- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 455
- Messages
- 7,306
- Reaction score
- 5,684
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
তেতুল বনে জোছনা
মূল লেখকঃ হুমায়ুন আহমেদ
মূল লেখকঃ হুমায়ুন আহমেদ
পর্ব - ১
আকাশ মেঘশূন্য, পরিষ্কার। হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল। প্রথমে কয়েকবার কামানদাগার মতো গুম গুম শব্দ, তারপর কাক ডাকতে শুরু করল। গাছের সব পাখি এক সঙ্গে আকাশে উড়ে গেল। এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্ৰচণ্ড ঝড় বয়ে গেল বিরাটনগর গ্রামের ওপর দিয়ে। ঝড়ের স্থায়িত্ব দু’তিন মিনিট–এর মধ্যেই গ্ৰাম লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। প্রকৃতি নানান রকম খেলা খেলে। সে বিরাটনগর নিয়ে মজার কোনো খেলা খেলল। এই খেলার উদ্দেশ্য মানুষকে ভয় দেখানো না–বিস্মিত করা। যে কারণে কালিমন্দিরের সঙ্গে লাগোয়া পাঁচ শ’ বছরের পুরনো বট গাছ উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল অথচ তার পাশেই রাইসুদিনের খড়ের চালা স্পর্শও করল না।
রাইসুদ্দিন উঠোনে ধান সিদ্ধ দিচ্ছিল। সে চোখ বড় বড় করে দেখল তার মাথার ওপর দিয়ে বট গাছ উড়ে যাচ্ছে। গাছ না, যেন পাখি। শান্ত ভঙ্গিতে উড়ছে।
গ্রামের একটা মানুষও মারা পড়ল না–কিন্তু শত শত পাখি মারা পড়ল। বিরাটনগরের সব ক’টা পুকুরের মাছ এক সঙ্গে ভেসে উঠল। মরে ভেসে ওঠা না, জীবিত অবস্থায় ভেসে ওঠা। যেন দেখতে এসেছে–ঘটনা কী? ঝড় থেমে যাবার পরও সেইসব মাছ ড়ুবল না, ভেসেই রইল। প্রকৃতির এই খেলা দেখে মাছেরাও যেন অভিভূত। বিরাটনগরের মানুষজনের প্রাথমিক ধাক্কা কাটতেই তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল মাছ মারার সরঞ্জামের খোঁজে। অদ্ভুত ঘটনার ব্যাখ্যা পরে খোজা যাবে–আপাতত মাছ মারা যাক। বিরাটনগরে শুরু হলো মাছ মারা উৎসব।
আজকের মাছ মারা অন্যদিনের মতো না। খালি হাতে পুকুরে নেমে পড়লেই হবে। মাছগুলোর স্বভাবে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এদের গায়ে হাত রাখার পরও এরা নড়ছে না। পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে না।
মতি মিয়া বড় বাড়ির পুকুরের সামনে কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে বসে রইল। তার মাথা ঝিম বিষ্কাম করছে, এ-কী কাণ্ড! বাপের জন্মে সে এমন জিনিস দেখে নাই। লোকগুলোর কাণ্ড দেখেও সে বিস্মিত–কতবড় একটা ঘটনা ঘটেছে, এটা নিয়ে তোরা চিন্তা কর। মাছ মারা বড় হয়ে গেল? কে জানে। হয়তো কেয়ামত শুরু হয়েছে। আছরের ওয়াক্তে কেয়ামত হওয়ার কথা। ঘটনাটা তো বলতে গেলে আছর ওয়াক্তেই ঘটেছে। এই সময় সূর্য পশ্চিম দিকে ড়ুবতে গিয়েও ড়ুববে না। উল্টা দিকে ঘোরা শুরু করবে। আর কোনোদিন মাগরেবের ওয়াক্ত আসবে না। মূর্খ গ্রামবাসী মাছ মারা বন্ধ করে সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখ ঠিকমতো ড়ুবে কি ড়ুবে না। সূর্য না ড়ুবলে খবর আছে।
