- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 468
- Messages
- 7,526
- Reaction score
- 6,262
- Points
- 4,063
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
জীবনের আসল ব্যকরণ
মূল লেখকঃ সোহেল আর রানা (Sohel R Rana)
মূল লেখকঃ সোহেল আর রানা (Sohel R Rana)
আপনার স্ত্রী যদি হঠাৎ একদিন আপনার পুরোনো প্রেমিকার সব চিঠি খুঁজে পায়, তবে কী করবেন?
পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ইশতিয়াক সাহেবের জীবনে এমনই এক ঝড় এসেছিল।
ইশতিয়াক সাহেবের মতে, সংসার হলো সমান্তরাল দুটি সরলরেখার মতো, যারা পাশাপাশি চলে যায়, কিন্তু কখনোই একে অপরকে স্পর্শ করে না। আর যদি ভুলক্রমে স্পর্শ করে, তবে নিশ্চিত বুঝতে হবে সেখানে একটি ছেদবিন্দু তৈরি হয়েছে, যার পরিণতি দুর্ঘটনা।
ইশতিয়াক সাহেব পেশায় পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। তাঁর জীবনটি একটি নিখুঁত ছকে বাঁধা। সকাল সাতটায় দুই পেগ কড়া লিকারের চা, ঠিক সাড়ে সাতটায় দৈনিক পত্রিকার প্রথম চার পৃষ্ঠা পড়া, এবং আটটা বেজে পনেরো মিনিটে উত্তরার বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাত্রা। গত দশ বছরে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে মাত্র একবার, যেদিন তাঁর ছোট ভাই অকালপ্রয়াত হন।
তাঁর স্ত্রী সুচরিতা ঠিক তাঁর বিপরীত। সুচরিতা কথা বলেন কম, কিন্তু তাঁর নীরবতার মধ্যে এক অদ্ভুত ভারী তরঙ্গ থাকে। সংসারটা তিনি পরিচালনা করেন পরম দক্ষতায়, কিন্তু সেই দক্ষতার পেছনে কোনো ভালোবাসা কাজ করে নাকি নিছক অভ্যাস, তা ইশতিয়াক সাহেব এতদিন ধরেও পরিমাপ করতে পারেননি।
আজ শনিবার। সকাল থেকে আকাশ মেঘলা। ইশতিয়াক সাহেব তাঁর স্টাডি রুমে বসে ক্লাসের খাতা দেখছিলেন। এমন সময় সুচরিতা ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে একবাটি কাঁচা আম ভর্তা।
সুচরিতা বাটিটি টেবিলে রেখে বললেন, "খাবে?"
ইশতিয়াক সাহেব চশমার উপর দিয়ে তাকালেন। তাঁর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়লো। "আমার অ্যাসিডিটির সমস্যা আছে, তুমি জানো।"
"জানি। তবু আনলাম। মানুষ তো সারাজীবন শুধু নিজের জন্য যেটা ভালো, সেটাই খায় না। মাঝেমধ্যে যেটা ক্ষতিকর, সেটাও খায়।"
ইশতিয়াক সাহেব কলমটা নামিয়ে রাখলেন। সুচরিতা ইদানীং অদ্ভুত সব কথা বলেন। এই জাতীয় কথাগুলোর পেছনে গূঢ় অর্থ থাকে, যা ফিজিক্সের থিওরি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
তিনি বললেন, "কথাটা পরিষ্কার করে বলো।"
সুচরিতা জানালার দিকে তাকালেন। বাইরে বাতাস বাড়ছে। আমগাছের পাতাগুলো সশব্দে কাঁপছে। তিনি ধীরকণ্ঠে বললেন, "তোমার পুরোনো ড্রয়ারটা পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা চিঠির তোড়া পেলাম। নীল ফিতে দিয়ে বাঁধা।"
ইশতিয়াক সাহেবের হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কিন্তু তিনি অভিজ্ঞ শিক্ষক, নিজের অনুভূতি লুকাতে পটু। তিনি মুখের ভাব পরিবর্তন না করে বললেন, "ওটা আজ থেকে দশ বছর আগের। আমার ছাত্রজীবনের।"
"আমি জানি। চিঠিগুলো মিতার লেখা, তাই না? যে মেয়েটির জন্য তুমি একসময় গৃহত্যাগ করতে চেয়েছিলে?"
