- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 439
- Messages
- 6,909
- Reaction score
- 4,834
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
কালো মেঘের দিন
মূল লেখকঃ মোহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম
মূল লেখকঃ মোহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম
-
"স্যার, চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটির
একজন শিক্ষক আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন।"
-"উনাকে ভেতরে আসতে বলো।"
-"জি স্যার!"
নীরা জেল সুপারের রুমে ঢুকল।জেল সুপার তাকে দাঁড়িয়ে সম্ভাষণ জানালেন। কুশল বিনিময়ের পর নীরাই প্রথম কথা বলা শুরু করল।
- "আমার একজন আপনজন আপনার জেলে আছেন । "
-"কি মামলায়?"
-"হত্যা!"
-"আপনি কি তার সাথে দেখা করতে চান?"
-"জি"
-"আপনি ওনার নাম বলুন, আমি জেল পুলিশকে বলছি ওকে নিয়ে আসতে।"
-"আসলে শুধু দেখা করতে নয়,আরো একটা ব্যাপারে কথা বলার জন্য আপনার কাছে এসেছি।"
-"জি,বলুন!"
-"কেউ যদি চায় জেলের কোন কয়দিকে বিয়ে করতে, পারবে?"
-"ব্যাপারটা ঠিক আমি বুঝলাম না! একটু বুঝিয়ে বলুন প্লিজ!"
-"তাহলে সরাসরি বলি, আমি আমার ওই আপনজনকে জেলে থাকতেই বিয়ে করতে চাই।"
-"কি বলছেন? লোকটা হত্যা মামলার আসামী, তার তো ফাঁসিও হয়ে যেতে পারে।"
-"হ্যাঁ হতে পারে, তারপরেও... "
- "আপনি আরো ভাবুন। "
-"আমি অনেক ভেবেছি, ভেবেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছি! এখন আপনি যদি আমাকে একটু হেল্প করেন। "
জেল সুপার চুপ করে রইলেনলেন।কি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না? অনেক ভেবে চিন্তে বললেন -"ঠিক আছে, আপনি যেহেতু চাচ্ছেন আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কিন্তু আমার অনেক কিছু জানতে ইচ্ছে করছে, বিশেষ করে ওই কয়েদি সম্পর্কে।"
নীড়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর বলতে শুরু করল- "ওর নাম আবির। বাড়ি ময়মনসিংহে। ইউনিভার্সিটিতে পড়া অবস্থায় ওর সাথে আমার পরিচয় । আমি শুধু জানতাম ওর নাম আবির। কি করে না করে তাও জানতাম না। তারপরও কেন জানি ভালো লেগে যায় ওকে! সেই ভালোলাগাটা এত প্রচন্ড হয় যে আমি ওকে ছাড়া আমার জীবনে আর কাউকে ভাবতে পারতাম না। আবিরকে কখনো সরাসরি ভালো লাগার কথাটা বলিনি। তবে আমার আচার আচরণে ও বুঝে গিয়েছিল আমি ওকে প্রচন্ড ভালোবাসি। যখন বুঝলো আমি ওকে ভালবাসতে শুরু করেছি তখন থেকেই কেন জানি ও দূরে সরতে শুরু করল। একদিন হারিয়ে গেল ও।সপ্তাহ মাস বছর কেটে গেল কোন হদিস পেলাম না ওর। আমার সহপাঠীও আবিরের কোন হদিস দিতে পারল না। কয়েকদিন আগে হঠাৎ করেই খবরের খবরের কাগজে দেখি ওর ছবি। ও জোড়া হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়েছে! পত্রিকায় নিউজটা দেখার পর আমি সিদ্ধান্ত নেই ময়মনসিংহে আসার। সিদ্ধান্ত নেই জেলেই ওকে বিয়ে করার।"
-"আপনি বলছেন ওর সম্বন্ধে কিছুই জানেন না! এমনও তো হতে পারে ও একজন সন্ত্রাসী?"
