- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 445
- Messages
- 7,050
- Reaction score
- 5,052
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
তিথিডোর
মূল লেখকঃ বুদ্ধদেব বসু
মূল লেখকঃ বুদ্ধদেব বসু
পর্ব - ১
রাজেনবাবু মানুষটি একটু শৌখিন। শৌখিন মানে বাবু নয়। হাঁটুর কাছে কাপড় তুলে, দু-হাতে দুই ঝুলি নিয়ে বাজার করে আসতে আপত্তি নেই তার, কিন্তু শোবার সময় বালিশে একটু সুগন্ধ চাই। এক জামা পরে সপ্তাহের ছদিন আপিশ করবেন, এদিকে কাচের গেলাসে ছাড়া জল খাবেন না। ঠিকে-ঝি কামাই করলে রাত থাকতে বিছানা ছেড়ে উনুন ধরিয়ে রাখবেন, তারপর বারান্দার ভাঙা তক্তায় খালি গায়ে বসে গুনগুন করবেন— ভৈরবী কি যোগিয়া।
পনেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়ে, বাপের বাড়িতে এক বছর কাটিয়ে শিশিরকণা প্রথম যখন স্বামীর ঘর করতে এলেন, স্বামীর এসব ছোটোখাটো শখগুলি তার মনে বিশুদ্ধ কৌতুক জাগিয়েছিল। এমন কি এর কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ও তিনি দিয়েছিলেন বিছানার তলায় অগুরুর শিশি লুকিয়ে রেখে–তার চেয়েও বেশি, ঠিকে-ঝির সাহায্যে সংগৃহীত কয়েকটি পথে-ঝরা বকুল কোনো রাত্রে নিজের আঁচলে বেঁধে নিয়ে। সুগন্ধ ভালো, সুগন্ধের উৎসটা আরো ভালো হতে দোষ কী? কয়েক মাস পরে শিশিরকণা যখন অন্তঃসত্ত্বা হলেন আর রাজেনবাবু বললেন— বেশ হল, ছোট্ট ফুটফুটে একটা মেয়ে হবে, বেশ—তখন স্বামীর এই নতুন শখটিতে বেশি সুখী না হয়ে তিনি বললেন–কেন, মেয়ে কেন?
—ছেলে হলে তো শুধু হাফপ্যান্ট আর ডান্ডাগুলি। আর মেয়ে? রং-বেরঙের ফ্রক, রিবন, ঝাকড়া-ঝাকড়া, কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল—আর একটু বড়ো হলে তো কথাই নেই। কিন্তু স্বজাতির সংখ্যাবৃদ্ধির সম্ভাবনায় শিশিরকশাকে বিশেষ উৎফুল্ল দেখা গেল না। যে রকম কথা নিজের মার মুখে অনেকবার তিনি শুনেছেন, তারই পুনরুক্তি করলেন এই ভাবী-মা—ফ্রক, রিবন, বাঃ! মেয়ের শিক্ষার ব্যবস্থা তো ভালোই!
তা তুমি যা-ই বলল, একটা মেয়ে থাকলে ঘর আলো।
কয়েক মাস পরে আলো হল ঘর। আর তিন দিন পরে রাজেনবাবু তার শেীখিনতার আর একটি নমুনা দেখালেন। মেয়ের নাম তিনি রাখলেন শ্বেতা।-না বাবা, আঁতুড়ঘরের দরজায় বসে বলে উঠলেন শিশিরকণার বিধবা পিসিমা-সীতা নাম রেখো না, বড়ো দুঃখিনী সীতা। সীতা নয়, শ্বেতা-গম্ভীরভাবে রাজেনবাবু বললেন, তালব্য-শ আর ব-ফলা দুটোই স্পষ্ট উচ্চারণ করে।
ওসব বিলিতি নাম আমাদের মুখে তো আসবে না, তবে হ্যাঁ–মেয়ে তোমার মেমের মতোই রূপসী হবে।–বিলিতি নয় তো-রাজেনবাবুর কথা কেটে দিয়ে আর একটি কণ্ঠস্বর উঠল আঁতুড়-ঘরের ভিতর থেকে—ওঁর কথায় তুমি আবার কান দাও পিসিমা, ওঁর তো ঐরকমই! মেয়ের নাম আমি মঞ্জু রেখেছি। শেষের কথাটি শিশিরকণা একটু চেঁচিয়ে বললেন, যাতে যথাস্থানে নির্ভুলভাবে পৌঁছয়। পৌঁছলো, কিন্তু যথাস্থানটি অবিচলিত। মাসখানেকের মধ্যে একটা নামের লড়াই লেগে গেল বাড়িতে। মেয়েকে বুকে চাপড়ে-চাপড়ে আদর করেন শিশিরকণা-মঞ্জু-মঞ্জুল–মঞ্জুলি-ই। আর রাজেনবাবু ঠিক সুরে সুর মিলিয়ে বলে ওঠেন-মঞ্জু-ঝুমঝুম-লজনচু–ষ! তারপর কাছে এসে মেয়ের গালে একটু আঙুল ছুঁইয়ে ডাকেন-শ্বেতা! চোখের পাতা মিটমিট করেন কন্যা, যেন এই নামই তার পছন্দ। তা হতেই পারে, যা ফুটফুটে ফর্সা!
