Collected জন্মদিন

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
472
Messages
7,801
Reaction score
7,069
Points
4,113
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
জন্মদিন
(ফেসবুক হতে সংগৃহীত)







আমাদের অফিসে জন্মদিনের জন্য একটা চাঁদা তোলা হয়।

মাসে একশ টাকা। বছরে বারোশ। এই টাকার বিনিময়ে জন্মদিনের দিন একটা কেক, একটা গোলাপ আর অফিসের পক্ষ থেকে একটা ছোট্ট উপহার পাওয়া যায়।

ব্যবস্থাটা চালু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি লস করেছে হিসাব বিভাগের রফিক সাহেব। কারণ তিনি প্রতি মাসে একশ টাকা করে দেন, কিন্তু জন্মদিনের দিন অফিসে থাকেন না।

তার জন্মদিন পড়ে মে দিবসের ছুটিতে।

তাই গত তিন বছরে তিনি তিনটা কেক, তিনটা গোলাপ এবং তিনটা উপহার পাওনা রেখে দিয়েছেন।

একদিন কাজের ফাঁকে রফিক ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম,
“কেক কয়টা জমলো?
তিনি চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন,
“তিনটা।”
আমি বললাম,
“নেন না কেন?”
“নেব।”
“কবে?”
“অবসরের পর।”
আমি হেসে বললাম,
“তখন তো একসাথে বিশ পঁচিশটা কেক খেতে হবে।”
তিনি বললেন,
“আমি খাব না। ছেলেমেয়েদের দেব।”

সেদিন কথাটা শুনে হেসেছিলাম। কিন্তু আমার নিজের জন্মদিনে বুঝলাম, অফিসে জন্মদিনের সবচেয়ে বড় সমস্যা কেক না। হিসাব। সকাল সাড়ে দশটার দিকে মানবসম্পদ বিভাগের নাসরিন আপা আমাকে বললেন,
“আপনার জন্মতারিখটা আবার বলেন তো।”
আমি বললাম,
“১৫ সেপ্টেম্বর।”
“নিশ্চিত?”
“জি।”
“এনআইডি দেখে বলছেন?”
“না। নিজের জীবন দেখে বলছি।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর বললেন,
“জীবন দিয়ে অফিস চলে না। কাগজ দিয়ে চলে।”

দুপুরে আমাকে কাগজ দেখানো হলো। আমার এনআইডিতে জন্মতারিখ ১৫ সেপ্টেম্বর। অফিসের পুরোনো রেজিস্টারে ১৫ সেপ্টেম্বর। কিন্তু নতুন সফটওয়্যারে ৫১ সেপ্টেম্বর।
আমি বললাম,
“৫১ সেপ্টেম্বর আবার কবে থেকে হলো?”
নাসরিন আপা বললেন,
“আমরাও সেটা বুঝতে পারছি না।”
আমি বললাম,
“এটা কীভাবে সম্ভব?”
তিনি বললেন,
“আপনার ফর্মটা যে কম্পিউটারে এন্ট্রি হয়েছে, সেখানে সংখ্যাগুলো উল্টে গেছে সম্ভবত।”
আমি বললাম,
“কীভাবে উল্টালো?”
তিনি বললেন,
“কম্পিউটারকে এই প্রশ্ন করা যাবে না। সে খুব আত্মসম্মানী।”

আমার জন্মদিনের অনুষ্ঠান স্থগিত হয়ে গেল।

কারণ সফটওয়্যারে ৫১ সেপ্টেম্বর বলে কোনো তারিখ নেই। অফিসের নিয়ম অনুযায়ী, সফটওয়্যারে যার জন্মদিন নেই, তার জন্মদিনও নেই।
আমি বললাম,
“কিন্তু আমি তো আছি।”
নাসরিন আপা বললেন,
“আপনি আছেন, কিন্তু সিস্টেমে আপনার জন্মদিন নেই।”
আমি বললাম,
“তাহলে আমাকে সিস্টেমে ঢুকিয়ে দেন।”
তিনি বললেন,
“সিস্টেমে ঢোকানোর দায়িত্ব আইটি বিভাগের।”