ঘরের ভেতর দীর্ঘ নীরবতা নেমে এলো। দেয়ালঘড়ির পেন্ডুলামের টিকটিক শব্দটা হঠাৎ তীব্র হয়ে উঠলো।
ইশতিয়াক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "সুচরিতা, অতীতকে টেনে আনার কোনো অর্থ হয় না। মিতার সাথে আমার বিচ্ছেদ হয়েছে দশ বছর আগে। তোমার সাথে আমার বিবাহিত জীবন দশ বছরের। এই দশ বছরে আমি তোমার প্রতি বা এই সংসারের প্রতি কোনো অন্যায় করিনি।"
"তুমি অন্যায় করোনি ইশতিয়াক। তুমি একজন আদর্শ স্বামী। বাজার থেকে সবচেয়ে তাজা মাছটি আনা থেকে শুরু করে আমার প্রতিটা জন্মদিনে একটি করে শাড়ি উপহার দেওয়া, কোনোটাই তুমি ভুলোনি। কিন্তু জানো তো, দায়িত্ব পালন করা আর ভালোবেসে জড়িয়ে থাকা এক জিনিস নয়।"
ইশতিয়াক সাহেব সোজা হয়ে বসলেন। "তুমি কী বলতে চাইছো?"
"আমি বলতে চাইছি, তুমি এই দশ বছর ধরে শুধু একটি কর্তব্য পালন করে গেছো। তোমার মনটা সেই দশ বছর আগের এক পুরোনো চিলেকোঠায় আটকে রয়ে গেছে। তুমি আমাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছো, কিন্তু তোমার ভেতরে যে প্রেমিক মানুষটি ছিল, তাকে তুমি মিতার চিঠির সাথে ঐ নীল ফিতে দিয়ে বেঁধে ড্রয়ারে রেখে দিয়েছো।"
ইশতিয়াক সাহেব কিঞ্চিৎ বিরক্ত বোধ করলেন। "বাস্তবতা আর আবেগ এক নয় সুচরিতা। আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি, যত্ন করি। এই বয়সে এসে ভালোবাসা নিয়ে কবিতা লেখার প্রবৃত্তি আমার নেই।"
সুচরিতা আলমারির উপর থেকে একটি খাম বের করলেন। "আমি কবিতা লিখতে বলছি না। চিঠিগুলো আমি পড়েছি ইশতিয়াক। অসভ্যতা হলেও পড়েছি। মিতা তোমাকে লিখেছিল, ‘তুমি যদি আমাকে না পাও, তবে যার সাথেই তোমার সংসার হোক না কেন, তুমি তাকে কোনোদিন সম্পূর্ণ হৃদয় দিতে পারবে না। তুমি অর্ধেক মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবে।’"
সুচরিতা খামটি ইশতিয়াক সাহেবের সামনে রেখে বললেন, "মিতা সত্যি বলেছিল। তুমি দশ বছর ধরে আমাকে শুধু তোমার অর্ধেকটা দিয়েছো। বাকি অর্ধেকটা আমি কোনোদিন ছুঁতেও পারিনি।"
ঝুম বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টির ঝাপটায় জানালার কাঁচ ঝাপসা হয়ে আসছে।
ইশতিয়াক সাহেব স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তিনি ভেবেছিলেন চিঠিগুলোর কথা উঠলে সুচরিতা ঝগড়া করবেন, কাঁদাকাটি করবেন, কিংবা বাপের বাড়ি যাওয়ার হুমকি দেবেন। কিন্তু সুচরিতা এমন কিছুই করছেন না। তিনি অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে এমন এক কঠিন সত্যের সামনে ইশতিয়াক সাহেবকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।
ইশতিয়াক সাহেব নিচু গলায় বললেন, "তাহলে তুমি এখন কী চাও? এই বয়সে এসে ডিভোর্স?"