প্রথম সন্তান যুবক পিতার কণ্টক, এ কথা যাঁরা বলেন, নিশ্চয়ই তারা রাজেনবাবুকে দ্যাখেননি। হাঁটু কেঁকে-বেঁকে মেয়েকে ঘুম পাড়াচ্ছেন তিনি, বোতলে দুধ খাওয়াচ্ছেন, কোলে নিয়ে বেড়াচ্ছেন বিকেলে, রাত্তিরে বদলে দিচ্ছেন কথা। প্রথম ছ-মাসের মধ্যে একটি রাত্রিও ঘুমের ব্যাঘাত হল না নতুন মার, বাঙালি পরিবারের পক্ষে যার তুল্য আশ্চর্য কথা আর নেই। কিন্তু এ সুখের একটি দাম দিতে হল। শ্বেতার জামাটা কোথায়-শ্বেতার পাউডারটা দাও—শ্বেতা তো খুব ঘুমোচ্ছ আজ—সব সময় এই শুনতে শুনতে শিশিরকণাও মাঝেমাঝে শ্বেতা বলে ফেলতে লাগলেন। প্রথমে ঠাট্টা করে তোমার শেতা! যেমন—তোমার শেতার তো রূপের খ্যাতি হচ্ছে খুব, কি-শ্বেতা কী রকম হাসে দেখেছ? তারপর শুধুই শ্বেতা। সীতা কিংবা সীতুও নয়, একেবারেই শ্বেতা। মঞ্জু যুদ্ধে হেরে দেশান্তরী হল, রাজেনবাবু মহৎ যোদ্ধার মতো নিজের জয় মেনে নিলেন সবিনয়ে।
দেড় বছর পরে আর একটি মেয়ে যখন জন্মাল, রাজেনব বু তক্ষুনি তার নাম দিলেন মহাশ্বেতা। তৃতীয় কন্যাটি অতদিনও সবুর করল না। মহাশ্বেতার সঙ্গে চোদ্দ-মাসের ব্যবধান রেখে শিশিরকশার কোলে এল সরস্বতী।
থাক, থাক, আর সোহাগ করে নাম দিতে হবে না—শিশিরকণা বলে উঠলেন।
নাম তো একটা চাই—
ছাই!–নিজের অজান্তে শিশিরকণা একটা পদ্য রচনা করে ফেললেন। দ্বিতীয়বারে তাঁর বিশ্বাস ছিল, ছেলে হবে। তবু মহাশ্বেতাকে সহ্য করেছিলেন ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু এবারেও! তিনতিনটে মেয়ে। তার বিরক্তি, তার বিক্ষোভ আর তিনি গোপন রাখতে পারলেন না। রাজেনবাবু বললেন—কী সুন্দর চুল হয়েছে সরস্বতীর!
