Collected ঘর

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
422
Messages
6,701
Reaction score
4,372
Points
3,963
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
ঘর
মূল লেখকঃ মুস্তাকিম বিল্লাহ






আয়েশার উপর আমার রাগ জমে৷ তবে মায়ের কারণে রাগ করতে পারি না। মায়ের এক কথা আয়েশার সাথে উঁচু গলায় কথা বলা যাবে না৷ বুঝিয়ে বলতে হবে। কেন ও কি বাচ্চা? না আয়েশা বাচ্চা না। এবার পঁচিশ তম জন্মদিন ছিলো। তবে বাচ্চাদের কিছু স্বভাব ওর ভিতরে আছে৷ এই যেমন একটু চিৎকার করে কিছু বললে কেঁদেকুটে ঘর ভাসিয়ে ফেলবে৷ মা ছুটে আসবে, আয়েশাকে কি বলেছিস? আমি কি বলছি? এমন অল্পতে কাঁদলে তারে আর কি বলবো।

কেবল বাজার থেকে এসেছি। এখনই মনে পড়েছে বাসায় লবন নেই। লবন নেই সে কথা আগে বললে কি অসুবিধা হতো? আয়েশা হেসে বলে, ভুলে গেছি। তুমি মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করো, আমি মাকে লিস্ট দেখিয়েছি৷ দুজনেই ভুলে গেছি। এবার মায়ের উপরও রাগ উঠে।

এখন এই রোদের ভিতরে কে বাইরে যাবে? আমি আর যেতে পারবো না বলে দিলাম। মা আয়েশাকে উদ্দেশ্য করে বললো, আজকে আর রান্না করতে হবে না। দেখি দুপুরে কি খায়!

সব টুকু রাগ একপাশে রেখে বাসা থেকে বের হই। লবনের সাথে আর কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করি।

মফস্বল শহরে আমাদের একতলা বাড়ি, বাবা অবসরে যাওয়ার পরে এই বাড়িটাই শুধু করতে পেরেছেন। কিছু টাকা পায় প্রতি মাসে। আমি ছোটো একটা চাকরি করি। বাবা যে টাকা পায় সে টাকা ওষুধ কিনতেই খরচ হয়ে যায়।

রোদে হেঁটে হেঁটে জীবনের হিসাব করছি। আমাদের বাসার সামনে নলু মামার দোকান। নলু মামা আমার মায়ের দিকের আত্মীয়, মায়ের কেমন যেনো দুঃসম্পর্কের ভাই লাগেন। তাই মামা ডাকি।

নলু মামার দোকান থেকে একটা সিগারেট নিয়ে বাজারের দিকে যাই। অন্য সময় হলে এখন সিগারেট ধরাতাম না। এখন দুপুর, পথে তেমন কোনো লোক নেই। এই মুহুর্তে সিগারেট খেতে কেউ দেখবে না। শহরটা ছোটো, এখানে সবাই সবাইকে চিনে।

দুই প্যাকেট লবন কিনলাম, একটা ছোটো একটা বড়। লবন নিয়ে বাসার দিকে যাবো তখনই থেমে যাই। মনে হয় দক্ষিণের হাওয়া এসে গায়ে লাগছে। আমার ভাবনার জগৎ ছড়িয়ে যায়, ভাবনা যেনো একটা পাখি, সেই পাখিটা উড়ে।

তখন আমি সবে কলেজে উঠেছি। তেমন কাউকে চিনি না। যেহেতু আমি এই শহরে তখন নতুন। আমরা পুরাতন থানার পাশে একটা বাড়িতে ভাড়া থাকি, তখন বাবা জমি কিনেনি, বাড়ি করেনি।

একটা তিনতলা বাড়ি, বাড়িটার দোতলায় আমরা থাকতাম। পাশের ফ্ল্যাটেই থাকতো নীতুরা। নীতু তখন ক্লাস টেনে পড়ে।

যেহেতু আমি ছাত্র হিসেবে অনেক ভালো ছিলাম নীতুকে পড়ানোর দায়িত্ব আসে আমার উপর। নীতুকে পড়াতে যেতাম। দুইমাস পড়াই। এরপরে আমার অসুখ হয়, ভয়ংকর এক অসুখ। নীতুকে আর পড়ানো হয়নি।

নীতু আমাদের বাসায় আসতো। তখন আমার কলেজে ফাইনাল পরীক্ষা চলে, আমার আবার সেই আগের অসুখটা দেখা গেলো। রাত হলেই জ্বর সাথে খিঁচুনি। দুটো পরীক্ষা দিতে পারিনি। নীতু তখন প্রতিদিন আমাদেন বাসায় আসতো।

একদিন আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরছি। কেবল সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। বাসায় ফিরতে যেয়ে ভিজে গেছি কিছুটা। নীতু কোথা থেকে এসে হাতে একটা কাগজ দিয়ে দৌড় দেয়। যেনো বাতাসে হারিয়ে গেলো।

জীবনে প্রথমবার আমি প্রেমের চিঠি পাই কোনো মেয়ের থেকে। নীতুকে কখনো এমন চোখে আমি দেখিনি। প্রতিবেশী হিসেবে দেখেছি।

নীতু দেখতে সুন্দর। এমন মেয়ের থেকে চিঠি পেয়ে সব ছেলেরই ভালো লাগবে। আমি তার ব্যাতিক্রম না। তবে আমার যে ভালো লাগে কখনো নীতুকে প্রকাশ করতে দিতাম না।