মতি পুকুর পাড় থেকে ওঠে গেল। তার বুক ধড়ফড় করছে। বড়ই অশান্তি লাগছে। ঝড়ের সময় কী কী ঘটনা ঘটেছে ভালোমতো জানা দরকার। জুম্মাঘরের টিউবকল থেকে লাল পানি বের হচ্ছে বলে শুনেছে–এটাও দেখা দরকার। কালিমন্দিরের বটগাছ উপড়ে কোথায় নিয়ে ফেলেছে–এই খোঁজটা বের করতে হবে। এতবড় একটা বটগাছ উড়ে আর কতদূর যাবে? খলপাড়ের সুলেমান নাকি আল্লাহর নামে কীরা কেটে বলেছে–বটগাছ যখন উড়িয়ে নিয়ে যায়। তখন বটগাছে তরুণী একটা মেয়ে পা ভাজ করে বসে ছিল। মেয়েটার গায়ে কোনো কাপড় ছিল না। তার জন্য মেয়েটার কোনো লজ্জা শরমও ছিল না। মুখে ছিল হাসি। সুলেমানের কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কিছু কিছু লোকের জন্মই হয়েছে মিথ্যা কথা বলার জন্যে। সুলেমান তাদের একজন। তারপরেও সে কী বলতে চায় এটা শোনা দরকার। কঠিন মিথ্যাবাদীও মনের ভুলে দুএকটা সত্য কথা বলে ফেলে। কে জানে সুলেমানের এই কথাটা হয়তো সত্যি।
মারা পাখিগুলো দেখে মতির খুব মায়া লাগছে। ঝড় তুফানের খবর পাখিরা আগে পায়। পাখিদের উচিত ছিল উড়ে পাশের যে-কোনো একটা গ্রামে চলে যাওয়া। পাশের গ্রামগুলোতে কিছুই হয় নি। গাছের একটা পাতাও নড়ে নি। এটাও একটা আচানক ঘটনা। মতি একটা মরা ডাহুক পাখির পাশে বসে পড়ল। ডাহুক পাখির মাংস অতি স্বাদু। ঝড়ে যে পাখি মারা গেছে তার মাংস খাওয়া ঠিক কি-না কে জানে? মরা মাছ খাওয়া যায়, কিন্তু মরা পাখি কি খাওয়া যায়? যে-কোনো পাখি মরার সময় পা দুটা আকাশের দিকে তুলে রাখে। এটাই নিয়ম। কিন্তু এই পাখিগুলো কুঁকড়ে মুকড়ে পড়ে আছে।
নিয়মমতো মরতেও পারে নাই। এটাও একটা আফসোস।
মতি, কী কর?
বিরাটনগর কম্যুনিটি হেলথ কমপ্লেক্সের ডাক্তার সাহেব সাইকেল হাতে ধরে হেঁটে হেঁটে আসছেন। ডাক্তার সাহেবকে দেখে মতির বুক ধড়াস করে উঠল। গলা খানিকটা শুকিয়ে গেল। এমিতে এই ডাক্তার অতি ভালো মানুষ। অতি সজ্জন। নিজ থেকে আগবাড়িয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে। ডাক্তার হিসেবে এক নম্বরেরও ওপরে। কোনো রোগীর বাড়িতে গিয়ে একবার শুধু যদি সাইকেলের ঘণ্টা দেয় তাহলেই ঘটনা ঘটে যায়। ঘন্টার শব্দ শুনে রুগি বিছানায় উঠে বসে বলে, মুরগির সালুন দিয়ে ভাত খাব। আগের যে দু’জন ডাক্তার ছিল তারা দু’জনই ছিল খচ্চর ধরনের। এর মধ্যে দ্বিতীয় জন ছিল খচ্চরেরও নিচে। তাকে সালাম দিলে সালামও নিত না। সালামের জবাবে মাটির দিকে তাকিয়ে ঘোঁৎ করে একটা শব্দ করত। মানুষ হয়ে জন্তুর মতো শব্দ করবে। কেন? তুই কি জন্তু?
