Collected কান্ত বাবুর ভাড়াটে

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
442
Messages
6,925
Reaction score
4,842
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
কান্ত বাবুর ভাড়াটে

রুচিরা সুলতানা






চাকরি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মামার বাসা ছেড়ে ভাড়া বাসায় উঠে গেছি। আমাকে নিয়ে মামা মামীর অশান্তি দেখতে দেখতে একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছি, আর নয়।এইবার একটা বিয়ে করবো।

তাছাড়া "ঘরেতে এলো না সে তো, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া"—লাইনটা গত দুবছর ধরে ভয়ানক যন্ত্রণা দিচ্ছিলো। হরিপদ কেরানির মতো অভাগা মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।আমার একজন ঘরের মানুষ চাই।

এত কম ভাড়ায় এই শহরে বাসা পাবো, ভাবিনি।তার উপর বাড়ির মালিকের চেহারা হুবহু সেই কান্তবাবুর মতোন।যত্নে পাট করা চুল, বড় বড় চোখ। মেজাজও শৌখিন মনে হলো ।ভদ্রলোক সরকারি স্কুল মাস্টার।

অবশ্য বাড়িটার চেহারা একেবারেই উল্টো। এদিক-ওদিক জোড়াতালি দেওয়া। মাত্র দুইখানা ঘর।টিকটিকিও আছে কয়েকটা। যাকে বলে আমার জন্যে পুরোপুরি মানানসই।

এতোকাল মাস্টার মশাই নিজেই পুরো বাড়িটা নিয়ে থাকতেন। এখন হয়তো আয়ের চেয়ে ব্যয় কিছুটা বেশি। তাই একটা অংশে আমার মতো গরীব ভাড়াটে তুলেছেন।

পুরনো রান্নাঘর আর গোসলখানাটিকে পাতলা হার্ডবোর্ড দিয়ে দুই ভাগ করা হয়েছে। ফলে রান্নাঘর আর গোসলখানা দুটোই প্রায় পাখির বাসার আয়তনে নেমে এসেছে। তাতে অবশ্য আমার কোনো সমস্যা ছিল না। নিজের একটা আলাদা বাসা হয়েছে, এই আনন্দেই দিনরাত গলায় সুর খেলা করে।

তবে মন ভরে যে গাইবো সে উপায় নেই।

নিজের ঘরে একটু জোরে নিঃশ্বাস ফেললেও সেই শব্দ বাড়িওয়ালার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একইভাবে ওইবাড়িতে মাছমাংস বা পান চিবানোর শব্দ থেকে শুরু করে চুমু এবং চুমুক দিয়ে ঝোল, ডাল খাওয়ার শব্দ পর্যন্ত আমার কানে আসে।

তাও ভালো, আলাদা একখানা শৌচালয় পেয়েছি। আমার জন্যেই নতুন করে বানানো হয়েছে সেটি।

নতুন চাকরি, নতুন বাসা। মনে অদেখা এক নারীর স্বপ্ন। সব মিলিয়ে মনটা তো ফুরফুরে থাকার কথা, তাই নয় কি?
কিন্তু গরীব ব্যাচেলর বলে কথা। সুখ কি এতো সহজে ধরা দেয়?

যে বিয়ের স্বপ্ন নিয়ে বাসাটা নিলাম, সেটাই এখন ভেঙে যাবার পথে ।হার্ডবোর্ডের ওপাশ থেকে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া শুনে শুনে, বিয়ে নিয়ে রীতিমতো দুঃস্বপ্ন দেখছি।

মামা মামীও দিনরাত ঝগড়া করতেন ।কিন্তু সেটা হতো আমার কারনে।এইখানে কি সমস্যা, সেটা তো বুঝতে পারছি না।

বাড়িওয়ালিকে কখনো চোখে দেখিনি , তবে বাড়িওয়ালাকে তো রোজ দেখি। কান্ত বাবুর মতো চেহারা, তার উপর মাস্টার মশাই __হিসেব অনুযায়ী তো ঠিকঠাক একটা প্রেমময় সংসার হবার কথা।

অথচ ভদ্রলোক খেতে বসলেই স্ত্রীর রান্না নিয়ে হাজারটা দোষ ধরেন।কোনোটায় তেল কম তো কোনোটায় ঝাল বেশি।ভাত গলে যায় তো ডাল আস্ত রয়ে যায়।যেটা তিনি কষা খেতে চান সেটায় নাকি টলটলে পানি থাকে আর যেটায় ঝোল চান, সেটা শুকিয়ে মরুভূমি ।

কিছুতেই যেন রান্না মনমতো হয় না তার।এদিকে চকমচকম শব্দ করে খাওয়া চলে বেশ।

স্ত্রীও কম যান না। সকাল থেকেই তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। বনেদি বাড়ির মেয়ে হয়ে গরীব মাস্টারের সংসার করছেন।সেই দুঃখে সারাদিন মাস্টার মশাইয়ের বাপ বাপান্ত ।প্রতিদিন বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার হুমকি দিতে থাকেন।