-"না, এটা হতে পারে না! ওকে আমি এক বছর দেখেছি! শান্তশিষ্ট ভদ্র!! চমৎকার কবিতা আবৃত্তি করে! ভালো কবিতা লিখে! একজন সন্ত্রাসীর কখনো এসব গুণ থাকতে পারে না।"
-"কিন্তু জোড়া হত্যার ব্যাপারটা?"
-"আমার মনে হয় সে কোন পরিস্থিতির শিকার। "
-"এত বিশ্বাস ওর প্রতি আপনার? "
-"বিশ্বাস আছে বলেই হয়তো এই কঠিন সিদ্ধান্তটা আমি নিতে পারছি।"
-"ঠিক আছে, আপনি আজ ওর সাথে দেখা করে যান। বিয়ের ব্যাপারটা ওকে বলুন। ও যদি রাজি থাকে তাহলে আমি ব্যবস্থা করছি।"
।২।
আবির কয়েকজন কয়েদির সাথে সেলে বসে তাস খেলছিল। এমন সময় একজন পুলিশ এসে বলল - "আবির হাসান, তোমার সাথে একজন দেখা করতে এসেছেন।"
আবির জানে তার সাথে কে দেখা করতে এসেছে? তার বড় বোন। কারণ এই পৃথিবীতে বড় বোন ছাড়া তার আপন কেউ নেই। চাচা, চাচাতো ভাইরা হয়তো আছে, আছে মামা ও মামাতো ভাইয়েরাও কিন্তু কোনদিন তার সাথে কেউ দেখা করতে আসে নি। আবির জানে কেন তারা আসে না।এই নিয়ে তার মনে কোন ক্ষোভ নেই।প্রথম প্রথম খারাপ লেগেছিল,এখন সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে । এখন সে তার বড় বোন ছাড়া কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তাই যেদিন তার বড় বোন তার সাথে দেখা করতে আসে সেদিন তার মনটা ভালো হয়ে যায়।
তাই জেল পুলিশের ডাক শুনে আবিরের মনটা ভালো হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলো -আপা আজ কি রান্না করে নিয়ে এসেছে? ছোট মাছ? গত তারিখে যখন আপা দেখা করতে এসেছিল তখন সে বলেছিল ছোট মাছ খাবে। নিশ্চয়ই আপা ছোট মাছ রান্না করে নিয়ে এসেছে।
সে একটু তাড়াতাড়ি করেই যাচ্ছিল দেখা করার স্থানে। কিন্তু জেল পুলিশ বলল -"এই এদিকে আসো , জেলার স্যারের রুমে। "
-"কেন স্যার?"
-"তোমার সাথে যিনি দেখা করতে এসেছেন উনি বসে আছেন জেলার স্যারের রুমে!"
আবির ভেবে পাচ্ছে না কে তার সাথে দেখা করতে এসেছেন। বোন আসলে তো জেলারের রুমে দেখা করার কথা নয়? সাধারণত বিশেষ ব্যক্তিরা দেখা করতে আসলে জেলারে রুমে নিয়ে যায়, তাহলে কি তার সাথে বিশেষ কোন ব্যক্তি দেখা করতে এসেছেন? কিন্তু বিশেষ ব্যক্তিটি কে?কেন তার সাথে দেখা করতে এসেছেন ?
ভাবতে ভাবতে সে চলে এলো জেলারের রুমে। জেলারের রুমে ঢুকে নীরাকে দেখে অবাক হয়ে গেল সে। তার মুখের ভাষা যেন হারিয়ে গেছে! কিছুই বলতে পারছে না আবির, শুধু তাকিয়ে আছে নীরার দিকে!
নীরাও কিছু বলছে না আবিরকে দেখে। শুধু তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে,বাধভাঙ্গা অশ্রু!!
