- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 452
- Messages
- 7,221
- Reaction score
- 5,442
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
শেষ ইচ্ছে
মূল লেখকঃ মতিউর মিয়াজী
মূল লেখকঃ মতিউর মিয়াজী
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে নিজের কর্মজীবনের প্রথম দিন শুরু করলাম।
আদালত প্রাঙ্গণে পা রাখতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জেগে উঠল। মনে হচ্ছিল, বহুদিন ধরে বাবার দেখানো কোনো স্বপ্নের ভেতর ঢুকে পড়েছি। এই লাল-ইটের ভবন, পুরোনো গাছগুলোর ছায়া, বারান্দাজুড়ে মানুষের ভিড়, কালো কোট পরা আইনজীবীদের ব্যস্ত পদচারণা—সবকিছুই আমার কাছে নতুন, অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত।
কতবার ছাত্রজীবনে এই আদালতে এসেছি। সিনিয়রদের পেছনে পেছনে নীরবে হেঁটেছি। দূর থেকে বিচারকদের এজলাস দেখেছি। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামিদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভেবেছি, একটা রায় কত মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। তখন আমি ছিলাম দর্শক। আজ আমি সেই মঞ্চেরই একজন কর্মী।
নিজের নাম প্রথমবার আদালতের কার্যতালিকায় দেখে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
মামলার ফাইল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল, এই কাগজের পাতাগুলো শুধু আইনের ধারা নয়। প্রতিটি পাতার ভাঁজে লুকিয়ে আছে কারও কান্না, কারও শেষ আশ্রয়, কারও ন্যায়বিচারের আকুতি, কারও ভেঙে যাওয়া সংসার, কারও আজীবনের অপমান।
সেই মুহূর্তে বুঝলাম, একজন আইনজীবীর কাঁধে শুধু কালো কোটের ওজন থাকে না। তার কাঁধে থাকে মানুষের বিশ্বাস, ভরসা আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক অদৃশ্য দায়িত্ব।
বার লাইব্রেরিতে ঢুকতেই কয়েকজন সিনিয়র হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানালেন। বাবার খুব কাছের বন্ধু ফরহাদ চাচার ছেলে নিয়াজ ভাই কাঁধে হাত রেখে মুচকি হেসে বললেন, আজ থেকে তোমার আসল শেখা শুরু। তোমার বাবা বেঁচে থাকলে আজ ভীষণ খুশি হতেন। তোমাকে তাঁর মতোই হতে হবে।
নিয়াজ ভাইয়ের কথাটা যেন বুকের গভীরে কোথাও গিয়ে বিঁধল। বাবার কথা উঠতেই আদালতের কোলাহল, মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের হাঁটাহাঁটি, সবকিছু যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য দূরে সরে গেল।
ওহ, বাবার সম্পর্কে তো বলাই হয়নি, আমার বাবা বিচারপতি ফয়সাল আহমেদ। কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সর্বোচ্চ আসনে বসেই তিনি তাঁর দীর্ঘ বিচারিক জীবন শেষ করেছিলেন। মানুষ তাঁকে বিচারপতি হিসেবে চিনত। তবে আমি চিনতাম একজন নীরব, কঠোর অথচ ভীষণ মানবিক মানুষ হিসেবে।
তাঁর মতো হওয়া?