দুজনের বাড়ি একই এলাকায় হবে।কথা বলার সময় চন্দ্রবিন্দুতে বেশ অনেকটা জোর দেন, মনে হয় যেন কয়েকশো চন্দ্রবিন্দু আছে।আবার প্রয়োজন ছাড়াই যেখানে সেখানে চন্দ্রবিন্দু জুড়ে দেন।"ড়" এর উচ্চারণ করতে গেলে এমন চাপ প্রয়োগ করেন, যেন মাটিতে পুতে ফেলছেন।

শুক্রবার দিন, একটু বেলা করে উঠবো ভেবেছিলাম। কিন্তু সকাল সকাল মাস্টার মশাই আর উনার স্ত্রীর চেঁচামেচিতে উঠে গেলাম ।

আজ মনে হচ্ছে ঝামেলা একটু বেশি লেগে গেছে।
বেশ কান্নাকাটি হচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর শুনতে পেলাম মাস্টার মশাইয়ের বনেদি স্ত্রী ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাচ্ছেন। জীবন থাকতে এ সংসারে ফিরবেন না, জানিয়ে গেলেন।

মনটা খারাপ হয়ে গেলো। নিজের বিয়ের কোনো অগ্রগতি তো হলোই না। এদিকে মাস্টার মশাইয়ের সংসারটাও ভেঙে গেলো।

হঠাৎ করেই বাড়িটা কেমন নীরব হয়ে গেলো।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো ।
নিঃশব্দ বাড়িটা একেবারে অচেনা লাগছে ।

আমি গান ধরলাম,

সখী, ভালোবাসা কারে কয়!সে কি কেবলই যাতনাময় ।
সে কি কেবলই চোখের জল?সে কি কেবলই দুখের শ্বাস ?
লোকে তবে করে কী সুখেরই তরে এমন দুখের আশ।

মাস্টার মশাই ওপাশ থেকে গলা মিলালেন।
আহ্ কি কষ্ট!

চা খেতে ডাকলাম।

ভদ্রলোক এলেন শুকনো মুখে।
বুঝলাম, সারাদিনে খাওয়া দাওয়া হয়নি। আমি বলতেই লজ্জিত মুখে খেতে বসে গেলেন।

ছুটির দিন, আয়োজন ভালোই ছিল। তাছাড়া আমার রান্নার হাতও বেশ ভালো বলেই জানি।

বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্লেটে খাবার বেড়ে দিলাম।

বেচারা মাস্টার, স্ত্রীর হাতের অখাদ্য খেয়ে খেয়ে জীবন পার করে দিলো।

__এইগুঁন কিয়া রাইনছেন? হাঁঁঁস নি? আড়ে মিঁয়া আমনেগো ভাবির হাতেড় হাঁঁঁস যদি খাইতেন, বুইজতেন।

__ডাইলে বাঁঁঁগাড় কি দি দিছেন?আমনেগো ভাবি তো ডাইল বাঁঁঁগাড় দেয়, সুবাঁস এলাকা ছঁড়ি যাঁয়।

মাস্টার মশাইয়ের কথায় আমি বেশ আহত হলাম।অবাক তো বটেই।

আমার রান্না করা ভাতটাও পছন্দ করলেন না তিনি । আর চায়ের তো এমন সমালোচনা করলেন, কি বলবো?

স্ত্রীর রান্নার স্বাদ কতটা অমৃত, সেই বিষয়ক গোটা তিরিশখানা গল্প বলে ফেললেন মাস্টার মশাই।

দিনরাত যে রান্নার এতো দূর্নাম শুনলাম, সেই রান্নার এমন প্রশংসা!

আমি ঠিক কি বলবো বুঝতে পারছি না।

কিছুক্ষণ না যেতেই বাইরে অটো রিকশার শব্দ ।
মাস্টার মশাই এক ছুটে বেড়িয়ে গেলেন।আমিও কৌতুহল বশতঃ পিছু নিলাম।

দেখি ব্যাগপত্র সমেত বাড়িওয়ালি নামছেন ।হাতে কয়েক পদের খাবার দাবারও আছে।হাসিমুখে বললেন,
__গাঁঁঁঁঁড়ি ভাঁঁঁড়া দেও ।

হৈহৈ করে ভাড়া মিটিয়ে, ব্যাগপত্র ঘরে নিতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন মাস্টার মশাই।

যেন কিছুই হয়নি কোনোকালে এদের দুজনের মধ্যে।

আমি তথৈবচ।

বুঝলাম, দাম্পত্য ভালোবাসার লক্ষ কোটি রকমফের আছে।
আমি তার একচুলও জানি না।

ঘুটঘুটে অন্ধকার সেই রাতে, দুজন মানুষের সংসার জীবনের গল্প নতুন করে আবিষ্কার করলাম আমি।

আর ঠিক তখনই মনটা আবারো ফুরফুরে হয়ে গেলো, সেই অদেখা নারীর স্বপ্নে।
 
Back
Top