Own/Self জীবনের রঙ: এক রঙিন গল্পের আড্ডা

WhisperBD

Special Member
Registered
1K Post
Joined
Dec 28, 2024
Threads
173
Messages
6,185
Reaction score
5,905
Points
2,213
Age
47
Location
Dhaka
Gender
Male
জীবনের রঙ: এক রঙিন গল্পের আড্ডা
(লেখক: আমার অনুভূতির রঙে গাঁথা শব্দমালা, যা হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে)


প্রথম পর্দা: সাদাকালো জীবনে প্রথম ছোঁয়া

রাহুল সেনের জীবনটা ছিল একটা পুরনো সাদাকালো সিনেমার মতো। সকালে অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙে, তারপর দ্রুত প্রাতঃরাশ সেরে অফিস। দিনভর কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ, আর বসের ইমেলে টেনশন। ফিরে এসে নেটফ্লিক্স আর ঘুমের ওষুধ। বয়স মাত্র ত্রিশ, কিন্তু মনে হতো জীবনটা যেন একটা ধূসর কুয়াশায় ঢাকা। রঙ বলতে ছিল শুধু তার মায়ের ফোনকল আর পাড়ার কাকিমার পুজোর ডালি থেকে আসা ফুলের গন্ধ।

এক শনিবার সকালে, রাহুলের ফ্ল্যাটের দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলে দেখে, একটা ছোট্ট মেয়ে, বয়স বড়জোর এগারো। পরনে হলুদ ফ্রক, হাতে একটা রঙিন খাম। মেয়েটা হাসিমুখে বলল, “ভাইয়া, এটা আপনার জন্য। খুলে দেখুন, মজা হবে!” রাহুল ভ্রু কুঁচকে খামটা নিল। মেয়েটা দৌড়ে পালানোর আগে বলে গেল, “আমি মিষ্টি!”

খামের ভেতর একটা হাতে লেখা চিঠি। কাগজটা যেন কোনো পুরনো বইয়ের পাতার মতো, হালকা হলুদ। লেখা, “রাহুল, তোমার জীবন এখন একটা সাদাকালো ছবি। রঙ ফিরিয়ে আনতে চাও? তাহলে আজ বিকেল চারটায় পুরানো বটতলায় চলে এসো। একটা চ্যালেঞ্জ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।” সই নেই, শুধু একটা ছোট্ট হাসির ইমোজি।

রাহুল প্রথমে ভাবল, এটা কোনো মার্কেটিং স্টান্ট। কিন্তু তারপর মনে হলো, “শনিবার তো আর কিছু করার নেই। যাই না কেন!” সে জানত না, এই ছোট্ট সিদ্ধান্ত তার জীবনের ক্যানভাসে একের পর এক রঙ ছড়িয়ে দেবে।


দ্বিতীয় পর্দা: লাল রঙের উৎসাহ

বিকেল চারটায় রাহুল পৌঁছে গেল পুরানো বটতলায়। জায়গাটা ছিল শহরের এক কোণে, যেখানে বড় বড় গাছ আর পুরনো বেঞ্চগুলো যেন সময়ের গল্প বলে। কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না। রাহুল বিরক্ত হয়ে বেঞ্চে বসে ফোনটা বের করল। ঠিক তখনই, একটা কাগজের টুকরো হাওয়ায় উড়ে এসে তার কোলে পড়ল।

কাগজে লেখা, “প্রথম রঙ: লাল। এই রঙ খুঁজতে হলে, পাশের পুকুরপাড়ে যাও। সেখানে একটা লাল বেলুন তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।” রাহুলের মাথায় প্রশ্ন ঘুরতে লাগল। এটা কী খেলা? কে এসব করছে? কিন্তু কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে গেল পুকুরপাড়ে।

সেখানে সত্যিই একটা ঝকঝকে লাল বেলুন বাঁধা ছিল একটা গাছের ডালে। বেলুনের সঙ্গে আরেকটা চিঠি। লেখা, “লাল মানে উৎসাহ, আবেগ। আজ একটা কাজ করো, যেটা তুমি কখনো করার কথা ভাবোনি। পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে গল্প শুরু করো। তার জীবনের একটা গল্প শোনো।”

রাহুল হাসল। “এটা কী পাগলামি!” কিন্তু বেলুনটা হাতে নিয়ে সে হাঁটতে লাগল চায়ের দোকানের দিকে। সেখানে এক বুড়ো লোক বসে চা খাচ্ছিলেন, পাশে একটা পুরনো রেডিওতে গান বাজছে। রাহুল গিয়ে বলল, “দাদু, আপনার সঙ্গে একটু গল্প করতে পারি?” বুড়ো লোকটা, যার নাম হরিদাসবাবু, হেসে বললেন, “বাবা, আমি তো গল্পের ভাণ্ডার! বোসো!”