আমি জানতাম, সেটা আমার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব নয়। কারণ সবার আগে আমি আগে একজন লেখক। যে স্বাধীনতা ভালোবাসি। অজানা রহস্যের পেছনে ছুটতে ভালোবাসি। মানুষের গল্প শুনতে ভালোবাসি।
বাবা ও অজানা রহস্যের পেছনে ছুটতে ভালোবাসতেন৷ বাকি সব ছিলো ঠিক আমার বিপরীত। শৃঙ্খলাবদ্ধ, সংযত, অনুভূতিকে মুখে প্রকাশ করতেন না কখনো। তাঁর কাছে আইন ছিল ধর্মের মতো পবিত্র।
বাবার ইচ্ছেতেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এক সেমিস্টারও হয়তো টিকতে পারব না। পড়াশোনা আমার জন্য নয়।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টা যেন ধীরে ধীরে আমাকে নিজের প্রেমে ফেলে দিল। পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি ভবন। বর্ষার কুয়াশা। শীতের সকালের শিশির। কাশফুলে ঢাকা পাহাড়ি ঢাল। রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার সারি, যা চলে গেছে সোজা শহিদ মিনারে।
বিকেলের নরম বাতাসে নজরুল হলের ছাদে বসলে মনে হতো, যেন প্রকৃতি নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থপতি।
অনার্স শেষ হলো, তারপর মাস্টার্সও। সেশনজটের জন্য তখন বিরক্ত হতাম। তবে আজ বুঝি,
মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো চলার পথে কখনোই সুন্দর মনে হয় না। পেছনে ফিরে তাকালে তবেই বোঝা যায়, কতটা মূল্যবান ছিল সেগুলো।
পেশাগত জীবনে ঢোকার পর নিজের ভেতর একটা অদ্ভুত পরিবর্তন টের পেলাম। যে ছেলেটা অবসর পেলেই গল্প-উপন্যাস পড়ত, সে এখন রাত জেগে ফৌজদারি কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইন, দণ্ডবিধি, বিচারিক নজির পড়ে।
বাবার বিশাল বুকশেলফটা দিন দিন যেন আমার নতুন শিক্ষক হয়ে উঠল। দেশি-বিদেশি আইনের বই, পুরোনো রায়, হাতে লেখা নোট, মলিন হয়ে যাওয়া ফাইল। সবকিছুতেই বাবার স্পর্শ লেগে আছে।
জয়েন করার প্রায় ১ বছরের মধ্যেই অনেকগুলো বই পড়ে শেষ করলাম। একদিন নতুন একটা বই খুঁজতে গিয়ে বুকশেলফের ডান পাশের উপরের ড্রয়ারটা টানতেই থমকে গেলাম।
ভেতরে ছোট্ট একটা কাঠের বাক্স। গাঢ় বাদামি রঙের। ধুলো জমলেও বোঝা যাচ্ছিল, কোনো এক সময় খুব যত্ন করে রাখা হয়েছিল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বাবা জীবিত থাকতে এই বাক্স আমি কখনো দেখিনি। হয়তো তিনি ইচ্ছে করেই লুকিয়ে রেখেছিলেন।
বাক্সটা খুললাম। বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। ভেতরে পাশাপাশি রাখা তিনটি ফাউন্টেন পেন। প্রতিটি কলমের নিব ভাঙা। ইচ্ছে করেই ভাঙা।
দেখে মনে পরে গেল, বাবা পুরো একজীবনে ফাঁসির রায় দিয়েছিলো যে তিনজন মানুষকে, এগুলো সেই কলম, যা দিয়ে তিনি স্বাক্ষর করেছিলেন।
কলমগুলোর পাশে রাখা তিনটি হলুদ খাম। প্রতিটি খামের ভেতরে ভাঁজ করা কাগজ।
প্রথম খামের ওপরে বাবার হাতের লেখা,
"ফাঁসির রায়প্রাপ্ত আক্কাস আলীর জীবনের শেষ ইচ্ছাগুলো।"
দীর্ঘক্ষণ খামটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। খামটা খুলতেই এমন কিছু দেখলাম, যা জানার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
বাবার হাতের লেখা, একদম পরিষ্কার। সুশৃঙ্খল প্রতিটি অক্ষরে অদ্ভুত এক মমতা। বুঝতে পারলাম,
আক্কাস আলীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পরে পরে বাবা নিজেই কারাগারে গিয়েছিলেন।
তবে বিচারক হিসেবে নয়। একজন মানুষ হিসেবে।
শেষবার তাঁর কথা শুনতে। শেষ ইচ্ছাগুলো লিখে রাখতে। চিঠি পড়তে পড়তে বুঝলাম, মৃত্যুর ঠিক আগে একজন মানুষ কত ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে চায়।
আক্কাস আলীর তিনটে ইচ্ছে সম্পর্কে এখানে বাবা লিখেছেন। প্রথমটি তিনি একটি ঘর পাকা করতে চায়, তারপর বোনের বিয়ে দিতে চায়।
চিঠির শেষ অংশে এসে আমার বুক ধক করে উঠল।
ঠিক তখনই শরীরের প্রতিটি লোমকূপ দিয়ে ঠান্ডা ঘাম বের হতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল, ঘরের বাতাস হঠাৎ কয়েক ডিগ্রি ঠান্ডা হয়ে গেছে।