বর্তমান ডাক্তার সাহেবের নাম আনিসুর রহমান ঠাকুর। মুসলমানের নামের শেষে ঠাকুর থাকবে কেন এটা জিজ্ঞেস করা দরকার। মতি ঠিক করে রেখেছে কোনো এক সময় জিজ্ঞেস করবে। এই ডাক্তার সাহেব এত ভালো যে মতি নিশ্চিত ইনি বেশি দিন বিরাটনগরে থাকবেন না। বিরাটনগর এমন একটা জায়গা যেখানে ভালো মানুষ বেশিদিন টিকে না। ডাক্তার সাহেব অতিরিক্ত ভালো মানুষ। এমন ভালো মানুষকে দেখে কারোরই বুক ধড়াস করার কথা না–কিন্তু মতির বুক কাঁপছে। কারণ, সে গত বুধবার সন্ধ্যাকালে ডাক্তার সাহেবের দুটা শার্ট আর একটা লুঙ্গি চুরি করেছে। ডাক্তার সাহেবের কাজের ছেলে সুজাত মিয়া কাপড় ধুয়ে রোদে শুকাতে দিয়েছিল। সন্ধ্যা পার হবার পরেও সেই বদছেলে কাপড় ঘরে তুলল না। কাজেই মতি কাপড় ভাঁজ করে তার চাদরের নিচে নিয়ে নিল। কাজটা অন্যায়। আবার ঠিক অন্যায়ও না। কাপড় মতি না নিলে অন্য কেউ নিয়ে নিত। বিরাটনগর চোরের জায়গা। সমস্যা হলো ডাক্তার সাহেবের কাপড় এখন পরা যাবে না। দেখেই সবাই চিনে ফেলবে। ডাক্তার সাহেব বদলি হয়ে গেলে সে পরবে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবে, ডাক্তার সাহেব যাবার সময় পেয়ার করে তাকে দিয়ে গেছেন। অবিশ্বাস করার মতো কথা না। ডাক্তার সাহেবের অন্তরে মায়া মহব্বত আছে। পেয়ার করে তিনি মতিকে নিজের কিছু ব্যবহারী কাপড় দিতেই পারেন। ডাক্তার সাহেবের দ্রুত বদলি হয়ে যাওয়াটা মতির জন্যে মঙ্গলজনক।
মতি হাত কচলে খুবই বিনীত ভঙ্গিতে বলল, ডাক্তার সােব কেমন আছেন
ভালো আছি।
কেমন প্ৰলয় ঘটনা ঘটেছে দেখলেন? আর একটু হলে কিয়ামত হয়ে যেত।
হুঁ।
বাপের জন্মে এই জিনিস দেখি নাই। বটগাছ উড়ায়ে নিয়ে গেছে। বটগাছের কাছে ইয়াছিন মিয়া বইস্যা হুক্কা টানতেছিল। তার কল্কির আগুন পর্যন্ত নিভে নাই। সে এমন ভয় খাইছে। কাপড় নষ্ট করে ফেলেছে। ছোট নষ্ট না, বড় নষ্ট। লুঙ্গি বরবাদ কেমন আচানক ঘটনা বলেন দেখি?
খুব আচানক না। টর্নেডোতে এমন হয়।
কী কন আপনে?
টর্নেডোর ঠিক মাঝখানে থাকে। টর্নেডোর চোখ। এই চোখ যে সব জায়গা দিয়ে যায় তার ব্যাপক ক্ষতি করে। কিন্তু আশেপাশে তেমন কিছু হয় না।
পুস্কুনির সব মাছ ভাইস্যা উঠছে–খবর পাইছেন?