সুচরিতা একমুহূর্ত থামলেন। তারপর তাঁর ঠোঁটের কোণে এক অপূর্ব, করুণ আলো ফুটে উঠলো।
"না ইশতিয়াক। ডিভোর্স হলে সমাজকে জবাব দিতে হয়, চারপাশের মানুষকে নাটক দেখাতে হয়। আমি কোনো নাটক চাই না।"
"তবে?"
সুচরিতা খামটি ইশতিয়াক সাহেবের হাতে দিলেন। "চিঠিগুলো আমি পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারপর ভাবলাম, পুড়িয়ে ফেললে চিঠি পুড়ে যাবে, কিন্তু স্মৃতিটা ছাই হয়ে তোমার মগজেই রয়ে যাবে। তাই আমি একটা অন্য ব্যবস্থা করেছি।"
ইশতিয়াক সাহেব খামটি খুললেন। ভেতরে একটি ট্রেনের টিকিট। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী আগামীকালের ভোরের টিকিট, মাত্র একটি।
ইশতিয়াক সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন। "একটা টিকিট কেন? তুমি যাবে না?"
সুচরিতা শান্তকণ্ঠে বললেন, "না।"
ইশতিয়াক সাহেবের মাথার ভেতর বিদ্যুৎ চমকে উঠলো! "মানে?"
সুচরিতা বললেন, "মিতা এখন বিধবা। দুই বছর আগে তাঁর স্বামী মারা গেছেন। তিনি থাকেন চট্টগ্রামেই। মাসখানেক আগে খুঁজে তাঁর সন্ধান পেয়েছি এবং তাঁর সাথে যোগাযোগও করেছি। একটা বিশেষ কাজে তিনি এখন ঢাকায় আছেন। আগামীকাল ভোরে চট্টগ্রামে ফিরবেন, তুমিও তার সঙ্গে চট্টগ্রাম ফিরবে।"
ইশতিয়াক সাহেব অবিশ্বাস্য চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ ফুটলো না।
সুচরিতা বলতে লাগলেন, "আমি মিতাকে বলেছি, দশ বছর ধরে একজন মানুষ আমার পাশে শুয়ে থেকেও অন্য কারো স্বপ্নে বেঁচে আছে। এই যন্ত্রণা আমি আর বইতে পারছি না। ওকে তোমার সাথে নিয়ে যাও। কারণ অর্ধেক মানুষকে নিয়ে সংসার করার চেয়ে একা থাকা অনেক ভালো।"
ঘরের বাতাস এক মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠলো।
ইশতিয়াক সাহেব কাঁপানো কণ্ঠে বললেন, "সুচরিতা, তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? তুমি আমাকে অন্য একজন নারীর হাতে তুলে দিচ্ছো? এসব কী ধরণের ফ্যান্টাসি?"
সুচরিতা ইশতিয়াক সাহেবের খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন। দশ বছরে প্রথমবার ইশতিয়াক লক্ষ্য করলেন, সুচরিতার চোখের মণিতে কোনো রাগ নেই, কেবল এক অগাধ সমুদ্রের মতো অভিমান আর আত্মমর্যাদা ফুটে উঠেছে।
সুচরিতা বললেন, "এটা ফ্যান্টাসি নয় ইশতিয়াক, এটা মুক্তি। আমি তোমাকে মুক্তি দিচ্ছি। কাল ভোর পাঁচটায় ট্রেন। সিদ্ধান্ত তোমার।"
সুচরিতা ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
ইশতিয়াক সাহেব একা স্টাডি রুমে বসে রইলেন। তাঁর টেবিলে রাখা কাঁচা আমের ভর্তাটা ততক্ষণে শুকিয়ে গেছে। হাতে সেই ট্রেনের টিকিট।
তিনি সারারাত ঘুমাতে পারলেন না।
পরদিন ভোর। কমলাপুর রেল স্টেশন।
ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের তাড়াহুড়ো।
ট্রেন ছাড়ার আর মাত্র দশ মিনিট বাকি। ট্রেনের এসি কামরার জানালার পাশে বসে আছেন একজন নারী, মিতা। তাঁর চোখে অপেক্ষার আলো, আবার এক অজানা সংশয়।
ঠিক এমন সময় কামরার দরজায় একজন পুরুষ এসে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে একটি ছোট ট্রাভেল ব্যাগ।
মিতা চমকে উঠে দাঁড়ালেন। "ইশতিয়াক?"
