- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 434
- Messages
- 6,838
- Reaction score
- 4,701
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
গুল্মলতা
মূল লেখকঃ রিফু
মূল লেখকঃ রিফু
১
এক বিকালে কমলাপুর ব্রিজ হয়ে হেঁটে ফিরছি, হুট করে মনে হলো যে কেউ ডাকছে। পেছনে তাকিয়ে দেখি রহমতউল্লাহ স্যার। এই স্যার আমাদের পিটি স্যার ছিলেন, আড়ালে ছেলেমেয়েরা কেন যেন তাকে ‘মামা’ বলে ডাকতো। ছেলেরা স্যারকে বেশ ভয় করতো, এমনিতে বেশ পছন্দও করতো। ঢাকার স্কুলে পিটি টিচাররা তেমন প্রভাবশালী হয় না, কিন্তু রহমতউল্লাহ স্যার ছিলেন স্কুলের প্রথম সারির প্রভাবশালী শিক্ষক। পারিবারিকভাবে তিনি অভিজাত, মধ্যবিত্তের দ্বিধায় ভোগার রোগ তাই সম্ভবত তার ব্যক্তিত্বে ছিলো না। একজন পিটি শিক্ষক হিসেবে এমন কিছু নেই যা তিনি অর্জন করেন নি। সত্যি বলতে তার সময়ে তার মতো উদ্যমী মানুষ বলতে গেলে আমি আর একটিও দেখি নি।
এখন, এতকাল পর পথে স্যারকে দেখে আমি সালাম দিলাম।
“আসসালামুআলাইকুম স্যার!”
স্যার কাছে এসে সালামের জবাব দিয়ে বললেন, “ কীরে ব্যাটা, ভুইলা গেছস স্যাররে…”
“ না না স্যার, সেরকম কিছু…”
“ আরে রাখ ব্যাটা, তোরা ভুলবি, এইটাই তো নিত্য ব্যাপার। কেমন আছিস বল, দেইখা তো মনে হয় ম্যালা উপরে উঠসস।“
“ আরে না না স্যার, আপনার মতো পারি না এখনও…”
“ হুম, তোর তেল মারার স্বভাবটা যায় নাই এখনও। ভালো , ভালো স্বভাব, ভালো জায়গায় যাইতে হলে এই গুণের বিকল্প নাই। এখন কই আছস ক…”
“ আছি স্যার এক্সিম ব্যাংকে আপাতত, স্টার্টাপ দিবো চিন্তা করতেসি।“
“ ব্যবসা করবি ? “
“ জ্বী স্যার, ইচ্ছা আছে।“
“ ভালো, ব্যবসা না করলে টাকা গুনা যায় না হাতে। কিসের ব্যবসা করবি?”
“ ভাবতাসি স্যার বাগান করবো। আপাতত আমের করার শখ আছে। সামনে ফার্ম টাইপের করবো!”
স্যার বেশ প্রীত হলেন খবরটা জেনে। জমি লিজ নিবো নাকি কিনবো জানতে চাইলেন। কেনার টাকা এই মুহূর্তে হাতে নেই। তথ্যটা জেনে মনে হলো আরও খুশি হলেন। বললেন, “ একদিন বাসায় আয়, এই ব্যাপারটা নিয়া কথা বলি,
আমারও এমন একটা আইডিয়া আছে।“
আমি একটু অবাক হলাম, কিন্তু হ্যাঁ বলে দিলাম। শুনেছি চাপাইনবাবগঞ্জে স্যারের পারিবারিকসূত্রে পাওয়া বিস্তর জমি আছে। সে জমিতে কিছু করা গেলে মন্দ হবে না।
সেদিনের মতো বাড়ি ফিরে এলাম। আসার আগে স্যার আমার ক্রমশ ফুলে উঠতে থাকা ভুঁড়ি নিয়ে খোঁচা মারতে ছাড়লেন না। বললেন, “ শুধু ট্যাকা নিয়া ভাবিস না জাহিদ, এই ভুঁড়িটার দিকে নজর দে। শরীরটার একটু যত্ন আত্তি কর!“
আমি কাচুমাচু করে বললাম, “ বসা কাজ স্যার ব্যাংকে…”
স্যার একটু চটে গিয়ে বললেন, “ ঘরে ব্যায়াম করবি। নাকি ব্যায়াম যা শিখাইসি ভুইলা গেছস সব?”
আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম আবারও। মাথা নাড়ালাম, জানালাম ভুলি নি। এমন আহামরি কোনও ব্যায়াম অবশ্য নয়, সাধারণ কম্পাউন্ড ব্যায়ামগুলোই। আর কিছু স্ট্রেচিং, ফুটবল খেলতাম স্কুল টিমে, তাই এসবের দরকার ছিলো। এখন আর কী, ফুটবল তো খেলা দূরে থাক, দেখাই হয় না কতকাল! স্কুল্টিমের দু তিনজনের সঙ্গে যদিও এখনও ভালো বন্ধুত্ব আছে, তবে যোগাযোগটা কমে গেছে একেবারে। প্রায় সকলেই গত বছর তিনেকের ভেতর বিয়ে করেছে, কমাটাই স্বাভাবিক। আমার পরিচিতদের ভেতর শুধু আমারই বিয়ে করা হয় নি এখনও। অবশ্য, এটা নিয়ে কোনও চাপ নেই। আর, চাপ দেবার মতোও একমাত্র মা বাদে অন্য কেউ নেই, তিনিই নিয়ম করে মাসে এক দুবার মনে করান। আমি বিশেষ পাত্তা দেই না। তবে, মনে মনে ঠিক করেছি যে বাগানটা করতে পারলে বিয়েটা করে ফেলবো। আসলে বয়স তো ভালোই হয়েছে, বত্রিশ চলছে, সামনের ডিসেম্বরে তেত্রিশ হবে, এখন না হলে আর কখন! ছেলেমেয়ে ছোটছোট রেখে মরবার আমার ইচ্ছে নেই।
২
প্রায় মাসখানেক স্যারের বাড়ি যাওয়া হলো না। প্রথমে সময় হচ্ছিলো না, পরে যখন সময় হলো, তখন গেলাম ভুলে। হুট করে একদিন মনে পড়লো। স্যারের ফোন নাম্বারটা নেয়া হয় নি, নিয়ে নেয়াটা উচিত ছিলো। কল দিয়ে বাড়ি যাওয়া যেতো। এখন হয়তো যাবো, যেয়ে দেখবো তিনি ঘরেই নেই। তার দুনিয়া ঘুরে বেড়ানোর স্বভাব আছে। মনে হয় না পরিবর্তিত পরিস্থিতি সে স্বভাবে কোনও পরিবর্তন আনতে পেরেছে।
এক ছুটিরদিন বিকালে আমি স্যারের বাড়ি হাজির হলাম। দক্ষিণ গোরাণের পুরোনও ধরণের একটা বাড়ি, এই বাড়িতে আমি আগেও এসেছি। আমি ভালো সেন্টার ফরওয়ার্ড ছিলাম, সুযোগ পেলে গোল মিস করতাম না খুব একটা। স্কুলকে বেশ কয়েকটা আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট জিতিয়েছি। এই জন্য বোধহয় স্যার আমাকে বিশেষ পছন্দ করতেন। আমার দেখা মতে ফুটবল টিমের আর কাউকে তিনি তার বাড়িতে এতোবার আনেন নি। স্কাউটের ছেলেরা অবশ্য প্রতিনিয়তই আসতো। তাদের ব্যাপারটাই আলাদা ছিলো।
বেল বাজিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়ালাম। স্যারকে কী অযুহাত দেয়া যেতে পারে ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে গেলো, আমি সামনের মানুষটিকে দেখে তার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলাম। আমাকে দেখেও সামনের ব্যক্তিটির ঠোঁট দুটো সামান্য স্ফীত হলো। দুজনেই প্রায় এক সঙ্গে চোখ পিটপিট করলাম, জয়ী চোখ সরিয়ে নিলো, আমি নার্ভাস গলায় বললাম, “ তুমি!”
