- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 435
- Messages
- 6,886
- Reaction score
- 4,813
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
হিমুর বাবার কথামালা (২০০৯)
হুমায়ুন আহমেদ
হুমায়ুন আহমেদ
পর্ব - ১
ভূমিকা
বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি গ্রহণ করা যায়। বিচিটা নাকি আড়াআড়ি থাকে। পনেরো হাত বিচি গ্রহণ করার কোনোই কারণ নেই। হিমুর বাবার কথামালা চল্লিশ পৃষ্ঠার একটি বই। এখানে দুই পৃষ্ঠার ভূমিকার অর্থ বারো হাত কাঁকুড়ের পনেরো হাত বিচি।
এ ধরনের বইয়ের ধারণা অমির মাখায় আসে নি। কবি বাপ্পির মাথায় এসেছে। সে প্রায় জবরদস্তি করেই হিমুর বাবাকে নিয়ে আমাকে লিখিয়েছে। হিমুর বাবার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে কাজটা করিয়েছে আমার তা মনে হয় না। তার মধ্যে বাণিজ্য বিষয়টা কাজ করেছে বলে আমার ধারণা। কবি সাহেব কিন্তু আবার একজন প্রকাশকও। আমি নিশ্চিত বাপ্পি কল্পনায় দেখছে- বইমেলা শুরু হয়েছে। পাঠকরা লাইন বেঁধে কিনছে হিমুর বাবার কথামালা।
স্বপ্ন দেখতে সবাই ভালবাসে। কবিরা একটু বেশি ভালবাসেন। এটাই স্বাভাবিক। মানব সম্প্রদায়ের স্বপ্ন দেখে না হিমুরা। তারা অন্যদের স্বপ্ন দেখায়।
---------------
হিমুর বাবার কথামালা বইটি শুধুমাত্র হিমুরা পড়লেই ভাল হয়। অন্যরা (বিশেষ করে কিশোর কিশোরীরা) যেন না পড়ে। তাদের মাথায় ভ্ৰান্তি ঢুকে যেতে পারে। ভ্রান্তি একবার ঢুকে গেলে তাকে বের করা বেশ কঠিন। আমি ভ্রান্তির চাষ করতে চাই না।
এখন কথা হচ্ছে হিমু কে? আমি নিজে কি পরিষ্কার জানি? মনে তো হয় না। প্রায়ই যে সব চিঠি পাই তার একটা বড় অংশে এই জাতীয় লেখা থাকে।
১.
স্যার, হিমু হইবার নিয়মাবলি দয়া করিয়া জানাইবেন। আনি একটি সিল্কের পাঞ্জাবী খরিদ করিয়াছি। আমার এক বন্ধু বলিয়াছে হিমুদের পাঞ্জাবী সুতি হইতে হইবে। এই বিষয়ে আপনার মূল্যবান মতামত জানাইয়া বাধিত করিবেন।
২.
আংকেল, আমার নাম নাসিমী। আমি নবম শ্রেণীর ছাত্রী। আমার খুব ইচ্ছা আমি হিমু হব। মেয়েদের হিমু পোশাক কি? হলুদ পাঞ্জাবীর সঙ্গে কি ওড়না পরব? না-কি হলুদ শাড়ি পরব? হলুদ শাড়ি পরলে মনে হবে গায়ে হলুদে যাচ্ছি।
৩.
হুমায়ূন সাহেব! আমার বড় ছেলে সম্প্রতি হিমু হয়েছে। সে হলুদ পাঞ্জাবী পরে খালি পায়ে রাস্তায় হাঁটাহাটি শুরু করেছে। গতকাল পা কেটে বাসায় ফিরেছে। তাকে টিটেনাস ইনজেকশন দেয়া হয়েছে। আমার বক্তব্য আপনি লেখার মাধ্যমে কোমলমতিদের বিভ্রান্ত করে আনন্দ পান। একজন পিতা হিসেবে আপনার প্রতি অনুরোধ এই কাজটি করবেন না।
আমার অবস্থা হচ্ছে ভিক্ষা চাই না হলুদ চিতাবাঘ সামলাও।
জগতের সমস্ত হিমুরা ভাল থাকুক।
এই শুভ কামনা।
হুমায়ূন আহমেদ
নুহাশ পত্রী, গাজীপুর।
.
