- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 445
- Messages
- 7,085
- Reaction score
- 5,081
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে
মূল লেখকঃ তামান্না বিনতে সোবহান
(লেখাটি অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)
মূল লেখকঃ তামান্না বিনতে সোবহান
(লেখাটি অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)
পর্ব - ১
বিচ্ছেদের ঠিক সাত বছর পর প্রাক্তন স্ত্রীকে দেখে ঠোঁটের কোল ঘেঁষে স্বচ্ছ হাসির রেখা ফুটে উঠল অর্ণবের। প্রাক্তনকে দেখে ঠোঁটে হাসি ফুটে এমন কোনো রেকর্ড কেউ তৈরী করেছে কি না, সেই সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই তার। তবে সে জানে, এই হাসি মিথ্যে নয়। স্বচ্ছ এবং ভীষণ প্রাণবন্ত। কোথায় জ্বালাময়ী অনুভূতি হবে, রাগ-ঘৃণা-ক্ষোভ জন্মাবে, তা নয়, হচ্ছে ঠিক উলটো। আশ্চর্য! মানুষ জানলে তাকে নির্ঘাত পাবনা ফেরত পাগল বলবে।
এখনও দিন, মাস, সময় সবটাই মনে আছে অর্ণবের৷ স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে যদি জীবনের কোনো স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ পেত, সে হয়তো সেইসব স্মৃতিকেই বাঁচিয়ে রাখত। যে স্মৃতিগুলো তার জীবনের অন্যতম বিস্ময় ও ভালো লাগার ভিন্ন এক অধ্যায়ের নাম হয়ে আজও হৃদয় কুঠুরিতে অমলিন হয়ে আছে।
মানুষের জীবনে কিছু সুখকর স্মৃতি থাকে, সেইসব স্মৃতি মানুষ আমৃত্যু অন্তরে লালন করে বাঁচতে চায়। ভুলার চেষ্টাই করে না। অর্ণবও তাই। ফেলে আসা দিনের সবকিছু সে মনে রেখেছে। দামী দামী ইরেজার দিয়েও সেসব দিনের গল্প মুছে ফেলা সম্ভব নয়। এজন্য সে কোনোদিন চেষ্টাই করেনি ভুলে যাওয়ার। বরং এখনও কিছু দামী দামী মুহূর্তকে মনের অভ্যন্তরে ভীষণ যত্নে ও আদরে আগলে রেখেছে। যার ওপর কোনো ধরনের ধুলোময়লার আস্তরণ জমতে দেয় না সে।
এতগুলো বছর পর আবারও পুরনো স্মৃতি, পুরনো মানুষ তার সামনে আসবে ভাবেনি অর্ণব। পৃথিবী গোল৷ তাই হয়তো তারা আজ মুখোমুখি।
বলছি অর্ণবের প্রাক্তন স্ত্রী মিঠির কথা। যার সাথে বিয়ে হলেও সংসার জীবনের ছ'মাসের মাথায় বিচ্ছেদ হয়েছিল। দু'জনের ইচ্ছেতেই বিচ্ছেদ নামক শব্দটা এসেছিল সম্পর্কে। কিন্তু কেন এসেছিল?
আজ সন্ধ্যের পর চেম্বারে বসে রোগী দেখছিল অর্ণব। সেই সময় ছোট্ট একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল মিঠি। মিঠি দেখতে তার নামের মতোই সুন্দর। গোলগাল চেহারার এই মিষ্টি মেয়েটাকে অতিরিক্ত চকোলেট খাওয়ার কারণে সে নামের বদলে নিকনেমে ডাকত৷ এই বদভ্যাসের কারণে অর্ণবই প্রথম তাকে মিঠি নামের বদলে চমৎকার একটা নিকনেম দিয়েছিল।
মিঠি অর্ণবকে দেখলেও চিনতে পারেনি। কারণ তার মুখে মাস্ক ছিল। রোগী দেখার সময় মুখে মাস্ক ব্যবহার করা অভ্যাস অর্ণবের।
অর্ণব একজন শিশু বিশেষজ্ঞ। দেশের বাইরে থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে পুরোদমে ডাক্তারি পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছে সে। রোগী যে মিঠির কোলের ছোট্ট বাচ্চা, সেটা স্পষ্ট। সে সামনের চেয়ার দেখিয়ে বলল, "এদিকটায় আসুন।"
মিঠি থমকে গিয়ে সামনে দৃষ্টি দিল। একজোড়া মায়াময় চোখের দিকে তাকিয়ে মুখে হাত রেখে কী যেন ভাবল। এরপর ডক্টরের নাম খেয়াল হতেই ঠোঁটে অবাককরা হাসি ফুটিয়ে বলল, "ও মাই গড! এটা আপনি! আমি ভেবেছিলাম, এ্যা আর রাফি নামের এই ডক্টর অন্য কেউ।"
চেহারা না দেখেও মিঠি এবার তাকে চিনতে পেরেছে, এটা অর্ণবের জন্য একটা বিরাট বিস্ময়। সে মুখের মাস্ক খানিকটা নামিয়ে ছোট্ট বাচ্চার দিকে খেলনা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "মনে আছে তাহলে!"
