paaglajogaai

New Member
Registered
Joined
May 2, 2025
Threads
2
Messages
3
Reaction score
0
Points
1
Location
Bangladesh
Referrer
dukhopakhi
Gender
Male
১.

ভরা আষাঢ়। ঝুম বৃষ্টি চলছে সকাল থেকে। আকাশটা যেন কোনো এক বিষণ্ণ গৃহবধূ। বাপের বাড়ি যেতে না পারার দু:খে হঠাৎ ফুঁপিয়ে কাঁদছে, কখনো বা চোখ মুছে একটুখানি শান্ত হয়ে ঘরকান্না করছে, পরক্ষণেই আবার ডুকরে উঠছে। বেলা এগারোটার দিকে বৃষ্টিটা একটু ছিয়াটি দিল। একটা নীল রঙের ছাতা মাথায় নিয়ে নাবিল গলির মুখে দাঁড়াল। নাবিলের ঠিক পেছনে দাঁড়াল কালো ছাতার মালকিন, সুমিতা। ডানদিকের শেষ আড়াইতলা বাড়িটা ওদের গন্তব্য। বাড়িটা লিটনের, নাবিলের বন্ধু, ইতালি প্রবাসী। লিটনের তিন বছর বয়সে ওর মা মারা যান। বাবা আর এক ফুপু মিলে বড় করেছেন লিটনকে। লিটনের বাবাও বছর দুয়েক আগে মারা গেছেন। সেই থেকে বাড়িটা প্রায় খালিই পড়ে থাকে। দুইটা ভাড়াটে আছে অবশ্য, নীচতলায়। নাবিলই ভাড়াটাড়া তোলে। দুইতলার উপরে টিনের ছাউনি দেওয়া চিলেকোঠার ঘরটা নবিল আপদ বিপদে ব্যবহার করে। এই যেমন আজকের আপদ সুমিতাকে নিয়ে নাবিল পড়েছে মধুর বিপদে। সুমিতা নাবিলের প্রাইমারি স্কুলের বন্ধু। রীতিমত শাঁখা- সিঁদুর পরা গেরস্ত ঘরণী, অন্যের। নাবিলের তাতে কিছু আসে যায় না। নাবিলের জীবনে নারীরা আসে ট্রেনের মতো; সময় মেনে আসে, চলেও যায়।

আড়াইতলায় ওঠার সিঁড়িগুলো স্যাঁতসেঁতে। আধো অন্ধকার আর নোনা ধরা দেয়ালের মাঝেই এক টুকরো নিষিদ্ধ স্বর্গ। টিনের ফাঁক ফোকড় দিয়ে আসা মৃদু আলোর তড়পানি অপরাধের সুখ দ্বিগুণ করে তোলে। বাইরে আবার তোলপাড় করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দে যেন আদিম, বুনো কামনার তাড়া। সুমিতা ঘরে আগে ঢুকল, পেছন পেছন নাবিল ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ঘরের ভেতরের সময় দুই লাহমা স্থির থাকে। যেন দুটো সেকেন্ড পৃথিবীর ঘড়ি থেকে কেউ মুছে দিয়েছে। এরপর শুরু হয় উন্মত্ততা। কৃত্রিম পোশাকের বাঁধন আলগা হতে হতে একসময় দুজন আদিম পোশাকে একে অন্যের বাহুডোরে ডুবে যায়। একে অপরকে আবিষ্কারের এক পর্যায়ে সুমিতা নাবিলের শরীরের বিশেষ অংশে মুখ ডোবাল। তীব্র শিহরণ নাবিলের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। সে আবেশে চোখ বুজে ফিসফিসিয়ে বলল, "কী করিস, সুমি?" সুমিতা এক মুহূর্ত স্তব্ধ রইল। মাথা তুলে নাবিলের চোখে চোখ রেখে হাসল। হাসিটা ঝরল চোখ থেকে, যেন দু'ফোটা মদিরা বেয়ে পড়ল। সে ঠোঁটটা প্রায় না নাড়িয়ে বলল, "গাড়ল! ফোনটা দে। ভিডিও কল কর। লাইভে দেখ কী করি।" নাবিল চমকে ওঠে। হায়রে কামিনী! কিন্তু সেই ঘোর লাগা ভেজা দুপুরে ভাবনার অবকাশ ছিল না। টিনের চালের বৃষ্টির তালে তালে বাড়ে তাদের উন্মত্ততা।