হয়েছে, হয়েছে, যাও এখন—বলে শিশিরকণা নবজাতার একমাথা কোঁকড়া চুলের দিকে একটু তাকালেন আড়চোখে। কেন, তিনটি সুন্দর সুন্দর মেয়ে, ভালো লাগে না তোমার? ও, এখনো মেয়ের শখ মেটেনি দেখছি! তোমার জন্যই, তোমার জন্যই তো খালি-খালি মেয়ে হচ্ছে আমার, আর মেয়ের নাম মুখেও এনো না। কিন্তু মুখে না আনলে হবে কী, রাজেনবাবুর মনের এই একটি শখ ভালোরকম মিটিয়ে দিতে ভাগ্যবিধাতার আশ্চর্য তৎপরতা দেখা গেল। বছর সাতেক চুপচাপ থেকে শিশিরকণা হঠাৎ আবার উঠে পড়ে লাগলেন। সতেরো বছরের বিবাহিত জীবনে পঞ্চ-কন্যার পিতা হলেন রাজেনবাবু। এক ফাঁকে একটি ছেলেও অবশ্য এসে গেল। বোনদের সঙ্গে তার পার্থক্য একেবারে লাল কালিতে টেনে দিয়ে রাজেনবাবু তার নাম রাখলেন বিজন। সে কী! শিশিকশার চোখ উঠল কপালে–মেয়েদের নামের জাঁকজমকে তো পাড়ার লোক অস্থির, আর ছেলেটা বিজন!
পুরুষের সাধারণ নামই ভালো। কী হবে না হবে জানি না তো, মিছিমিছি একটা লম্বা-চওড়া নাম দিয়ে…
আর মেয়েরাই-বা তোমার কোন রাজকন্যা?
তা আমার মেয়ে যখন, রাজকন্যা তো বলাই যায়।
তাহলে ছেলেই-বা রাজপুত্র নয় কেন?
তা বলে বিক্রমাদিত্য তো নাম রাখা যায় না!
এত কষ্টের, এত দিনের চেষ্টার একটা মাত্র ছেলে, তার সম্বন্ধে স্বামীর এই অবহেলা শিশিরকণার সহ্য হল না। জ্বলে উঠে বললেন—মেয়ে-মেয়ে করে তুমি পাগল, মেয়ের হাতে তোমার অনেক লাঞ্ছনা আছে বলে দিচ্ছি। সত্যি, মেয়েদের সম্বন্ধে রাজেনবাবু একটু বেশিই মুগ্ধ। আর কপালও তার—পাঁচটি মেয়ের যে-কোনোটির দিকে তাকালে চোখ ফেরে না। শিশিরকণা সেকেলে ধরনের সুন্দরী—ফর্সা রং, টানাটানা নাক-চোখ, রাজেনবাবুও দেখতে ভালোই। কিন্তু তাই বলে এত রূপ হবে প্রত্যেকটি মেয়ের, এরকম তো কথা ছিল না। না-ও তো হতে পারত। আর শুধু কি রূপ!
অবশ্য পাঁচটি মেয়েকে একসঙ্গে বাড়িতে পাওয়া রাজেনবাবুর ভাগ্যে ঘটে উঠল না। শ্বেতার বিয়ে হয়ে গেল স্বাতী জন্মাবার আগেই। শিশিরকণার বিয়ে হয়েছিল একটু বেশি বয়সে, তার সময়ের পক্ষে বেশি। স্পষ্ট মনে পড়ে অবিবাহিত অবস্থায় তিনি সুখী ছিলেন না, বিয়ে হয়ে যেন বাচলেন। বড়ো মেয়ে পনেরোয় পড়া মাত্র, তাই তার বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে উঠলেন তিনি। রূপের জোরে পাত্র জুটল মৈমনসিং-এর এক ছোটোখাটো জমিদারের পুত্র। ছেলের ফোটোগ্রাফ দেখে শিশিরকণা পছন্দ করলেন। ছেলের বাপ পছন্দ করলেন সশরীরে পাত্রীকে দেখে। বিয়ে হয়ে গেল। স্বাতী তখন মাতৃগর্ভে সাত-মাসের। ঐ অবস্থায় নবজামাতার সামনে লজ্জাই করছিল শিশিরকণার, কিন্তু উপায় কী?