সেটাই দেখতে এসেছিলাম। ইন্টারেষ্টিং তো বটেই। এই জিনিস। আমি নিজেও আগে কখনো দেখি নি।
মতি গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল, এটা আর কিছু না। এটা আল্লাপাকের ঘণ্টা। আল্লাপাক ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি দিয়া আমাদের বলেছেন–বান্দা, সাবধান হও।
আনিস কিছু বলল না। সাইকেল টেনে এগুতে লাগল। তার পেছনে পেছনে আসছে মতি। এটা মোটামুটি একটা দুর্ঘটনা। মতি কথা না বলে থাকতে পারে না। হড়বড় করে কথা সে বলতেই থাকবে। মতির বয়স ত্ৰিশ। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়াশোনা। বিরাটনগরে তার একটা চালাঘর আছে। তবু রাতে সে ঘুমায় নান্দাইল রোড ইষ্টিশনে। একই সঙ্গে সে নানান কাজকর্ম করে, আবার কিছুই করে না। মাঝে মধ্যে কুলির কাজ করে। যাত্রীদের মালামাল নামায়। কিছুদিন গ্রামে এসে থাকে। ঘরামীর কাজ করে। শীতের সিজনে মুড়ি লাড়ু বানিয়ে ট্রেনে করে বিক্রি করতে চলে যায়–গৌরীপুরমোহনগঞ্জ। কিছুদিন হলো–সে জুরের একটা বড়ি বানানোর চেষ্টা করছে। লালু ফকিরের কাছ থেকে ফর্মুলা জোগাড় হয়েছে। ফর্মুলা মতো বড়ি বানিয়ে রোদে শুকাতে দেবার সময় গণ্ডগোলটা হচ্ছে। একটু শুকালেই বড়ি পাউডারের মতো হয়ে যাচ্ছে। বড়ির নামও মোটামুটি ঠিক করা–
‘জ্বরমতি’
নিজের নামটা কায়দা করে বড়ির নামের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া। যতদিন এই বাড়ি থাকবে ততদিন মতির নামও থাকবে। এটা কম কথা না।
বড়ি বানানো হয়ে গেলে হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে গৌরীপুর, নেত্রকোনা, শ্যামগঞ্জ এই লাইনে বিক্রি করতে হবে। এই অঞ্চলের লোকদের পেটের ব্যথা বেশি– ট্যাবলেটে চোখের নিমিষে উড়ে যাবে। বিজ্ঞাপনের ভাষাও মোটামুটি ঠিকঠাক–
আসিয়াছে! আসিয়াছে!!
জ্বর নাশক ‘জ্বরমতি’ বাড়ি।
এক বড়ি যেমন তেমন
দুই বাড়িতে কাম
ভাই ব্রোদার শুনেন শুনেন
জ্বরমতির নাম।
এই বড়ি স্বপ্নে প্রাপ্ত। বড়ির ক্রয় বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
শুধু হাদিয়া বাবদ পাঁচ টাকা।
বড়ি সেবনের পরের সাত দিন গোমাংস ভক্ষণ এবং
স্ত্রী সহবাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
গ্যারেন্টিসহ চিকিৎসা। বিফলে সম্পূর্ণ মূল্য ফেরত।
মতির ইচ্ছা বড়ির বিষয়টা নিয়ে ডাক্তার সাহেবের সাথে কথা বলে। ডাক্তার সাহেব অতি জ্ঞানী মানুষ, তিনি সমস্যার সমাধান জানবেন। বড়িগুলো পাউডার হয়ে যাচ্ছে কেন এটা তিনি কি আর জানবেন না। ডাক্তার মানুষ তাদের কাজ কারবার হলো বড়ি নিয়ে।
ডাক্তার সাব।
হুঁ।
মতি চিন্তিত মুখে ডাক্তার সাহেবের দিকে তাকাল। সে সামান্য হতাশ বোধ করছে। ডাক্তার সাহেব হুঁ বলা শুরু করেছেন। ডাক্তার সাহেবের এই এক অভ্যাস। একবার হুঁ বলা শুরু করলে–হুঁ বলতেই থাকেন। যাই জিজ্ঞেস করা হোক, উত্তর একটাই– হুঁ।
বড়ই আচানক ঝড় হয়েছে। কি বলেন?
হুঁ।
পাখি মারা পড়েছে বেশুমার। সব ধরনের পাখি মারা পড়েছে। এর মধ্যে একটা ডাহুক পাখিও দেখলাম।
হুঁ।
ডাহুক পাখির মাংস অতি স্বাদু।
হুঁ।
আপনি ডাহুক পাখির মাংস কোনোদিন খেয়েছেন?
না। খাই নি।
মতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ডাক্তার সাহেব হুঁ বলা বন্ধ করেছেন। এখন হয়তো কিছু কথাবার্তা বলবেন।
ডাহুক পাখি। বছরে একদিন অন্ধ হয়ে যায়–এটা জানেন?