মিঠি ঠোঁটে প্রাণোচ্ছল হাসি ফুটিয়ে বলল, "আপনাকে ভুলব! আমি? এ যে অসম্ভব মি. অর্ণব আর রাফি।"
অর্ণব পিছনে ফিরতে চাইল না। তাই স্পষ্টকণ্ঠে বলল, "দিনকাল কেমন যাচ্ছে, চ...?"
মুখ ফস্কে বেরিয়ে আসা 'চকোলেট' শব্দটা সম্পূর্ণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই ঠোঁট চেপে ধরল অর্ণব৷ সম্পর্ক ভাঙনের সাথে সাথে অধিকার ও আধিপত্যও কমে এসেছে। যদিও তাদের সম্পর্কে এসব কিছু ছিলই না। যা ছিল সব টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো নাটক সিনেমার মতো সাজানো-গোছানো কাল্পনিক ও মিথ্যে অভিনয়ের দৃশ্য। যেগুলো এখন মনে করে দুঃখিত হওয়ার কোনো মানেই হয় না।
মিঠি ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল, "কেটে যাচ্ছে ভালোমন্দ মিলিয়ে।"
জড়তা সরিয়ে অর্ণব বলল, "মেয়ের বয়স কত?"
"দেড় বছর হয়নি এখনও।"
"নাম কী?"
"মিশু বিনতে নুহাশ।"
"খুব সুন্দর নাম। ওর বাবা এখন কী করছে?"
মিঠির প্রাণোচ্ছল হাসিটা হঠাৎ করেই মিইয়ে গেল। সে ইচ্ছাকৃতভাবে এই চ্যাপ্টার এড়িয়ে যেতে বলল, "ওকে একটু দেখুন না। ভীষণ অসুস্থ। এইযে ওর ছোট্ট শরীর, ওইটুকু শরীরে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে চাকা চাকা হয়নি। গতকালই খেয়াল করেছি৷ আজ দেখি বেড়ে গেছে।"
অর্ণব বুদ্ধিমান ও ভীষণ স্পষ্টবাদী ছেলে। সেইসাথে ম্যাচিওর ও ব্যক্তিত্ববান। মানুষের মনে কখন কী চলে, সেটা না বুঝলেও এই মিঠিকে সে খুব ভালো বুঝে৷ ছয় মাস! খুব কম সময়? মোটেও নয়। এখনও তার এড়িয়ে যাওয়া, লুকিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজেও ওই টপিকে এগোতে চাইল না।
ছোট্ট মিশুকে চেক-আপ করে কিছু ঔষধ লিখে দিয়ে অর্ণব বলল, "এগুলো তিনদিন কান্টিনিউ করুন। এরপর যদি না সারে, নিয়ে আসবেন আবার। আশা করছি, সেরে যাবে।"
"থ্যাংক ইউ।"
মিঠি ঝটপট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে চেম্বার ত্যাগ করল। তার এই পালাই পালাই আচরণ দেখে চিন্তিতমনে কিছু একটা ভাবল অর্ণব। এরপর মাথা থেকে সাত বছর আগের স্মৃতিকে ঝাড়া দিয়ে ফেলে, রিল্যাক্স হতে মায়ের নম্বরে ডায়াল করল।
মেয়েকে নিয়ে বাড়ি এসে, ঔষধ খাইয়ে তাকে আগে ঘুম পাড়িয়ে রাখল মিঠি। এরপর নিজে রান্নাবান্না গুছাতে গিয়ে দেখল, তার মা ফাতেহা বেগম আগে থেকেই রান্নার ঝামেলা শেষ করে ফেলেছেন।
মিঠি মায়ের কাছে যেতেই তিনি জানতে চাইলেন, "ডাক্তার কী বলল? সারবে তো? বাচ্চাটাকে এত দুর্বল দেখতে ভালো লাগছে না।"