একটু পর বৃষ্টি কমে এলে প্রেমিক- প্রেমিকা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। চারদিকে থৈথৈ পানি। পানি নেমে যাচ্ছে নিচুতে। সাথে বিয়ে যাচ্ছে আবর্জনা। সাবধানে আবর্জনা বাঁচিয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে চলল তারা। স্ট্যান্ডের পাশেই নূরজাহান বেকারি। সেখানে আসতেই সুমিতা বাচ্চাদের মতো বায়না ধরল, "আইসক্রিম খাব। ললি।" নাবিল হাসে। নারীরা অদ্ভুত। একটু আগের সেই রিরংসা খুঁজেই পাওয়া যায় না সুমিতার চেহারায়, যেন ফ্রক পরা স্কুলছাত্রী। নাবিল যখন ললির দাম দিচ্ছে, ঠিক তখনই তার ঘাড়ে একটা আঙুলের টোকা পড়ল। হালকা, কিন্তু ভীষণ পরিচিত এক স্পর্শ।



২.

নাবিল প্রবল বিরক্ত হয়ে ঘাড় ঘোরাল। কিন্তু পেছনের মানুষটাকে দেখামাত্র তার হাত নিথর হয়ে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি নাদুস-নুদুস, কালো বোরখা দিয়ে আগাপাশতলা ঢাকা, কপাল আর চোখজোড়া যা একটু দেখা যায়। অন্য কেউ চিনতে না পারলেও নাবিলের চিনতে এক সেকেন্ডও লাগল না। এই চোখ, এই বোরখা ঢাকা শরীর, শরীর থেকে ঠিকরে পড়া উষ্ণতা তার চেনা, খুব চেনা। মেয়েটা তারিন। নাবিলের ডায়েরির আরেক জটিল পাতা। সপ্তাহখানেক আগেই তারিন প্রচণ্ড মার খেয়েছে স্বামীর হাতে, নাবিলের সাথে যোগাযোগ রাখার অপরাধে। ফোনটাও কেড়ে নিয়েছে। সেই থেকে ওদের যোগাযোগ বন্ধ।

প্রবল বর্ষার এই জল-কাদায় তারিন যে তার সামনে এসে দাঁড়াবে এটা নাবিলের চরমতম দু:সাহসিক কল্পনাতেও আসেনি। কিন্তু তারিন এসেছে। এবং পরিস্থিতি বুঝেছে। সে একজনের সংসার সামলায়, একটা ছয় বছরের মেয়ে সামলায়, মাঝে মাঝে নাবিলকেও সামলায়। সে বোকাতো নয়ই, তার চোখেও কোন সমস্যা নেই। সুমিতার গলার নিচে হালকা লালচে কাঁচা দাগটা সে ঠিকই দেখেছ। কিন্তু সে কোন প্রতিক্রিয়ায় দেখালো না।

নাবিলও কম ঘাগু মাল নয়। সে এক সেকেন্ডে নিজেকে সামলে নিয়ে সুমিতাকে বলল, "দিদি, তুমি তাহলে যাও। ব্লাড নিয়ে টেনশন করার দরকার নেই। আমি তো মরে যাইনি। দেখছি।" সুমিতা বুদ্ধিমতী। সে পরিস্থিতি আঁচ করে কোন রকমে একটা সাফাই দিয়ে দ্রুত কেটে পড়ল।

এবার নাবিল তারিনের দিকে ফিরল। বুকের ভেতরটা তখনও দুরুদুরু করছে। হড়বড় করে বলল, "তুমি এই বৃষ্টিতে? শরীর ঠিক আছে? মেয়েটা ভালো আছে?" তারিন চোখ দু'টো হাসল। কোনো রাগ নেই, নেই অভিমান। অতি স্বাভাবিক হাসি। সে বলল, "চল, কথা আছে অনেক। জরুরি কথা।"

নাবিল আর কোথায় যাবে? উপায় না দেখে আবার সেই স্যাঁতসেঁতে লিটনের আড়াইতলার দিকেই পা বাড়াল।