বিজন জন্মেছে দু-বছর আগে। শুধুই কতগুলো বোনের মধ্যে বড়ো হয়ে উঠতে তার ভাল লাগবে না বলে সে-ই ডেকে আনছে একটি ভাইকে, মনে মনে এই রকম যুক্তি প্রয়োগ করেছিলেন শিশিরকণা। খাটল না… আবারও মেয়ে। তেরো বছরের মহাশ্বেতা, বারো বছরের সরস্বতী আর পাঁচ বছরের শাশ্বতী যখন আঁতুড়ঘরের দরজায় ভিড় করল, নেহাতই শোওয়া থেকে উঠতে পারছিলেন না বলে, নয়তো ঠিক ওদের গালে ঠাশ-ঠাশ চড় বসিয়ে দিতেন। রাজেনবাবু বললেন—বেশ হল, এক মেয়ে গেল শ্বশুরবাড়ি, আরেক মেয়ে এল। শিশিরকণা চোখ বুজে মনে মনে বললেন—হে ঈশ্বর, আর যেন কখনো আমার কিছু না হয়।
ভাগ্যবিধাতার কানে পৌঁছল এই প্রার্থনা। কিন্তু একটু ভুল করে, এরকম ভুল দেবতাটি প্রায়ই করে থাকেন। কিছুটা বেশিই মঞ্জুর করে ফেলেন তিনি। স্বাতীর জন্মের কয়েক মাস পর থেকে একটু একটু করে বোঝা যেতে লাগল যে শিশিরকণা শুধু যে আর নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আনতে পারবেন না তা নয়, তাঁর নিজের প্রাণই যেন থরথর করছে ঝরে পড়ার জন্য। মাস কাটল, বছর কাটল, শরীর আর সারে না। ডাক্তারে বিরক্ত হয়ে রাজেনবাবু ছুটি নিলেন দু-মাসের। অনেক খরচ করে মস্ত পরিবারটি নিয়ে মিহিজামে এলেন। শিশিরকণা অনেকটা সেরে উঠলেন, কলকাতায় ফিরেও বেশ ভাল থাকলেন কিছুদিন। আবার আস্তে-আস্তে খারাপ হল, আবার শয্যা নিতে হল। এ অবস্থাতেই কায়েমি হলেন তিনি। মাঝে-মাঝে ডাক্তার আসে, চিকিৎসায় উপকারও হয় তারপর। ডাক্তার যেই বলে—এইবার আপনি ঠিক সেরে উঠছেন, তখনই নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দেয়। মাঝে-মাঝে এমনিতেই বেশ ভাল থাকেন, আবার শুয়ে থাকতে হয় দিন পনেরো। রাজেনবাবু নিয়ম করে বছরে একবার কলকাতার বাইরে যেতে লাগলেন সক্কলকে নিয়ে। সমুদ্র, পাহাড়, শুকনো হাওয়া, দুধকুণ্ডের জল সবই হল, কিন্তু কীসের কী! হঠাৎ একদিন দেখা যায় শিশিরকণা কিছুই খাচ্ছেন না, কেমন চুপচাপ হয়ে আছেন, আবার বিছানা। বিশৃঙ্খলা এল সংসারে, অকুলোন ঘটল। শুয়ে-শুয়ে অসহায় চোখে শিশিরকশা তাকিয়ে দ্যাখেন চাকরদের চুরি, মেয়েদের অপব্যয়, ছেলেটার হতচ্ছাড়া চেহারা। সংসার! দিনে দিনে গড়েছেন একে, তিলে তিলে ভরেছেন, সকল গহ্বর পূর্ণ করেছেন তার শরীর দিয়ে। শরীর ছাড়া আর কী আছে মেয়েদের? পুরুষ কত কিছু পারে তার শক্তি, তার সাহস, তার অর্থ দিয়ে। মেয়েরা যা পারে শুধু শরীর দিয়েই পারে। স্বামীর এই আয় আর কবে থেকে, তারা তো গরিবই ছিলেন, অথচ কখনো একটুকু অস্বাচ্ছন্দ্য কি ঘটতে দিয়েছেন? কখনো কি ওরা একটা ময়লা জামা পরেছে, না খারাপ খেয়েছে, না কি ওঁকেই কখনো শুনতে হয়েছে যে হাতে টাকা নেই?
ক্ষীণ কণ্ঠ যথাসম্ভব চড়িয়ে তিনি ডাকলেন—মহাশ্বেতা! সরস্বতী! মহাশ্বেতা! কী নামই রেখেছে বাপু! কোনো রকমে যে একটু ছোটো করে নিয়ে ডাকব, এত বছরের চেষ্টায় তা পারলাম না। মহাশ্বেতা ঘরে এসে বলল—কেন, মা?
