Collected শোধ

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
454
Messages
7,238
Reaction score
5,494
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
শোধ

মূল লেখকঃ মুহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম






ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলল-কেমন আছেন?
-ভালো
-চিনেছেন আমাকে?
আমি একটু বিব্রত স্বরে বললাম-জ্বী,না।
উনি উচ্চস্বরে হাসলেন তারপর ফোনটা রেখে দিলেন । হাসিটা আমার কাছে খুব পরিচিত মনে হলো, মনে হলো এই হাসিটা আমি আগেও শুনেছি। কোথায় শুনেছি? মনে করতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু অনেক চেষ্টার পরেও মনে করতে পারলাম না।
সাত দিন পর উনি আবার ফোন দিলেন। কুশল বিনিময়ের পর উনি আবার আমাকে বললেন আমি ওনাকে চিনেছি কিনা! আমি না বলতেই উনি আবার হাসলেন, হেসে হেসেই ফোনটা রেখে দিলে!
আজ হাসিটা আমার কাছে আরো কাছের মনে হলো, মনে হল খুব কাছের মানুষের হাসি এটা ; কিন্তু কে সে? আমি মনে করার আবারো ব্যর্থ চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোনভাবেই আর মনে করতে পারলাম না।
নদীর তীরে বসে পূর্ণিমা দেখছি, দেখছি পূর্ণিমা বিছানো নদীর জল। এমন সময় আবার ফোন করলেন উনি। এবার আর উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন না আমি ওনাকে চিনেছি কি না । উনি সরাসরি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-আপনি কি আবির সাহেব বলছেন?
-জ্বী
-আমি সায়মা, ইন্টারমিডিয়েটে আমি আপনার ক্লাসমেট ছিলাম।
-হ্যাঁ ,মনে পড়েছে
-শুধুই কি মনে পড়েছে, না চিনেছেনো?
-চিনেছি
-একটা প্রশ্নের উত্তর দিবেন আমাকে?
-বলেন
-আপনি কি আগের মতই ভীরু-কাপুরুষই আছেন?
উনার প্রশ্ন শুনে আমি চুপ হয়ে গেলাম। আমার নিরবতায় উনি হাসতে লাগলেন। হাসতে হাসতেই উনি ফোনটা রেখে দিলেন।
আমি বুঝতে পারলাম না উনি এত দিন পর ফোন করে কেন এসব কথা বলছেন?
এরপর থেকে প্রায়ই ফোন করেন । ফোনে গালমন্দ করেন। তারপর হাসতে হাসতে ফোনটা রেখে দেন। আমি নিশ্চুপ হয়ে উনার গালমন্দ শুনি।
একদিন গানমন্দের মাঝে আমি ওনাকে থামালাম, বললাম-আমার একটা কথা শুনবেন?
-বলুন
-আপনি আমাকে ফোনে গালমন্দ করেন, এভাবে গালমন্দ করে তৃপ্তি পাওয়া যায় না। আমাকে আপনি আপনার ঠিকানা দেন, আপনার ওখানে আসি, সামনাসামনি গালমন্দ করেন ,তৃপ্তি পাবেন!
উনি ঠিকানা দিলেন, পরদিন সকালে রওনা দিলাম তার ওখানে। আমিই মনে হয় পৃথিবীর প্রথম ব্যক্তি যে সেজেগুজে গালমন্দ শুনতে যাচ্ছি।
ট্রেনে যেতে যেতে সায়মার সাথে আমার স্মৃতি গুলো মনে পড়লো। ইন্টারমিডিয়েটের ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। তখন চাঁদনী ছবি মুক্তি পেয়েছে।
সারা বাংলাদেশের টিন-এজরা চাঁদনি জ্বরে ভুগছে! একদিন সায়মা এসে বলল-আবির, চাঁদনী ছবিটা দেখেছিস?
-না
-দেখিস, যে সুন্দর!
এরপর থেকে ও প্রায় প্রতিদিন আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো আমি ছবিটি দেখেছি কিনা! ওর পীড়াপীড়িতেই আমি চাঁদনী ছবিটা দেখতে গেলাম। ছবি দেখতে দেখতে মনে হলো ছবির নায়িকা নয়, আমি যেন সায়মাকে দিচ্ছি! সায়মার সাথে ছবির নায়িকার চেহারা হুবহু মিল! আমি বুঝতে পারলাম সাইমা কেন পীড়াপীড়ি করছিলো ছবিটা দেখার জন্য। ছবি দেখে এসে ওর সাথে বাক বিতণ্ডায় জড়িয়ে গেলাম "নায়িকা নয় নায়কই বেশি সুন্দর"!
একদিন সত্য কথাটা আমার মুখ ফুটে বেরিয়ে আসলো "নায়ক নয়, নায়িকাই বেশি সুন্দর, একদম তোর মতো।
ইন্টারমিডিয়েট ফাইনাল পরীক্ষার আগে বিদায় অনুষ্ঠান চলছে। আমি কলেজের মাঠ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি অনুষ্ঠানের দিকে। দেখি সায়মা একা একা দাঁড়িয়ে আছে কমনরুমে।
ও আমাকে ডাকলো, কাছে যেতেই বললো-তোর সাথে একটু কথা আছে, শুনবি?
আমি ওর কথা পাত্তা দিলাম না।
বললাম -এখন কথা-টতা শুনতে পারব না।

