Collected সেই আলোটির নিচে

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
435
Messages
6,871
Reaction score
4,791
Points
3,963
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
সেই আলোটির নিচে

মূল লেখকঃ সৈয়দ বাশার






সুমনা ফোন করে বললো, 'অ্যাই, কারেন্ট চলে গেলে কি তোমার রুমের বাতিটা জ্বলে?'
আমি তখন মিটিংরুমে বসে, বসের ঝাড়ি খাওয়া মাত্র শেষ করেছি। মেজাজ খারাপ। এর মধ্যে ওর ফোন।
বললাম, 'জ্বলবে না কেন? জ্বলে তো। চিকমিক চিকমিক করে ঝাড়বাতির মতো জ্বলে।'

সুমনা বললো, 'মজা করো কেন? দেখেছি তাই বললাম।'
'জীবনে কোনো বাতিকে কারেন্ট গেলে জ্বলতে দেখেছ? তুমি তো আস্ত পাগল।'
'প্লিজ, পাগল বলবে না আমাকে।'
সুমনা ফোনটা রেখে দিলো। আমি বিরক্তি নিয়ে আবার স্যারের ঝাড়ি শোনায় মন দিলাম। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত আটকে রেখেছে ঝাড়ি শোনানোর জন্য। এর কোনো মানে হয়?

বাড়িতে ফিরে দেখলাম সুমনার মুখ থমথমে। আমি '' গানের সুর ভাজতে ভাজতে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। পাত্তাই দিলাম না ওকে। বাথরুম থেকে এসে দেখলাম ও ভাত তরকারি বেড়ে রেখেছে। খেয়ে শুতে চলে গেলাম। সুমনার সাথে কথাই বললাম না।

***
'শুনো, বিশ্বাস করো আমি দেখেছি। কারেন্ট চলে গেলেই বাতিটা জ্বলতে থাকে অন্ধকারে।'
সুমনার প্যানপ্যানানি আর ভালো লাগছে না। এই শুক্রবারটাতেও ও আগের কয়েকদিনের প্যানপ্যানানি বজায় রেখেছে ‌। অফিসের কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছি। বন্ধুদের সাথে আড্ডা-টাড্ডা দিয়ে ফিরবো। এর মধ্যে দেখি মা ফোন করেছে। ফোন ধরতেই মা বললো, 'তোর সমস্যা কি বলতো? মেয়েটাকে একা বাড়িতে রেখে চলে এসেছিস কেন?'
'অফিসের কাজ আছে তাই চলে এসেছি।'
'চড় লাগাবো একটা। শুক্রবার কি কাজ থাকে অফিসের? আমাকে শেখাস? যা, বাসায় যা এক্ষুনি।'

আমার প্রচন্ড রেগে গিয়ে বললাম, 'দেখো মা, তোমাদের পছন্দে বিয়ে করেছি। যে মেয়ের চেহারা নাই, স্ট্যাটাস নাই, কথা বলার সেন্সটা পর্যন্ত নাই, এমন একটা মেয়েকে স্রেফ মায়ার বসে আমার কাঁধে তুলে দিয়েছ। আমি তো একটা চ্যারিটি ফান্ড, যাকে ইচ্ছা দায়িত্ব আমার কাঁধে তুলে দিবা! তোমাদের পছন্দে বিয়ে করেছি, শেষ। এখন আমার লাইফটা আমার মতো কাটাতে দাও। রাখছি।'

ফোন রেখে মেজাজটা আরো বিগড়ে গেলো।‌নিশ্চয়ই সুমনার কাজ। মাকে ফোন দিয়ে বিচার দিয়েছে। ওকে আরো শিক্ষা দিতে হবে। ভেবেছিলাম আজকে ছয়টার সময়ই বাড়ি ফিরবো।‌কিন্তু এখন আর তা করবো না। এগারোটার আগে কোনো বাড়ি ফেরাফেরি নাই। মেয়েটা একা থেকে থেকে বুঝুক, মাকে বিচার দেবার কি শাস্তি।

বাসায় ফিরলাম বারোটায়। ভেবেছিলাম সুমনা ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু না, ও বসে আছে চুপচাপ সোফায়। মুখটা শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে গেছে। আমাকে দেখেই জড়ায় ধরে বললো, 'আমার খুব ভয় লাগছিলো। খুব ভয়।' ওর চোখে পানি।

