- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 419
- Messages
- 6,400
- Reaction score
- 3,446
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
ফিরতি পথের বাঁকে
মূল লেখকঃ মৌলি আখন্দ
মূল লেখকঃ মৌলি আখন্দ
চৈতীর সঙ্গে এভাবে দেখা হবে, এখানে, এতো দিন পরে, স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু ভাবতে পারা উচিত ছিল।
কতো দিন পরে আবার আমার সঙ্গে দেখা হলো ওর? প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পরে।
শেষ বার দেখা হয়েছিল মালয়েশিয়ায় একটা আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে। আমাদের একসাথে প্রেজেন্টেশন ছিল।
কনফারেন্স শেষ করে কোনো নোটিশ ছাড়াই আমাকে ব্লক করে দিয়েছিল ও, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, কন্ট্যাক্ট নাম্বার সবকিছু থেকে। ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।
তার কিছুদিন পরেই আবার জানতে পারলাম বিয়ে হয়ে গেছে ওর। যতটা না কষ্ট পেয়েছিলাম তার চেয়ে বেশি হয়েছিলাম বিস্মিত।
আমাকে একটু বললেই পারতো। আমি ওর পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াতাম।
ওর সুখের পথে বাধা হতাম না।
তারপর থেকে আমি আর যোগাযোগ রাখিনি কারো সঙ্গে। ভার্সিটির পুরো সার্কেলটাকেই এড়িয়ে যাওয়া শুরু করে দিয়েছিলাম।
আর পর পর কয়েকটা গেট টুগেদার অনুষ্ঠান এড়িয়ে যাওয়ার পরে ওরাও আর ডাকতো না আমাকে।
ইউনিভার্সিটি অফ এডমন্টন থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের পরে আবার দেশে ফিরে এসেছি, খুব বেশি দিন হয়নি। অনেক দিন পরে আবার আমার মনে হয়েছিল হয়তো এখন আর এই গেট টুগেদার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবে না ও।
মনে হওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। ও কখনো কোন দিন আমাদের ফেসবুক কিংবা মেসেঞ্জার গ্রুপে কোনো রেসপন্স করতো না।
এখন ও যে এমন নীরব ঘাতক হয়ে চলে আসবে অনুষ্ঠানে, কে জানত তা?
আমার সঙ্গে একই টেবিলে বসতে হলো তার। আর কোনো টেবিলে জায়গা ছিল না।
ওর বাম পাশের চেয়ারে বসে আছে ছোট্ট একটা দেবশিশু। রেশমের মতো চুল, মোম মাখানো আপেলের মতো লালচে গাল।
দেখে বুকের ভেতর ব্যথা করে ওঠে। এমন একটা দেবশিশুর বাবা কি আমিই হতে পারতাম না?
বার বার করে তাকাচ্ছি চুরি করে, কিন্তু ধরা পড়ে গেলাম একটা সময়। চোখে চোখ পড়ে যেতেই মৃদু হাসলো একটু।
আমি কথা বলবো না বলবো না করেও বলে ফেললাম, "ওর বয়স কতো? "
"সাড়ে চার বছর। "
"কী নাম রেখেছ?"
"তটিনী!"
স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম একটা মুহূর্তের জন্য। ভালোবাসার কোনো একটা চরম মুহূর্তে প্রেমিক প্রেমিকা ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য নাম ঠিক করে।
আমরাও করেছিলাম। তটিনী আমাদের দুজনের ঠিক করে রাখা অনাগত সন্তানের নাম ছিল।
ও আমার সঙ্গে প্রতারণা করে আবার আমার দেওয়া নাম কেন রেখেছে?
রাগ উঠে গেল। খাওয়া অসমাপ্ত রেখে উঠে গেলাম।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে কেউ একজন ওকে গান গাইতে অনুরোধ করতে শুরু করল।
খানিকক্ষণ সময় গাইগুই করে গান গাইতে শুরু করল সে।
"পথ চলিতে যদি চকিতে
কভু দেখা হয়, পরান প্রিয়!
চাহিতে যেমন, আগের দিনে
তেমনই মদির চোখে চাহিও..."
উফ অসহ্য। ভদ্রতা বজায় রাখা গেল না আর, প্রচণ্ড মাথা ব্যথার অজুহাত দেখিয়ে আসর ছেড়ে চলে এলাম।
এখন তো আমার সঙ্গে কোনো কথা বলার নেই তার। কোনো প্রয়োজন নেই।
এখন নিশ্চয়ই তার সুখের সংসার। তবে কেন আমার জগৎ এলোমেলো করে দেওয়া?