আমি কি হিমু বিষয়ক কোন বইয়ে তাঁর নাম বলেছি?
মনে করতে পারছি না। ভদ্রলোক দেখতে কেমন তাও বলতে পারছি না। তার চেহারার বর্ণনা কি কোথাও করেছি? মনে হয় না। চরিত্রের চেহারা বর্ণনা সাধারণত আমি করি না। দায়িত্ব পাঠকের উপর ছেড়ে দেই, তাদেরকেই চেহারা কল্পনা করে নিতে দেই। আমার উপন্যাসের চরিত্ররা দেখতে কেমন তা জোর করে পাঠকের উপর চাপিয়ে দেই না।
এই পৃথিবীর মহান লেখকদের একজন দস্তয়ভস্কি তার তৈরি চরিত্রগুলির ডিটেল বর্ণনা এমনভাবে দেন যে পাঠক চোখের সামনে চরিত্র দেখতে পান। ঔপন্যাসিক চালর্স ডিকেন্স এই কাজটি ভাল করেন। তার চরিত্র বর্ণনা—
লোকটির মুখ লম্বাটে। জোড়া ভুরু। কানে প্রচুর লোম। নাকের ঠিক নিচেই পেনি আকৃতির একটি লাল আঁচিল। আঁচিলে বড় বড় কয়েকটা কালো চুল আছে। এর মধ্যে একটার রঙ বাদামি। সেই চুল ঠোটের উপর ঝুলে থাকে। মুখের চামড়া কুঁচকানো। কালো তিলে ভর্তি। দাঁত নোংরা। একটি দাঁত সামান্য বড় বলে বের হয়ে থাকে। চোখ ব্রাউন। একটি চোখ অন্যটির চেয়ে সামান্য বড়। তিনি যখন কথা বলেন না তখনো অস্পষ্ট এক ধরনের শব্দ তার মুখ থেকে বের হয়।
চরিত্র বর্ণনায় লেখক কোন টেকনিক ব্যবহার করবেন সেটা তার ব্যাপার। আমার টেকনিকের কারণ কি এই যে আমি চেহারা কেমন তা নিয়ে মাথা ঘামাই না? চরিত্রের মানসিকতাই প্রধান হয়ে দাড়ায়? হতে পারে। রূপবতী মেয়েদের রূপ বর্ণনা এক কথায় সেরে ফেলি— মেয়েটি অসাধারণ রূপবতী। অসাধারণ কোন অর্থে তা ব্যাখ্যা করা হয় না। রূপ বর্ণনা ব্যাখ্যা না করা বা ব্যাখ্যা করতে না পারা কি একটি বড় ধরনের ত্রুটি না?
নায়িকাদের রূপ বর্ণনার নির্ধারিত নিয়ম (Set rules) আছে। যেমন, পটলচেরা চোখ, বাঁশির মত নাক ইত্যাদি। আমি পটল চিরে তাকিয়ে দেখে ধাক্কার মত খেয়েছি। কেন চোখের বর্ণনায় এই সবজি চলে এসেছে আল্লাহপাকই জানেন।
হরিণের মত চোখের কথাও উপমায় ব্যবহার হয়। নুহাশ পল্লীতে এক সময় প্রচুর হরিণ ছিল। তাদের চোখের শেষ অংশ বড়শির মত বাঁকানো। সেখানে কোনো সৌন্দর্য নেই। গরুর বড় বড় চোখে তাও কিছুটা সৌন্দর্য আছে। তবে মেয়েদের চোখের তুলনা মেয়েদের চোখের সঙ্গেই হওয়া বাঞ্ছনীয় ! ঐ যে সুনীলের কবিতা—
একটি গোলাপ ফুটেছিল
গোলাপের মত।
প্রস্তাবনা বন্ধ থাকুক, হিমুর বাবার কাছে ফিরে যাই। পাঠক আসুন আমরা সবাই মিলে তার অবয়ব দাঁড়া করাই। প্রসেস অফ এলিমিনেশনের মাধ্যমে চেহারা দাঁড় করানো। অনেক না অতিক্রমের পর হ্যাঁ তে পৌছনো।
ভদ্রলোকটি কি বেঁটে?
অবশ্যই না।
ভদ্রলোক কি থলথলে মোটা?