বাড়িতে এসেই এসব গা ঘেঁষাঘেঁষি ভালো লাগে না আমার। ওকে দূরে ঠেলে দিয়ে বললাম, 'ভয় পাও কেন শুধু শুধু? এই ছয়তলা বিল্ডিংয়ের উপর কিসের ভয়?' শেষ কথাটা ধমকের সুরেই বলেছি।

সুমনা বললো, 'সন্ধ্যা বেলায় কারেন্ট চলে গেলো। তখন ঐ বাতিটা জ্বলে উঠলো। বাতির আলো আমাদের বেডরুম থেকে সামনের ড্রয়িংরুমটা পর্যন্ত যায়। আমি হঠাৎ দেখি, ওখানে একটা মানুষ হাঁটছে।'

আমার মেজাজ গেলো গরম হয়ে, 'কি বলো এসব বোকার মতো। বন্ধ ঘরে মানুষ হাঁটবে কি করে?'

সুমনা বললো, 'সত্যিই বিশ্বাস করো। আমি দেখেছি।'

আমি বললাম, 'পাগল না হলে এসব কেউ দেখে না। তুমি কি একটা পাগল?'

সুমনা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলো। আমার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে বললো, 'প্লিজ, পাগল বলবে না আমাকে।' বলেই চলে গেলো। আমি কেবল তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে।

***

'হ বাবা। ঠিক ধরছো তুমি। ওর মাথায় একটু সমেস্যা আছে।'
সুমনার দাদি ভরা মজলিসে মাথা নিচু করে কথাটা বললেন। ভরা মজলিস বলতে আমাদের আর তাদের পরিবারের সদস্যদের মাঝখানে। আমরা তখন রাগে ফুঁসছি। চিৎকার করে বললাম, 'এ কথা বলেন নাই কেন আগে?'
দাদি বললো, 'বিশ্বাস করো, আমরা পেথ্থমে এরকম বুঝি নাই। সুমনা তো ঠিকই আছিলো আগে। সমেস্যা ছিলো ওর মায়ের মাথায়। ওর নানুর মাথাতেও নাকি সমেস্যা আছিলো। হেরা নাকি কাগোরে দেখতো আন্ধারের মইধ্যে। এইসব সমেস্যার জন্যই লোকে বলতো, সুমনার মাথাতেও সমেস্যা হইতে পারে, ওদের বংশের দোষ। তাই ভয়ে বলি নাই বাপ তোমাদের।'

মা বললেন, 'তাই বলে এরকম পাগল মেয়েকে আমাদের ছেলের ঘাড়ে তুলে দিবেন। আপনারা কি মানুষ?'

সুমনা কাঁদতে কাঁদতে বললো, 'বিশ্বাস করেন মা। আমি সত্যিই কিছু দেখেছি। কয়েকদিন দেখেছি। কারেন্ট চলে গেলে সত্যিই উনার বেডরুমের বাতিটা জ্বলে। আর কারা কারা জানি ঘুরে বেড়ায় ঘরের ভেতর। সত্যি মা এরকম হয় আমার সাথে...'

সুমনার দাদি চিৎকার করে উঠলো, 'অ্যাই মাইয়া চোপ থাক, দেখোস না তোর লাইগাই এই কষ্ট যন্ত্রণা ভোগ করতে হইতেছে আমাগো। তোর মায়ের লাহান বদ্ধ পাগল হবি তুই? তোরে রাস্তায় ছেড়ে দিয়া আসুম এইরকম করলে, আর আমাদের ঘরে উঠতে দিবো না।'

মা বললো, 'আপনি যা ইচ্ছা করুন আপনার মেয়েকে, কিন্তু আমার ছেলের ঘাড়ে তো আর তাকে আমি উঠতে দিতে পারি না। আপনার মেয়েকে নিজের বাসায় নিয়ে যান। ও যেন আমাদের বাড়িতে আর কখনো না আসে।'

সুমনার দাদি সুমনাকে নিয়ে চলে গেলো।‌ সুমনা মাথা নিচু করে চলে গেলো। শুধু একবার ফিরে চেয়েছিলো আমার দিকে। ভেবেছিলাম, ওর চোখে কান্না আর দুঃখের অশ্রুবিন্দু দেখবো। কিন্তু না, ওর চোখে সেরকম কিছু ছিলো না। ওর চোখে ছিলো ঘৃণা, প্রচন্ড ঘৃণা। দাউ দাউ করে জ্বলছিলো ওর চোখদুটো।
আমি ওর দিকে একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে ফেললাম। আর ওর দিকে ফিরে তাকাতে পারলাম না।