ডাক্তারের কথা বলাতে অর্ণবের হাস্যজ্বল মুখটা দু'চোখের পর্দায় ভেসে উঠল মিঠির। আনমনেই হেসে উঠল। এখনও আগের মতোই আছে। একটুও বদলায়নি। কিছু মানুষ এমন কেন? এত ভালো, এত উদার! এইটুকু বিড়বিড় করে উত্তর দিল, "বললেন তো সেরে যাবে। না সারলে তিনদিন পর আবার যেতে হবে। আচ্ছা, ওর অ্যালার্জি হলো কী করে বলো তো! আমার তো এই ধরনের সমস্যা কোনোকালেই ছিল না।"
এইটুকু বলেই ফাতেহা বেগমের থমথমে দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হুঁশে এলো মিঠি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঝটপট বলল, "দেখি, সরো। খাবার সাজাই৷ উফফ এত ক্ষিধে পেয়েছে আমার!"
মা-মেয়ে মিলে খাবার শেষ করলেন ঠিকই, কিন্তু পুরো সময়টায় কেউ আর কোনো বিষয় নিয়ে কথা তুললেন না। মিঠিও মাকে যথেষ্ট এড়িয়ে ঘুমাতে চলে এলো। মেয়ের পাশে শুয়ে একহাতে তাকে আগলে নিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, "তুই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন মা। রব তোকে সুস্থ করুন দ্রুত। দীর্ঘায়ু জীবন দান করুন তোকে।"
চোখ বন্ধ করলেও ঘুম এলো না চোখে। থেকে থেকে বার বার অর্ণবের চেহারাটা ভাসছে৷ ও কি বিয়ে করেছে আবার? সুখী হয়েছে তো? এমন মানুষ খুব করে সুখ ডিজার্ভ করে! আচ্ছা, তখন কী বলতে চাইছিল অর্ণব? চকোলেট বলে ডাকতে চাইছিল? এত বছর পরও ডাকটা ভুলেনি সে? কেন ভুলেনি? কী দরকার ছিল মনে রাখার? যে নেই, তার স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার দরকার কী? নিকনেম স্মরণে রাখার দরকার কী? অর্ণব আস্তো পাগল!
প্রশ্নে প্রশ্নে মনটা ভার হয়ে উঠলেও নির্দিষ্ট কোনো উত্তর খুঁজে পেল না মিঠি। পিছনের দিনগুলো মনে করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, মনে মনে আওড়ে গেল, "আমায় ক্ষমা করে দিন! আমি আপনার সাথে ভীষণ অন্যায় করেছি!"
দশটার পর বাসায় ফিরে ফ্রিজে রেখে যাওয়া খাবার ওভেনে গরম করে খেতে বসল অর্ণব। এখানে সে একাই থাকে৷ বাবা-মা গ্রামে থাকেন। ছোট্ট ভাই ও ভাইয়ের বউয়ের সাথে। তার ওপর ভীষণ অভিমান, তাই জেদ দেখিয়ে ছেলের থেকে দূরে আছেন। অর্ণব অবশ্য এত জেদ খুব একটা গায়ে মাখে না কোনোদিন। তার যা মন চায়, সে সেটাই করে। আর এসব করে অভ্যস্ত!
আজ খাবার মুখে নিতে গিয়ে আবিষ্কার করল, ভেতরে একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা হচ্ছে। এই যন্ত্রণা তার অস্তিত্বের সাথে মিশে গিয়েছে একদম। এ কেমন জীবন! কেন এমন! কেন তার সবকিছু থেকেও কিচ্ছু নেই!