অবশ্যই না।
ভদ্রলোকের মাথায় কি টাক?
অবশ্যই না।
কুৎসিত দর্শন?
না।
গায়ের রঙ কুচকুচে কালো।
না।
পান খাওয়ার কারণে দাত কি লাল হয়ে থাকে?
না।
তাহলে চেহারা কি দাঁড়াচ্ছে? লম্বা ফর্সা একজন মানুষ। রোগা। মাথা ভর্তি চুল।
এই ভদ্রলোকের চেহারা কল্পনায় হিমুর প্রতি আমাদের যে মমতা, সেই মমতা কাজ করেছে। ভদ্রলোক পাগল ধরনের একজন মানুষ। এই পাগল কিন্তু নেংটো হয়ে ট্রাফিক কনট্রোল করা পাগল না। মমতার পাগল। সে পাগলের স্বপ্ন ছেলেকে মহাপুরুষ বানানো। তার যুক্তি ইঞ্জিনিয়ার বানানোর জন্যে যদি ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থাকতে পারে, ডাক্তার বানানোর জন্যে মেডিকেল কলেজ থাকতে পারে তাহলে মহাপুরুষ বানানোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন থাকতে পারে না।
কাজেই তিনি নিজেই একটা স্কুল খুললেন। সেই স্কুলের একজনই ছাত্র। তার পুত্র হিমু এবং তিনিই একমাত্র শিক্ষক।
ভদ্রলোকের চিন্তা ভাবনা কি খুবই হাস্যকর?
না, খুব হাস্যকর না। কারণ সাধু সন্ত বানানোর স্কুল কলেজ কিন্তু আছে। মনটাসিয়ারি, মঠ, আশ্রম। হিমালয়ের গুহায় বাস করা সন্ন্যাসী। ঈশ্বরের আরাধনা শেখানোই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য না। শুদ্ধ মানুষ হবার প্রক্রিয়া শেখানোও তাদের ট্রেনিং-এর অংশ। মহাপুরুষতে শুদ্ধ মানুষ ছাড়া আর কিছু না।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যে মহাপুরুষ হবার ট্রেনিং-এ কিছু কাল ছিলেন তা-কি পাঠকরা জানেন? সাধনার জন্যে তিনি গিয়েছিলেন হিমালয়ের গুহায় সন্ন্যাসীদের কাছে। এই সাধনায় তিনি আধ্যাত্মিক সিদ্ধি লাভ করেছিলেন এমন মনে হয় না। তার শিক্ষক প্রফেসর ওটেনকে তিনি নিজে কলেজ কম্পাউন্ডে প্রহার করেছিলেন। তারচে আশ্চর্য ব্যাপার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রহার সমর্থন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন–বিদেশি অধ্যাপকের কাছ থেকে দেশ, জাতি ও ধর্মের অপমানের কথা শুনলে ছাত্ররা অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করবেই। না করলেই বরঞ্চ লজ্জা ও দুঃখের কথা।
সুভাষ বসুর আত্মজীবনীতে কিন্তু ওটেন সাহেব দেশ জাতি ও ধর্মের অবমাননা করেছেন এমন কথা লেখা নেই। ছাত্রদের সঙ্গে তার ধারাবাহিক দুর্ব্যবহারের কথা বলা আছে।
অধ্যাপক ওটেন সুভাষ বসুর উদ্দেশ্যে একটি কবিতা লিখেছিলেন, তাতে তিনি লিখেন সুভাষ তাঁর প্রতি সুবিচার করেন নি। তিনি ছাত্রদের দেশপ্রেমকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন (অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অনুকরণীয়। ঈদ সংখ্যা ২০০৮, সাপ্তাহিক)।
গুরুগম্ভীর এই অংশে আমি আসলে কি বলতে চাচ্ছি? বলতে চাচ্ছি মহাপুরুষ আমাদের মধ্যে নেই। নেই বলেই মহাপুরুষদের প্রতি আমাদের দুর্নিবার আকর্ষণ। ভিন্নভাবে বলতে গেলে দুর্বলতা মানবজাতি ঘেন্না করে কারণ দুর্বলতা আছে তার মধ্যেই। Mankind abhors timidity, because he is timid.
