Collected সততার প্রাঙ্গণ

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
468
Messages
7,526
Reaction score
6,262
Points
4,063
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
সততার প্রাঙ্গণ

মূল লেখকঃ সোহেল আর রানা (Sohel R Rana)






ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে একটা ক্যাফে আছে। নাম, সততার প্রাঙ্গন।
সবাইকে অনুরোধ, এই ক্যাফেতে কেউ যাবেন না।

গতকাল আমার মেজাজটা খুব খারাপ ছিল। একটু নিরিবিলিতে কফি খেয়ে মাথা ঠান্ডা করার জন্য সততার প্রাঙ্গনে গিয়ে বসলাম। একেবারে নতুন, ঝকঝকে পরিবেশ।

আমি এক কোণে বসে কোল্ড কফি আর একটা স্যান্ডউইচ অর্ডার দিলাম। বিল এলো ৪৫০ টাকা। পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটা নতুন নোট বের করে ওয়েটারকে দিলাম।

ওয়েটার ছেলেটি অত্যন্ত বিনয়ী। একদম দেবদূতের মতো হাসি দিয়ে বললো, "স্যার, আপনার বাকি ৫৫০ টাকা আমি ক্যাশ কাউন্টার থেকে নিয়ে আসছি।"

আমি কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে ১০ মিনিট অপেক্ষা করলাম। ১৫ মিনিট গেল, ২০ মিনিট গেল, ওয়েটারের কোনো দেখা নেই।

আমার মেজাজ চড়তে শুরু করলো। সামান্য ৫৫০ টাকা চেঞ্জ করে আনতে ২০ মিনিট লাগে? আমি টেবিল ছেড়ে উঠে সোজা ক্যাশ কাউন্টারের দিকে গেলাম।

কাউন্টারের সামনে ক্যাফে ম্যানেজার, দুইজন ওয়েটার আর চার পাঁচজন কাস্টমার গোল হয়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন!

আমি এগিয়ে গিয়ে ওয়েটারকে বললাম, "কী ব্যাপার ভাই? আমার বাকি ৫৫০ টাকা কই? ২০ মিনিট ধরে বসে আছি।"

ওয়েটার ছেলেটি ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখে জল এনে বললো, "স্যার, আমাকে ক্ষমা করবেন! আপনি যে এক হাজার টাকার নোটটা দিয়েছিলেন, সেটা ক্যাশে রাখার পর আমরা হঠাৎ খেয়াল করলাম, ক্যাশে আগে থেকেই আরেকটা এক হাজার টাকার নোট ছিল। এখন আমরা বুঝতে পারছি না কোন নোটটা আপনার, আর কোনটা ক্যাফের।"

আমি অবাক হয়ে বললাম, "তাতে কী আসে যায়? দুটোই তো এক হাজার টাকার নোট। একটা বের করে আমাকে ৫৫০ টাকা ফেরত দিলেই তো হয়।"

ম্যানেজার সাহেব চশমাটা নাকের উপর ঠেলে অত্যন্ত কড়া গলায় বললেন, "ইম্পসিবল স্যার! আমাদের এই ক্যাফের নীতি হলো, একদম শতভাগ সততা। আমরা না জেনে ভুল নোট স্পর্শ করে কারচুপি করতে পারবো না। যদি আপনার নোটটা বেশি পুরোনো হয়, আর আমরা আপনাকে নতুন নোটের চেঞ্জ দিয়ে দিই? তবে তো ক্যাফের অ্যাকাউন্টে অন্যায় হয়ে যাবে।"

আমি হাঁ হয়ে গেলাম! এরা কি পাগল?

আমি রাগ সামলে বললাম, "ভাইরে ভাই! আমার নোটে হালকা লাল কালির একটা দাগ ছিল, ডান কোণে।"

ম্যানেজার সাহেব জার থেকে দুটো নোটই চিমটে দিয়ে তুলে লাইটের সামনে ধরে পরীক্ষা করলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "দুঃখিত স্যার! দুটো নোটের ডান কোণেই লাল দাগ আছে। একটিতে রক্তের ফোটা, অন্যটিতে চায়ের দাগ। কোনটা আপনার?"

আমার মাথার রগ লাফাতে শুরু করলো। সামান্য ৫৫০ টাকার জন্য এরা মহাকাশ গবেষণার ড্রামা শুরু করছে!

আমি চিৎকার করে বললাম, "ভাই, আমার টাকা লাগবে না! আপনারা ৫৫০ টাকা রেখে দেন, আমি চলে যাচ্ছি!"

ম্যানেজার সাহেব টেবিল থাপড়ে উঠে দাঁড়ালেন, "না স্যার, আপনি আমাদের সততাকে অপমান করতে পারেন না। গ্রাহকের পাওনা না বুঝিয়ে দেওয়া আমাদের নীতিবিরুদ্ধ। আপনি বসুন, আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করছি!"