নীরা কান্না জড়িত কন্ঠে আবিরকে বলল -"কেন তুমি আমার জীবন থেকে হঠাৎ করে হারিয়ে গেলে? কি দোষ ছিল আমার? আমাকে কেন এত কষ্ট দিলে তুমি?"
আবির একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল -"তোমার কোন দোষ ছিল না নীরা।আসলে আমার কঠিন জীবনের সাথে তোমার সুন্দর জীবনটা জড়াতে চাইনি বলেই তোমার কাছ থেকে পালিয়ে থাকা। আমি বারবার বলতে চেয়েছি আমার জীবন সম্পর্কে, তুমি কখনো শুনতে চাওনি। এখন তো বুঝলে কি ভয়ংকর আমার জীবন!"
-"তোমার জীবন যত ভয়ংকরই হোক আমি সব সময় তোমার পাশে থাকতে চাই আবির।"
-"নীরা,তুমি খুব আবেগী। কিন্তু অতি আবেগ মানুষকে পোড়ায়,ধ্বংস করে দেয়। তাই আমি বলব, আমার পাশে থেকে তুমি শুধু দুঃখই পাবে। তার চেয়ে ভালো তোমার জীবন থেকে আমাকে মুছে দাও।"
-"ইচ্ছে করলেই কি কেউ কাউকে জীবন থেকে মুছে দিতে পারে? "
-"হ্যাঁ পারে! যদি কেউ নতুন করে কারো হাত ধরে।
-"আমি জীবনে আর কারো হাত ধরতে চাইনা আবির।তোমার হাত ধরে আমি সারাটি জীবন চলতে চাই!"
-"কোথায় পাবে আমাকে? নিজ হাতে দুটো খুন করেছি আমি! সাক্ষী আছে। তাছাড়া আমি নিজেও খুনের কথা অস্বীকার করবোনা। নির্ঘাত ফাঁসি হবে আমার।"
-"সেজন্যই আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
-"কি সিদ্ধান্ত?"
-"তুমি জেলে থাকা অবস্থাতেই আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই?"
-"কি বলছো এসব নীরা?তুমি কি স্বাভাবিক আছো?"
-"স্বাভাবিক না থাকলে ইউনিভার্সিটিতে কিভাবে ছাত্র পড়াই আমি? স্বাভাবিক না থাকলে কিভাবে চিটাগাং থেকে একা একা ময়মনসিংহে চলে আসি?"
-"আসলে আমি ওই স্বাভাবিকের কথা বলিনি?বলেছি তোমার অস্বাভাবিক সিদ্ধান্তের কথা!"
-"তোমার কাছে সিদ্ধান্তটা অস্বাভাবিক হলেও আমার কাছে এটাই স্বাভাবিক! তুমি আমাকে ভালো না বাসলেও আমি তো তোমাকে ভালবেসেছি । সেই কারণেই আমার সিদ্ধান্তটা তোমার কাছে অস্বাভাবিক লাগছে!"