জয়ী কয়েক মুহূর্তে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলল, “ হঠাৎ এখানে?”
“ স্যার…স্যারের সাথে কথা ছিলো, আছে স্যার…”
“ আসতে বলসে?”
“ হ্যাঁ…”
“ আচ্ছা আমি ডেকে দেখছি…”
“ আ…আমি কি এখানেই দাঁড়ায় থাকবো?”
জয়ী দরজা লাগিয়ে দিতে যাচ্ছিলো, এক মুহূর্ত থেমে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ সরি, ভেতরে আসো।“
আমি ভেতরে ঢুকলাম। মার্বেলে বাঁধানো ঝকঝকে তকতকে ঘর,
বিলাসবহুল আসবাবে ভরপুর। বাইরে থেকে বাড়ির যে চিত্র দেখা যায় তার সাথে কোনও মিলই নেই ভেতরের। নতুন দেখলে যে কেউ অবাক হতো, কিন্তু আমি তো নতুন দেখছি না। আগেও বহুবার আসা হয়েছে। আসার সুবাদেই জয়ীর সঙ্গে পরিচয়। ও স্যারের ছোট ভাইয়ের মেয়ে, বেশ আদরের ভাতিজি। পরিচয় এবং বয়সের প্রভাবে ওর সঙ্গে আমার প্রেম প্রেম একটা সম্পর্ক হয়েছিলো স্বল্প সময়ের জন্য, কিন্তু প্রেম ঠিক হয়ে ওঠে নি। দীর্ঘদিন ওর সঙ্গে দেখা হয় নি। ও এখানে থেকে পড়তো, হুট করে চলে গেলো। পরে শুনেছিলাম বিয়ে হয়ে গেছে। অল্পবিস্তর কষ্ট লেগেছিলো, পরে কেটেও গেছিলো। এতোদিন পর আজ হুট করে ওকে দেখে তাই সামান্য ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছি। ও-ও খেলো দেখলাম, ব্যাপারটা ভেবে এখন হাসি পাচ্ছে!
খানিক পরেই স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে স্যার ড্রয়িং রুমে আমার সামনের একটা সোফায় এসে বসলেন। হালকা গলায় বললেন, “ তোরে দিয়া তো ব্যবসা হবে না, তুই তো আগেই আউট।“
আমি জিভে কামড় দিয়ে বললাম, “ স্যার কয়দিন অনেক চাপ গেলো অফিসে, আমি…”
তিনি আমাকে হাত নেড়ে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, “ হ, তোমার তিন নাম্বার হাতের খবর তো আমি জানিই। এখন কী কবি ক।“
“ আমি তো শুনতে আসছি স্যার, বলবেন তো আপনি…”
“ আমি বলবো?”
“ জ্বী স্যার, আপনার প্ল্যানটা…”
“ হ হ দাঁড়া…”, স্যার আমাকে থামিয়ে দিয়ে ভেতরে কারও উদ্দেশ্যে বিকট গলায় চিৎকার করে বললেন, “ এই , এইখানে ছেলেটা এতক্ষণ বসে আছে, কোনও নাস্তা পানি দাও নাই কেন!”