দশ মিনিটের মধ্যে তিনজন তদন্ত কমিটির লোক এসে হাজির! শুরু হলো নোট শনাক্তকরণ শুনানি।

তারা ক্যাফের সিসিটিভি ফুটেজ জুম করে দেখতে লাগলেন, আমি কোন পকেট থেকে টাকা বের করেছি, কীভাবে ভাজ করেছি, পুরো ক্যাফের সব কাস্টমার এখন কফি খাওয়া ছেড়ে আমাদের এই নোট বিচার দেখছে।

রাত ১০ টা বেজে গেল। আমি খিদেয় আর রাগে কাঁপছি।

আমি বললাম, "ভাই, আপনাদের পায়ে ধরি! আমার ৫৫০ টাকা লাগবে না, আমাকে ছেড়ে দেন।"

ম্যানেজার সাহেব শান্ত গলায় বললেন, "এতো অধৈর্য্য হওয়ার দরকার নেই স্যার। আমাদের সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, আপনি যখন নোটটা বের করেন, তখন নোটের কোণটা একটু কোঁকড়ানো ছিল। এই যে, ক্যাশের দুই নম্বর নোটটা আপনার!"

সবাই একযোগে তালি দিয়ে উঠলো। যেন কঙ্গোতে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো।

ওয়েটার অত্যন্ত ভক্তিভরে আমার হাতে সেই ৫৫০ টাকা ফেরত দিলো।

আমি মনে মনে বললাম, "বাপরে বাপ! জীবনে আর এই ক্যাফের ধারের কাছেও আসবো না।" টাকাটা পকেটে পুরে ঝড়ের গতিতে ক্যাফে থেকে বের হয়ে রাস্তায় এলাম।

রাস্তায় এসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে রিকশা ডাকবো, ঠিক তখনই পকেটে হাত দিয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল!

আমার মানিব্যাগটা নাই!

ভালো করে পকেট চেক করলাম, নেই! নিশ্চয়ই ক্যাফের কাউন্টারে ভিড়ের মধ্যে পকেট থেকে পড়ে গেছে। আর সেই মানিব্যাগে ছিল আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্র, ক্রেডিট কার্ড আর নগদ সাত হাজার টাকা!

আমি উল্টো দৌড় দিয়ে আবার ক্যাফেতে ঢুকলাম।

ভেতরে ঢুকতেই দেখি, ক্যাফে ম্যানেজার, ওয়েটার আর সেই তদন্ত কমিটির তিনজন লোক আবার কাউন্টারে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন! তাদের মাঝখানে আমার সেই কালো রঙের চামড়ার মানিব্যাগটি রাখা।

আমাকে দেখেই ম্যানেজার সাহেব বললেন, "আরে স্যার, আসুন আসুন! আপনার মানিব্যাগটি কাউন্টারের নিচে পাওয়া গেছে।"

আমি এক লাফে সামনে গিয়ে বললাম, "ধন্যবাদ ভাই! ব্যাগটা দিন, আমি বাড়ি যাই।"

আমি হাত বাড়াতেই ম্যানেজার সাহেব ব্যাগটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বললেন, "হোল্ড অন, স্যার! প্রুফ কই যে এটা আপনারই মানিব্যাগ?"

আমি চিৎকার করে বললাম, "ব্যাগের ভেতরে আমার এনআইডি কার্ড আছে, আমার ছবি আছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে।"

ম্যানেজার সাহেব মাথা নেড়ে বললেন, "এনআইডি কার্ডের ছবি তো দশ বছর আগের! তার সাথে আপনার বর্তমান চেহারার মিল মাত্র ৬০% আর ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ আগামী মাসে শেষ হচ্ছে। আমরা কীভাবে নিশ্চিত হবো আপনি ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করছেন না? বসুন, আমরা দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করছি।"

আবার শুরু হলো সেই ৫৫০ টাকার নোটের মতো অশেষ ড্রামা! তারা সিসিটিভি জুম করলেন, ব্যাগের চামড়ার কোয়ালিটি যাচাই করলেন, ব্যাগের ভেতরের সাত হাজার টাকার নোটগুলো আসল না নকল তা পরীক্ষা করলেন, আর ছয়জন তদন্ত কমিটির লোক মিলে টানা এক ঘণ্টা গোপন মিটিং করলেন!

আমি ক্যাফের ফ্লোরে বসে মাথার চুল ছিঁড়ছি!

অবশেষে রাত ১১ টা ৩০ মিনিটে তারা ঘোষণা দিলেন, সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে মানিব্যাগটা আমার পকেট থেকেই পড়েছিল!

পুরো ক্যাফের লোক আবার তালি দিয়ে উঠলো! ওয়েটার অত্যন্ত সম্মানের সাথে মানিব্যাগটি আমার হাতে তুলে দিলো।

আমি আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালাম না। মানিব্যাগটা পকেটে চেপে ধরে ক্যাফে থেকে বের হয়ে উল্টো দৌড় দিলাম!

ক্যাফে থেকে বেশ খানিকটা দূরে এসে রাস্তায় দাঁড়ালাম। যাক বাবা! জীবনে এত বড় যুদ্ধের পর বিজয়ী হয়ে মানিব্যাগটা নিয়ে ফিরতে পারছি।

বাসার উদ্দেশ্যে রিকশা নেবো বলে অন্য পকেটে হাত দিলাম মোবাইলটা বের করে সময় দেখার জন্য

কিন্তু পকেট একদম ফাঁকা!

শার্টের পকেট, প্যান্টের পেছনের পকেট, সাইড পকেট, সব চেক করলাম, কোথাও মোবাইল নেই!

হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠলো, তৃতীয় তদন্ত কমিটির লোক আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে...
 
Back
Top