***
'অ্যাই, বলো তো, বিয়ে করছো কবে আমাকে?'
ইতির খিলখিল হাসিটা ফোনের এপাশ থেকেও আমি অনুভব করতে পারছি। মেয়েটা হাসলে কি যে সুন্দর লাগে! মনে হয় মোনালিসা ওর কাছে ফেইল, দ্য ভিঞ্চি ওকে দেখলে মোনালিসার ছবি ফেলে দিয়ে ইতির ছবি আঁকতেন।
'বলো না, বিয়ে করছো কবে আমাকে?'
'খুব তাড়াতাড়িই, জান। আমাদের ছেলেদের তো আর ইদ্দত পালনের ব্যাপার-স্যাপার নেই, ওর সাথে ডিভোর্সটা হয়ে গেলেই তোমাকে বিয়ে করে নিবো।'
ইতি হাসে, 'উফ, ভাবতেও পারিনি এতো সহজে বোকা বানাবা সবাইকে।'
'দেখতে হবে না, কে বোকা বানিয়েছে।' বলে আমিও হাসি। আসলে সবাইকে বোকা বানাতে হয় নাই তো। শুধু একজনকেই বোকা বানিয়েছিলাম।

সুমনার ফ্যামিলিতে পাগলামির ইতিহাসটা আমি জানতে পেরেছিলাম আমাদের বিয়ের পর। তখন আমার বাড়ির কাউকেই জানাইনি ব্যাপারটা। কিন্তু তখনই প্ল্যানটা মাথায় আসে। ঠিক করেছিলাম, যদি কোনোদিন সুমনাকে ঘর থেকে তাড়াতে হয়, তবে এই বুদ্ধিই অ্যাপ্লাই করবো।

তারপর তো ইতির সাথে আমার পরিচয় হয়। ওর প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকি আমি। একবার অন্তরঙ্গ হয়েই বুঝতে পারি, আমি যেমন একজনকে চাচ্ছিলাম, ইতি তেমনই। আমার মনের সব চাহিদা সে বুঝতে পারে। ওকেই আমার লাগবে।

ওকে পেতে হলে সরাতে হবে সুমনাকে। তাই ওকে সরানোর বুদ্ধিও অ্যাপ্লাই করা শুরু হয়।

ঘরের লাইটটা বদলে একটা বিশেষ এলইডি লাইট লাগিয়ে দিলাম সুমনার অলক্ষ্যে। এটা এখন সব দোকানেই পাওয়া যায়, বোকা সুমনাটা জানে না। লাইটের ভেতর ব্যাটারি থাকে, কারেন্ট চলে গেলেও বেশ কিছুক্ষণ ব্যাকআপ দেয়। যদিও কারেন্ট থাকা অবস্থার আলোর থেকে এই আলোর উজ্জ্বলতা থাকে কম।

এরপর যে কাজটা করলাম, ঘরের ডুপ্লিকেট চাবি দুজন লোককে দিয়ে দিলাম। কিছু টাকাও দিলাম ওদের। ওদের কাজ হবে, যখনই কারেন্ট চলে যাবে কোনো কারণে, ওরা ঘরের দরজা খুলে ভেতরে এসে হাঁটাহাঁটি করবে শুধু। আর কিছু না।

এখন কারেন্ট কখন যাবে, সেটা ওরা জানবে কিভাবে, তাই না? এটা ওদের ওপরই ছেড়ে দিলাম। কারেন্ট তো ঝড়বৃষ্টি ছাড়া যায় না। ঝড়বৃষ্টি ছাড়া কারেন্ট নেবার যে ব্যবস্থা, সেটা ঘরের সার্কিটের এমসিবি বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েই হোক, বা বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করে 'আগুন লেগেছে, লাইনটা বন্ধ করেন দ্রুত' বলে ভাঁওতাবাজি করেই হোক, ব্যাপারটা ওরা দেখেছে। আমার দরকার শুধু সুমনাকে ভয় পাওয়ানো, ব্যস। সুমনা ভয় পেলে ওরা সফল। আর ওরা সফল হলে ওদের টাকার পরিমাণও বাড়বে।