বলতে দ্বিধা নেই, আজও ও আমার দিকে তাকালে শূন্য হয়ে যায় আমার সমস্ত চরাচর। থেমে যায় বাতাসের গতি, থমকে দাঁড়ায় ঘড়ির কাঁটা।
কিন্তু তাতে কী? সে তো আর আমার নয়।
সে তো এখন অন্য কারো ঘরণী।
ঢাকা থেকে চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। পোস্ট ডকের অফার পেয়েছিলাম।
জয়েন করব বলে জানিয়ে দিয়ে মেইল করে দিয়েছি। শেষ মুহূর্তের কিছু কেনাকাটা করতে হবে।
ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা তুলতে পারলাম না, কী যেন সমস্যা। অগত্যা বাধ্য হয়ে গেলাম ব্যাংকে।
আর সেখানেই ডেস্কে দেখা হয়ে গেল তার সাথে।
চমকে উঠলাম আমরা দুজনেই। প্রথমে সামলে নিল ও-ই।
কেজো স্বরে বলল, "ইয়েস স্যার, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?"
বললাম প্রয়োজনটা।
টাকাগুলো তুলে প্রয়োজন ছাড়াই হাসলো একটু। আমি আমার মুখে সেই হাসি ছড়িয়ে পড়তে দিলাম না।
অনাবশ্যকভাবে শক্ত করে রাখলাম মুখের সব মাংসপেশি।
ওর হাসি মুছে গেল তাই দেখে। টাকাগুলো নিতে নিতে শুনলাম বলছে, "হ্যাভ আ গুড ডে স্যার! "
টাকার বান্ডিল খোলার সময় ওপরে একটা কাগজ পেলাম আমি। সেখানে লেখা একটা ছোট্ট চিরকুট।
সাদিব,
এতো দিন পরে আবার তোকে দেখে অনেক ভালো লাগল। আমার দিকে অনেক রেগে আছিস না? বিশ্বাস কর আমার দোষ ছিল না। একটা বার কল করিস, বুঝিয়ে বলব।"
নিচে একটা নাম্বার দেওয়া।
চিরকুটটা টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেললাম। এতো দিন পরে আবার এইসব আদিখ্যেতা অর্থহীন।
তাও আবার অন্যের বউ, পরস্ত্রী!
যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে শীঘ্রই। দেখতে দেখতে কেটে গেছে আমার ছুটির সময়।
এয়ারপোর্টে এসে বিদায় জানিয়ে গেল আমার ভার্সিটির সার্কেল। শেষ মুহূর্তে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল রাইমা, "খুব এক্সপেক্ট করেছিলাম তোদেরকে আবারও একসাথে দেখবো, কিন্তু.. হলো না! "
আমার বুকের ভেতর পুরনো ক্ষত, সেখানে নতুন করে ছুরিকাঘাত হলেও আমি আমার গোপন রক্তক্ষরণ সামলে নিতে শিখে নিয়েছি। হাসতে হাসতে বললাম, "মাফ কর বস, অন্যের বউ নিয়ে আমার টানাটানি করা ঠিক পোষালো না!"
রাইমা মাথা নেড়ে বললো, "হ্যাঁ, আমার বোঝা উচিত ছিল, ছেলেদের তো আর ডিভোর্সি মেয়ে পছন্দ না! তাদের জন্য দরকার কুমারী মেয়ে! "
ভয়াবহ চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, "ডিভোর্সি মেয়ে? এ কথার অর্থ কী হলো? "
এবার রাইমাও চমকে গেল, "কেন? তুই জানিস না?"
"না তো! আমি কীভাবে জানব?"
"মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসার পরেই আংকেল অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। আংকেলের জোরাজুরিতে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল ও। কিন্তু সেই ছেলেটার চরিত্র ভালো ছিল না, গায়েও হাত তুলত শুনেছি। অবশেষে সাড়ে তিন বছর পরে যখন আংকেল মারা যায়, ওকে ডিভোর্স দিয়ে চলে এসেছে আমাদের চৈতী! এখন মেয়ে নিয়ে একাই থাকে, সেই হারামি মনে হয় খবরও নেয় না! "
নিদারুণ অপরাধবোধে পুড়তে লাগলাম আমি। রাইমা মাথা নেড়ে বললো, "অবশ্য ভালোই হয়েছে, বিয়ের জন্য বাচ্চাসহ ডিভোর্সি মেয়ে পছন্দ করে আবার কে? আন্টিকে বল তোর জন্য একটা ভালো মেয়ে দেখতে! "
আমি বাধা দিয়ে বললাম, "রাইমা, ওর নাম্বার দিবি আমাকে? "
অবাক হয়ে গেল রাইমা, "এখন? এখন তোর ফ্লাইটের সময়.. "
"কথা বাড়াইস না রাইমা, দে, প্লিজ! "
আর কথা না বাড়িয়ে নাম্বার দিলো রাইমা। আমি ডায়াল করলাম আমার চৈতীর নাম্বারে, কাঁপা কাঁপা হাতে। একদিন আমার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিল ও, আমি বলিনি। আজকে বুভুক্ষুর মতো করে ওর নাম্বারে কল করে যাচ্ছি আমি, রিসিভ করছে না ও।
ভীষণ ভয় লাগছে আমার। কলটা রিসিভ করবে না চৈতী?
কতো জন্ম ধরে, কতো যুগ যুগ ধরে কল করে যাচ্ছি আমি ওকে?