন না। সময়ের আগে যেন তাড়িয়েও দেবেন।
আপনাকে বহু দিন বলেছি, যা দিতে পারি, সেটুকু দেওয়ার আনন্দ থেকে আমাকে বঞ্চিত করে, যা দিতে পারি না তা না-দেওয়ার বেদনাকে আরো তীব্র করবেন না।
আশা করি, আপনি আমাকে বুঝবেন।
আপনার চোখে আমি কি এবং কতখানি শুধু এ কথাই আপনি বারবার জানিয়েছেন, আপনি কোনোদিন সত্যিকারের আমার চোখে আপনি কি এবং কতখানি তা বোঝেননি এবং বুঝতে চাননি।
আপনার হয়ত অনেক আছে, অনেকে আছে, কিন্তু আমার আপনি ছাড়া আর কেউ নেই এত বড় পৃথিবীতে। আপনার মত করে এই অল্পবয়সের জীবনে আমাকে কেউ ভালোবাসেনি; অমন করে কেউ ভালোবাসতে জানে না।
আমার জীবন থেকে আপনি কিছু দিনের জন্যে হারিয়ে গেছিলেন, স্বল্পদিনের জন্যে। যার সামান্যই থাকে, সেই অসামান্যটুকু হারানোর দুঃখ যে কি, তা আমার মত করে আর কেউই জানেনি।
সোমবারে আমি ক্যাজুয়াল লিভ নেব। ধীরে সুস্থে রাঁচী ফিরলেই হবে।
আমি আসছি এ খবর শুনে আপনার শরীর নিশ্চয়ই বেশি অসুস্থ হবে না। অসুস্থ হলেও আমার কিছু করার নেই। আপনি বরাবরই স্বার্থপর। নিজের সুখের জন্যে চিরদিন আপনি অন্যকে দুঃখী করেছেন অথচ কোনোদিন অন্য কারো দুঃখের খোঁজ রাখেননি।
আমি জানি, আপনি নিশ্চয়ই এখন ভালো আছেন। আপনাকে ভালো থাকতেই হবে। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, যতদিন আমার নিঃশ্বাস পড়বে, ততদিন আপনার কোনো রকম ক্ষতি হতে দেব না। পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই যা আপনার ক্ষতি করে।
ইতি–আপনার অনাদরের ভুলে-যাওয়া ছুটি।
 
Back
Top