সুমনা ভয় পেয়েছে। ওদেরও মোটামুটি ভালো পরিমাণের টাকা দিয়ে খুশি করে দিয়েছি।

যাই হোক, এতো খাটাখাটনির পর দেখছি আমি বেশ সফল, আর কিছুদিনের মধ্যেই ডিভোর্স দিচ্ছি আমি সুমনাকে, আর এরপর ইতিকে বিয়ে করছি। তারপর আমাদের দুজনের উদ্দাম মেলামেশায় কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

ইতিকে এই কথা বললাম। ইতি বললো, 'অসভ্য'। বলেই লাজুক হাসলো। সেসময়েই চলে গেলো কারেন্টটা।

কারেন্ট যাবার কারণ বুঝতে পেরেছি। বাইরে ঝড় শুরু হয়েছে। কারেন্ট চলে যেতে ওয়াইফাই-য়ের লাইনও বন্ধ হয়ে গেছে, ইতির সাথে হোয়াটসঅ্যাপের কলটাও গেছে কেটে। আমি অন্ধকারে বসে আছি। অন্ধকারে না ঠিক, আধো আলোতে। আমার সেই বিখ্যাত এলইডি লাইট জ্বলছে। ঢিমে তালে জ্বলছে। চারপাশে তাকিয়ে সুমনাকে থাম্বস আপ না দিয়ে পারলাম না। ওর ভয় পাওয়াটা একদমই স্বাভাবিক ছিলো। এমন আলো আঁধারিতে ঘরের বাইরে কাউকে হাঁটতে দেখলে আমি নিজেই তো ভয়ে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে যেতাম।

এখন এসবে মন দিয়ে লাভ নেই। মোবাইলে ব্যালেন্স ভরছি ডাটা কেনার জন্য। ইতিকে আবার কল দিবো। বৃষ্টির রাতে ওর সাথে ইটিশপিটিশ কথা না বললে জমবে না।

ইতিকে কল করছি, বাজছে ফোনটা। এরমধ্যে শব্দ। কেমন একটা পায়ে হাঁটার শব্দ। বাইরের ঘরে মনে হলো হচ্ছে শব্দটা। কে যেন হাঁটছে আমার রুমের বাইরে।

আমি তুড়ি মেরে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলাম। বাইরের দরজায় তালা লাগানো। ঐ ছেলেগুলোকে ডুপ্লিকেট চাবি দেওয়ার পর, কাজ শেষে ওদের কাছ থেকে চাবি নিয়েও রেখেছি। কারো ঘরে ঢুকতে পারার কথা না।‌

তাই বলা যায়, মনের ভুল। এসবে সময় দিয়ে লাভ নেই। ইতিকে কল করছি। ধরছে না ইতি।

এরমধ্যে বাবার ফোন। এতো রাতে বাবা আবার ফোন করে কেন? ধরলাম ফোনটা।

ফোন ধরেই জিজ্ঞেস করলাম, 'কি খবর বাবা?'
বাবা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, 'তোর বউ রাতে বৃষ্টির সময় হঠাৎ ঘরে ঢুকে পড়ে তোর মা কে কুপিয়েছে ছুরি দিয়ে। আমি আটকাতে গেলে আমার হাতেও ছুরি মেরে দিয়েছে। তোর মায়ের অবস্থা ভালো না। আমি তাকে নিয়ে হসপিটাল যাচ্ছি।'
আমি বললাম, 'আমি আসছি বাবা। কোন হসপিটালে যাচ্ছো?'
বাবা হঠাৎ ভয় পাওয়া গলায় বললেন, 'তুই পালা বাবা। শিগগির পালা। ও তোদের বাসার ডুপ্লিকেট চাবিটা নিয়ে গেছে। যেকোনো সময় চলে যাবে তোদের বাসায়। তুই পালা।'

বাইরের ঘরে এসময় শব্দটা আবার হলো। হাঁটার শব্দ। কেউ হাঁটছে। আমি সামনে তাকাই।

আমার ঘরের বাইরে আবছা আলো। ঘরের এলইডি লাইটের অস্পষ্ট আলো বাইরে ঘরে ছায়ামাখা পরিবেশ তৈরি করেছে। সেই আধো-অন্ধকারে, একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়ের মুখটা চুল দিয়ে ঢাকা। হাতে ছুরি। ছুরি থেকে রক্ত পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়।

আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়, নিঃশব্দে।

বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে।


(সমাপ্ত)
 
Back
Top