বিজুটা কী রকম নোংরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখিস না তোরা! বাথরুমে নিয়ে গিয়ে দে-না ওকে একটু পরিষ্কার করে।
বাথরুমে সরস্বতী, মা।
তবে নিচে নিয়ে যা কলতলায়। আলমারি খুলে দ্যাখ তো ওর জামা-কাপড় কী আছে। মহাশ্বেতা আলমারি খুলে একটি ভেলভেটের নিকারবোকার বের করল।
বুদ্ধি তোর! এই গরমে—! আর এটা ছোটোও হয়ে গেছে ওর। একটা সাদা প্যান্ট আর একটা গেঞ্জি বের কর। কিন্তু খুঁজে খুঁজে গেঞ্জি পাওয়া গেল না কোথাও। মহাশ্বেতার মুখ লাল হল, কপাল ঘেমে উঠল, একটা টানতে গিয়ে তিনটে ফেলল মেঝেতে। শিশিরকণা অনেক ধৈর্য খাটিয়ে বললেন–ঐ পপলিনের শার্টটা—আঃ, ভাল করে গুছিয়ে রাখ, আর আঁচলটা তোল না গায়ে! ভাইয়ের শার্ট-প্যান্ট নিয়ে মহাশ্বেতা একটু দ্রুত ভঙ্গিতেই বেরিয়ে গেল। একটু পরেই ফিরে এসে বলল—বিজু আসছে না, মা।
আসছে না আবার কী! জোর করে ধরে নিয়ে যা।
আমি কি ওর সঙ্গে জোরে পারি নাকি?
না, এত বড়ো মেয়ে, ঐটুকু ছেলের সঙ্গে তুমি পার না!
বিজু বড়ো মারে। শিশিরকণা হেসে বললেন–মার না খেলে আর দিদি কী? আর এত বড় মস্ত মা-র মতো দিদি! দুই ঠোঁটে একটা বিরক্তির শব্দ করে মহাশ্বেতা মাথা ঝেকে উঠল। কিছু বললেই এ-রকম করিস কেন রে?
আমি পড়ব না? পরীক্ষা না আমার? মহাশ্বেতার গলা শুনে শিশিরকণা স্তম্ভিত হলেন। মা-র কথার উত্তরে এরকম গলা বের করা যায়, সেটা কল্পনাতীত ছিল তাদের ছেলেবেলায়। চুপ করে একটু তাকিয়ে থেকে বললেন—আচ্ছা যা, পড় গিয়ে। তক্ষুনি অন্তর্হিত হল মহাশ্বেতা। বাঁচল যেন। সেদিনই সন্ধেবেলায় শিশিরকণা স্বামীকে বললেন–রাজকন্যাদের জন্য রাজপুত্র খুঁজতে লেগে যাও এবার।
–হবে, হবে, তুমি সেরে ওঠো তো।
–আমি যা সারব তা জানি! একসঙ্গেই ব্যবস্থা কোরো দুজনের, খরচও বাঁচবে, আমিও বাঁচব।
—এত ব্যস্ত কী! ছেলেমানুষ, ম্যাট্রিক পাশ করে কলেজে পড়বে, আজকাল তো আর সেদিন নেই যে—
সেদিন নেই মানে-মৃদু স্বরে কিন্তু খুব স্পষ্ট করে শিশিরকণা বললেন–মেয়েদের বিয়ে হতে পারছে না, তাই ও নিয়ে কেউ আর কিছু বলছে না আজকাল; কিন্তু যৌবন তো আর দেরি করে আসছে না তাই বলে।
–ও রোগের একমাত্র চিকিৎসা বুঝি বিয়ে? একটু হাসলেন রাজেনবাবু।
ঠাট্টা কী, ঠিকই তো, তোমার মেয়েদের তো আর অন্যদের অবস্থা নয়। রূপ আছে, তরে যাবে। ঠাট্টার সুরটা বজায় রেখে রাজেনবাবু বললেন–তা পাণিপ্রার্থী রাজপুত্রেরাই আসবে কদিন পরে।
—দু-একটি এসে গেছে মনে হচ্ছে। ও ঘরে এত হৈচৈ কীসের?
খুব আড্ডা জমিয়েছে ওরা।
কারা?
কারা আবার। মহাশ্বেতা, সরস্বতী—
আরো কার গলা পাচ্ছি যেন?