মহাপুরুষ বিষয়ে আমার প্রবল আগ্রহের কারণ সম্ভবত একটাই আমার মধ্যে মহাপুরুষ বিষয়ক কিছু নেই। আমি নিতান্তই আমজনতার একজন। ভুলে যাবার আগে বলে রাখি আমার লেখা প্রথম মঞ্চ নাটকের নাম— মহাপুরুষ।
মহাপুরুষ গড়ার কারিগর হিমুর বাবার পোশাক কি হবে? হিমু হলুদ পাঞ্জাবী পরে। তিনি কি পরবেন? পোশাক খুব তুচ্ছ করে দেখার বিষয় না। স্বয়ং শেক্সপিয়ার বলেছেন, মানুষের প্রথম পরিচয় তার পোশাকে। বাংলা প্রবচনেও আছে—
পহেলা দর্শনধারি
তারপরে গুণবিচারি।
দর্শনধারি হতে হলে সে রকম পোষাক লাগবে। গামছা পরে দর্শনধারি হওয়া যাবে না।
পরিধেয় বস্ত্র নিয়ে শেখ সাদীর বিখ্যাত শায়েরও আছে। পোশাক যথাযথ না হওয়ায় রাজসভাতে শেষের দিকে তাকে বসতে দেয়া হয়েছিল। কবি অভিমান থেকে লিখলেন–
রাজসভাতে এসেছিলেম
বসতে দিলে পিছে
সাগর জলে সুক্তো ভাসে
মুক্তো থাকে নীচে।
.
আমি আমার জীবনে পোশাককে কখনই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি নি। ইস্ত্রিবিহীন কুঁচকানো শার্ট তার সঙ্গে স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে বড় কোনো অনুষ্ঠানে যেতে কখনই সমস্যা বোধ করি নি। তবে একবার মহাবিপদে পড়েছিলাম। সেই বিপদ নিয়ে ঢাকা ক্লাবের ম্যাগাজিনের রমনা সুবর্ণ জয়ন্তী সংখ্যায় একটা লেখা লিখেছিলাম। লেখাটি আমি আমার অনুমতিক্রমে আবার ছাপছি। কারণ মহাপুরুষ গড়ার কারিগরের পোশাক নির্বাচনের আগে লেখাটা পড়া থাকলে ভাল হবে।
বাঙালের ঢাকা ক্লাব দর্শন
আমার দীর্ঘদিনের পুরনো বন্ধুদের একজনের নাম জুয়েল আইচ। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আমার ব্যবহার একটু অদ্ভুত। আমি কখনই তাদের টেলিফোন করি না। বাসায় আসতে বলি না। রোগে শোকে খবর নেই না। ব্যাপারটা ভাইস ভার্সা। তারাও নেন না।
একদিন হঠাৎ জুয়েল আইচের টেলিফোন। তিনি বললেন, আপনাকে একটা জায়গায় নিমন্ত্রণ করতে চাচ্ছি। আপনি কি আসবেন?
আমি বললাম, অবশ্যই। জায়গাটা কোথায়?
ঢাকা ক্লাবে।
ভাই আমি তো ঢাকা ক্লাবের মেম্বার না। আমাকে ঢুকতে দেবে।
জুয়েল আইচ বললেন, ক্লাবে আলাদা আলাদা ঘর আছে। এসব ঘর ভাড়া নেয়া যায়। সেখানে অতিথিরা যেতে পারেন।
আমি বললাম, দিনক্ষণ বলুন। যথাসময়ে উপস্থিত থাকব। কোনো উপলক্ষ কি আছে?
উপলক্ষ আছে।
জুয়েল আইচ উপলক্ষ ব্যাখ্যা করলেন। তার এক বন্ধু এসেছেন কোলকাতা থেকে, নাম রঞ্জন সেনগুপ্ত। ভদ্রলোক একজন শিল্পপতি। তিনি লেখক হুমায়ূন আহমেদের কিছু রচনা পাঠ করেছেন। তার শখ লেখকের সঙ্গে কথা বলবেন।
আমি নির্দিষ্ট দিনে ঢাকা ক্লাবের রিসিপশন রুমে উপস্থিত হলাম। জুয়েল আইচ তার বন্ধুকে নিয়ে আগেই উপস্থিত। রিসিপশনের যিনি প্রধান, তিনি কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছেন। প্রথমে মনে হলো লেখককে চিনতে পারার আনন্দের জন্যেই তার চোখের দৃষ্টি অদ্ভুত লাগছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ভুল ভাঙল। রিসিপশনিস্ট বিনয়ের সঙ্গেই বললেন, স্যার আপনাকে ক্লাবে ঢুকতে দেয়া যাবে না। সরি।
আমি বললাম, কেন?