এরপর সাইমার সাথে আমার দুই বার দেখা হয়েছিল। একবার বাসে, ও বসে আছে ,আমি দাঁড়িয়ে । ওকে দেখেই আমি বললাম-কেমন আছিস তুই?
সেদিন আমার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়েই জালানার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল!
আরেকদিন দেখা হয়েছিল আনন্দমোহন কলেজে। জোওলোজি ডিপার্টমেন্টে গিয়েছিলাম আমার ফ্রেন্ডের ফ্রেন্ডের কাছে। গিয়ে দেখি ও দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন বান্ধবীর সাথে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ও আমাকে অবাক করে বললো-আপনাকে তো ঠিক চিনতে পাচ্ছি না!
এরপর থেকে আর কোনদিন দেখা হয়নি ওর সাথে আমার। আজ আবার দেখা হবে, ও আমাকে গালমন্দ করবে আমি বসে বসে ওর গালমন্দ শুনবো।
সায়মার বাসায় যেতে যেতে দুপুর গড়িয়ে গেল । একজন এসে রিসিভ করলো আমাকে।
বলল-ম্যাডাম বাসায় নেই ,আপনি বিশ্রাম করুন উনি এসে পড়বেন।
আলিশান বাড়ি সায়মার। আমি যে রুমটায় বিশ্রাম করছি তা যেন কোন পাঁচ তারকা হোটেলের স্যুট! ফ্রেশ হওয়ার পর আমাকে নাস্তা দিয়ে গেলো, নাস্তার মধ্যেও আভিজাত্যের ছাপ। রাত যখন ঠিক নয়টা বাজে কেউ যেন কড়া নাড়ল দরজায়! দরজা খুলে দেখি সায়মা দাঁড়িয়ে! চোখ দুটো আগের মতই ,শরীরে মেদ জমেনি একটুকুও!
বয়সের ছাপ অবশ্য কিছুটা পড়েছে তবে আমার মত নয়।
-আরির সাহেব, চলুন ডিনার করবো একসাথে!
ডিনারের পর সায়মা আমাকে নিয়ে গেল ওর বাগানে। চমৎকার বিশাল বাগান। নানা রকম ফুলের সমাহার। লাইটের আলোতে বাগানটা দেখতে চমৎকার লাগছে। বাগানের ঠিক মাঝখানে বসার জায়গা ,ওখানে গিয়ে বসলাম দুজন। আমি ভেবেছিলাম এই নীরব জায়গায় এসে ও আমাকে ইচ্ছেমত গালমন্দ করবে! আমাকে অবাক করে দিয়ে ও বলতে শুরু করল-আমি প্রতিদিন ডিনারের পর এখানে এসে বসি । এখানে বসেই মাঝে মাঝে তোকে গালমন্দ করি! ও সরি, তুই বলে ফেললাম।
-অসুবিধা কি, একসময় দুজন দু'জনকে তুই বলেই তো সম্বোধন করতাম!
সাইমা হাসলো, তারপর আবার বলতে শুরু করল-তুই ছিলি আমার পছন্দের একমাত্র পুরুষ! মাঝখানে আমার বিয়ে হয়েছিল সত্যি, কিন্তু বিয়েটা হয়েছিল একজন লম্পটের সাথে। আমি মানিয়ে নিতে চেয়েছিলাম, তাই একটা সন্তানও নিয়েছিলাম। সন্তান আসার পরেও যখন দেখলাম ওর কোনো পরিবর্তন নেই তখন সিদ্ধান্ত নিলাম ডিভোর্স দিব। ডিভোর্সের পর বাবার বাড়িতে চলে এলাম। বাবার বাড়িতে থাকার সময় খুব হীনমন্যতায় ভোগতাম। একসময় সিদ্ধান্ত নিলাম ব্যবসা করব। শুরু করলাম ব্যবসা, প্রথমদিকে হোঁচট খেলেও আস্তে আস্তে উন্নতি হতে লাগলো। এখন এই শহরের হাতেগোনা কয়েকজন ব্যবসায়ীর মধ্যে আমিও একজন। এই যে বিশাল বাড়ি দেখছিস, সব আমার টাকায় কেনা। টাকা হয়েছে কিন্তু মনের মধ্যে সব সময় শূন্যতা অনুভব করি। মনটা যখন খুব খারাপ হয় তখন তোর মুখটা ভেসে ওঠে। তুই যদি আমার জীবনে থাকতি তাহলে হয়তো আমার জীবনটা এমন হতো না। তাই প্রচন্ড রাগ হয় তোর প্রতি। রাগ হলে তোকে আগে মনে মনে গালমন্দ করলাম। একদিন বই মেলায় গিয়ে দেখি তোর বই। প্রকাশকের কাছ থেকে তোর ফোন নাম্বারটা নিলাম। এরকম তোকে ফোন করে জ্বালাতন করি গালমন্দ করি! আমার প্রতি তোর খুব রাগ হয় তাই না?
-না
-সান্তনা দিচ্ছিস।
-একদম না! আমার কাছে মনে হয়েছিল যেকোনো কারণেই হোক আমার প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ তোর। এই ক্ষোভের কারণেই আমাকে গালমন্দ করিস। তোর সামনে গেলে এই ক্ষোভটা আর থাকবেনা।
সায়মার ওখান থেকে আসার পর ও প্রায়ই ফোন করে । অনেক কথা বলে, কিন্তু কখনোই জানতে চায় না আমার জীবন সম্পর্কে।


সমাপ্ত
 
Back
Top