না।
খুবই আচানক ঘটনা। বছরে একদিন ডাহুক পাখি চোখে দেখে না। ডাহুক পাখি ধরার এই একটাই সুযোগ। ঐ দিনেই ধরা হয়।
ডাক্তার কৌতূহল চোখে তাকাল। একটি বিশেষ শ্রেণীর পাখি বৎসরে একদিন চোখে দেখে না–এটাতো বিস্ময়কর ঘটনা। ঘটনার পেছনে কি সত্যতা আছে? না-কি এটিও অনেক লোকজ বিশ্বাসের মতো একটি অপরীক্ষিত লোকজ বিশ্বাস?
ডাক্তার সাব।
বল।
ঝড়ে যেসব পাখি মারা গেছে সেইগুলা খাওয়া কি জায়েজ আছে?
তোমার কথা বুঝতে পারছি না।
ধরেন একটা ডাহুক পাখি গাছের আগায় বসে আছে। ছররা গুলি দিয়া তারে মারলাম। এই পাখি খাওয়া জায়েজ আছে। আবার ধরেন ঝড়ে পাখিটা মারা গেলে–সেটা খাওয়া কি জায়েজ আছে?
আমি বলতে পারছি না। তবে আমি কোনো সমস্যা দেখি না।
খাবেন?
ডাক্তার বিস্মিত হয়ে বলল, কী খাব?
মতি ইতস্তত করে বলল, বাঁশ ঝাড়ের নিচে একটা ডাহুক পাখি মরে পড়ে আছে। বেশি করে পিয়াজ রসুন দিয়ে ঝালকাল করে রোধে নিয়ে আসি? খান। আপনে ডাহুক পাখির মাংস খান নাই। খেলে মজা পাবেন। পাখির মাংস শক্ত হয়। ডাহুক পাখির মাংস মোলায়েম। হাড্ডি সুন্দা মুখের মধ্যে গলে যায়। যদি খান–ব্যবস্থা করি।
না। ডাহুক পাখি খাব না।
আমার কথায় রাগ হয়েছেন?
না, রাগ হই নি। রাগ হব কেন?
রাগ হয়ে থাকলে নিজগুণে ক্ষমা করবেন। এতবড় একটা বড় নিজের চউক্ষে দেখার পর থাইক্যা মাথা ঠিক নাই। কী বলতে কী বলি।
ডাক্তার জবাব না দিয়ে সাইকেলে উঠে পড়ল। মতি ফিরে চলল বাঁশ ঝাড়ের কাছে। ডাহুক পাখিটার একটা ব্যবস্থা করতে হয়। নান্দাইল রোড ৰাজারের একটা মেয়ে মানুষের কাছে তার যাতায়াত আছে। মেয়ে মানুষটার নাম মর্জিনা। এই মেয়ের খাওয়া খাদ্য খুব পছন্দ। সবসময় তার মুখে কিছু না কিছু আছে। মুখ নড়ছেই-টুকুর টুকুর টুকুর। এক বাটি পাখির মাংস রোধে নিয়ে গেলে মার্জিনা বড়ই খুশি হবে। তুফানের গল্পটাও করা দরকার। সামান্য জোড়াতালি দিয়ে সুন্দর করে বলতে হবে। আচানক ঘটনা শুনতে পুরুষ মানুষ তেমন পছন্দ করে না, মেয়ে মানুষ করে। ঝড়ের ঘটনা মতি কীভাবে বলবে মনে মনে গুছাতে শুরু করল–
বুঝলি মর্জিনা–আল্লাপাকের কুন্দরতির শেষ নাই। পরিষ্কার দিন। নীলা আসমান। হঠাৎ বাজ পড়ার মতো শব্দ। দৌড় দিয়া ঘর থাইক্যা বাইর হইয়া দেখি মাথার ওপর দিয়া উড়াজাহাজের মতো কী জানি যায়। শো শো বো বেঁ শব্দ। চউখ কচলাইয়া তাকাইলাম।–না উড়াজাহাজ না, বটগাছ। বিরাট বটগাছ আমার বাড়ির ওপরে দিয়া উড়াল মাইরা যাইতেছে। ঘটনা এইখানে শেষ না। বটগাছে এক মাইয়্যালোক বসা। পানের বাটার মতো গোল মুখ। ঠোঁট টকটকা লাল। মনে হইতাছে এইমাত্র রক্ত খাইয়া আসছে–ঠোঁটে রক্ত লাইগ্যা আছে। তার পরনে একটা কাপড় দূরের কথা, সুতা পর্যন্ত নাই।