এইযে এই ফ্ল্যাট, এই রান্নাঘর, এই ডাইনিং, ড্রয়িংরুম, বাড়ির ছাদ এমনকি তার বেডরুম সবকিছুই তো মিঠির দখলে ছিল। সবকিছুতেই তো মেয়েটা নিজের অধিকার ধরে রেখে গোটা ঘরের প্রতিটা কোণায় প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছিল৷ কেন সেই প্রাণকে নিষ্প্রাণ করে চলে গেল সে? থাকতে পারত না? একটু মানিয়ে নিয়ে! পারত তো!
মনের সাথে দ্বন্দ করতে গিয়ে অর্ণব উপলব্ধি করল, মিঠিকে সে সব দিতে পারলেও সুন্দর একটা সংসার দিতে পারত না। যেখানে মনের টান নেই, সেখানে ঘর হওয়া তো আকাশচুম্বী চিন্তাভাবনা। মিঠি কী করে পারত? দোষটা আসলে কারোরই নয়! সবটাই ভাগ্য! আর এমন ভাগ্যের সাথে জড়িয়ে অর্ণবের সব ইচ্ছে ও স্বপ্ন একদম ফালাফালা হয়ে গেছে।
যাক সেসব! স্মৃতি মনে করে কষ্ট করে লাভ আছে? সে তো স্বেচ্ছায়ই তাকে যেতে দিয়েছে। তখন যদি আটকে রাখার চেষ্টা করত, মিঠি কি থাকত? কখনও তো এটা জিজ্ঞেস করেনি! প্রয়োজন মনে হয়নি! তাহলে এখন কেন মনে হচ্ছে, মিঠিকে যেতে দেয়া ঠিক হয়নি?
অর্ণব অস্থির হয়ে গেল। ঢকঢক করে কয়েক ঢোক পানি গিলে রুমে এসে বিয়ের অ্যালবাম বের করে বসল। প্রথম ছবিটাই মিঠির। এত সুন্দর লাগছে। স্নিগ্ধ ও মায়াময় চেহারা। বিয়ের কনে বলে কথা। সুন্দর লাগবে না? তারুণ্য তখন মাত্র ছুঁয়েছিল মেয়েটাকে। আর তার সবটুকু চঞ্চলতা ছুঁয়েছিল অর্ণবকে। কী অদ্ভুত! একটা নিষ্পাপ হাসি, যে হাসিতে অর্ণব উপলব্ধি করত ঝিমিয়ে পড়া গাছের পাতাও সজীব হয়ে উঠছে৷ অথচ নিয়তির কী নিষ্ঠুর নিয়তি! দু'জনের পথ আজ বেঁকে গেছে। এতটাই বেঁকে গেছে যে, কোনোকিছুই আর ঠিক হওয়ার নয়!
সব কথা কি মনে আছে মিঠির? না কি ভুলে গেছে? সেদিনের কথা! সেই রাতের কথা! যে রাত দাম্পত্য জীবনের গল্পে মাত্র একদিনই পূর্ণতা নিয়ে এসেছিল। উঁহু, সব স্মৃতি! সব মিথ্যে! একদম মরিচীকার মতো।
সবগুলো ছবি ওলট-পালট করে দেখা শেষ হলে অর্ণব বিড়বিড়িয়ে রবের নিকট অভিযোগ পেশ করল, "ঠিক কতটা কাছে এলেও কারও মন ছোঁয়ার মতো কাছে আসা হয় না, মাবুদ?"
চোখের কোণে জ্বালাময়ী অশ্রু নিয়ে অর্ণব মনে মনে আওড়ে গেল, "আপনি কি জানেন চকোলেট, আজও আমি প্রতিরাতে আপনার স্মৃতি চোখে নিয়ে ঘুমোই? প্রতি ভোরে আমি আপনার হাসি মনে নিয়ে ঘর থেকে বের হই! প্রতি সন্ধ্যায় আমি, আপনার হাতটা কল্পনায় এঁকে, আমার হাতে আটকাই। সেই হাত ধরে আমি ব্যস্ত শহরের ফুটপাত ধরে হাঁটি। কিচ্ছু জানেন না আপনি! কিচ্ছু না।"