-"নীরা,কে বলেছে আমি তোমাকে ভালবাসি না? তোমাকে ভালোবাসি বলেই তোমার ভালোর কথা চিন্তা করে আমি তোমার জীবন থেকে সরে এসেছি।ভেবেছিলাম কিছুদিন হয়তো তুমি কষ্ট পাবে তারপর ঠিকই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।"
-"সব কষ্ট ক্ষণস্থায়ী হয় না! কিছু কষ্ট বুকের ভিতর এমন ভাবে জমাট বেঁধে যায় যা সারা জীবন পোড়ায়! তোমাকে যদি আমি খুঁজে না পেতাম তাহলে আমিও পোড়তাম সারাটা জীবন। এখন তোমাকে আমি খুঁজে পেয়েছি, তুমি আমাকে এই কষ্ট থেকে মুক্তি দাও।"
-"কিন্তু তোমার এই সিদ্ধান্ত তোমার জীবনের কষ্টকে শুধু বাড়াবেই নীরা।"
-"না বাড়াবে না! তুমি দূরে থাকো অথবা নাই থাকো তবু জানবো তুমি আমার জীবনে আছো।"
কথাটা বলেই আবিরের হাত দুটো চেপে ধরল নীরা।চোখে চোখ রেখে বলল - "আমার বিশ্বাস, সৃষ্টিকর্তা তোমাকে আমার জীবন থেকে একেবারে কেড়ে নেবেন না।"
নীরার কথা শুনে আবিরেরও কান্না পেল। খুব ইচ্ছে করছে নিরাকে জড়িয়ে ধরে তার।বলতে ইচ্ছে করছে -আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি নীরা,খুব।
নীরা অবাক হয়ে যায় আবিরের চোখে জল দেখে। আবিরের। আবিরের চোখ মুছে দিয়ে বলে -"আমি জেল সুপারের সাথে কথা বলেছি। তুমি সম্মতি দিলেই উনি বিয়ের ব্যবস্থা করবেন।"
আবির আরো কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু এমন সময় জেল পুলিশ এসে বলল - "আপনাদের সময় শেষ!"
আবির চলে যাচ্ছে, বারবার ফিরে তাকাচ্ছে নীরার দিকে! নীরা দাঁড়িয়ে আছে।না,এখন আর তার বুকটা ভারী লাগছে না। আবিরের স্পর্শে যেন সব কষ্টগুলো জল হয়ে গেছে।
।৩।
নীরা ময়মনসিংহে যার বাসায় উঠেছে তার নাম মীরা। মীরা তার সহপাঠী। ইউনিভার্সিটিতে তারা খুব কাছের বন্ধু ছিল। সেই বন্ধুত্বটা এখনো অটুট আছে। নীরা-আবিরের ব্যাপারটা মীরা আগে থেকেই জানতো। বহুদিন পর যখন নীরা আবিরের সন্ধান পায় তখন মীরাকেই প্রথম জানায় নীরা। মীরা ময়মনসিংহে থাকায় নীরার জন্য আবিরের কাছে আসাটা সহজ হয়।
মীরার স্বামী বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সে নিজেও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পড়ায়। তাই তারা থাকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়াটারে। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার । তাই আবিরের সাথে দেখা করে মীরার বাসায় আসতে বিকেল গড়িয়ে গেল। মীরা ও তার স্বামী এখনো বাসায় ফেরেনি। বাসায় এখন আছে মীরার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে ও গৃহকর্মী।
বাসায় এসে সময় নিয়ে গোসল করলো নীরা। গোসল সেরে ভাত খাওয়ার পর তার মনে হল শরীরটা খুব ভারী লাগছে। দুচোখ জুড়ে ঘুম। বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে।
নীরার ঘুম ভাঙলো মীরার ডাকে।
-তোর দুলাভাই ডাইনিং এ বসে আছে তোর সাথে খাবে বলে। মীরা বললো।
-কয়টা বাজে রে?
-প্রায় দশটা!
-অনেক লম্বা ঘুম দিয়েছি।
তড়িঘড়ি করে উঠে ফ্রেশ হয়ে এসে ডাইনিং এ আসলো নীরা। এসে দেখে মীরার স্বামী অধ্যাপক শরীফ হাসান বসে আছেন।
-দুঃখিত দুলাভাই, দেরি হয়ে গেল।
-অসুবিধা নেই, চলো শুরু করি।
খেতে খেতে অধ্যাপক হাসান নীরাকে জিজ্ঞেস করলেন-কেমন লাগলো ময়মনসিংহ শহর?
- মোটামুটি, আমি ভেবেছিলাম পুরনো শহর, রাস্তাঘাট বেশ উন্নত।কিন্তু রাস্তাঘাটের অবস্থা তেমন ভালো নয়।
-তা কোন কোন জায়গা দেখলে?
