Collected মনের ছায়াঘড়ি

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
468
Messages
7,515
Reaction score
6,220
Points
4,063
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
মনের ছায়াঘড়ি

মূল লেখকঃ সোহেল আর রানা (Sohel R Rana)






আমার বাবা ছিলেন অসম্ভব হিসেবি মানুষ। সেকেন্ডের কাঁটার মতো কাঁটায় কাঁটায় মেপে চলতেন পুরো জীবন। আমাদের বাড়িতে আবেগের কোনো স্থান ছিল না। কিন্তু এই নিয়ম শৃঙ্খলার বাইরে একজন মানুষ ছিলেন। তিনি আমার ফুফু, নাম সুরঞ্জনা।

ফুফু বিবাহিত ছিলেন, কিন্তু বাবার বাড়িতেই থাকতেন। ফুফুর স্বামী সেনাবাহিনীতে ছিলেন, জাতিসংঘের শান্তি মিশনে গিয়ে গত চব্বিশ বছর ধরে নিখোঁজ। কোনো খবর নেই, জীবিত না মৃত তাও কেউ জানে না। বাড়ির সবাই ধরে নিয়েছিল ফুফু বিধবা, কিন্তু ফুফু কোনোদিন সাদা শাড়ি পরেরনি। আবার কোনোদিন কেঁদে কেটে বাড়িও মাথায় তোলেননি।

ফুফুর ঘরে কোনো ঘড়ি ছিল না। ফুফু বলতেন, "যে সময়ের মধ্যে আমার মানুষটা নেই, সেই সময় মেপে আমি কী করবো রে সোহেল?"

আমি যখন চারুকলার শেষ বর্ষে পড়ি, তখন একদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম ফুফুর একটা অদ্ভুত অভ্যাস হয়েছে। প্রতিদিন বিকেল চারটে বাজলেই ফুফু বারান্দার কোণে গিয়ে দাঁড়াতেন। রোদের আলো ঘরের উত্তর দেওয়ালের যে কোণে গিয়ে পড়তো। ফুফু একটা মার্কার দিয়ে সেই আলোর শেষ সীমায় দাগ কেটে দিতেন। আর তার ঠিক পাশে একটা ছোট্ট অঙ্ক লিখতেন।

একদিন কৌতুহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, "ফুফু, দেওয়াল জুড়ে এসব কীসের হিসেব রাখছো?"

ফুফু হেসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "এটা একটা ছায়াসময়, সোহেল। তোর বাবা তো নিয়ম শৃঙ্খলার হিসেব মাপে। আর আমি মাপি মানুষের অপেক্ষার সময়। রোদটা যখন ঐ কোণে পৌঁছায়, তখন বুঝতে পারি আরও একটা দিন চলে গেল, অথচ আমার সময়ের কাটাটা সেখানেই আটকে আছে।"

আমি সেদিন বুঝেছিলাম, ফুফুর এই দাগ কেটে যাওয়াটা কোনো মানসিক ব্যাধি নয়, এটা হলো বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন। আশা আর নিরাশার মাঝখানে ঝুলতে থাকা এক বিশ্বাস।

কিন্তু ধাক্কাটা এলো তার কয়েক মাস পর। বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাসপাতালে যাওয়ার আগে বাবা আমাকে ডেকে দোকানের চাবিটা দিয়ে বললেন, "সোহেল, কাউন্টারে যে কালো চামড়ায় বাঁধানো ডায়রিটা আছে, ওটা কাউকে দেখতে দিবি না। আমার জীবনের সব ভুলত্রুটির জমা খরচ ওখানে আছে।"

বাবা মারা যাওয়ার পরদিন রাতে সেই ডায়রিটা খুলে বসলাম। ভেবেছিলাম হয়তো দেনাপাওনার হিসেব পাবো। কিন্তু পাতা উল্টাতেই আমার বুকটা ধপ করে উঠলো।

১৯৯৮ সালের একটা চিঠির প্রতিলিপি রয়েছে সেখানে। সেনাবাহিনীর তরফ থেকে আসা সরকারি চিঠি। ফুফুর স্বামী সিয়াচেনের বরফে ধসে মারা গেছেন এবং তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। চিঠিটা বাবার কাছেই এসেছিল। কিন্তু বাবা সেই চিঠিটা কোনোদিন ফুফুকে জানাননি।

