- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 433
- Messages
- 6,820
- Reaction score
- 4,643
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
ইরাপা
মূল লেখকঃ শিতিমা আলম
মূল লেখকঃ শিতিমা আলম
আজকে আপা দেশে আসবে, আমার ইরাপা। ডা. ইরাবতী ইসলাম। ভাইয়াও নামকরা ডাক্তার। দুই মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে আপার সুখের রাজ্য।
আমি বজলুর রশিদ। একটা সরকারি কলেজে বাংলা পড়াই। আমার মেয়েটা ক্লাস সিক্স আর ছেলে ফোরে পড়ছে। ফুপি আসার কথা শুনে অতি উৎসাহী দুই ভাই বোনের সময় কাটছেই না। আমারও কত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে...
তখন আমি ক্লাস সেভেন, রোল ২৬, পড়ি বেসরকারি একটা স্কুলে, যে স্কুলে না ছিলো ইউনিফর্ম আর না ছিলো কোনো ঠিকঠাক নিয়ম কানুন। কি আর করবো, সরকারি স্কুলে চান্স পাই নি তো। অবশ্য অন্যরা পছন্দ না করলে কি হবে, আমার ঐ স্কুলটাই বেশ লাগতো। কারণ, পড়াশোনার কোনো চাপ ছিলো না। আপা তখন ক্লাস এইটে। আমার মত হাদা ছিলো না ও, ভর্তি পরীক্ষায় থার্ড হয়েছিল। আপা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছে। আর একারণেই বাড়িতে ওর কদর ছিলো বেশি। আপাকে ঠিক সময়ে স্কুলে পৌঁছাতে হত। আর আমার স্কুলের সময় অসময় নেই। গেলেই হলো!
দাদু নাম রেখেছিলেন ইরাবতী, সেখান থেকে আপা হয়ে গেলো ইরা।আমার চেয়ে বয়সে দেড় বছরের বড়। ছোট চাচার মেয়ে। ও কঠিন দুষ্টু ছিলো, কিন্তু ভালো রেজাল্ট আর লক্ষীমন্ত চেহারা ওর ঢাল ছিলো। পড়াশোনায় একটু খারাপ হওয়াতে সব ধকল যেত আমার ওপর দিয়ে।
আমাদের একান্নবর্তী পরিবার নয়। তবে একই উঠোন। সকালে উঠে মা চাচি ব্যস্ত হয়ে যেত রান্নায়। যে চুলো থেকে আগে ভাত নামতো, আমি আর আপা সেখানেই খেতে বসে যেতাম। তবে মর্নিং শিফট হওয়ায় সকালবেলাটা ওর বড্ড তাড়া থাকতো।
আমার স্কুলে ডে বা মর্নিং বলে আলাদা কোনো শিফট ছিলো না। ১০.৩০টায় ক্লাস শুরু হত। তাই প্রায় প্রতিদিনই ওর জন্য টিফিন টা আমাকেই বয়ে নিয়ে যেতে হত। গার্লস স্কুলে ঢুকতে বেশ লজ্জা লজ্জা লাগত। আমি স্কুলে পৌঁছালে, আপা আর ওর প্রাণের বান্ধবী নিতু আসতো টিফিনবাক্স নিতে। নিতুকে আমি মনে মনে নিতুই ডাকতাম, আপা নয়। তখন মনে হতো, মরে গেলেও নিতুকে আপা ডাকতে পারব না। নিতু যেন কেমন অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতো আর আমি চোখ সরিয়ে নিতাম!
আমার ছিলো দুটো শার্ট। ঘুরেফিরে তা-ই পরতে হত। অবশ্য আমার খালাত ভাই (সমবয়সী) বেড়াতে এলে আমার শার্টের সংখ্যা হত চার। কিন্তু ও আসতোই ছুটির দিনে, নয়তো বৃহস্পতিবার। বৃহস্পতিবার হাফ স্কুল, টিফিন নিয়ে যেতে হত না। তবুও ছুতোয় নাতায় আপার স্কুলে যাবার জন্য ঘুরঘুর করতাম। আমি খুব খেয়াল করে দেখেছি, যেদিন চুল আঁচড়ে, পরিপাটি হয়ে বের হতাম বাসা থেকে, সেদিনই নিতু স্কুলে আসত না। আমার দুর্ভাগ্য!