আমি একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “ আপনের বাড়ির নিয়মনীতি আর আগে মতো নাই স্যার। এতক্ষণ বসলাম, কেউ কিছু দিলো না…”
“ আরে হাভাত, বাড়িতে আইসা পারলি না খাই খাই শুরু করছস! এই এদিকে নাস্তা লাগাও জলদি…”
আমি হাসলাম। ফাঁকে স্যারের আলাপ শুনলাম। কোথায় কোথায় ঘুরেছেন, কী কী অর্জন করেছেন নতুন। শেষে বাগানের কথায় আসলেন। জানলাম, চাপাইনবাবগঞ্জে আসলেই তার জায়গা আছে, কিন্তু সেটা পতিত জমি। জঙ্গল হয়ে আছে, প্রত্যন্ত এলাকা। বিদ্যুৎ নেই, বিদ্যুৎ চালিত কিছু চালাতে হলে ট্রান্সফর্মারে চালাতে হবে। কিন্তু তারপরেও, জমির পরিমাণ আশাতীত হওয়ায় আমি রাজি হয়ে গেলাম। স্যার জানালেন তার বাগানের শখ নেই, কিন্তু গরুর খামার করার শখ আছে। আমি প্রস্তাব দিলাম, সাথে মহিষ পালা যেতে পারে, কিন্তু তিনি মহিষে তেমন আগ্রহী হলেন না। টাকা পয়সার কথা ওঠার আগেই কাজের মেয়েটি ট্রেতে করে বাটি ভর্তি ধোঁয়া ওঠা গরম হালিম নিয়ে এলো। দেখলাম একটা বাটিই। স্যার বাটির দিকে ইশারা করে বললেন, “ খা তুই, আমার বয়স হইয়া গেসে। আর হার্ট নিতে পারে না।“
হালিমটা চমৎকার। মুখে লেগে থাকার মত। কিন্তু আমার মনটা তবুও ভরলো না। খানিকটা যেন হতাশও হলাম। ভেবেছিলাম খাবার দিতে জয়ী আসবে। স্যারের বাসায় যে কাজের লোক আছে সে কথা আমি ভুলে গেছিলাম। জয়ীর প্রেমে আমি হাবুডুবু খাচ্ছি এমন নয়, কিন্তু আজ এতোদিন পরে দেখলাম, তখন ভালো করে তাকাইওনি, তাই দেখার ইচ্ছে হচ্ছিলো। যাক, সব ইচ্ছে পূরণ হবে এমন তো কোনও কথা নেই!
সেদিনকার মত কথাবার্তা একরকম শেষ হয়ে গেলো। স্যার বললেন, জমি তিনি দিচ্ছেন, কিন্তু বাকি সব কিছুর পয়সা আমাকে দিতে হবে। আমি বললাম, জমিটা আগে দেখে আসি, কেমন অবস্থা, পরিষ্কারে কেমন টাকা-শ্রম যাবে। স্যার রাজি হলেন।
৩
“ হ্যাঁ, ঐ যে, রহমতউল্লাহ স্যার… হ্যাঁ…হ্যাঁ , ফুটবলের স্যারই, রাজি হইসে ইনভেস্ট করতে। “
“ আবার ফাঁসায় দিবে না তো কোনওভাবে…”
“ আরে না না আম্মা, কী বলতেসো, আর আমি তো দেইখা শুইনাই আগাবো।“
“ ঠিক আছে। তাইলে আব্বা, এইবার দেইখা শুইনা একটু সংসারের দিকেও আগা, একটা বিয়া কর…”
“ আরে! বিয়া তো একটাই করবো আম্মা!”
“ কবে করবি বাপ, বয়সও বাইড়া যাইতাসে, আর কয়দিন পরে মাথা খালি হওয়া শুরু করবো, তখন মেয়ে কে দিবো…”
“ আরে কী সব বলতাসো আম্মা, ধুরু!”
