- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 445
- Messages
- 7,085
- Reaction score
- 5,081
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
নিষ্ঠুর সময়
মূল লেখকঃ মোস্তাফিজুর রহমান টিটু
মূল লেখকঃ মোস্তাফিজুর রহমান টিটু
দক্ষিণ বঙ্গের প্রত্যন্ত এক গ্রাম । সময়টা ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে।
বাড়ির বড় ছেলে সোবহান মেট্রিক পাশ করলো দ্বিতীয় বিভাগে। গ্রামের স্কুল থেকে আর একজনই কোনো মতে পাশ করেছে তৃতীয় বিভাগে। বাকি সবাই ফেল। এরকম রেজাল্টেই অবশ্য গ্রাম বাসী অভ্যস্ত। তিন বছর পর এই গ্রাম থেকে কেউ পাশ করলো। সেই হিসাবে সোবহানের রেজাল্ট অভাবনীয়। ঐ সময়ে সাধারণত গ্রামের কেউ মেট্রিক পাশ করলে অল্প দিনের মধ্যেই ভালো একটা চাকুরী জুটিয়ে ছাত্রজীবনের সমাপ্তি টানতো। কিন্তু সোবহান তো আর সাধারণ পাশ করে নাই। অতএব সোবহান কলেজে ভর্তি হলো। সমস্যা হলো কলেজ হলো গ্রাম থেকে চার মাইল দূরে। এত দূর হেটে প্রতিদিন কলেজে যাওয়া-আসা সম্ভব তবে সেটা কষ্টকর, আর ভালো ছাত্র মানেই তো অন্যদের চাইতে আলাদা; কিছুটা অতিরিক্ত সুবিধা তাদের প্রাপ্যই। সুতরাং ঠিক হলো খালার বাসায় থেকেই সোবহানের পড়াশুনা হবে। খালার বাসা কলেজ থেকে মাত্র আধা মাইল দূরে। খালা-খালু খুব খুশী মনেই সোবহানকে বাসায় নিয়ে আসলেন। এখনকার আত্মীয়তার বাঁধন যদি সুতা হয় তৎকালে সেটা যে নাইলনের দড়ি ছিলো সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই। তবে এর চাইতেও বড় কারণ ছিলো দুই খালাতো ভাই। একজন ক্লাস এইটে দুইবার ফেল আর একজন সিক্সে একবার। সোবহান বাসায় থাকলে নিশ্চয়ই ছোট ভাইদের পড়াশুনায় সাহায্য করবে।
তিন-চার সপ্তাহ কেটে গেলো। একদিন হঠাৎ গ্রামের মানুষ দেখে সোবহান হনহন করে বাসার দিকে যাচ্ছে এক হাতে স্যুটকেস আর এক হাতে একটা বড় ইলিশ নিয়ে। বাসায় পৌঁছাতেই মা জিজ্ঞেস করে, কিরে সোবহান কলেজ কি ছুটি?
নাহ। ছোট করে উত্তর দেয় সোবহান।
তাহলে?
উত্তরে কিছু বলে না সোবহান। মায়ের মনে দুঃশ্চিন্তা জাগে। কোনো ঝগড়া করে আসলো না তো। বোন, বোন জামাই সোবহানকে খুবই পছন্দ করে। সেরকম তো কিছু হবার কথা না।
খাওয়া, দাওয়ায় কোনো সমস্যা?