একদিন হঠাৎ স্কুল থেকে ফিরে হুট করে আপা আমাকে বলেছিলো, "বাবু, আমার স্কুলে আর যাবি না। মাকে বলবো তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করতে, আমিই টিফিন নিয়ে যাবো।" তারপর সারা বিকেল দরজা বন্ধ করে কেঁদেছিল, হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আমি জানলার ফুটো দিয়ে দেখেছিলাম।
নিতুকে দেখতে না পেয়ে আমার মন খারাপ হয়। কিচ্ছু ভালো লাগে না। আমি কি করেছি, তা-ও জানি না। কিন্তু আপা এত শান্ত স্বরে আমাকে মানা করেছিলো যে আমি কারণটা জিজ্ঞেস করতেও পারি নি। অভিমানে আমিও আপার সাথে কথা বলি নি উনিশ দিন। চোখ বন্ধ করে জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সময়গুলির কথা মনে করতে চাইলে, ঐ সময়টা সবার আগে মনে আসে।
তার কিছুদিন পর আপার বৃত্তি পরীক্ষা। টেস্ট হয়ে গেছে। দিন রাত এক করে পড়ে। চোখের নিচে কালি পড়েছে, গালে একটা দুটো ব্রণ। আমার সাথে কথা বলার নানান চেষ্টা করেছে, তাতে লাভ হয় নি। আপার সাথে পাল্লা দিয়ে আমিও পড়ছি। বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি।
আপার পরীক্ষা হয়ে গেলো, রেজাল্টও। আমি ছাব্বিশ থেকে এলাম সাতে। সবাই সাধারণ গ্রেড আশা করেছিলো, কিন্তু আপা চমকে দিয়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেলো।
আপার রেজাল্ট এর বেশ কিছুদিন পরের কথা। সন্ধ্যাবেলা আপা চুপি চুপি আমাদের ঘরে এসে আমাকে একটা প্যাকেট দিয়েছিলো। জিজ্ঞেস করলাম কি ওটা, বলেছিলো "আমার একা একা করা জীবনের প্রথম কেনাকাটা!"
প্যাকেট খুলে পেয়েছিলাম দুটো শার্ট, একটা প্যান্ট আর এক জোড়া জুতো। আর ছিলো একটা চিরকুট।
তাতে লেখা,
"চটির ফিতা ছেঁড়ার পর একই রঙের ফিতা লাগাতে হয়, তুই হাদা বলেই অন্য রঙের লাগাস। নিতুরা জুতো বদলায়, ফিতা নয়। সেজন্যই তোর জামা জুতো দেখে অবাক চোখে তাকায়। ভাই দেখিস, একদিন আমাদের সাফল্য আকাশ ছোঁবে। সেদিন আর তোকে এক জোড়া শার্ট কিনে দেবার জন্য আমাকে বৃত্তির টাকার অপেক্ষা করতে হবে না, মাটির ব্যাংক ভাঙতে হবে না। ফিতা ছিঁড়ে গেলে আমরাও নতুন জুতো কিনবো। নিতুরাও আর আমার ভাইয়ের কাপড় জামা নিয়ে হাসাহাসি করার সুযোগ পাবে না।"
মনে আছে, প্যাকেট টা দিয়ে আপা উঠোনে দাঁড়িয়ে চুল বাধছিল। আমি ছুটে গিয়ে আপাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। তারপর দু ভাইবোন উঠোন মাঝখানে জড়াজড়ি করে পাল্লা দিয়ে কেঁদেছিলাম...
এই হলো আমার আপা, ইরাপা। আমার ফ্রেন্ড, ফিলোসফার এ্যান্ড গাইড।