মর্জিনা গল্পটা পুরো বিশ্বাস করবে। মেয়ে মানুষের যে স্বভাব বিশ্বাস করলেও ভাব দেখাবে বিশ্বাস করে নাই। মুখ ঝামটা দিয়ে বলবে, আফনে এমন মিছখোর। খালি মিছা কথা। বটগাছের ওপরে নেংটা মেয়েছেলে। ছিঃ।
মতিকে তখন আল্লাখোদার নামে কীরা কাটতে হবে। এতে কিছু পাপ হবে। কোনো এক জুম্মাবারে মসজিদে গিয়ে তওবা করে পাপ কাটাতে হবে। ডাক্তার সারাগ্রাম ঘুরে এখন দাঁড়িয়ে আছে মগড়া খালের কাছে। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেলেও এই জায়গায় কী করে জানি খানিকটা আলো আটকে আছে। শীতকালে খালে কোনো পানি থাকে না। এখন আশ্বিন মাস, পায়ের পাতা ডোবার মতো পানি আছে। পাহাড়ি নদীর পানির মতো এই খালের পানি চকচক করছে। মগড়া খাল মূল যে নদী থেকে এসেছে তার পানি ঘোলা অথচ এই খালের পানি সবসময়ই ঝকঝকে পরিষ্কার। দেখলেই আজলা ভর্তি পানি নিয়ে চোখে মুখে দিতে ইচ্ছা করে।
ডাক্তার জংলী কাঠগোলাপ গাছে হেলান দিয়ে সাইকেলটা রাখল। সাইকেলের কেরিয়ারে বাধা পেটমোটা চামড়ার ব্যাগ হাতে নিল। মাগড়া খালের পাশে সুন্দর বসার ব্যবস্থা আছে। জনৈক বিধুভুষণ চক্রবর্তীর বানানো গোলাকৃতি ঘর। যে ঘরের মেঝে, শ্বেতপাথরে বাঁধানো। একসময় মগড়া খাল বিশাল নদী ছিল। তার নাম ছিল হাবলংগা নদী। নদীর তীরে ছিল মহাশ্মশান। দূর দূরান্ত থেকে খাঁটিয়ায় করে মরা আসত। সেই সময় বিধুভুষণ চক্রবর্তী শঙ্কুশান যাত্রীদের জন্য এই ঘর বানিয়ে দেন। নিজের কর্মকাণ্ডও দেয়ালে লিখে রাখেন–
শ্মশানবন্ধুর কল্যাণ কর্মে
অনাথ কাঙালি বিধুভুষণ চক্রবর্তী
কর্তৃক বঙ্গতারিখ ১৩২০ সনে নির্মিত।
শুধুমাত্র ব্ৰাহ্মণ প্রবেশ করিবেক
অন্যথায় মহাপাতকী হইবেন।
দেড়শ বছরে হাবলংগা নদী হোজেমেজো হয়ে গেছে মগড়া খাল। শ্মশানবন্ধুদের কল্যাণকৰ্মে নির্মিত ঘর ধ্বসে গিয়েছে। উত্তরদিকের দেয়াল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তবে শ্বেতপাথরের মেঝে অবিকৃত আছে। জোছনার সময় মেঝে থেকে জোছনা ঠিকরে পড়ে। ডাক্তার লোক লাগিয়ে মেঝে পরিষ্কার করিয়েছে। সে মাঝে মাঝে এখানে এসে বসে, যদিও জায়গাটা বিপজ্জনক। গত বৎসর দুটা গরু এই জায়গায় সাপের কামড়ে মারা গেছে। তার আগের বছর এক ভিখিরিণী মারা গেছে। ভিখিরিণীর পরিচয় উদ্ধার হয় নি। মনে হয় অনেক দূরের কোনো গ্রাম থেকে ভিক্ষা করতে করতে এদিকে চলে এসেছিল। দুপুরে ক্লান্ত হয়ে আঁচল পেতে নির্জন শ্মশান ঘরে শুয়েছিল। সেখানেই তাকে সাপে কাটল।