“ শুন তোর বাপে বিয়া করসিলো বেশি বয়সে…”
“ আরে ধুর, আমি রাখলাম আম্মা, তুমি ওষুধপত্র খাইয়ো ঠিক ঠাক মতো।“
আমি ফোন রেখে দিলাম। মা এতো আচানক কথা বলে! কিন্তু বয়সটা তো আসলে সত্যিই বাড়ছে। কপালটা প্রতি বছর বড় হচ্ছে, অবশ্যই সেটা আকারে, সৌভাগ্যে না। আমার বাবা টাক ছিলেন যতদূর মনে পড়ে। চাচা-মামাদের ভেতরেও টাকের নজির একেবারে কম না। আমার বয়সী অনেক কাজিন ভাইদের ইতোমধ্যে টাক পড়েও গেছে। সামান্য চুল মানুষের চেহারাকে কতো বদলাতে পারে সেটা তাদের দেখে দেখে আমি বুঝেছি। বিয়েটা আসলে করে ফেলা দরকার। আমার বাবা অনেক বয়সে এসে মাকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি মানুষ বেশ ভালো ছিলেন, কিন্তু মায়ের সঙ্গে তার মতামতে তেমন মিলতো না। সময় ভিন্ন ছিলো বলে তাদের টিকেছিলো, বেশিরভাগ চিৎকারচেঁচামেচিতে মা নিজে থেকে পিছিয়ে আসতো। আমি আমার জীবনে এই ধরণের সংসার জীবন চাই না। বাগানের ব্যাপারটা হয়ে গেলেই মেয়ে দেখা শুরু করবো, দেখি।
গত মাসে দুদিনের জন্য যেয়ে জায়গাটা দেখে এসেছি। ভয়াবহ অবস্থা, পরিষ্কার করতে জান বেরোবে। লোক লাগাতে হবে কিন্তু কেউ ওদিকেটায় কাজ করতে যেতে চায় না, জায়গা নাকি ভালো না। সাপ দেখলাম বেশ কিছু, কিন্তু ঢোড়া, বিষাক্ত সাপ চোখে পড়ে নি। মশা খুব। জমির মাঝামাঝি দিকে একটা আধমজাপুকুর আছে, লতায় পাতায় পঁচে পঁচে তার পানির গন্ধ নাকে নেয়া দায়। সম্ভবত ওটার জন্যই মশার এমন বাড় বাড়ন্ত অবস্থা।
জমির একপাশে অনেকগুলো শেয়াল থাকে। উজ্জ্বল বাদামী গায়ের পশম, দেখতে এতো সুন্দর, কিন্তু স্বভাবে খুবই দুষ্ট। এদের জন্য কটা কুকুর পালতে হবে, নাহলে আমার হাঁসমুরগি ছাগল সব ধরে ধরে নিয়ে যাবে।
এছাড়া মাটি পরীক্ষা করিয়েছি, খারাপ না, ভালোই। বাগান হবে, সমস্যা নেই। কিন্তু সব গোছাতে সময় লাগবে মাস চারেকের মতো। অফিসটা ছেড়ে দেয়া গেলে পুরোপুরি মনোনিবেশ করা যেতো, কিন্তু এতো আগেই চাকরিশূন্য হওয়ার সাহস হচ্ছে না। রহমতউল্লাহ স্যারকে ফোনে বলেছি, তিনি শুনে বললেন কাগজপত্র নিয়ে যেতে বাসায়। প্রেজেন্টেশন একটা খসড়া রেডি করেছি, স্যারের ইমেইলে মেইল করে দিয়েছি, এখন পুরো করে একদিন স্যারকে কাজগুলো গুছিয়ে বলবো দেখি। ভেবেছিলাম এই শুক্রবার যাবো, কিন্তু হাতে এতো কাজ, সময়ই করে উঠতে পারছি না।