ও-তে অরুণ।
অরুণ? শিশিরকণা ভুরু কুঁচকোলেন।
আহা, অরুণকে ভুলে গেলে? শেতার দেও, সেই যে ডাক্তারি পড়ে–
অরুণ এসেছে নাকি? কেন?
প্রায়ই আসে তো।
প্রায়ই আসে? আমার সঙ্গে তো দেখা করে না।
তোমাকে আর বিরক্ত করে না। জানে তো, শরীর ভাল নেই।
তোমার সঙ্গে?
আহা, আমার সঙ্গে আবার আলাদা করে দেখা করবে কী! ছেলেমানুষ সবাই, সন্ধেবেলা একসঙ্গে বসে গল্প-টল্প করে, আমি আর ও ঘরে যাই-টাই না। উঁচু-করা বালিশের ঢালু থেকে শিশিরকণার টানা-টানা ক্লান্ত দুটি চোখ স্বামীর মুখের উপর স্তব্ধ হল।
এতদিন আমাকে বলনি এ-কথা!
আহা, এ আবার একটা—
তুমি কী!—শিশিরকণা সোজা হয়ে উঠে বসলেন—আমি মরে গেলে উপায় হবে কী তোমার?
যত বাজে–!
অরুণকে একটু ডেকে দাও আমার কাছে।
–পাগল নাকি! কুটুম্ব মানুষ—
তা, শিশিরকণা একটু ভাবলেন—শ্বেতার আপন দেওর তো নয়। আর যদি আপনও হত, তাহলেও কী–
–লক্ষ্মী-তো শিশু, মিছিমিছি শরীরটাকে আরো খারাপ কোরো না। ওকে তো দেখেছ। সুন্দর ছেলে, খুব ভাল। ঝড়ের মতো ঘরে এসে বাবার কোলে ঝাপিয়ে পড়ল পাঁচ বছরের স্বাতী—বাবা, শোনো… বলেই প্রকাণ্ড কান্না। কী রে, কী?–কোমরে হাত রেখে বীরের ভঙ্গিতে দাঁড়ানো বিজু পিছন থেকে বলে উঠল—কিছু না বাবা, ছোড়দি কিনা ওর চকোলেটগুলি দেখতে চেয়েছিল একটু..
—না বাবা। চোখের জলে বাপের কোল ভিজিয়ে দিতে দিতে স্বাতী বলল—না বাবা, কেড়ে নিয়েছে আমারটা—
–মিথ্যুক! হিংসুটি! দরজার কাছ থেকে বাবরি দুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল রঙিন ফ্রক-পরা শাশ্বতী–
সবটা নিয়ে কেঁদে হাট বাধানো চাই! তোকে তো আর দেয়নি—
তোমাকেই যেন দিয়েছে–রোদনের রন্ধ্রপথে বেরিয়ে এল স্বাতীর প্রত্যুত্তর। দিয়েছে তো সেজদিকে! –ঠিক বোঝা গেল না, বিজু কোন পক্ষের সৈনিক। বিজুর কথায় শিশিরকণা একটু চমকালেন। বললেন—সেজদিকে একটু ডেকে দিস তো বিজু।
দাও আমার চকোলেট-আনুনাসিক আর্তস্বর বের করল স্বাতী–যাঃ! চাই না একটাও! আহ্লাদি মেয়ে! শাশ্বতীর লম্বা সাদা হাতটা ঝিলিক দিয়ে উঠল, আর মেঝের উপর, ঠিক শিশিরকণার পায়ের কাছে ছড়িয়ে পড়ল চিকচিকে ম্যাজেন্টা আর সবুজ আর রুপােলি রাঙতায় মোড়া কয়েকটা চকোলেট। হঠাৎ বিজুর ছোট্টো শরীরে ডিগবাজি খাওয়ার মতো একটা ভঙ্গি হল, চকিতে সব কটা কুড়িয়ে এক লাফে ঘর পার হল সে, শাশ্বতী চীৎকার করে ছুটল তার পিছনে। স্বাতী অবিশ্রান্ত ঈ-ঈ করে কাদছে। রুগ্ন শরীরে গর্জন করে উঠলেন শিশিরকণা—স্বাতী, চুপ! সঙ্গে সঙ্গে স্বাতীর গলা আর শোনা গেল না, কিন্তু কান্না উদ্বেল হল দ্বিগুণ। চুপ, থামাও কান্না! মেয়েকে কাধের উপর ফেলে রাজেনবাবু তাড়াতাড়ি চলে এলেন বারান্দায়। পাইচারি করতে করতে মেয়ের কোঁকড়া-কোঁকড়া ঘন চুলের মধ্যে আস্তে আঙুল চালাতে-চালাতে গুনগুন করে বলতে লাগলেন—স্বাতী, আমার স্বাতীসোনা, আর কাদে না… লক্ষ্মী-ততা, মণি-তো, আর কাঁদে না… বাঃ, কী-সুন্দর চোখ, দেখি, দেখি একটু..