হরিদাসবাবু ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। তিনি রাহুলকে বললেন, কীভাবে তিনি তরুণ বয়সে একবার বাড়ি থেকে পালিয়ে সার্কাসে যোগ দিয়েছিলেন। “দশ দিন পর ফিরে এসেছি, মা আমাকে দেখে কেঁদে ভাসিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই দশ দিনে জীবনের রঙ দেখেছি, বাবা।” রাহুল মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল। হরিদাসবাবু শেষে বললেন, “জীবনটা একটা প্যালেট। তুমি যত রঙ মাখাবে, ততই সুন্দর হবে।”

রাহুল ফিরে এলো, তার বুকে একটা অদ্ভুত উষ্ণতা। সে ভাবল, “লাল রঙটা যেন আমার ভেতরে জ্বলে উঠল।”


তৃতীয় পর্দা: নীল রঙের শান্তি

পরের দিন সকালে, রাহুলের দরজায় আবার টোকা। এবারও মিষ্টি, হাতে আরেকটা খাম। খামে লেখা, “দ্বিতীয় রঙ: নীল। শান্তির রঙ। আজ সন্ধ্যায় তোমার পুরনো বন্ধু রিয়ার সঙ্গে দেখা করো। তার ঠিকানা: ১২/বি, শান্তিনিকেতন অ্যাপার্টমেন্ট, ওয়ারী।”

রিয়া! রাহুলের মনটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। রিয়া ছিল তার কলেজের বন্ধু, একসঙ্গে কত হাসি, কত আড্ডা। কিন্তু একটা ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝিতে পাঁচ বছর আগে তাদের কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাহুল দ্বিধায় পড়ল। “এখন গিয়ে কী বলব? আমাকে দেখলে ও রাগ করবে না তো?” কিন্তু নীল রঙের শান্তির লোভ তাকে টেনে নিয়ে গেল।

সন্ধ্যায় রাহুল রিয়ার ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়াল। দরজা খুলল রিয়া, চোখে বিস্ময়। “রাহুল? তুই এখানে?” রাহুল আমতা আমতা করে বলল, “একটা অদ্ভুত চিঠি পেয়েছি। বলল, তোর সঙ্গে দেখা করতে।” রিয়া হেসে বলল, “আয়, ভেতরে আয়। আমিও একটা চিঠি পেয়েছি। বলল, তুই আসবি।”

দুজনে বসে পুরনো দিনের গল্প শুরু করল। রিয়া বলল, সে এখন একটা এনজিও চালায়, গ্রামের বাচ্চাদের পড়ায়। রাহুল বলল তার একঘেয়ে জীবনের কথা। কথায় কথায় পুরনো ভুল বোঝাবুঝির কথা উঠল। রিয়া হেসে বলল, “আমরা কী বোকা ছিলাম, না? একটা ছোট কথায় এত বছর কথা বন্ধ!” রাহুলের মনে হলো, তার বুক থেকে একটা ভার নেমে গেল। সেই রাতে তারা অনেকক্ষণ গল্প করল, যেন পাঁচ বছরের ফাঁকটা কখনো ছিলই না।

ফেরার পথে রাহুল ভাবল, “নীল রঙটা যেন আমার মনকে শান্ত করে দিল।”


চতুর্থ পর্দা: সবুজ রঙের প্রকৃতি

তৃতীয় চিঠি এলো সোমবার সকালে। এবার লেখা, “তৃতীয় রঙ: সবুজ। প্রকৃতির রঙ। আজ দুপুরে শহরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাও। সেখানে একটা গাছ লাগাও। আর একজনের সঙ্গে গাছের গল্প শেয়ার করো।”

রাহুল অবাক হলো। গাছ লাগানো? সে তো কখনো এসব করেনি! কিন্তু সে গেল বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সেখানে একটা ছোট্ট নার্সারি ছিল, যেখানে একজন মালি, শ্যামলকাকু, তাকে একটা আম্রপালি আমের চারা দিলেন। “এটা লাগাও, বাবু। বছর দশেক পর ফল দেবে।”

রাহুল মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে পাশে দেখল, একটা মেয়ে তার বাবার সঙ্গে গাছ লাগাচ্ছে। মেয়েটির বয়স বড়জোর সাত। রাহুল হেসে বলল, “তোমার গাছটা কী?” মেয়েটি, যার নাম ছিল ঝুমুর, বলল, “এটা কৃষ্ণচূড়া। বাবা বলেছে, ফুল ফুটলে লাল হয়ে যাবে!” ঝুমুরের বাবা বললেন, “আমরা প্রতি বছর একটা গাছ লাগাই। এটা আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব।”