নীরা যদি সত্য বলে তাহলে বলতে হবে জেলখানা। তাই নীরা বলল -ব্রহ্মপুত্র নদ আর নদের পাশে কি যেন জায়গাটা?
-সার্কিট হাউস?
-জি,জি...
-জয়নাল আবদীন সংগ্রহশালায় ঢুকনি?
-না ওটার খোঁজ পায়নি।
-ঠিক আছে তোমার বান্ধবী এক দিন নিয়ে যাবে তোমাকে। আচ্ছা অন্য প্রসঙ্গে আসি, বিয়ে করছ না কেন?
-আসলে দুলাভাই...
-মনমত পাত্র পাচ্ছো না?
-ব্যাপারটা ওরকমি
-আমার কাছে ভালো একটা পাত্রের খোঁজ আছে। তুমি চাইলে ঘটকালি করতে পারি।
-তুমি করবে ঘটকালি? মীরা বললল।
-কেন অসুবিধা কি?
-বাজার করার সময় পাওনা, ঘটকালীর সময় পাবে কোথায়?
-সময় পাওয়া যাবে কারণ পাত্রটা আমার কলিগ।
-তাই নাকি?
-দেখতে কেমন?
-হ্যান্ডসাম! তোমার বান্ধবীর সাথে বেশ মানাবে ভালো।
আরো অনেক কথা বললেন শরীফ হাসান। নীরা শুধু ওনার কথা শুনল এবং মুচকি হাসল।
খাবারের পর থাকার রুমে গেল নীরা।একটা বই হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়তে লাগলো সে। এমন সময় মীরা ঢুকলো রুমে, বলল -তোর দেখি এখনো ঘুমানোর সময় বই পড়ার অভ্যাসটা রয়ে গেছে।
-হ্যাঁ, ঘুমানোর আগে বই না পড়লে আমার ঘুম আসে না।
-আজ আমি তোর সাথে থাকবো, তোর দুলাভাইকে বলে এসেছি।
-তাহলে তো ভালোই হবে, আমরা অনেক গল্প করব।
-তা নীরা,আবির ভাইয়ের দেখা পেয়েছিস?
-হ্যাঁ
-কেমন আছে?
-জেলখানায় মানুষ যেমন থাকে।
-খুব শুকিয়ে গেছে?
-শুধু শুকিয়ে যায়নি, ও যে একসময় ফর্সা ছিল সেটাও বুঝা যায় না।
-তোকে প্রথম দেখে কি বলল?
-আমাকে দেখে কেমন জানি থমকে গেল । অনেকক্ষণ কোন কথা বলেনি!
-আসলে আবির ভাই কখনো আশা করিনি তুই তাকে জেলে দেখতে যাবি। সেই কারণেই হয়তো?
-হয়তোবা!
-জেল সুপারের সাথে দেখা হয়েছে?
-হ্যাঁ
-উনি কি ব্যবস্থা করতে পারবেন?
-উনি বলেছেন আবির রাজি থাকলে ব্যবস্থা করে দিবেন।
-আবির ভাই কি বলল?
-প্রথম রাজি হতে চায়নি।পরে অবশ্য রাজি হয়েছে।
-এক কঠিন পথে যাত্রা করছিস তুই! জানিনা এই পথটা তুই কিভাবে পাড়ি দিবি, বন্ধু হিসাবে তোকে সাহস দেওয়া ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই।
-ওটুকু হলেই হবে, তুই শুধু মানসিকভাবে আমাকে সাহস দিয়ে যাস।
নীরা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মীরাকে। মীরার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে নীরা। নীরাও চোখের জল আটকাতে পারে না। দুই বান্ধবীর চোখের জল একাকার হয়ে ভিজিয়ে দেয় ওদের বুক!