ডাক্তার চামড়ার ব্যাগ খুলে পেটমোটা একটা শিশি বের করে শিশির মুখ খুলল। ছড়িয়ে পড়ল কাৰ্বালিক এসিডের কড়া গন্ধ। সে যতক্ষণ এখানে থাকে মুখ খোলা অবস্থায় কার্বালিক এসিডের বোতলাটা পাশে থাকে। যে-কোনো পুরনো ধ্বংসস্তুপ হলো গোখরা সাপের আস্তানা। প্রচণ্ড বিষধর সাপ ভীরু প্রকৃতির হয়ে থাকে। তাদের স্বভাব হলো মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকা। এই ক্ষেত্রে মানুষেরও কিছু করণীয় আছে। মানুষদের উচিত তাদের উপস্থিতি জানান দেয়া।
ডাক্তারের চায়ের পিপাসা পেয়েছে। তার পেটমোটা ব্যাগে চায়ের সব সরঞ্জামই আছে। ফ্লাস্ক ভর্তি ফুটন্ত গরম পানি। টি ব্যাগ, চিনি। আল গ্রে চায়ের একটি টিনের কৌটাও আছে। আল গ্রে চায়ের বিশেষ গন্ধটা নবনীর অতি প্রিয়। এই কৌটার মুখ এখনো খোলা হয় নি। সামনের সপ্তাহেই নবনীর আসার কথা। তখন খোলা হবে।
চা বানানোর সরঞ্জাম ব্যাগ থেকে বের করা হয়েছে। সন্ধ্যা মিলিয়ে যাবার পরেও জায়গাটা পুরোপুরি অন্ধকার হয় নি। অবশ্যি অন্ধকার হলেও সমস্যা নেই। ব্যাটারিতে চলে এমন একটা ছোট্ট লণ্ঠন ব্যাগে আছে। চা কড়া হয়ে গেছে–তারপরেও চুমুক দিয়ে আনিসের ভালো লাগল। সে ব্যাগের ভেতর থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। মাস ছয়েক হলো সে সিগারেট ছাড়ার প্রাণপন চেষ্টা করছে। লাভ হচ্ছে না। সিগারেট খাওয়া বরং বেড়ে গেছে। নবনী এলে সিগারেট খাওয়া পুরোপুরি ছাড়তে হবে। নবনী সিগারেটের গন্ধ একেবারেই সহ্য করতে পারে না। তার নাকি সিগারেটের প্যাকেট দেখলেই গন্ধে মাথা ধরে, বমি চলে আসে। গত সপ্তাহে নবনীকে চিঠি লেখা হয় নি। নির্জন জায়গায় বসে চট করে কয়েক লাইনের চিঠি লিখে ফেলা যায়। চিঠির সরঞ্জাম–কাগজ, বিলপয়েন্ট, খাম, ডাকটিকিট সবই তার মোটা ব্যাগে আছে। চিঠি লিখবে কি লিখবে না–আনিস মনস্থির করতে পারছে না। তার সিগারেট শেষ হয়েছে, সে আরেকটা সিগারেট ধরিয়েছে। চিঠি লেখার পরিকল্পনা আপাতত বাতিল। তবে চিঠির ব্যাপারটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মস্তিষ্কের একটা অংশ গুটিগুটি করে চিঠি লেখা শুরু করে দিয়েছে। আনিস এখন যদি সাইকেলে উঠে রওনা দেয়। তবু চিঠি লেখা বন্ধ হবে না।
নবনী,