রাহুলের মনে হলো, সে যেন প্রকৃতির সঙ্গে নতুন করে কথা বলছে। গাছটা লাগানোর পর সে শ্যামলকাকুর কাছে গাছের যত্নের কথা শিখল। ফেরার পথে তার মনে হলো, “সবুজ রঙটা আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়ে দিল।”


পঞ্চম পর্দা: হলুদ রঙের হাসি

চতুর্থ চিঠি এলো বুধবার। লেখা, “চতুর্থ রঙ: হলুদ। হাসির রঙ। আজ বিকেলে পাড়ার মাঠে বাচ্চাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলো। আর একটা বাচ্চার সঙ্গে তার স্বপ্নের গল্প শোনো।”

রাহুল হেসে ফেলল। ক্রিকেট? সে তো কলেজের পর আর ব্যাট হাতে নেয়নি! তবু সে বিকেলে পাড়ার মাঠে গেল। সেখানে একদল বাচ্চা প্লাস্টিকের ব্যাট আর বল নিয়ে খেলছিল। রাহুল গিয়ে বলল, “আমি খেলতে পারি?” বাচ্চারা হইহই করে তাকে দলে নিল।

খেলার মাঝে রাহুলের সঙ্গে আলাপ হলো রাজু নামে একটা ছেলের। রাজু, বয়স বারো, বলল, “ভাইয়া, আমি বড় হয়ে পাইলট হব। আকাশে উড়ব!” রাহুল হেসে বলল, “তুই পারবি। শুধু পড়াশোনা ছাড়িস না।” খেলা শেষে রাহুল বাচ্চাদের আইসক্রিম কিনে দিল। তাদের হাসি দেখে তার মনে হলো, “হলুদ রঙটা যেন আমার ছোটবেলাটাকে ফিরিয়ে দিল।”


ষষ্ঠ পর্দা: সাদা রঙের শান্তি

শেষ চিঠি এলো শুক্রবার। লেখা, “শেষ রঙ: সাদা। শান্তির রঙ। আজ রাত আটটায় পুরানো বটতলায় এসো। তোমার জীবনের রঙের রহস্য উন্মোচিত হবে।”

রাহুলের মন উত্তেজনায় ভরে গেল। এতদিনের রহস্যের জবাব পাওয়া যাবে! রাত আটটায় সে বটতলায় পৌঁছল। অন্ধকারে বটগাছের নিচে একটা ছায়ামূর্তি। কাছে গিয়ে দেখল, মিষ্টি! সে হেসে বলল, “ভাইয়া, আমাকে ধরে ফেললে!”

মিষ্টি জানাল, তার দিদা, মৃণালিনী দেবী, রাহুলের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন। মৃণালিনী দেবী রাহুলের একঘেয়ে জীবন দেখে চিন্তায় পড়তেন। মারা যাওয়ার আগে তিনি মিষ্টিকে বলে গিয়েছিলেন, “রাহুলের জীবনে রঙ ফিরিয়ে দিস। ওকে বোঝা, জীবন মানে শুধু অফিস আর ঘুম নয়।” মিষ্টি তাই এই খেলাটা শুরু করেছিল।

রাহুলের চোখ ভিজে গেল। সে মিষ্টিকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তুই আমার জীবনটা বদলে দিলি।” সেই রাতে, বটতলায় দাঁড়িয়ে, রাহুল বুঝল, সাদা রঙ মানে শান্তি, যে শান্তি আসে কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা থেকে।


শেষ পর্দা: রঙিন ক্যানভাস

এরপর রাহুল আর সেই পুরনো রাহুল রইল না। সে অফিসের পর সময় দিতে লাগল নতুন শখে। রিয়ার সঙ্গে মিলে সে এনজিওতে বাচ্চাদের পড়াতে শুরু করল। শ্যামলকাকুর সঙ্গে মাঝেমধ্যে গাছের যত্ন নিতে গেল। পাড়ার বাচ্চাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা হয়ে গেল তার রুটিন। আর মিষ্টি? সে হয়ে গেল রাহুলের ছোট্ট বোন।

প্রতিবার বটতলার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাহুলের মনে হতো, জীবনটা একটা রঙিন ছবি। লালের উৎসাহ, নীলের শান্তি, সবুজের প্রকৃতি, হলুদের হাসি, আর সাদার কৃতজ্ঞতা, প্রতিটা রঙ তাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।


তো, পাঠক, আপনি কোন রঙটা আজ আপনার জীবনে মাখবেন? একটা রঙ বেছে নিন, আর আপনার গল্পটা শুরু করুন।
 
You must log in or register to view this reply.
 
Back
Top