- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 462
- Messages
- 7,447
- Reaction score
- 6,054
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
ফিলাডেলফিয়ার সেই রাত
মূল লেখকঃ শরীফ হাসান
মূল লেখকঃ শরীফ হাসান
সালটা উনিশশো ছিয়ানব্বই। অক্টোবরের এক রাত। শহরের এক বড় হাসপাতাল।
করিডোর দিয়ে হেঁটে গেলে শুধু মনিটরের সবুজ আলোগুলো দেখা যাচ্ছে, দূরে কোনো যন্ত্রের ক্ষীণ শব্দ, আর ফিনাইলের গন্ধ।
সাতশো তেরো নম্বর কেবিনের নারী রোগীটির তখনও পুরোপুরি জ্ঞান ফেরেনি। অপারেশনের পর শরীর তার ভারী, মাথার ভেতর তুলোর মতো কুয়াশা। হাত তুলতে চাইল, পারল না। চোখ খুলল, আবার বন্ধ হয়ে গেল।
তার মনে হচ্ছিল কেউ কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে ফিসফিস করে বলল, “নার্স...”
কেউ উত্তর দিল না। তারপর সেই মানুষটি ঝুঁকে এল।
ডাক্তার।
দিনের বেলায় এই মানুষটির মুখ দেখলে কেউ ভয় পেত না। বরং বিশ্বাস করত। পরিচ্ছন্ন সাদা কোট, গলায় স্টেথোস্কোপ, পরিমিত হাসি, নরম গলা।
রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সময় এমন ভঙ্গি করে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দায়িত্বশীল মানুষ তিনি। কিন্তু হাসপাতালের রাত মানুষের আরেক চেহারা বের করে আনে।
আর কিছু মানুষ অন্ধকার পেলেই বুঝতে পারে, ক্ষমতা আসলে কী জিনিস।
ডাক্তারটি জানতেন রোগিণী দুর্বল। জানতেন ওকে কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে। জানতেন তাঁর কথা স্পষ্ট হবে না, হাত-পা ঠিকমতো নড়বে না, প্রতিবাদ করার শক্তি থাকবে না।
এই জ্ঞানই তাঁকে থামায়নি। বরং আরও সাহসী করেছিল।
পরদিন সকালে নার্স যখন রোগিণীর বিছানার চাদর বদলাচ্ছিল, মেয়েটি শুধু বলেছিল—“রাতে ডাক্তার এসেছিল।”
নার্স থেমে গিয়েছিল। “কোন ডাক্তার?”
মেয়েটি নাম বলতে পারেনি। শুধু বলেছিল—“যেই মানুষটা হাসে।”
───
মানুষটির নাম এখানে জরুরি নয়। ধরা যাক, নাম সামির হোসেন। বাংলাদেশে জন্ম। মেধাবী ছাত্র। ঢাকা মেডিকেল কলেজ। তারপর আমেরিকা। এমন গল্প বাংলাদেশে খুব পরিচিত।
বিমানবন্দরে বাবা-মা বিদায় দিয়েছেন। মা কেঁদেছেন। বাবা বলেছেন, “মন দিয়ে থেকো, নাম করো।”
ছেলেটি সত্যিই নাম করেছিল।
অবশ্য বাংলাদেশ থেকে MBBS-এর সার্টিফিকেট নিয়ে গেলেই আপনি ওখানে ডাক্তার হতে পারবেন না। USMLE নামের তিনটে লোহার গেট পেরোতে হয়, প্রত্যেকটার জন্য দিনের পর দিন, রাতের পর রাত মুখ গুঁজে পড়া লাগে।
তারপর ECFMG, তারপর রেসিডেন্সি ম্যাচ - যেখানে একজন আমেরিকান ছাত্রের সাথে লড়াইয়ে একজন বাংলাদেশি ছাত্রের নম্বর বেশি হলেও ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা অর্ধেক।
অনেকেই মাঝপথে হাল ছেড়ে দেয়। কেউ ট্যাক্সি চালায়, কেউ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ক্যাশে বসে, আর বুকের ভেতর পুষে রাখে একটা সাদা অ্যাপ্রোনের স্বপ্ন।
সামির অবশ্য পেরেছিল। শেষ পর্যন্ত আমেরিকার রেজিস্টার্ড ফিজিশিয়ান হিসেবে হাসপাতালের চাকরি হয়েছিল তার।
তারপর তো কেবলই টাকা আর টাকা। ভালো বাড়ি। দামি গাড়ি। শহরের অভিজাত এলাকায় বসবাস।
বাংলাদেশে আত্মীয়স্বজন বলতে শুরু করেছিল—
“আমাদের সামির এখন অনেক বড় ডাক্তার।”
বড় হওয়ার সংজ্ঞা আমাদের খুব সরল। ডলার বেশি মানেই মানুষ ও বড়।
───
সামিরের একটা দুর্বলতা ছিল। নারী। তবে দুর্বলতা বললে তাকে একটু বেশি ভদ্র শোনায়। সে আসলে ছিল লম্পট।
ক্ষমতাবান পুরুষদের মধ্যে যে ধরনের লালসা সবচেয়ে বিপজ্জনক, তার মধ্যে সামিরের লালসা ছিল সেই ধরনের—সে নারীকে মানুষ হিসেবে খুব কমই দেখত।
তার কাছে মানুষ ছিল সুযোগ। হাসপাতালে অসুস্থ নারী মানে আরও বড় সুযোগ।
কেউ ভীত, কেউ একা, কেউ স্বামী থেকে দূরে, কেউ অস্ত্রোপচারের পর দুর্বল—সামিরের চোখে এসব ছিল রোগীর medical condition নয়, ক্ষমতার মানচিত্র।