।৪।
গভীর রাত। পুরো জেলখানা নিস্তব্ধ। হয়তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ঘুম আসছেনা আবিরের। বারবার চোখে ভাসছে নীরার অবয়ব। এখন তার মনে হচ্ছে নীরার প্রস্তাবে রাজি হওয়াটা তার মোটেই ঠিক হয়নি। নীরাকে যদি সে বিয়ে করে তাহলে নীরার জীবনটা যেমন নষ্ট হয়ে যাবে তেমনি তার বেঁচে থাকার স্বাদটাও বেড়ে যাবে। কিন্তু সে তো জানে, তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা একদম ক্ষীণ।
জনসম্মুখে জোড়া খুন,হাজার হাজার সাক্ষী! কিভাবে শাস্তি থেকে রেহাই পাবে সে? নির্ঘাত ফাঁসি হবে তার,
এক বছর, দু বছর অথবা পাঁচ বছর পর।
তাকে বিয়ে করে একটা দিনও কি সংসার করতে পারবে নীরা?
তাহলে কেন মিথ্যে ভালবাসার আবেগে জড়াচ্ছে মেয়েটা?
এত শিক্ষিত, এত মেধাবী তারপরও এত বড় ভুল করছে কেন সে? নীরা ভুল করেছে, সেও তো সে ভুলের সাথে সায় দিয়েছে।
একটা বিড়ি ধরায় আবির। রাতের আঁধারে চোখে ভেসে ওঠে বাবার লাশ। লাশের পুরো শরীরের রক্ত!! কতই বা বয়স হবে তখন তার ৮ কি ১০।
দেখতে পায় আরেকটি দৃশ্য! তখন তার বয়স ২৩-২৪।এলাকার প্রভাবশালী চৌধুরী পরিবার ঘেরাও করে তাদের বাড়ি। তার ভাইকে না পেয়ে একজন তার কলার চেপে ধরে শাসায়-তোর ভাইকে বলবি,আমাদের সাথে যেন লাগালাগি না করে।
কিন্তু তার মুক্তিযোদ্ধা ভাই চৌধুরী বাড়ির সন্ত্রাসকে মেনে নিতে পারেনি। সেই কারণেই তার ভাইও একদিন লাশ হয়। বাবার মত একই রকম লাশ। রক্তে ভেজা পুরো শরীর।
ভাইয়ের হত্যা মামলায় বাদী হয় আবির। সেই মামলা তুলে নিতে দিন দিন চাপ বাড়ে তার উপর। এক সময় এমন পরিস্থিতি দাঁড়ায়, মামলা তুলে নিতে হবে নয়তো পালিয়ে যেতে হবে।
দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয় সে। সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় । থাকতে থাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তার এক বন্ধুর সাথে ।
নীরার সাথে পরিচয় হয় তখনই। এক সময় আবির বুঝতে পারে নীরা তার প্রতি প্রচণ্ড দুর্বল । তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয় নীরার জীবন থেকে পুরোপুরি সরে যাবে সে।। তাই কাউকে না জানিয়েই চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় একদিন চলে আসে ।
ঢাকায় চলে আসার পর বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা জাগে আবিরের। তাই একদিন গভীর রাতে বাড়িতে যায় সে।
গিয়ে দেখে তার বাড়িটা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বাড়ির সাথে পুড়ে অঙ্গার হয়েছে তার বৃদ্ধ মা!
বাবা, ভাই, মা তিনজন আপনজন। হত্যাকারী একই।
তারপর একদিন?