সত্যিই সে সপ্তাহে আর যাওয়া হলো না, পরের শুক্রবারে গেলাম। স্যারকে কল দিয়েই এসেছি, কিন্তু এসে শুনলাম স্যার বাড়ি নেই। ফোন দেয়ার পরে বললেন, উত্তরা গেছেন, গাড়িতে আছেন, ফিরছেন, বসতে বাসায়। আমি বসলাম, এমনিতেও আজ কোনও কাজ নেই। অপেক্ষা করায় সমস্যা নেই, কিন্তু তবুও কিছুক্ষণ বসে থাকার পরে অস্থির হয়ে গেলাম। বসে থাকা আমার স্বভাবে নেই। এজন্যই বোধহয় চাকরি ছেড়ে কৃষক হবার চেষ্টায় আছি। দিয়ে যাওয়া চায়ের কাপ আর নাস্তার প্লেট খালি হয়ে গেছে। স্যারের বাসার ছাদটা সুন্দর। ছাত্রাবস্থায় এই বাসার ছাদে কখনও উঠি নি, কদিন আগে প্রথম উঠলাম। বাসার মতো ছাদটা ঝকঝকে না, কেমন পুরোনও একটা ভাব আছে। এই বাড়ির পেছনের দিকে ছোট উঠোনের মতো একটা জায়গা আছে। স্কুলে পড়বার সময় দেখেছি স্যার জায়গাটাকে শরীরচর্চার জন্য ব্যবহার করেন। সেদিন দেখলাম লোহার বারগুলো খুলে ফেলা হয়েছে ব্যায়ামের, ওগুলো একপাশে পড়ে আছে। পুরো জায়গাটায় ফুলের বাগান করা হয়েছে, সেখানে ফুটে রয়েছে নানা ধাঁচের ফুল। ওপর থেকে দৃশ্যটা দেখতে মন্দ লাগে না।
আমি স্যারকে কল দিলাম আবার। সালাম বিনিময় করে বললাম, “ স্যার আসবেন কখন?”
“ আসতেসি, তোর তাড়া আছে নাকি?”
“ না স্যার, কিন্তু…”
“ চাকরি করো ব্যাংকে আর আমার বাসায় দুই মিনিট বইসাই ঝিমাইতাসো... শোন, আমার ভাস্তি বাগান করসে, বাগানে হাঁট, শরীর ভালো থাকবো। আমি আসতেসি…”
স্যার ফোন কেটে দিলেন। আমি হতাশ হয়ে আরও কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসার ঘরে পড়ে রইলাম, শেষে আর না পেরে উঠে নিচের বারান্দা হয়ে বাগানের দিকে এগোলাম। বারান্দা থেকে উঠানে নামবার সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত এসে আমাকে দাঁড়িয়ে যেতে হলো। ভেতরে জয়ী হাঁটাহাটি করছে। আমার ইতস্তত বোধ করবার মত কিছু থাকা উচিত না, কিন্তু তবুও বেশ অস্বস্তি অনুভব করলাম। ফিরে যাবো নাকি ভাবছি এমন সময় চোখাচোখি হয়ে গেলো। অগত্যা ফেরা হলো না, আমি ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে বললাম, “ বাগান…বাগানটা সুন্দর।“
জয়ী কিছু বলল না, মুখ ঘুরিয়ে অচেনা একটা ফুল গাছের দিকে তাকালো। দীর্ঘক্ষণ কেউ কোনও কথা বলল না, শেষে নীরবতা বুকে এসে ঠোকর মারা শুরু করলে আমি নিজেই হালকা গলায় বললাম, “ স্যারের কখনও ফুলের বাগানে ইন্টারেস্ট হবে ভাবি নাই!”
জয়ী আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ভ্রূ কুঁচকাল, গম্ভীর গলায় বলল, “ এটা স্যারের বাগান কে বলসে?”
আমি মাথা দুলিয়ে বললাম, “ ও! আচ্ছা! এটা স্যার করে নাই!”
জয়ী হালকা করে মাথা দোলালো, আমি নার্ভাস গলায় বললাম, “ তু…তুমি করলা?”
“ হ্যাঁ।“
“ সুন্দর!”
“থ্যাংকিউ।“
আবার অখণ্ড নীরবতা এসে বাগানটাকে ঘিরে ফেলে কী না, তার আশঙ্কায় আমি আগেই বলে উঠলাম, “ তোর… তোমার সাথে কথাই হয় নাই। কেমন আছো...?”
জয়ী অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলো, বলল, “ ভালো। তোর কী খবর?”