ইশতিয়াক সাহেব মিতার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। দশ বছর পর দুই জোড়া চোখ একে অপরের মুখোমুখি।
মিতা আর্দ্র গলায় বললেন, "সুচরিতা আমাকে ফোন করেছিল, সে বললো তুমি আসবে। তুমি সত্যি এলে ইশতিয়াক?"
ইশতিয়াক সাহেব শান্ত চোখে মিতার দিকে তাকালেন। তাঁর ভেতরে আজ কোনো ঝড় নেই, কোনো হাহাকার নেই।
তিনি পকেট থেকে নীল ফিতে দিয়ে বাঁধা চিঠির তোড়াটি বের করে মিতার কোলের উপর রাখলেন।
"আমি এসেছি মিতা। তবে তোমার কাছে ফিরতে আসিনি। এসেছি দশ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো এই ছায়াটুকু তোমাকে ফেরত দিতে।"
মিতা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
ইশতিয়াক সাহেব ধীরকণ্ঠে বললেন, "মানুষ যখন অতীতে বাস করে, তখন সে মনে করে অতীতটাই বেশি সুন্দর। কিন্তু কাল রাতে আমি বুঝতে পেরেছি, আমার রক্ত মাংসের জীবনটা কেটেছে সুচরিতার সাথে। ও আমাকে অর্ধেক হৃদয় দেয়নি, ও আমাকে পুরো জীবনটা দিয়ে নিজে নিঃশব্দে একপাশে দাঁড়িয়েছিল। যে নারী নিজের স্বামীকে অন্য নারীর হাতে তুলে দেওয়ার মতো সাহস দেখাতে পারে শুধু আমার সুখের জন্য, তার ভালোবাসাকে অবহেলা করে আমি যদি আজ তোমার হাত ধরি, তবে ঈশ্বরের কাছে আমি কোনোদিন মাফ পাবো না।"
ট্রেনের বাঁশি বেজে উঠলো। হুইসেল দিলো গার্ড।
ইশতিয়াক সাহেব একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিছিয়ে এলেন। "ভালো থেকো মিতা। তোমার চিঠিগুলো তুমি রেখে দাও। আমার জীবনের আসল ব্যাকরণ লেখা হয়ে গেছে অন্য কোথাও।"
ইশতিয়াক সাহেব ট্রেন থেকে নেমে এলেন। ট্রেনটি ধীরে ধীরে স্টেশন ছেড়ে অন্ধকারের দিকে চলে গেল।
বাইরে তখনো ঝুম বৃষ্টি।
ইশতিয়াক সাহেব ভিজতে ভিজতে স্টেশনের বাইরে এসে একটা সিএনজি ডাকলেন।
বাড়ি ফিরে তিনি দেখলেন, ড্রয়িংরুমের আলো নেভানো। সুচরিতা বারান্দায় একা বসে আছেন। তিনি ট্রেন ছাড়ার সময় জানতেন, তিনি ধরে নিয়েছিলেন ইশতিয়াক আর ফিরবেন না।
ইশতিয়াক সাহেব ধীর পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
সুচরিতা চমকে মুখ তুললেন। অন্ধকারের মধ্যেও তাঁর চোখ দুটি জ্যৈষ্ঠ মাসের মতো ছলছল করে উঠলো।
"তুমি, তুমি ফেরোনি?"
ইশতিয়াক সাহেব সুচরিতার পাশের চেয়ারটায় বসলেন। তিনি প্রথমবারের মতো দশ বছরের বিবাহিত জীবনে শক্ত করে স্ত্রীর হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন।
"সমান্তরাল রেখা দুটো এতদিন পর এসে মিশে গেছে সুচরিতা। আর কোনো ফাঁক নেই। আম ভর্তা করবে? অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলেও আপত্তি করবো না।"
সুচরিতা কোনো কথা বললেন না। তিনি মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললেন। দশ বছরের জমে থাকা একাকীত্ব আর অভিমান মুহূর্তেই শ্রাবণের ধারায় ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।
বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে আসছে, আর আকাশে ফুটে উঠছে একফালি আলো।