আপনার ড্রেসকোড ঠিক নেই। আপনার পায়ে স্যান্ডেল। শার্ট যেটা পরেছেন সেখানেও সমস্যা।
জুয়েল আইচ নানা চেষ্টা চরিত্র করছেন। ক্লাবের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন, কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।
আমি বুঝতে পারছি, আমাকে দেখাচ্ছে লেবেনডিসের মতো। গায়ে ইস্ত্রিবিহীন কুঁচকানো শার্ট। পায়ে স্যান্ডেল। স্যান্ডেলের আয়ুও শেষ পর্যায়ে। যে-কোনো সময় চামড়ার ফিতা খুলে সে রিটায়ারমেন্টে চলে যাবে।
আমার সামনে রিসিপশনের একজন একজোড়া জুতা এনে রাখল। সেই জুতা গামা পালোয়ানের পায়েরও তিন চার সাইজ বড়। আমাকে বলা হলো– এই জুতা পরে ঢুকে যান।
আমি বললাম, অন্যের জুতা পরে কেন ঢুকব? খালি পায়ে কি ঢুকতে পারি? আমার খালি পায়ে ঢুকতে আপত্তি নেই। আমার উপন্যাসের এক চরিত্র হিমু, খালি পায়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল।
রিসিপশনিস্ট বলল, জ্বি-না স্যার। খালি পায়ে ঢুকতে পারবেন না।
আমি বললাম, আচ্ছা মহাত্মা গান্ধী তো আধা নেংটা থাকেন। ছাগলের দড়ি হাতে ঘুরে বেড়ান। ছাগলটা ভ্যাঁ ভ্যাঁ করতে থাকে। মহাত্মা গান্ধী যদি ইচ্ছা প্রকাশ করেন ঢাকা ক্লাবের লাউঞ্জে বসে এক কাপ গরম দুধ খাবেন। তিনি কি পারবেন?
না। তাকে ঢুকতে দেয়া হবে না।।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তো আপনাদের ক্লাবে অনেক অনুষ্ঠান হয়। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী। রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান। হয় না?
জি স্যার হয়।
রবীন্দ্রনাথ যদি ক্লাবে আসতে চান, তাঁকে কি ঢুকতে দেয়া হবে? তিনি জোকাটাইপ পোশাক পরেন। পায়ে থাকে চপ্পল।
না উনাকেও ঢুকতে দেয়া হবে না।
আলবার্ট আইনস্টাইনকে কি ঢুকতে দেয়া হবে? ঢাকা ক্লাবের ড্রেসকোডের ধার কিন্তু তিনি ধারেন না।
স্যার, উনাকেও ঢুকতে দেয়া হবে না।
এতক্ষণে আমি কিছু স্বস্তি ফিরে পেয়েছি। এই গ্রহের সেরা তিনজনই যদি ক্লাবে ঢুকতে না পারেন, আমি কোথাকার হরিদাস পাল? আমাকে যে এরা কানে ধরে উঠবোস করায় নি এতেই আমি খুশি।
.
এই ঘটনার মাস ছয়েক পর আমি ঢাকা ক্লাব থেকে একটা চিঠি পেলাম। চিঠিতে লেখা, আমাকে ঢাকা ক্লাবের অনারারি মেম্বারশিপ দেয়া হয়েছে। এই খবর শুনে আমার বন্ধুরা এমন ভাব করতে লাগল যেন চব্বিশ ক্যারেট সোনার একটা হরিণছানা আমার ঘরে ঢুকে গেছে। ঢাকা ক্লাবের মেম্বারশিপের যে এত গুরুত্ব তা তো জানতাম না। আমি ক্লাব টাইপ মানুষ না। গুরুত্ব ধরতে পারার কথাও আমার না। আমি আমার নিজের ক্লাব সঙ্গে নিয়ে ঘুরি। যেখানে যাই ক্লাব সাথে নিয়েই যাই।।