সে জানত কোথায় গেলে কেউ প্রশ্ন করবে না। কোন নার্স কখন ডিউটিতে থাকে। কোন করিডর রাত দুটোর পর ফাঁকা পাওয়া যায়। কোন রোগী ওষুধে ঘুমিয়ে থাকবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কোন মানুষটি তার বিরুদ্ধে কথা বললেও কেউ প্রথমে বিশ্বাস করবে না। কারণ সে ডাক্তার।
সাদা কোটের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। রক্ত লেগে থাকলেও মানুষ প্রথমে ভাবে—অপারেশন করতে গিয়ে রক্ত লেগেছে।
───
সেই রাতের ঘটনার পর মেয়েটি অভিযোগ করেছিল।
প্রথমে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করতে চায়নি।
তারপর পুলিশ আসে। তারপর কাগজপত্র। তারপর আইনজীবী। আর সামির?
সে তখনও শান্ত। অবিশ্বাস্য রকম শান্ত।
সে বলেছিল, “রোগী post-operative delirium-এ ছিল।”
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষা অনেক সময় সত্যের চেয়েও শক্তিশালী শোনায়।
একজন অসহায় নারী বলছে—“আমার সঙ্গে খারাপ কিছু হয়েছে।”
অথচ একজন বিখ্যাত চিকিৎসক বলছে—“এগুলো ওষুধের সাইড এফেক্টস।”
কাকে বিশ্বাস করবেন? এটাই ছিল সামিরের হিসাব।
কিন্তু হিসাবের একটা ভুল ছিল। মেয়েটি পুরো রাত মনে রাখতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু সবকিছু ভুলেও যায়নি।
কিছু স্মৃতি শরীরের ভেতরে আটকে থাকে। মুখ মনে থাকে না। নাম মনে থাকে না। কিন্তু গন্ধ মনে থাকে।কণ্ঠস্বর মনে থাকে। একটি হাতের স্পর্শ মনে থাকে।
আর কখনো কখনো ভয় সবচেয়ে ভালো সাক্ষী হয়ে ওঠে।
───
সামির একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। বিমানবন্দরে তার নাম ছিল না। বাড়ি খালি। গাড়ি নেই। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে খুব বেশি টাকা নেই।
স্ত্রীও কিছু জানেন না—অথবা জানলেও বলছেন না।
বাংলাদেশে ফোন গেল। সেখানে বৃদ্ধ বাবা প্রথমে বললেন— “আমার ছেলে এমন করতে পারে না।”
কিছুক্ষণ পরে বললেন— “ছোটবেলা থেকেই একটু জেদি ছিল।” তারপর ফোন কেটে দিলেন।
───
এই জায়গায় গল্পটা থামিয়ে অন্য একটি গল্প শুরু করা যাক। ঢাকার বহু পুরনো এক খুনের মামলা।
নাম ধরা যাক—ফয়সাল করিম। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে শহরটাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেই ঘটনা। ফয়সাল ছিল বিত্তশালী পরিবারের সন্তান।
ওর স্ত্রী খুন হলেন। মামলা হলো। সংবাদপত্রে প্রতিদিন নতুন খবর। শেষ পর্যন্ত আদালত মৃত্যুদণ্ড দিল।
তারপর এক ভোরে কারাগারের ফাঁসির মঞ্চে একজন মানুষ দাঁড়াল।
সরকারি কাগজ বলল—ফয়সাল করিমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। কিন্তু ঢাকার গল্প সরকারি কাগজের চেয়ে বেশি দীর্ঘ।
কয়েক বছর পর এক লোক বলল, সে ফয়সাল কে কোলকাতায় দেখেছে।
আরেকজন বলল, না, সে নাকি ব্যাংককে।
তৃতীয়জন বলল, “আমার চাচাতো ভাই জেলে চাকরি করত। সে বলেছে, ফাঁসিটা অন্য লোকের হয়েছিল।”
কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু গল্পটি মরেনি। বরং বছর যত গেছে, গল্প তত সুন্দর হয়েছে।
এটাই বাঙালির সমস্যা। আমরা সত্যকে একবার শুনে ভুলে যাই। কিন্তু রহস্যকে বংশপরম্পরায় বহন করে চলি।
───
প্রায় পঁচিশ বছর পর কানাডার একটি ছোট শহরে এক বৃদ্ধ চিকিৎসকের নাম নিয়ে গুজব ছড়াল।
ওই লোকটি ই নাকি সামির। একই বয়স। একই দেশের মানুষ। চেহারায়ও অদ্ভুত মিল।
কেউ ছবি তুলে রাখেনি। কেউ নিশ্চিত নয়। তবু গল্প ছড়িয়ে গেল।
তারপর কেউ বলল, তিনি নাকি আর ডাক্তারি করেন আরেকজন বলল, করেন।
তৃতীয়জন বলল, আরে উনার স্ত্রীও তো ডাক্তার। চতুর্থজন বলল, “লোকটা নাকি খুব ভদ্র।”
এই শেষ কথাটিই সবচেয়ে অস্বস্তিকর। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষগুলোকে বাইরে থেকে অনেক সময় ভদ্রই দেখায়।
───
সামিরের স্ত্রী একবার ওর বন্ধুকে বলেছিলেন— “তুমি জানো, ওর একটা অভ্যাস ছিল?”
“কী?”
“ঘুমানোর আগে দরজা তিনবার পরীক্ষা করত।”
বন্ধুটি হেসেছিল। “ভয় পেত নাকি?”
স্ত্রী বলেছিলেন, “না। ও ভয় পেত না।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে যোগ করেছিলেন—
“ও চাইত অন্যরা যেন ভয় পায়।”
───
মানুষের চরিত্র বোঝার জন্য তার পেশা সবসময় যথেষ্ট নয়। একজন ডাক্তার জীবন বাঁচাতে পারেন। আবার একই জ্ঞান দিয়ে কাউকে অসহায়ও করে দিতে পারেন।
একজন আইনজীবী ন্যায়বিচারের জন্য লড়তে পারেন।
আবার অপরাধীকেও আইনের ফাঁক দিয়ে বের করে আনতে পারেন।
একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রার্থনা করতে পারেন। আবার সময়ে দরজা বন্ধ করে নিষ্ঠুর হতে পারেন।
পেশা মানুষকে ভালো করে না। ক্ষমতা মানুষটির ভেতরে কী আছে, সেটাই প্রকাশ করে।
সামিরের সমস্যা ছিল সে ক্ষমতা পেয়েছিল খুব বেশি, আর বিবেক পেয়েছিল খুব কম।
───
তবু তার গল্পের সবচেয়ে অদ্ভুত অংশ হলো—সে কোথায় গেল? কেউ জানে না।
হয়তো সে সত্যিই অন্য দেশে নতুন নামে বসবাস করেছে।
হয়তো কোনো শহরের হাসপাতালে আবার কাজ করেছে।
হয়তো কোনো বৃদ্ধাশ্রমে বসে একদিন নিজের পুরনো জীবনের কথা মনে করেছে।
হয়তো তার স্ত্রী পুরো ব্যাপারটা জানতেন। হয়তো তিনিও জানতেন না।
অথবা সবচেয়ে ভয়ংকর সম্ভাবনাটি সত্যি— হয়তো সামির কখনো নিজেকে অপরাধী মনে করেনি। এফবিআই এর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকার পরেও।
কারণ কিছু মানুষ অপরাধ করার পর অনুতপ্ত হয়। আর কিছু মানুষ শুধু ধরা পড়ার জন্য আফসোস করে।
───
বছর কুড়ি পরে সেই নারী, যিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রাতটা কাটিয়েছিলেন, একদিন একটি পুরনো ছবি দেখলেন। একটি সম্মেলনের ছবি।
সাদা কোট পরা বহু ডাক্তার। ছবির এক কোণে সামির৷ নারীটি ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব ধীরে বললেন— “এই লোকটা।”
স্বামী পাশে বসেছিলেন। “নিশ্চিত?”
তিনি মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ।”
“কীভাবে?”
নারীটি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—
“মানুষের মুখ ভুলে যাওয়া যায়।”
তারপর ছবির দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন—
“কিন্তু ভয়কে ভুলে যাওয়া যায় না।”
───
আর সেই মুহূর্তে কয়েক হাজার মাইল দূরে, কোনো এক অচেনা শহরে, হয়তো একজন বৃদ্ধ মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখছিলেন।
চুল সাদা। চোখের চারপাশে ভাঁজ। মুখে বয়সের ছাপ।
কিন্তু আয়নার ভেতরের মানুষটি জানত— সাদা কোট খুলে ফেলা যায়। দেশ বদলানো যায়। নাম বদলানো যায়।
কিন্তু নিজের ভিতরের মানুষটিকে নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলা যায় না।
সমাপ্ত