Collected পেপার কাকা

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
469
Messages
7,535
Reaction score
6,287
Points
4,063
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
পেপার কাকা

মূল লেখকঃ মাইনুদ্দিন চৌধুরী






দুই দুইটা বাসি দৈনিক পত্রিকা কেনার পর অবশেষে মুখ খুললেন পেপার ওয়ালা কাকা!
জানালেন তার পাশে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে থাকা বিড়ালটির নাম "বখতিয়ার!"

কাকার সাথে দেখা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে!
খুলনাগামী সন্ধ্যার চিত্রা এক্সপ্রেসে ভায়রা ভাইকে উঠিয়ে দিতে এসেছিলাম!

দেখি কাঠের একটা বাক্সের উপর বিক্রি না হওয়া পত্রিকা আর বিড়ালটা নিয়ে বসে আছেন!

কাকার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ দেখে ভয়ে ভয়ে বললাম, "আপনি কি বিড়ালটা পালেন?"

"আমি কি পালুম? আমারেই পালে কেডা?"
আমার কথা শুনে কাকার বিরক্তি‌‌ যেন আরো বেড়ে গেল!

"তয় বিলাই টা রাইতে কেন জানি আমার এই বাক্সের উপর আইসা ঘুমায়!
অবলা প্রাণী, আমিও কিছু কই না!"

কাকার মেজাজ এর দিকে খেয়াল করে আস্তে আস্তে বলি, "বখতিয়ার নাম রাখার কোনো মাজেজা আছে?'

"তেমন কিছু না! পোলা বিলাই, তাই নাম রাখছি বখতিয়ার! আমি ডাকলে ম্যাও ম্যাও কইরা সাড়া দেয়!
সারাদিন স্টেশনেই থাকে! রাতে আইসা আমার খ্যাতা কম্বলের মধ্যে ঢোকে! আমার হাতে খায়!"

বোঝা যাচ্ছে এখন নিঃসঙ্গ মানুষটার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী এই বিড়াল!

"নিজের পোলারে তো ত্যাজ্য করছি, এখন এইডাই আমার পোলা!

কেন ত্যাজ্য করছি তা আর জানতে চাইয়েন না!" পুত্রের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে সেখানেই ইতি টানেন "পেপার কাকা"!

কাকার আসল নাম জিজ্ঞাসা করার সাহস পাইনি, তবে আমরা কথা বলা অবস্থায় একাধিক হকার তাকে "পেপার চাচা" নামে ডাকছিল!

চাচার বেচা বিক্রির অবস্থা যে তথৈবচ তা বোঝা যাচ্ছে তার এই স্তুপ করা অবিকৃত পত্রিকা দেখে!

তবুও জিজ্ঞেস করি, "পত্রিকা বিক্রি হয় না কাকা?"

"১৮ বছর‌ আমি এই কমলাপুর রেলস্টেশনে! আগে প্রথমবারের পেপার দুপুরের মধ্যে বিক্রি হইয়া যাইত, এজেন্ট এর কাছ থেকে দুইবার আনা লাগছে! আর এখন তো দেখতেই পাইতাছেন!" কাকার মুখটা কালো হয়ে ওঠে!

আসলেই তো! একটা সময় সকাল হলেই আমরা অপেক্ষা করতাম দৈনিক পত্রিকার জন্য! সকালে উঠে উত্তেজনা নিয়ে দরজার নিচে তাকিয়ে থাকতাম কখন হকার চাচা দরজার ফাঁক দিয়ে তরতাজা নতুন পত্রিকা দিয়ে যাবেন!

সকালের গরম গরম খবর আর নিউজপ্রিন্টের অদ্ভুত একটা গন্ধ!
খেলাধুলার পাতা, সিনেমা আর বিনোদনপাতা নিয়ে ভাই-বোনদের টানাটানি! চাকুরির বিজ্ঞাপনের পাতাটা আবার বেকার বড় ভাইয়ের জন্য আলাদা করা থাকতো!

তখন নিশ্চয়ই আমাদের "পেপার কাকা"র মুখেও থাকত ছোট্ট এক তৃপ্তির হাসি। দুপুরের আগে যে সব পত্রিকা শেষ!

কিন্তু সে সময়টা হারিয়ে গেছে!

মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। খবর এখন আলোর গতিতে আসে স্ক্রিনে, আঙুলের এক ছোঁয়ায়।

তাই এখন প্রায় প্রতিদিনই অনেক পত্রিকা বিক্রি না হয়ে পড়ে থাকে। রাত্রি গভীর হলে 'পেপার কাকা' সেই অবিক্রীত কাগজগুলোকে বালিশ বানিয়ে বাক্সের উপর শুয়ে পড়েন।

তার হেরে যাওয়া জীবনটায় একটু শান্তি হয়ে থাকে শুধু বখতিয়ার!

বললাম, "কাকা আপনার কোন ইচ্ছা আছে যা পূরন‌ হলে ভালো লাগতো! "

"মাইয়াটার বিয়া দিছি বড় ঘরে!
দুই বছর হইলো নাতি হইছে একটা! এখনো দেখতে যাইতে পারি নাই! হাত খালি ছিলতো একেবারে!"

পেপার কাকা এবার তার মনের ঝাঁপি পুরো খুলে দিয়েছেন!

"ইচ্ছা আছে এবার কোরবানে নাতিরে দেখতে যামু! টাকা জমাইছি! বড়লোকেরা যেমন কুটুমবাড়িতে গরুর রান পাঠায়, আমিও একটা রান লইয়া যামু, নাতিটার জন্য!"

সোডিয়ামের আলোতে বৃদ্ধ মানুষটার স্বপ্নিল চোখ ছলছল করে ওঠে!
 
Back
Top