“ ভালো, এইতো, ভালোই!”
“ ভালো।“
আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললাম, “ তোর…তোর বাকি সবাই ভালো? ছেলেমেয়েদের দেখলাম না, ওরা…”
জয়ী কপাল কুঁচকে আমার দিকে তাকালো, আমি থেমে গেলাম। ও বলল, “ তোর এখনও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলার অভ্যাস যায় নাই, ঠিক কর এটা। আর, সবাই ভালো আছে। কাকাকে দেখিস না, এখনও কতো সুস্থ…”
আমি ভ্রূ কুঁচকালাম। জয়ী টবের পাশে রাখা একটা প্রাণআপের বোতল নিয়ে মুখ খুলতে খুলতে বলল, “ ভ্রূ বাঁকাচ্ছিস কেন, কী ভাবছিস মনে মনে?”
আমি লুকোলাম না, হালকা গলায় বললাম, “ সবার কথায় কেবল কাকার আলাপ দিলি, ভাবলাম বাকিরা ঠিক আছে কী না!”
জয়ী ঢকঢক করে প্রানআপ গিলে বলল, “ এতো বুদ্ধি খাটাস তুই সবসময় খোদা!”
আমি খোঁচাটা গায়ে মাখালাম না। বললাম, “ বুদ্ধি কমে যাচ্ছে, পার্টনার দরকার। তোর শ্বশুড়বাড়ির ঐদিকে মেয়ে টেয়ে থাকলে বল, সামনে তো টাকাও হবে…”
“শশুড়বাড়ি নাই।“
আমি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর বললাম, “ ডিভোর্স?”
জয়ী মাথা দোলালো। আমি ছোট করে জানতে চাইলাম, "কবে?"
“ হইসে বছর তিনেক। এখন জিগাইস না কেন ডিভোর্স হইসে।“
আমি চিন্তিত গলায় বললাম, “ বাচ্চা হয় না?”
ও ভ্রূ কুঁচকে বলল, “ তুই এখনও এতো ইনসেন্সিটিভ!”
আমি বললাম, “ দুঃখ করিস না, বাচ্চা ছাড়াও কতজন…”
“ আমার হাজব্যান্ডের সমস্যা ছিলো। “
আমি বিব্রত হয়ে থেমে যেয়ে বললাম, “ওহ! আমি মজা করতেসিলাম!”
জয়ী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে কী যেন বলল, সম্ভবত ‘প্যাট্রিয়ার্কি’ জাতীয় কিছু একটা। আমি একটু লজ্জা পেলাম। ও অন্য দিকে তাকিয়ে আছে, এতোদিনে প্রথমবারের মতো ভালো করে দেখছি। ও এতো সুন্দর! চুল গুলো একটু বড় করেছে আগের চাইতে, ওজনটাও একটু বেড়েছে। গায়ের চকোলেটের মতো রঙটা ওকে এতো মানাতো যে আমি আগে চোখ ফেরাতে পারতাম না। এমনিতে তো হতোই, কল্পনাতে ওকে দেখলে আমার মস্তিষ্কে অদ্ভুত, উত্তেজক, অজানা মন ভালো করা অনুভূতিরা এসে মৃদু তালে নাচতে শুরু করতো। এই মুহূর্তেও তাই করছে।
আচমকা ও আমার দিকে তাকালো, আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চোখ নামিয়ে ফেললাম।
বহুক্ষণ কেউ কথা বলল না। একটু পর স্যার চলে এলে আমি ফিরে এলাম বসার ঘরে, ও বাগানেই থেকে গেলো। সম্ভাব্য কাজের ধাপ বুঝে নিতে নিতে স্যার এক দুবার বললেন মন কোথায় আমার, সিনেমার নায়কের মতো আমার বলতে ইচ্ছে করলো, বাগানে। আমার মনটা স্যারের বাড়ির বাগানে পড়ে গেছে। তার বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটি আমার মনটাকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে।