Collected কিছুক্ষন - হুমায়ুন আহমেদ

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
443
Messages
7,007
Reaction score
5,034
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
কিছুক্ষন

মূল লেখকঃ হুমায়ুন আহমেদ






পর্ব - ১


ট্রেন কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাড়বে। চিত্রাকে সিদ্ধান্ত যা নেবার এখনই নিতে হবে। সে ট্রেনে থাকবে, না-কি স্যুটকেস নিয়ে নেমে যাবে? বিশাল এই স্যুটকেস হাতে নিয়ে নামা তার পক্ষে সম্ভব না। নেমে যাবার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে কুলি ডাকতে হবে। দেরি করা যাবে না। এক্ষুণি ডাকতে হবে। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। ছটায় ছাড়ার কথা। এখন বাজছে পাঁচটা পঞ্চাশ। দুঃখে চিত্রার চোখে পানি এসে যাচ্ছে।
চিত্রার হাতে প্রথম শ্রেণীর স্লিপিং বার্থের টিকেট। হাত পা ছড়িয়ে যাবে। ট্রেনে তার একফোঁটা ঘুম হয় না। তাতে অসুবিধা নেই গল্পের বই পড়তে পড়তে যাবে। হাত ব্যাগে দুটো গল্পের বই আছে। দুটাই ভূতের গল্প। স্টিফেন কিং। চলন্ত ট্রেনে ভূতের গল্প পড়তে ভাল লাগে। স্টেশনের বুক স্টল থেকে এক কপি রিডার্স ডাইজেস্ট কিনেছে। ট্রেনে বাসে ডাইজেস্ট জাতীয় পত্রিকা পড়তে আরাম। মন দিয়ে পড়তে হয় না। চোখ বুলালেই চলে।
ট্রেন এখনো দাঁড়িয়ে। আজ কি ট্রেন লেট হবে? চিত্রা জানালা দিয়ে মুখ বের করল। একজন কুলিকে জানালার পাশেই দেখা যাচ্ছে। সে কি ডাকবে তাকে? বলবে স্যুটকেস নামিয়ে দিতে?
সে ঠিক করল নেমেই যাবে আর তখনই বিশাল বড় বড় দুটা কালো ট্রাঙ্ক দরজায় নামল। ট্রাঙ্কের সঙ্গে বেডিং, বেতের ঝুড়ি। এইসবের মালিক এক মাওলানা। সুফি সুফি চেহারা যার গা থেকে আতরের গন্ধ আসছে। মাওলানার স্ত্রী গর্ভবতী। বোরকায় তাঁর অস্বাভাবিক বিশাল পেট ঢেকে রাখা যাচ্ছে না। ভদ্রমহিলা দৌড়ে ট্রেনে উঠার পরিশ্রমে ক্লান্ত। তিনি ট্রাঙ্কের উপর বসে পড়েছেন। বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। বিশাল এই ঝামেলা ডিঙিয়ে চিত্রার পক্ষে নামা অসম্ভব। বোরকাপরা মহিলা স্বামীকে বললেন, পানি খাব। পানি। আর ঠিক তখনই ট্রেন দুলে উঠল।
চিত্রার প্রধান সমস্যা দুজনের যে কামরায় তার সিট সেখানে বুড়ো এক ভদ্রলোক আধশোয়া হয়ে আছেন। ভদ্রলোকের মাথা অস্বাভাবিক ছোট। তিনি তাঁর ছোটমাথা হলুদ রঙের মাফলার দিয়ে পেঁচিয়ে বলের মতো বানিয়েছেন। গায়ে প্রায় মেরুন রঙের কোট। কোন রুচিবান মানুষ এই রঙের কোট পরে বলে চিত্রার জানা নেই। তাঁর হাতে সিগারেট। সিগারেটে একেকটা টান দিচ্ছেন আর বিকট শব্দে কাশছেন। ঘর ভর্তি সিগারেটের ধূয়া। ভদ্রলোকের পরণে লুঙ্গি। এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা ট্রেনে বা লঞ্চে উঠেই কাপড় বদলে লুঙ্গি পরে ফেলে। উনি মনে হয় সেই জাতের। প্লেনে উঠেও কি এরা এই কাণ্ড করে? হয়ত করে। লাঞ্চ টাইমে গামছা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায় গোসলের জন্যে। বিমানবালার কাছে গায়ে মাখার জন্যে তেল চায়। অসহ্য!
ভদ্রলোকের লুঙ্গি হাঁটু পর্যন্ত উঠে এসেছে। কাঠির মতো দুটো পা বের হয়ে আছে। পা ভর্তি পাকা লোম। ভদ্রলোক আবার কিছুক্ষণ পর পর এক পা দিয়ে আরেক পা ঘসছেন। পায়ের বেহালা বাজাচ্ছেন। কি কুৎসিত! কি কুৎসিত।
এমন একজন মানুষের সঙ্গে দিনাজপুর পর্যন্ত যেতে হবে? চিত্রা করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। কামরায় ঢুকছে না। রেলের একজন এটেনডেন্টকে পাওয়া গেলে জিজ্ঞেস করত খালি কোনো কামরা আছে কি-না। এত বড় স্লিপিং বগি। একটাও খালি সিট থাকবে না? শাদা পোশাকের কোনো এটেনডেন্টকে দেখা যাচ্ছে না। প্রয়োজনের সময় এদের কাউকেই পাওয়া যায় না।
চিত্রাকে এই বিপদে ফেলেছে তার রুমমেট লিলি। ট্রেনের টিকিট লিলি তার মামাকে দিয়ে কাটিয়েছে। সেই মামা না-কি রেলের বিরাট অফিসার। লিলি তার মামাকে বলেছে টু সিটার স্লিপারের একটা টিকিট দিতে। সেখানে যেন অন্য কেউ না যায়। একটা সিট অবশ্যই খালি যাবে। লিলির মামার কাছে এই ব্যবস্থা করা না-কি কোনো বিষয়ই না।
এখন দেখা যাচ্ছে বিষয়। লিলির ক্ষমতাবান রেল মামা কিছু করতে পারেন নি। চিত্রাকে যেতে হবে পা ভর্তি সাদা লোমের বুড়োটার সাথে। যে বুড়ো দুই পা ঘসে ঘসে পা বেহালা বাজাবে। মহান পা-সঙ্গীত! ইচ্ছা করলে চিত্রা এখনই লিলির সঙ্গে কথা বলতে পারে। মোবাইল ফোন সঙ্গে আছে। কিন্তু লাভ কি। লিলি নিশ্চয়ই বুড়োকে সরাতে পারবে না।
ম্যাডাম, কোনো সমস্যা?
চিত্রা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রেলের একজন এটেনডেন্ট। হাতে চাবির গোছা। সরল ধরনের চেহারা। গোল মুখ, বড় বড় কান। চিত্রা শরীর বিদ্যা নামের একটা বই-এ পড়েছে যাদের মুখ গোলাকার, কান বড় বড় তারা সরল প্রকৃতির হয় এবং অন্যকে বিপদে সাহায্য করার মানসিকতা এদের আছে। এরা পরোপকারী।
চিত্রা বলল, স্লিপিং বার্থে খালি কোনো সিট কি আছে? আমি এই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে যেতে চাচ্ছিনা। উনি ক্রমাগত সিগারেট খাচ্ছেন। একটু আগে একটা শেষ করেছেন এখন আরেকটা ধরিয়েছেন।
এটেনডেন্ট বলল, কামরার ভেতরে সিগারেট খাওয়া যাবে না, আমি উনাকে নিষেধ করে দিচ্ছি।
আর কোনো সিট কি আছে?
বাথরুমের কাছের ফোর সিটারে একটা খালি আছে কিন্তু সেখানে আপনি যেতে পারবেন না।
যেতে পারব না কেন?
ম্যাডাম, সামান্য অসুবিধা আছে। তারপরেও খোঁজ নিয়ে দেখি। আপাতত নিজের কামরায় বসুন।
এটেনডেন্ট স্যুটকেস ঢুকিয়ে দিল। চিত্রাকে তার পেছনে পেছনে যেতে হল। চিত্রাকে ঢুকতে দেখে বুড়ো পা গুটিয়ে নিল। পিট পিট করে তাকাল। বুড়োর নাকের নিচে বিশাল গোঁফ। উপরের ঠোঁটটা গোঁফের কারণে ঢাকা পড়ায় তাকে কার্টুন ফিগারের মত লাগছে।
চিত্রা বলল, দয়া করে সিগারেট খাবেন না। আমি সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারি না।
বুড়ো বলল, তুমি কি আমার সঙ্গে যাচ্ছ? আমার রুম মেট?
জি।
ভালো সমস্যা হল। আমি সিগারেটে টান না দিয়ে থাকতে পারি না।
করিডোরে গিয়ে খাবেন।
বুড়ো বলল, আমার শরীর ভালো না। আর্থরাইটিসের ব্যথা। হাঁটাহাঁটি করতে পারি না। প্রতিবার সিগারেটের জন্যে করিডোরে যাওয়া আমার জন্যে সমস্যা। যাই হোক তোমার নাম কি?
চিত্রা।
চিত্রা নামের অর্থ কি?
জানি না। (চিত্রা তার নামের অর্থ জানে। বুড়োটাকে অর্থ বলতে ইচ্ছা হচ্ছে না। চিত্রা একটা নক্ষত্রের নাম।)
হত। বাবা আবার কি মনে করে নামের আগে আব্দুর বসিয়েছেন। তুমি কি পড়াশোনা করছ? ছাত্রী?
জি।
কি পড়ছ?
ফিজিক্স।
কোন ইয়ার?
থার্ড ইয়ার। এবার অনার্স দেব।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি?
জি।
ইউনিভার্সিটি খোলা না?
খোলা।
ইউনিভার্সিটি খোলা, তাহলে যাচ্ছ কোথায়? ক্লাস মিস করে ঘোরাঘুরি করার মানে কি?
জবাব না দিয়ে চিত্রা বের হয়ে গেল। ক্লাস মিস দিয়ে ঘোরাঘুরি করলে বুড়োর কি? বুড়োর সঙ্গে অকারণ কথা বলার চেয়ে করিডোরে হাঁটাহাঁটি করা ভালো। ট্রেনে বুফে কার নিশ্চয়ই আছে। বুফে কারে জানালার পাশে বসে চা খেতে খেতে দূরের দৃশ্য দেখা যেতে পারে। সন্ধ্যা এখনো মিলায়নি। শেষ বিকেলের আলোয় দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত দেখতে ভালো লাগার কথা। রিডার্স ডাইজেস্ট খুলে jokes পড়া যেতে পারে। যদিও সে এখনো রিডার্স ডাইজেস্টের কোন জোক পড়ে হাসেনি। ভাগ্য ভাল থাকলে এবার হয়ত হাসবে।
তিন কামরা পরেই বুফে কার। সেখানে চা নেই আছে কফি। চা বিক্রিতে লাভ নেই। কফিতে লাভ বলেই কফি। কফির কড়া গন্ধ চিত্রার ভালো লাগে না তারপরেও সে কফি নিয়ে জানালার পাশে বসল। ব্যাগের ভেতর মোবাইল ফোনের রিং বাজছে। মনে হচ্ছে হাত ব্যাগের ভেতর ছোট্ট কোনো শিশু হাতপা ছুঁড়ে কাঁদছে। এক্ষুনি তাকে কোলে নিতে হবে।
টেলিফোন করেছে লিলি। ধরবে না ধরবে না করেও চিত্রা টেলিফোন ধরল। লিলি অকারণে কথা বলবে। বিরক্ত অবস্থায় কারোর অকারণ কথা শুনতে ভাল লাগে না।
হ্যালো চিত্রা, ট্রেন ছেড়েছে?
হুঁ।
টঙ্গী পার হয়ে গেছে?
হুঁ।
হুঁ হুঁ করছিস কেন। কথা বল। নিজের মতো করে টু সিটের স্লিপার পেয়েছিস?
হুঁ।
বললাম না মামাকে বললেই মামা ব্যবস্থা করে দেবে। এখন দরজা বন্ধ করে হাফ নেংটা হয়ে শুয়ে পড়। তুইতো আবার ট্রেনে ঘুমাতে পারিস না। গল্পের বই নিয়ে বসে যা। গান শোনার যন্ত্রপাতি নিয়েছিস? এম পি থ্রীটা আছে না?
না।
সেকি? আমার ওয়াকম্যানটা তোকে নিয়ে যেতে বললাম না? বের করে তোর টেবিলে রেখেছিলাম।
ওয়াকম্যানে গান শুনতে আমার ভালো লাগে না। মনে হয় কানের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে কেউ গান করছে।
লিলি আনন্দিত গলায় বলল, এটাইতো ভালো। শুধু পুরুষ গায়কদের গান শুনবি। মনে হবে কোনো পুরুষ তোর কানে চুমু খাচ্ছে।
চিত্রার বিরক্তি লাগছে। লিলির মুখ আলগা। অশালীন কথাবার্তা সে অবলীলায় বলে। চিত্রা বলল, লিলি একটা কথা—তোর মামা কিন্তু আমাকে একা সিট দেননি। আমার সঙ্গে এক বুড়ো আছে।
বলিস কি? আমি এক্ষুনি মামাকে টেলিফোন করছি।
এখন টেলিফোন করে লাভ কি?
অবশ্যই লাভ আছে। প্রয়োজনে ট্রেন ব্যাক করে ঢাকা যাবে। নতুন বগি লাগানো হবে। নো হাংকি পাংকি।
কেন অর্থহীন কথা বলছিস?
লিলি বলল, আমি মোটেই অর্থহীন কথা বলছি না। আমি অর্থহীন কথা বলার মেয়ে না। এক্ষুনি টেলিফোন করে আমি মামার বারটা বাজিয়ে দিচ্ছি। আর শোন, বুড়ো যেহেতু আছে—খবরদার ঘুমাবি না। বুড়োগুলো হয় sex starved। শুধু ছোঁক ছোঁক করে। রাতে ঘুমিয়ে পড়বি হঠাৎ জেগে উঠে দেখবি বুড়ো তোর বিশেষ কোনো জায়গায় হাত রেখে ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
Please stop it.
এরচে ভয়ংকর কিছুও ঘটতে পারে। যেমন ধর…
চিত্রা টেলিফোনের লাইন অফ করে দিল। লিলি থামবে না— নোংরা কথা বলতেই থাকবে। লিলি পরীর মতো একটা মেয়ে। মায়া মায়া চোখ। পবিত্র চেহারা অথচ কি সব নোংরা ধরনের কথা।
চিত্রা কফিতে চুমুক দিল। যা ভেবেছিল তাই অতিরিক্ত চিনি এবং কুসুম গরমও না। কফি থেকে হরলিক্সের গন্ধও আসছে। এর মানে কি? বয়কে ডেকে একটা ধমককি দেয়া যায় না? অবশ্যই দেয়া যায়। তবে এই মুহূর্তে ধমক দেয়া যাবে না। অন্য একজন ধমকা ধমকি করছেন। তিনি গর্ভবতী বোরকাওয়ালীর স্বামী–মাওলানা। তিনি পানি কিনতে এসেছেন। ছোট এক বোতল পানি তের টাকা চাচ্ছে। অথচ বাইরে বার টাকা। বয় নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, বাইরে থেকে পানি কিনেন। খামাখা প্যাচাল পারেন কেন?
মাওলানা এখনো তার স্ত্রীকে পানি খাওয়াননি ভেবে চিত্রার খারাপ লাগছে। তার স্বামীও কি এরকম ইনসেনসেটিভ হবে?
চিত্রা যাচ্ছে বিয়ে করতে। যদিও তার বড় মামা খোলাসা করে কিছু বলছেন না। তিনি খোলাসা করে কিছু বলার মানুষও না। তিনি জানিয়েছেন-আমার শরীর খুব খারাপ, স্ট্রোক হয়েছে। একটা পা অবস। আমি তোকে প্রতিষ্ঠিত দেখে মৃত্যুর জন্যে তৈরি হতে চাই। চিত্রাকে প্রতিষ্ঠিত দেখার মানে নিশ্চয়ই তাকে বিবাহিতা দেখা। পুরুষদের কাছে মেয়েদের প্রতিষ্ঠার একটাই অর্থ বিবাহ।
চিত্রা কফির কাপ সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে এটেনডেন্টকে খুঁজে বের করবে। সে কোনো ব্যবস্থা করেছে কি-না দেখব।
বুড়ো সিগারেট হাতে করিডোরে দাঁড়ানো। চিত্রাকে দেখে বলল, কোথায় গিয়েছিলে?
অভিভাকের মতো গলা, যেন কৈফিয়ত তলব করছে। চিত্রার যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাবে। বুড়োর কৈফিয়ত তলবের কিছু নেই।
চিত্রা, তুমি উপরের সিটে থাকবে। আমার পক্ষে উপরে উঠা সম্ভব না। তাছাড়া আমাকে ঘন ঘন সিগারেট খেতে হবে।
চিত্রা জবাব দিল না। জবাব দেবার কিছু নেই। বুড়োর সঙ্গে খেজুরে আলাপেরও কিছু নেই।
বুড়ো সিগারেটে লম্বাটান দিয়ে বলল, এই স্লিপিং কারে একটা ডেডবডি যাচ্ছে এটা কি জান? বাথরুমের লাগোয়া যে কামরা সেখানে।
চিত্রা বলল, তাই না-কি?
ইয়াং ছেলের ডেডবডি। সঙ্গে মা আছে, ভাই আছে। স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার হল এরা কেউ কাঁদছে না। মনে হয় অধিক শোকে পাথর।
চিত্রা জানালার দিকে এগিয়ে গেল। বুড়োর সঙ্গে বক বক করার কোনো ইচ্ছা নেই। ট্রেনে একটা ডেড বডি যাচ্ছে এই বিষয়টাও ভালো লাগছে না। এক সময় ডেডবডি থেকে গন্ধ ছড়াতে থাকবে। স্লিপিং বার্থের এসি কামরা। জানালা খোলার উপায় নেই। ডেডবডির গন্ধ বের হবে না। কামরার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকবে।
দরজার পাশে দাঁড়ানো গেল না। মধ্যবয়স্ক এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতেও সিগারেট। আজকের ট্রেনের সব যাত্রীই কি স্মোকার? চিত্রা আবার বুফে কারের দিকে রওনা হল। এক কাপ কফি কিনে জানালার পাশে বসে থাকবে। কফিতে চুমুক দেবে না। চিত্রা মোটামুটি নিশ্চিত আজ সারা রাত সে তাঁতের মাকুর মত একবার যাবে নিজের কামরায় একবার যাবে বুফে কারে। কফি কিনবে এবং জানালা দিয়ে ফেলে দেবে।
চিত্রা আগে যেখানে বসেছিল সেখানে চাদর গায়ে এক লোক বসে আছে। চিত্রার সামান্য মন খারাপ হল। বুফে কার পুরোটাই খালি। তাকে যে ঠিক আগের জায়গাতেই বসতে হবে তা-না। অথচ আগের জায়গাতেই বসতে ইচ্ছা করছে।
ম্যাডাম, আপনার নাম কি চিতা?
চিত্রার পেছনে স্লিপিং কারের এটেনডেন্ট দাঁড়িয়ে আছে। চিত্রা বিস্মিত হয়ে বলল, আমার নাম চিতা না। ফোঁটাওয়ালা বাঘের নাম চিতা। আমার নাম চিত্রা।
আপনার মোবাইল সেট টা কি বন্ধ?
হ্যাঁ।
আপনাকে মোবাইল সেট অন করতে বলেছে।
কে বলেছে?
ম্যাডাম, সেটাতো বলতে পারব না। ট্রেনের গার্ড সাহেব খবর দিয়েছেন। ম্যাডাম, আপনার কিছু লাগলে আমাকে বলবেন। আমি ব্যবস্থা করব।
গরম এক কাপ চা খাওয়াতে পারবেন? এরা বলছে চা নেই, শুধু কফি।
চায়ের ব্যবস্থা এক্ষুনি করব।
চা-টা যেন গরম হয় আর ঘন হয়। আমি পাতলা চা খেতে পারি না।
নাশতা কিছু দিতে বলব? এদের চিকেন কাটলেট খারাপ না।
নাশতা খাব না। থ্যাংক য়্যু।
চিত্রা তার মোবাইল টেলিফোন অন করল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লিলির টেলিফোন।
হ্যালো চিত্রা। তুই কি ভেবেছিস মোবাইল অফ করে আমার কাছ থেকে পার পেয়ে যাবি? দেখলি ক্ষমতার নমুনা? মামার মাধ্যমে ট্রেনের গার্ডকে ধরে তোর কাছে পৌঁছে গেলাম।
তাই তো দেখছি।
মামাকে তোর ব্যাপারটা বলেছি। উনি খুবই রাগ করেছেন। তোর টিকিটটা যাকে হ্যান্ডেল করতে বলেছেন তার চাকরি যায় যায় অবস্থা। কে জানে হয়তো এর মধ্যে চাকরি চলে গেছে। দেশের বেকার আরো একজন বেড়েছে।
ও আচ্ছা।
তুই যে ভাবে ও আচ্ছা বললি তাতে মনে হচ্ছে তুই আমার কথা বিশ্বাস করছিস না। মামা রেলওয়ে বোর্ডের মেম্বার। এই বৎসরই চেয়ারম্যান হয়ে যাবেন। চিত্রা নিশ্চিত থাক, একটা ব্যবস্থা হবে। প্রয়োজনে বুড়োকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হবে। ভালো কথা, বুড়ো কি ইতিমধ্যে তোর গায়ে হাত দিয়েছে?