আইটি বিভাগের মেহেদী বলল,
“ডেটা সংশোধনের অনুমতি মানবসম্পদ বিভাগের।”
মানবসম্পদ বিভাগ বলল,
“সংশোধন করবে আইটি বিভাগ।”
আইটি বলল,
“রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে।”
রিকোয়েস্ট পাঠাতে গিয়ে দেখা গেল রিকোয়েস্ট পাঠানোর জন্য জন্মদিনের তারিখ সঠিক থাকা দরকার।
আমি বললাম,
“তাহলে?”
মেহেদী বলল,
“আপনার জন্মদিন আপাতত প্রশাসনিকভাবে অস্তিত্বহীন।”

শেষ পর্যন্ত অফিসের বড় সাহেবকে জানানো হলো।
তিনি বললেন,
“এত ছোট একটা ব্যাপার নিয়ে এত কথা কেন?”
আমি মনে মনে খুশি হলাম।
বড় সাহেব বললেন,
“একটা কাজ করেন। কেকটা আজই কাটেন। ডেটা পরে ঠিক করা যাবে।”
আমি বললাম,
“এই তো!”

বিকেলে কেক এল। বড় কেক। উপরে লেখা—
‘HAPPY BIRTHDAY GOFUR’

নাসরিন আপা অনেকক্ষণ কেকের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলেন,,
“সোহেল, আপনার জন্মদিনে এবার একটা মজার ব্যাপার হয়েছে।”
“কী?”
“আপনার নামে কেকের অর্ডার দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অর্ডারের কাগজে নাম এসেছে গফুর।”
গফুর আমাদের অফিসের দারোয়ান।
আমি হেসে বললাম,
“তাহলে কেকটা উনাকেই দিয়ে দেন।”
নাসরিন আপা বললেন,
“সেটাই তো সমস্যা। উনি তো চাঁদা দেন না।”

নাসরিন আপা অর্ডারের কাগজটা এনে দেখালেন। অর্ডার করা হয়েছে অফিসের নম্বর থেকে।
নাম- গফুর।
তারিখ- ১৫ সেপ্টেম্বর।
বিল অফিসের জন্মদিনের ফান্ড থেকেই। কিন্তু কার অনুমতিতে অর্ডার হয়েছে, কেউ জানে না।

অবশেষে গফুরকে ডাকা হলো। সে গেট থেকে ধীরে ধীরে ভেতরে এলো। কেক দেখে প্রথমে দাঁড়িয়ে রইলো।
তারপর বললো,
“আমারে ডাকছেন স্যার?”
আমি বললাম,
“গফুর, এই কেকটা আপনার।”
সে অবাক হয়ে বললো,
“আমার?”
“হ্যাঁ।”
“ক্যান?”
আমি বললাম,
“আপনার জন্মদিন।”
গফুর কেকের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,
“আমার জন্মদিন কবে স্যার?”
অফিসে হাসির ঢেউ উঠল।
রফিক সাহেব বললেন,
“এইটাই তো সমস্যা। নিজের জন্মদিনই জানেন না!”
গফুরও হাসলো।
বললো,
“জন্মের সময় তো কেউ ক্যালেন্ডার হাতে আছিল না স্যার।”
বড় সাহেব বললেন,
“জন্মের সাল জানেন?”
“না।”
“তারিখ?”
“না।”
“এনআইডিতে কী আছে?”
গফুর পকেট থেকে এনআইডি বের করলো।
আমি এনআইডি দেখে বললাম,
“১৫ সেপ্টেম্বর।”
সবাই আবার হেসে উঠল।
আমি বললাম,
“ব্যস। আজ থেকে আপনার জন্মদিন ১৫ সেপ্টেম্বর।”
গফুর আমার দিকে তাকালো।
তারপর বললো,
“কেকটা কি সত্যিই আমারে কাটতে হবে?”
আমি বললাম,
“অবশ্যই।”