নিচে বাবার হাতে লেখা একটা ছোট্ট নোট-

"সুরঞ্জনাকে যদি সত্যটা বলে দিই, ও বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকু হারিয়ে ফেলবে। শোক মানুষকে মেরে ফেলে, কিন্তু অপেক্ষা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। আমি ওকে মিথ্যা একটা আলো দিলাম, যাতে ও অন্ধকারকে জয় করতে পারে।"

আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। আমার বাবার মতো এত নির্মমভাবে কঠোর, নীতিবাদী মানুষটা নিজের বোনের জন্য চব্বিশ বছর ধরে একটা মহাজাগতিক মিথ্যা লালন করে গেছেন!

পরের দিন বিকেলে আমি ফুফুর ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বিকেল চারটে বাজে। রোদ এসে দেওয়ালের সেই কোণটায় পড়েছে। ফুফু মার্কার হাতে তুলে নিয়েছেন দাগ কাটার জন্য।

আমার খুব ইচ্ছে হলো ফুফুকে জড়িয়ে ধরে সত্যটা বলে দিই। বলি, "ফুফু, আর দাগ কেটো না। আর অপেক্ষা কোরো না। যাকে তুমি খুঁজছো, সে চব্বিশ বছর আগেই বরফের নিচে ঘুমিয়ে গেছে।"

কিন্তু যখন ফুফুর মুখের দিকে তাকালাম, আমার গলা শুকিয়ে এলো। আমি উপলব্ধি করলাম, কিছু সত্য মানুষকে মুক্তি দেয় না, শুধু নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়। আর কিছু মিথ্যা মানুষকে আস্ত একটা জীবন বাঁচিয়ে রাখার শক্তি দেয়।

আমি ফুফুর কাছে গেলাম। ফুফুর হাত থেকে মার্কারটা আলতো করে কেড়ে নিলাম।

ফুফু অবাক হয়ে বললো, "কী করছিস সোহেল?"

আমি ফুফুর দিকে তাকিয়ে একটা হালকা হাসি দিয়ে বললাম, "ফুফু, প্রতিদিন শুধু দাগ কাটলে তো হিসেব মিলবে না। আজ থেকে আমি আর তুমি মিলে এই দেওয়ালে একটা বড় দেওয়ালচিত্র আঁকবো। যেই চিত্রে একটা বিশাল বরফের পাহাড় থাকবে, আর সেই পাহাড়ের উপর একটা আলো এসে পড়বে। রোদ যেখানটায় শেষ হবে, আমরা পাহারটাকে ততদূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবো।"

ফুফু আমার দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তার বয়সের ভারে ঝুলে যাওয়া চোখ দুটো দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। ফুফু ফিসফিস করে বললেন, "তুই বুঝতে পেরেছিস, না রে সোহেল?"

আমি চমকে উঠলাম, "কী বুঝতে পেরেছি ফুফু?"

ফুফু দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "তোর বাবা ভেবেছিল আমি কিছু জানি না। কিন্তু ভাইয়ের হাতের লেখা তো আমি চিনি! ঐ চিঠিটা চব্বিশ বছর আগেই আমি তোর বাবার বাক্সে দেখে ফেলেছিলাম।"

আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। থমকে গিয়ে বললাম, "তাহলে... তাহলে এই যে প্রতিদিন দাগ কাটাকাটি? কেন এই মিথ্যে অপেক্ষা ফুফু?"

ফুফু আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে মৃদু হেসে বললেন, "তোর বাবা আমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সত্যিটা লুকিয়েছিল। আর আমি তোর বাবাকে তার এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য না জানার ভান করেছিলাম।"

বাইরে তখন বিকালের রোদ আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে। দেওয়ালের গায়ে আলোর শেষ চিহ্নটুকু মুছে যাচ্ছে।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। বাবা সারাজীবন নিয়ম শৃঙ্খলার কথা বলে গেছেন, কিন্তু মানুষের মনের ভেতরের এই অনিয়ন্ত্রিত ছায়াঘড়ি, কোনো নিয়ম শৃঙ্খলা মানে না। তা শুধু নিঃশব্দ ভালোবাসায় চলতে থাকে, মৃত্যুর শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত!
 
Back
Top