ঘরের দরজা বন্ধ হতেই তারিন বোরখার খোলস থেকে বের হল। তার ফর্সা পিঠে এখনো কালশিটে! কিন্তু তার চোখে ক্ষিদে। সে যেন এক সপ্তাহ ধরে শিকার না পাওয়া বাঘিনী। নাবিলকে সে কোনো কথা বলার সুযোগই দিল না।

কিছুক্ষণ পর, বাইরের বৃষ্টি আর ভেতরের ঝড় যখন থামল, জানলা দিয়ে তখন মেঘভাঙা পড়ন্ত দুপুরের আলো এসে পড়েছে। নাবিলের মাথা তারিনের উদোম পেটে। তারিন খুব শান্ত ভঙ্গিতে নাবিলের চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে।

৩.

বৃষ্টি ঝরে গেছে। সূর্য এখনো মেঘের আড়াল থেকে পুরোপুরি সুবিধা করে উঠতে পারেনি। গা ধুয়ে, কাপড় ঠিক করে তারা যখন আবার রাস্তায় বের হলো, তখন চারপাশটা ঝা তকতকে। মনে হচ্ছে কেউ যেন এই মাত্র যত্ন করে সব মুছেছে। আবার সেই বাস স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা। হাঁটতে হাঁটতে নাবিল আর থাকতে পারল না। অপরাধবোধ আর কৌতুহল তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। সে জিজ্ঞেস করল, "তারিন, কেন এসেছিলে? কিছু তো বললেও না।" তারিন থামল। একটু হেসে নাবিলের চোখের দিকে তাকাল। অনেক কিছু দেখার ক্লান্তিতে তারিনের চোখ ক্লান্ত, কিন্তু স্নিগ্ধ। সে বলল, "চলে এসেছিলাম গো নাগর। সব ফেলে, এক কাপড়ে তোমার কাছে। ভেবেছিলাম দুনিয়ায় কেউ না থাকলেও তুমি থাকবে। কিন্তু তুমি যে আজ আমার চোখ খুলে দিলে।" নাবিল স্রেফ হা করে তাকিয়ে রইল। একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারল না। তারিন বলে চলল, "জানি আমি তোমার জীবনের একমাত্র মেয়ে নই, তুমিও নও একমাত্র পুরুষ আমার জীবনে। কিন্তু আমি যে দিনরাত মার খেয়ে মরছি, আর তুমি আমার বিরহে একটা দিনও নষ্ট না করে অন্য মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করছ—এটা আমি একদমই ভাবিনি। অবশ্য আমিও সাধু নই, স্বামীর ভাত খেয়ে তোমার বিছানায় আসি। কাজেই তোমার কাছে সাধুগিরি আশা করাটা আমার বোকামি। বোকামিটা আজ একটু বেশিই করেছিলাম।" নাবিল মাথা নিচু করে রইল। একটা রিকশায় উঠতে উঠতে তারিন বলল, "তুমি দুশ্চিন্তা করো না। মন চাইলে জানিও। সুযোগমত আমি আসব। দুই-একের মধ্যে ফোনটা ফেরত পাব। তখন যোগাযোগ হবে।" তারিনের রিকশা চলতে শুরু করল।

তারিন চলে যাওয়ার পর রেলস্টেশনের একটা আধাভেজা পাথরের বেঞ্চে গিয়ে বসে নাবিল। একটা লোকাল ট্রেন চলে গেল বিরক্ত না করে, কিন্তু নাবিলের মনের কেন্নোটা গেল না, বিরক্ত করেই যাচ্ছে অবিরত।

তারিন যদি সত্যিই ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসে থাকে, তবে নাবিলের শঠতা হাতে-নাতে ধরেও সে কেন এত নিস্পৃহ থাকল? কেন কোনো বাড়াবাড়ি না করে এতটা অন্তরঙ্গ হল? আর কেনই বা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিয়ে গেল? এই মিলন কি ভালোবাসার, নাকি প্রতিশোধের? নাকি অন্য কিছু?

নাবিল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আকাশে তখন শেষ বিকেলের মরা আলো। হায়রে নারী! নদীর তলও মাপা যায়, কিন্তু নারীর মনের অতল মাপা পুরুষের সাধ্য নয়।
 
Back
Top