মা পরে বলবো । এখন এই মাছটা একটু রান্না করো, আমি পুকুর থেকে ডুব দিয়া আসি।
আরো কয়েক ঘণ্টা পরে খেতে বসে সোবহান । ইলিশ মাছের অর্ধেকটা দিয়ে রান্না করা প্রায় সব ভাতই খেয়ে ফেলে সোবহান। বাড়ির সবাই আগেই খেয়ে ফেলেছিলো বলে রক্ষা।
খাওয়া শেষে ঢেকুর তুলে সোবহান বলে, ভাত কি সব শেষ করে ফেলেছি মা। তুমি তো মনে হয় আগেই খাইছো ।
হ বাজান, আমি খাইছি ।
ইচ্ছা করেই মিথ্যা বলে মা, ছেলের তৃপ্তির কাছে এক বেলা না খেয়ে থাকা আর এমন কি।
বাসার কেউ আর সোবহান কেনো ফিরে এসেছে জিজ্ঞেস করে না। খালা, খালু এমনিতে মানুষ খুব ভালো কিন্তু খালার রান্না মায়ের রান্নার ধারে কাছেও কিছু না। ইলিশ মাছের মধ্যে কেউ যদি এক গাদা হলুদ, মরিচ দেয় তাহলে ইলিশের কি আর স্বাদ থাকে, আমি চার মাইল হেটেই কলেজে যাবো; রাতে বাবার সামনে অনুচ্চ কন্ঠে বলে সোবহান।
এর ঠিক আটত্রিশ বছর পরে।
মাঝারী বিত্ত আর মাঝারী চিত্ত এবং সামান্য একটু বেশী মেধা নিয়ে আজকাল যেমন মানুষ দেশ ছেড়ে প্রবাসে থিতু হয় তৎকালে ঠিক তেমনি গ্রামের মানুষ শহরে থিতু হতো। সোবহান সাহেবও ঢাকা শহরে থিতু হয়েছেন। সে মাঝারী সরকারী কর্মকর্তা, চার ছেলেমেয়ে নিয়ে ব্যস্ত সংসার। গ্রামের সাথে সম্পর্ক অনেকদিন যাবত ঢালের দিকে। বাবা মারা যাবার পরে সেই পতন আরো বেগবান হয়েছে। সমস্যা হয়েছে মা কে নিয়ে। সোবহান সাহেব অনেকবার মাকে ঢাকায় নিয়ে আসতে চেয়েছেন, নিয়েও এসেছেন কিন্তু কিছুদিন পরেই মা আর ঢাকায় থাকতে চান না। তার নাকি হাঁসফাঁস লাগে। এবারও প্রায় জোর করেই মাকে নিয়ে এসেছেন সোবাহান সাহেব।
শুক্রবারে সোবহান সাহেব বাজার করতে পছন্দ করেন। সেদিন বাজারে গিয়ে প্রায় দুই কেজি ওজনের একটা ইলিশ নিয়ে আসেন। দাম বেশ বেশী নিয়েছে কিন্তু এরকম ইলিশ তো আজকাল পাওয়া যায় না।
“শোনো এরকম ইলিশ অনেকদিন বাজারে দেখি নাই। দাম একটু বেশী নিয়েছে। কিন্তু আমরা তো আর রোজ এরকম ইলিশ কিনি না। ভালো করে রান্না করো।“ অনেকটা কৈফিয়তের মতো করে স্ত্রীকে বলেন।
একটু পরেই সোবহান সাহেব বের হয়ে যান। শুক্রবার দুপুরে অফিসারস ক্লাবের মিটিং থাকে। সোবহান সাহেব ক্লাবের সভাপতি; সুতরাং শুক্রবারের দুপুরের খাবারটা বাইরেই খাওয়া হয় বেশী।
সোবহান সাহেবের মায়ের ইলিশ মাছটা দেখে আটত্রিশ বছরের আগের কথা মনে হয়।
বৌমা মাছটা আজকে আমিই রাঁধি।
আপনার শরীর ভালো না মা, কেনো কষ্ট করবেন। আমিই রাঁধি।
নাহ বৌমা, আমার শরীর ঠিক আছে।
ছেলের বৌ আর কিছু বলে না।
রান্না করতে করতে বড় নাতনিকে সেই আটত্রিশ বছর আগের সোবহান সাহেবের গল্পটা বলেন। বলার সময় বৃদ্ধার ভাজপরা মুখের চামড়ায়, তোবড়ানো গালে মাতৃ গর্ব ঠিকরে ঠিকরে বেরোতে থাকে।
রাতে সবাই খেতে বসে। সোবহান সাহেব ইলিশ মাছ মুখে নিয়েই মুখ বিকৃত করে ফেলেন।
বাসায় কি হলুদ মরিচের অভাব পড়েছিলো? আর বাসার কাজের লোকরে এখনো একটা মাছ কাঁটা শিখাইতে পারলা না! মনে হয় ব্লেড দিয়া পোচাইয়া পোচাইয়া কাটছে। এত শখ করে মাছটা আনলাম। রান্নার কারণে পুরাই নষ্ট।
ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলতে থাকেন সোবহান সাহেব। প্রথম থেকেই সোবহান সাহেবের স্ত্রী ইশারা-ইঙ্গিতে সোবহান সাহেবকে থামতে বলেন। সোবহান সাহেব যতক্ষণে সেই ইশারা খেয়াল করেন ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। বন্দুকের গুলি আর মুখ থেকে বের হয়ে যাওয়া কথা তো একই; ফেরত নেয়া যায় না।
নিঃশব্দ খাওয়ার টেবিলে সবার মাথা কুর্নিশের ভঙ্গিতে ঝুঁকে আসে। কাকে কুর্নিশ করে সেটা বোঝা যায় না, হয়তো সময়কেই।
সময়, নিষ্ঠুর সময় কোনো কিছুকেই ছাড় দেয় না; জীবন, যৌবন এমনকি সামান্য মাতৃ গর্বকেও অপমান করতে ছাড়ে না ।