লিলি! এই জাতীয় কথা আমার শুনতে ভালো লাগে না।
এটা হল বাস্তবতা। রিয়েলিটি। এইসব ঘটনাই সব জায়গায় ঘটছে। কয়েকদিন আগে মগবাজার রেলক্রসিঙের কাছে কি হয়েছে শোন। গার্মেন্টসের একটা মেয়ে ষোল সতেরো বয়স। কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছে। হঠাৎ দুই বদ এসে টান দিয়ে মেয়েটার শাড়ি পেটিকোট সব খুলে ফেলল। মেয়ে আচমকা নেংটু হয়ে এমন হতভম্ব যে…
লিলি! আমি শুনতে চাচ্ছি না।
তুই মুখে বলছিস শুনতে চাচ্ছিস না। আসলে ঠিকই শুনতে চাচ্ছিস। নোংরা কথা শুনতে নিষিদ্ধ আনন্দ আছে। কথা যত নোংরা তত মজা।
প্লিজ! প্লিজ লিলি। প্লিজ।
আচ্ছা ঠিক আছে। আমি টেলিফোন রাখছি। মামার সঙ্গে যোগাযোগ হলেই তোকে জানাব। বন ভয়াজ।
চিত্রার চা এসেছে। পট ভর্তি চা, দুধ, চিনি। একটা এক্সট্রা টি ব্যাগ। পট থেকে চায়ের গন্ধ আসছে। আজকালকার চা থেকে গন্ধ আসে না। অনেকদিন পর গন্ধ পাওয়া গেল। চিত্রার প্রায়ই মনে হয় চায়ের গন্ধে এক ধরনের মন খারাপ ভাব থাকে। কেন এ রকম মনে হয় কে জানে। চিত্রা রিডার্স ডাইজেস্ট খুলল। Laughter the best medicine এর পাতা বের করল। মন ভাল করার কোনো medicine পাওয়া যায় কি-না দেখা যাক।
From Websters Dictionary Windown 95 n.32 bit extensions and a graphical shell for a 16 bit patch to an 8 bit operating system originally coded for a 4 bit microprocessor written by a 2 bit company that cant stand 1 bit of competition.
এর মানে কি? এটা পড়ে কেউ হাসবে কেন?
আমি কি আপনার সামনের চেয়ারটায় বসতে পারি?