গফুর ছুরিটা হাতে নিলো। আমি খেয়াল করলাম, এতক্ষণে তার হাসিটা একটু অস্বস্তির হয়ে গেছে। সে কেক কাটার আগে একবার চারপাশে তাকালো। যেন নিশ্চিত হতে চাইছে, সত্যিই সবাই তাকে দেখছে। তারপর কেক কাটলো। সঙ্গে সঙ্গে সবাই হাততালি দিল। গফুর হাততালির শব্দে একটু কেঁপে উঠলো। তারপর মাথা নিচু করে হাসলো। সে হাসিটা অদ্ভুত। খুব বড় কোনো আনন্দের হাসি না। বরং এমন একজন মানুষের হাসি, যে হঠাৎ নিজের নামটাকে অন্যদের মুখে শুনতে পেয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেছে।

সবাই কেক খাওয়ার পর খানিকটা কেক রয়ে গেল।
গফুর রয়ে যাওয়া অংশটা হাতে নিয়ে বললো,
“আমি এইটুকু বাড়ি নিয়া যাই?”
নাসরিন আপা বললেন,
“বউয়ের জন্যে?”
সবাই হেসে উঠল।
গফুরও হাসলো।
তারপর কেকের অংশটা আরও শক্ত করে ধরলো।
বের হওয়ার আগে হঠাৎ থেমে বললো,
“স্যার, এই ফুলটাও নিয়া যাই?”
বড় সাহেব বললেন,
“ফুল দিয়ে কী করবেন?”
গফুর ফুলটার দিকে তাকিয়ে বললো,
“জানি না।”
তারপর আবার নিজেই বললো,
“বিয়ের প্রথম দিকে বউ একবার চাইছিল৷ নানান ঝামেলায় দিতে পারি নাই। তারপর আর কোনোদিন চায় নাই।”

সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

বড় সাহেব ফুলটা তার হাতে দিলেন। গফুর ফুলটা নিলো। খুব যত্ন করে। যেভাবে মানুষ দামি কোনো জিনিস নেয়, সেভাবে না। যেভাবে মানুষ বহুদিনের কোনো অসম্পূর্ণতার জায়গায় হাত রাখে, সেভাবে। তারপর কেকের প্যাকেট এক হাতে, ফুল আরেক হাতে নিয়ে গেটের দিকে চলে গেল।

আমি চুপ করে তার চলে যাওয়া দেখলাম। কেউ কিছু জানল না। শুধু আমি জানলাম, একটা নাম বদলাতে খুব বেশি সাহস লাগে না। কিন্তু একটা মানুষের জীবনে কোনোদিন না-আসা একটা দিনকে নিজের দিন থেকে সরিয়ে তার হাতে তুলে দিতে কী লাগে, সেটা সেদিন প্রথম বুঝলাম।

আমার জন্মদিনটা এবার একটু অন্যরকম হলো। কেকটা আমি কাটিনি। ফুলটাও আমার ঘরে গেল না। তবু মনে হলো, জীবনে পাওয়া জন্মদিনগুলোর মধ্যে এইটিই হয়তো সবচেয়ে সুন্দর।

গফুর গেটের কাছে গিয়ে ফুলটা শার্টের বুকপকেটে রাখলো। তারপর অকারণে একবার নিজের দিকে তাকিয়ে হাসলো। সেই হাসির দিকে তাকিয়ে মনে হলো-

আমার জন্মদিনটা ৫১ সেপ্টেম্বরই থাকুক, যেন পৃথিবীটা ভুল করে হলেও গফুরকে মনে রাখে।

সমাপ্ত
 
Back
Top