শ্যামগঞ্জ বাজার। হাজার হাজার মানুষ। চৌধুরী বাড়ির বড় দুই সন্তান চা খাচ্ছে স্টলে বসে।
লম্বা চুল দাড়িতে আবিরকে চিনতেই পারেনি ওরা।আবির তাদের পিছনে গিয়ে বসে। জ্যাকেটের পকেট থেকে রিভলবারটি বের করে পাঁচটি গুটি করে আবির।
মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আজিত ও মজিদ চৌধুরী।
।৫।
দুই বছর পর।ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে তিল ধারণের জায়গা নেই। কৌতূহলী মানুষ আর গণমাধ্যমকর্মীদের উপচে পড়া ভিড়।গেটের ঠিক পাশেই পাথরের মূর্তির মতো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে নীরা। আজ আবিরের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার তারিখ। এই দীর্ঘ চব্বিশটি মাস নীরা প্রতি মাসে নিয়ম করে দেখা করতে এসেছে, লড়েছে এক অসম যুদ্ধ। আবির বারবার বলেছিল উচ্চ আদালতে আপিল করতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে নিজেই বাধা দেয়। সে বলেছিল, "নীরা, আমি বিচার চাইনি, চেয়েছিলাম প্রতিশোধ। যারা আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাই আর বৃদ্ধা মাকে কেড়ে নিয়েছে, তাদের শেষ করে আমি কোনো অনুশোচনা বোধ করছি না। এই দণ্ড আমার প্রাপ্য।"
রাত যত গভীর হচ্ছে, নীরার বুকের ভেতরটা যেন মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। রাত ১২টা ১ মিনিট বাজার সাথে সাথেই পুরো জেলখানা এক ভৌতিক নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। আকাশের দিকে তাকাল নীরা, পুরো আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। নীরা চাইছিল যেন বৃষ্টি নামে।যেন বৃষ্টির জল তার দহন ধুয়ে দেয়। ঠিক সেই মুহূর্তে জেলের গভীর থেকে একটি ঘণ্টার ধ্বনি ভেসে এল। নীরা চোখের পাতা বন্ধ করল; সে বুঝতে পারল, আবিরের পৃথিবীর সব দেনা-পাওনার হিসাব চিরতরে চুকে গেছে। সে এখন সব সামাজিক গ্লানি আর আইনি জটিলতার ঊর্ধ্বে এক শান্তির জগতে পৌঁছে গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই চরম পরিণতি নীরাকে এক অদ্ভুত শূন্যতায় গ্রাস করল, যেখানে শুধু হাহাকার ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই।
|৬|
ভোরের আলো যখন ফুটতে শুরু করেছে, তখন জেলের ছোট গেটটি ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। কয়েদিদের কাঁধে চড়ে একটি সাধারণ কাঠের কফিনে করে বের করে আনা হলো আবিরের নিথর দেহ। একজন পুলিশ কর্মকর্তা নির্বিকার মুখে কিছু নথিপত্র এগিয়ে দিলেন। নীরা কোনো শব্দ না করে কম্পিত হাতে শেষবারের মতো সই করল— 'নীরা হাসান'। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কফিনের ঢাকনাটা একটু সরাল। আবিরের মুখটা যেন শরতের আকাশের মতো শান্ত, শুভ্র। তাকে দেখে মনেই হচ্ছে না সে কোনো সাজাপ্রাপ্ত খুনি; বরং মনে হচ্ছে সে এক গভীর এবং আরামদায়ক ঘুমে আচ্ছন্ন। ঠিক তিন বছর আগে দেখা সেই শান্তশিষ্ট, কবিতা আবৃত্তি করা ছেলেটির প্রতিচ্ছবি যেন ফিরে এসেছে এই মুখাবয়বে। নীরা আবিরের কপালে হাত রাখল; সেই স্পর্শ এখন বরফের মতো শীতল, যা নীরাকে মনে করিয়ে দিল যে উষ্ণ ভালোবাসার দাবি নিয়ে সে এখানে এসেছিল, তা আজ প্রাণহীন। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "তুমি তো তোমার সব দায়িত্ব পালন করে মুক্তি পেয়ে গেলে আবির, কিন্তু আমার সামনে পড়ে থাকা দীর্ঘ জীবনের একাকীত্বকে আমি কী নাম দেব? আমি কার জন্য নামের শেষে তোমার উপাধি বয়ে বেড়াব?"