কী সুন্দর হাসি! সত্যি সুন্দর। সরস্বতীর চেয়েও সুন্দর চুল হয়েছে ওর। স্বাতী—বাড়ির ছোটো-ছোটো মানুষগুলির মধ্যে সবচেয়ে ছোটো, পাঁচটি সুন্দরীর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, পাঁচটি মধুর নামের মধ্যে সবচেয়ে মধুর নাম। এ নাম তিনি তো ওর কোনো দিদিকেও দিতে পারতেন… সরস্বতীকে, কি শাশ্বতীকে; ভাগ্যিস দেননি, আর কাউকে মানাত না… নিজেরই অজান্তে এ নাম তিনি রেখে দিয়েছিলেন সবশেষের সবচেয়ে ভাললটির জন্য। স্বাতী শান্ত হল, স্তব্ধ হল, মাথাটি ভারি হল কাঁধের উপর! আহা, ঘুমিয়ে পড়ল… সারাদিন ছুটোছুটি দাপাদাপি করে… মার অসুখে কি আর ছেলেমেয়ের কোনো হাল থাকে। আমি আর কতটুকু পারি, সারাদিন তো আপিশ। তাছাড়া বাপকে দিয়ে কি হয় এসব… হয় সব! একটু বেশি আহ্লাদি হয়েছে মেয়েটা, বড়ো আধুট, জেদ—তা হবে না, জন্মে থেকে ও মাকে তো পায়ইনি বলতে গেলে। লুটিয়ে-পড়া চুল মুখ থেকে সরিয়ে দিয়ে ভিজে ভিজে ঠান্ডা নরম ঠোঁটের উপর একবার চুমু খেলেন রাজেনবাবু। তারপর আস্তে ঘরে নিয়ে এসে নিজের খাটে শুইয়ে দিলেন। শিশিরকণা শুয়ে ছিলেন চোখে হাত রেখে আলো আড়াল করে। না-তাকিয়েই বললেন–ঘুমিয়ে পড়ল তো? একদিনও ওর খাওয়া হয় না রাত্রে—
হয়েছে হয়েছে–রাজেনবাবু তাড়াতাড়ি বললেন—আমি ডেকে খাওয়াব এখন।
সারাদিনের খাটুনির পরে এই কর আর কী, ঈশ্বর!
তুমি ওরকম কোরো না তো, শিশু! আমার বেশ ভালই লাগে এসব। চোখ থেকে হাত সরিয়ে ঘমও স্বাতীর দিকে একটু তাকিয়ে শিশিরকশা বললেন–এত যে সোহাগ করলে মেয়েদের নিয়ে, হল কী তাতে? তিনটে টেকি-চেঁকি মেয়ে যে বাড়িতে, সেখানে তোমার ঐ স্বাতী-সুন্দরীও কি আর ওদের চেয়ে ভালো হবে?
কী যে বলো তুমি! আমার মেয়ে মন্দ! কী রে সরস্বতী? ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে সরস্বতী বলল-কী মা? ডেকেছিলে?
অনেক আগেই ডেকেছিলাম। মার কথাটার তাৎপর্য বুঝতে পারল না সরস্বতী। মিষ্টি করে একটু হাসল।
–চকোলেট কে দিয়েছে?
–অরুণদা তো!
–তোকে দিয়েছে?
—আগে একদিন মহাশ্বেতাকে দিয়েছিল কিনা, আজ আমাকে দিয়েছে। তা সকলে মিলেই তো খাই। কী সুন্দর বাক্সটা, দেখবে মা? এক ছুটে সরস্বতী নিয়ে এল কাচের মতো কাগজে মোড়া মস্ত রঙিন বাক্স। মার হাতের কাছে বিছানায় রেখে বলল–দ্যাখো মা। শিশিরকশা গম্ভীর স্বরে বললেন—দেখছি তো। কেন দিয়েছে?