চিত্রা সামান্য হকচকিয়ে গেল। অচেনা পুরুষদের সঙ্গে হড়বড় করে কথা লিলি বলতে পারে। সে পারে না। সে খানিকটা আড়ষ্ট বোধ করে। তার জায়গায় লিলি থাকলে বলতো—অবশ্যই বসতে পারেন। হঠাৎ আমার সামনে বসতে চাচ্ছেন কেন? নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কারণটা ব্যাখ্যা করুন। প্রথমবারেই সুন্দর করে ব্যাখ্যা করবেন যাতে আমাকে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার কোনো প্রশ্ন না করতে হয়, সহজ বাংলায় ঝেড়ে কাশুন।
ভদ্রলোক তার সামনে বসেছেন। বয়স ২৫ থেকে ত্রিশ। চারকোনা মুখ। চোখে গোলাকার মেটাল ফ্রেমের চশমা। চারকোনা মুখের সঙ্গে গোল চশমা মানাচ্ছে না। তাকে বোকা বোকা দেখাচ্ছে। গায়ে ব্লেজার। কফি কালারের ব্লেজার। ভদ্রলোকের মাথা ভর্তি কোকড়ানো চুল। কোকড়ানো চুলের জন্যে চেহারায় নিগ্রো নিগ্রো ভাব চলে এসেছে। তবে গায়ের রঙ গৌর। ইনি কি একজন তরুণীকে একা বসে থাকতে দেখে ভাব জমাতে এসেছেন? কিছু পুরুষ থাকে যাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা।
আমার নাম আশহাব। আশহাব অর্থ বীর। তবে আমি বীর না। ভীতু প্রকৃতির মানুষ। আমি একজন ডাক্তার। মাকে নিয়ে দেশের বাড়িতে যাচ্ছি।
চিত্রা বলল, ও। তার আড়ষ্ট ভাব কমল না বরং সামান্য বাড়ল। সামনে বসা ভদ্রলোক সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অচেনা এক তরুণীর সঙ্গে কথা বলছেন যেন তিনি পূর্ব পরিচিত। ঘটনা সে রকম না। চিত্রা এই প্রথম ভদ্রলোককে দেখছে।
ভদ্রলোক খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, আমি শুনেছি আপনি সামান্য বিপদে পড়েছেন। একটা কাজ করতে পারেন। আমার মার সঙ্গে এক কামরায় থাকতে পারেন। আমি চলে যাব আপনার সিটে।
চিত্রা বলল, থ্যাংক য়্যু।
চিত্রার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়েছে। ট্রেন জার্নি এখন তার অনেক ভালো লাগছে। সামনে বসা যুবককে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে জানালা দিয়ে দূরের দিগন্ত দেখতে পারলে ভালো হত। দিগন্ত ঘন কুয়াশায় ঢাকা। সেই কুয়াশা এগিয়ে আসছে। ট্রেন এমনভাবে ছুটছে যে মনে হচ্ছে কুয়াশা যেন তাকে ধরতে না পারে এটাই ট্রেনটির একমাত্র বাসনা।
আশহাব বলল, সহযাত্রী হিসেবে আমার মা কেমন সেটা জেনে তারপর ডিসিসান নেবেন। পরে দেখা গেল ফ্রম ফ্রাইং পেন টু ফায়ার। কড়াইয়ে ভাল ছিলেন ঝাপ দিয়ে পড়লেন আগুনে। আমার মা বেশির ভাগ সময়ই বিরক্তি
চিত্রা তাকিয়ে আছে। অপরিচিত একজন তরুণীর সঙ্গে কোনো ছেলে এই ভাবে কথা কি বলে?
আপনি মার সঙ্গে থাকলে সবচে বড় উপকার হবে আমার। মার চিৎকার হৈ চৈ শুনতে হবে না। মা নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে চিৎকার করবেন না।
চিত্রা বলল, চা খাবেন? আমার ফ্লাস্ক ভর্তি চা।
আশহাব বলল, আমি চা খাইনা, তবে এখন খাব। আমার মা ট্রেনে উঠার পর থেকে কি নিয়ে হৈ চৈ করছে শুনলে আপনি অবাক হবেন। আপনার শোনাও দরকার। হৈ চৈ আপনার সঙ্গেও করবেন। বলব?
চিত্রা বলল, বলুন।
স্লিপিং কারে একটা ডেডবডি কেন যাচ্ছে এই হচ্ছে মায়ের সমস্যা। ট্রেনে কি যাচ্ছে না যাচ্ছে সেটা আমার ব্যাপার না। ডেডবডি আমি তুলিনি। মা সামনের স্টেশনে নেমে যেতে চাচ্ছেন। অর্থহীন কথা না?
আশহাব উঠে গিয়ে কাউন্টার থেকে কাপ নিয়ে চা ঢালছে। তাকে খুবই বিরক্ত দেখাচ্ছে। তার সামনেই অতি রূপবতী একটা মেয়ে বসে আছে এই ব্যাপারটাই এখন তার মাথায় নেই।
চিত্রার ইচ্ছা করছে রিডার্স ডাইজেস্টের খোলাপাতাটি ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে—এই জোকটা পড়ে আমাকে বলবেন কোন জায়গাটা হাসির। সম্ভব না। এতটা ঘনিষ্ঠতা এই যুবকের সঙ্গে তার হয় নি। হবার সম্ভাবনাও নেই।
 
Back
Top