আমাদের এখানে আজ হঠাৎ করে টর্নেডোর মতো হলো। টর্নেডোর স্থায়িত্ব ছিল কম। দুই থেকে আড়াই মিনিট হবে। তবে এই কিছুক্ষণেই যা ঘটেছে তার নাম লণ্ডভণ্ড। ছবি তুলে রাখলে তুমি দেখতে পেতে। ফিল্ম ছিল না বলে ছবি তোলা হয় নি। এখানের বাজারে ফিল্ম পাওয়া যায় না। ফিল্যের জন্যে লোক পাঠাতে হয় নেত্রকোনায়। তোমার যদি মনে থাকে তাহলে ফিল নিয়ে এসো। এই আজ অঞ্চলে মাঝে মাঝে সুন্দর সুন্দর ব্যাপার ঘটে যার ছবি তুলতে ইচ্ছে করে।
আমার খবর ভালো। হাসপাতালে প্রচুর রোগী আসে। তেমন কোনো কারণ ছাড়াই আমার ধন্বন্তরী ডাক্তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। এরা আমার নাম কি দিয়েছে জান? আমার নাম দিয়েছে–‘সাইকেল ডাক্তার’। একটা সাইকেল নিয়ে ঘোরাফেরা করি এই জন্যেই এই নাম। ভাগ্যিস ঘোড়ার পিঠে চড়ি না। চড়লে এরা নাম দিত ‘ঘোড়া ডাক্তার’। আমার বিষয়ে যে মজার ব্যাপারটি ছড়িয়েছে সেটা হলো–যখন আমি ভিজিটে যাই এবং রোগীর বাড়ির সামনে সাইকেল থেকে নেমে ঘণ্টা দেই ঠিক তখনি সাইকেলের ঘণ্টা শুনে রোগীর রোগ সেরে যায়। ওষুধপত্র কিছুই লাগে না। আমি খুব ভয়ে ভয়ে আছি–অচিরেই এরা হয়তো আমাকে ‘সাইকেল ডাক্তার’ ডাকা বন্ধ করে ‘ঘন্টা ডাক্তার’ ডাকা শুরু করবে।
তুমি যে চারটা অর্কিড দিয়ে গিয়েছিলে সেইগুলো বারান্দার যে জায়গায় ঝুলাতে বলেছ সেখানেই কুলানো হয়েছে। যেভাবে যত্ন করতে বলেছ সেভাবেই যত্ন করছি। তোমার হিসেব মতো গত মাসেই গাছগুলোতে ফুল আসার কথা। এখনো কিন্তু আসে নি। হঠাৎ করে অর্কিন্ডের প্রসঙ্গ কেন এল–বলি। পরশু রাতে স্বপ্নে দেখি গাছগুলোতে ফুল ফুটেছে। স্বপ্নের ফুল বাস্তবের ফুলের চেয়েও সুন্দর হয়। স্বপ্নে দেখলাম গাছগুলোতে শুধু যে নীল রঙের ফুল ফুটেছে তা না। ফুলগুলো চাঁদের জোছনার মতো চারপাশে আলো ছড়াচ্ছে। আমি খুবই ব্যস্ত হয়ে এই অপূর্ব দৃশ্য তোমাকে দেখাবার জন্যে ডাকাডাকি করছি। তুমি যে এখানে থাক না এটা আমার মনে নেই।
আমার চিঠি পড়ে তোমার কি হাসি পাচ্ছে? মনে হচ্ছে ডাক্তারের ভেতর কাব্য ভাব চলে এসেছে? কিছুটা যে আসে নি তা-না। রোগ শোক ছাড়াও ইদানীং আমি আরো অনেক কিছু নিয়ে ভাবি। কিছু কিছু ভাবনা বেশ উদ্ভট।…
হঠাৎ একসঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকতে শুরু করল। লোক বসতির বাইরে যেসব বিবি ডাকে তাদের গলার জোর অনেক বেশি। তারা একসঙ্গে ডাকতে শুরু করে, আবার হঠাৎ করে একসঙ্গে থেমে যায়। একজন শুধু থামে না। সে ডেকে যেতেই থাকে। সে সম্ভবত বিবি পোকাদের লীডার।
আনিস উঠে দাঁড়াল। রাত হয়ে গেছে। কোয়ার্টারে ফেরা দরকার। কৃষ্ণপক্ষ চলছে। অন্ধকারে সাইকেল চালানো কষ্টকর ব্যাপার। রাস্তাটা খানাখন্দে ভরা। সাইকেল টেনে টেনে নিয়ে যেতে হবে।