-কেন মানে?
—এ রকম দেয় বুঝি মাঝে মাঝে?
দিলে কী হয়? কী-টাকে অনেকখানি টানল সরস্বতী, একটু আহুদি ধরনে। সুন্দর, সরল, উল মুখে এগিয়ে আসছে আশঙ্কার ছায়া, আবার তাকে হঠিয়ে দিচ্ছে আনন্দের অন্ধ বিলাস। সেইদিকে তাকিয়ে শিশিরকশা হঠাৎ কোনো জবাব দিতে পারলেন না। আর সেই সুযোগে রাজেনবাবু বললেন–কিছু হয় না যা। সরস্বতী মা-র দিকে একবার তাকাল। নিশাস ফেলে শিশিরকশা বললেন—যা। অরুণকে একবার ডেকে দিস আমার কাছে।
সরস্বতী চলে যাওয়ামাত্র রাজেনবাবু ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন—অরুণকে আবার কেন? এই শরীর তোমার, তার মধ্যে—
চকোলেটের বাক্সটার অন্তত দশ টাকা দাম হবে, কী বলো?
পাগল! অত কি আর! আর হলেই বা কী—ভাল লাগে বলেই তো—
এসব ভাললাগা ভাল না।
যত তোমার! ওকে তুমি কিছু বলে বোসসা না কিন্তু।
তুমি ভেবো না, আমি ঠিক কথাই বলব।
শুয়ে শুয়ে শিশিরকণা বুঝলেন অরুণকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে মহাশ্বেতা আর সরস্বতী বিদায় নিল। দরজার বাইরে জুতো ছেড়ে অরুণ একটু কুষ্ঠিতভাবে ঘরে ঢুকল। রোগা, উশকোখুশকো, একটু যেন দিশেহারা। এগিয়ে এসে অনভ্যস্ত আড়ষ্টভাবে প্রণাম করল শিশিরকশাকে। গৃহস্বামীকেও করা উচিত কিনা তা-ই বোধহয় ভাবছিল মনে মনে, রাজেনবাবু তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করলেন—দাঁড়িয়ে কেন, বোসো। ভাল তোক বাড়ির সব ভাল? চেয়ার উপেক্ষা করে বিছানাতেই বসল অরুণ, শিশিরকশার পায়ের কাছে। সলজ হেসে বলল-কেমন আছেন, মাসিমা?
আমি তোমার মামা হই-শিশিরকণা বললেন।
মাঐমা! সে আবার কী? না, না, এটা বিশ্রী, ও আমি ডাকতে পারব না! রীতিমত কাতর শোনাল অরুণের অনুনয়। শিশিরকণা হেসে ফেললেন। অরুণ বিজ্ঞভাবে জিজ্ঞেস করল—
কী অসুখ আপনার?
অসুখ কিছু না, ডাক্তারদের বুজরুকি।
নিশ্চয়ই ডাক্তারদের চান্স দেননি? তক্ষুনি প্রতিবাদ করল ভাবী ডাক্তার।
তুমি ডাক্তার হলে আমাকে সারাতে পারতে বইকি। কিন্তু তুমি যদ্দিনে ডাক্তার হবে তদ্দিনে হয় অসুখ থাকবে না, নয় আমি থাকব না। শিশিরকণার দিকে এক পলক তাকিয়ে বড়োসড়ো ডাক্তারি ধরনেই সান্ত্বনা দিল অরুণ-আমি-তো তেমন-কোনো অসুখ দেখছি না আপনার। শিশিরকণা বললেন—তোমাকে দেখেই কমে গেল যে অসুখ। ভাল ডাক্তার তুমি। আরো দুচারটে কথার পর অরুণ বিদায় নিল। যেসব কথা শিশিরকণা বলবেন ভেবেছিলেন, কিছুই আঁর বলা হল না, বলতে পারলেন না। বাজে। কিন্তু বাজে কেন? ছেলেটি ভালই, কিন্তু বিপদ যারা ঘটায় তারা কি সকলেই মন্দ লোক?