হৃদস্পন্দনের শব্দ নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছিলাম।
আমি থমকে গেলাম। আমার মনে পড়ে গেল বাবার মৃত্যুর এক বছর আগে দেবিদ্বারের খলিলুর গ্রামের সেই বিয়ের অনুষ্ঠানের কথা। সেখানে বাবার সাথে যাওয়ার সময় তখন আজকেে মতো করে কিছুই বুঝিনি।
বাবা নিজের টাকায় একটা মাটির ঘর পাকা করে দিয়েছিলেন। মেয়েটির বিয়ের সমস্ত খরচও বহন করেছিলেন।
তখন ভেবেছিলাম, একদমই অপরিচিত একজন মানুষের জন্য হয়তো বাবার দয়া থেকে এসব করছে।
আজ বুঝলাম, তিনি আসলে দয়া করেননি।
তিনি একটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষের শেষ ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন। ভাবতেই আমার বুকের ভেতর হঠাৎ শীতল ভয় নেমে এল। কাগজের শেষ দিকে লেখা, আক্কাস আলী নিজেকে নির্দোষ দাবি করছে। শেষ ইচ্ছে হিসেবে বলেছেন, "আমার মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, আল্লাহ যেন তাদের কাউকেই স্বাভাবিক মৃত্যু না দেন।"
আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে বসে থাকতে পারলাম না। সবকিছু আগের মতো গুছিয়ে রেখে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
সেদিন শুক্রবার ছিল। প্রতি শুক্রবারে সম্পাদক রায়হান ভাইকে নতুন গল্প পাঠানোর কথা। কিন্তু সেদিন একটি শব্দও লিখতে পারিনি।
বাবা কেন একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষের ইচ্ছাগুলো পূরণ করেছিলেন ? সারাদিন তা ভাবলাম।
ভেবেছিলাম রাতটা চিন্তামুক্ত হবে, হলো না। রাতে ঘুমানোর পর একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নে বাবা এসে ভীষন রাগ দেখালেন। স্বপ্নের একপর্যায়ে বক্সে থাকা খামের ব্যাপারে জানতে চাওয়ায় বলেলেন, যেনো বাকি খামগুলো খুলে না দেখি, ফাঁসির আসামীর শেষ ইচ্ছেগুলো কখনোই জানতে নেই। একবার জানলে তা জীবন দিয়ে হলে ও পূরণ করতে হয়।
মানুষের জন্মই হয় মৃত্যুবরন করার জন্য। ইংরেজিতে একটা কথা আছে "Death is not the opposite of life; it is a part of it." যার অর্থ -মৃত্যু জীবনের বিপরীত নয়; এটি জীবনেরই একটি অংশ।
আমি আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। তখনই বুক সেলফের যে পাশে পুরোনো ফাইল রাখে সেখান থেকে আক্কাস আলীর মামলার পুরোনো নথি বের করলাম।
পাতা উল্টাতেই একসময় থমকে গেলাম, মুহূর্তেই সারা শরীর ভিজে গেছে। ঘরের বাতাস হালকা ভারী। বাইরে ভোরের আজান। মোয়াজ্জেমের আজানের সূরে ও আজ একটা নিরবতা। বিছানায় বসে অনেকক্ষণ নিঃশব্দে থাকলাম।
মামলার বাদী মারা গেছেন। তিনজন প্রধান সাক্ষীও মারা গেছেন। চারজনের একজনও স্বাভাবিক মৃত্যুতে মারা যাননি। দুজনের মৃত্যু ছিল এতটাই ভয়াবহ যে প্রথম আলোর সংবাদপত্রের শেষের পাতায় পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল।
কান্ধীরপাড় বড় মসজিদে এসে ফজর নামাজ পড়লাম। নামাজের পর মোনাজাত নেওয়া হয়নি, বের হয়ে টাউনহল মাঠে হাটছি, এর মাঝেই জীবনে প্রথমবার মনে হলো, বাবার বাস দুর্ঘটনায় মৃত্যু, সেটাও কি সত্যিই দুর্ঘটনা ছিল?
নাকি, অন্যকিছু ? বাবা কি তাহলে আইনের চেয়ারে বসে সঠিক বিচার করতে পারেনি ?
মানুষ নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতিই সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়। আর আমি তো লেখক। রহস্যের গন্ধ পেলেই আমার ভেতরের মানুষটা আর স্থির থাকতে পারে না।
প্রতিদিন বিকেলে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে রক্তের মতো লাল হয়ে ডুবে যায়, আমি ছাদের পশ্চিম কোণে বসে সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। সবকিছু ভুলে থাকতে এখন আইনজীবীর পেশা বাদ দিয়ে সারাদিন উপন্যাস লিখি, তবু ও সবকিছু ভুলে থাকতে পারি না।
প্রায় মনে হয়, কেউ যেন খুব আস্তে করে আমার কানে ফিসফিস করে বলছে, "বাকি দুইটা খাম খুলে দেখো, তাদের শেষ ইচ্ছাগুলো তোমার বাবার মতোই পূরন করা দরকার, ..... "
সমাপ্ত