নীতু আমাকে চিঠি দিতো। সবমিলিয়ে একুশটা চিঠি দিয়েছে। নীতুকে আমিও চিঠি লেখা শুরু করি। সবার চোখের আড়ালে নীতুর কোচিং শেষে নদীর ঘাটে যাই, লোডশেডিং সময়ে দুজনে ছাদে যেয়ে গল্প করি। সেবার লোডশেডিং রাতে নীতু প্রথমবার আমার কপালে চুমু খায়, অবশ্য কপাল সরিয়ে নেওয়ায় চুলের উপরে পড়ে। এরপর নীতু এক সপ্তাহ আমার সামনে আসেনি। জিজ্ঞেস করলে, নিচু হয়ে বলে লজ্জায় আসেনি।

আমি কলেজ থেকে পাশ করবার পরে ঢাকা যাই। নীতুর সাথে দেখা হতো না। এর ভিতরে বাবারও বদলি হয়ে যায়। ভার্সিটি ছুটি দিলে বাবা মায়ের কাছে যেতাম এই শহরে যেহেতু কেউ থাকে না তাই আসা হয়নি। নীতুর সাথে আমার যোগাযোগ হতো।

সেবার কি মনে করে নীতুদের বাড়ির সামনেই নামলাম। রাতে কোনো বাস ছিলো না, নীতুর সাথে দেখা করে এক বন্ধুর বাড়িতে থাকি।

নীতুও শহরে আসে। মেডিকেলের জন্যে প্রস্তুতি নেয়। ভর্তির সুযোগ পেয়ে যায়। নীতুর সাথে দেখা হতো। দূরের আপন মানুষ নিকটে চলে আসে। কি যে খুশি হলাম। জানতাম না সব খুশি একদিন দুঃখের কারণ হয়ে যাবে। প্রতি সন্ধ্যায় আলী মামার চায়ের দোকানে, রাতে রিক্সা আর বৃষ্টিতে একসাথে ভিজে হলে আসা। আমাদের হলের এড়িয়াতে মেয়েদের যাওয়া নিষেধ ছিলো, সেবার আমার জ্বর। সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নীতু আসে। সিনিয়রদের কাছে অনেক কথা শুনতে হয়েছে যার কারণে।

সেই নীতুকে দেখলাম আজ সাত বছর পরে। তখন শীতকাল। নীতু ছুটিতে বাড়িতে যাবে। আমি বাসে তুলে দিলাম। বাসের জানালা দিয়ে আমারে তাকিয়ে দেখলো। নীতু ফিরলো আটদিন পরে। ঢাকাতে ফিরে আমাকে জানায়নি, নীতু লুকিয়ে থাকতো আমার থেকে। কিছুদিন পরে নীতুর একটা চিঠি পাই। চিঠিতে লেখা ছিলো, আমি যেনো আর কখনো দেখা না করি। নীতুর বিয়ে হয়ে গেছে, সবকিছুই হুট করে। ছেলে ডাক্তার। নীতুর বাবার কলিগের ছেলে৷

এরপর নীতুর সাথে আর কখনো দেখা হয়নি। কতোগুলো বছর চলে গেছে। প্রিয় মুখটাকে দেখিনি। নীতু অনেক বদলে গেছে।

নীতু আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। নীতু জিজ্ঞেস করে কেমন আছো? আমি হেসে বলি ভালোই।

নীতু দেশের বাইরে ছিলো, গত সপ্তাহে বাবার বাসায় এসেছে। নীতুর বাবার ওষুধ নিতেই এই দুপুরে বাসা থেকে বের হয়েছে।

আমাদের দুই বাড়ি পরেই নীতুদের বাড়ি। আমরা দুজনে পাশাপাশি হাঁটি। একদিন এই পথ হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে চাইতাম যেনো পথটা শেষ না হয়, আমাদের অনেক কথা ছিলো। কথা শেষ হবার আগে নীতুদের বাড়ি পর্যন্ত এসে যেতাম। এতো তাড়াতাড়ি কেন পথ শেষ হয়?

অথচ নীতু আর আমি আজকে পাশাপাশি হাঁটছি আমরা দুজনেই চুপচাপ। আমাদের কোনো কথা নাই। নীতুদের বাড়ির কাছাকাছি এসে যাই। নীতু বলে, তবে একদিন বাসায় এসো। বাবার সাথে দেখা করা যাবে। বিয়ে করেছো? আমি বলি হ্যাঁ। নীতু জিজ্ঞেস করে কি নাম? আমি বলি, আয়েশা।

নীতু হেসে বলে সুন্দর নাম। আমার অনেক কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে তবে কিছুই বলি না। হেসে বলি, আয়েশা রান্না বসাবে, বাসায় লবন নেই। লবন নিয়ে তাড়াতাড়ি যেতে হবে আসি তবে।

বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকি। বাসায় ফিরতেই আয়েশা ছুটে আসে, লবন নেয় হাত থেকে। আয়েশাকে বলি তুমি একটু বসবে? রান্না পরে বসাবে না হয়। আয়েশা বলে, কি হয়েছে তোমার? এমন লাগছে কেন? বেশি গরম লাগছে? তুমি বসো লেবুর শরবত নিয়ে আসি। আমি আয়েশার হাত ধরে বলি, তুমি একটু পাশে বসো কিছুই লাগবে না। আয়েশা পাশে বসে, মাথায় হাত রাখে, শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে দেয়। না আয়েশা মেয়েটা চমৎকার, একটু বাচ্চাদের মতো স্বভাব অবশ্য আছে তবে আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। আমি ফিসফিস করে বলি, আয়েশা তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। আয়েশা আমার কথা শুনে লজ্জা পায়, মুচকি হাসে, আশেপাশে তাকিয়ে দেখে কেউ আবার শুনে ফেললো কিনা।

নীতুকে হারানোর পরে আমি সেবার সেমিস্টার ফাইনাল দেইনি।ভার্সিটিতে আমার শিমুল নামের এক বড় ভাই ছিলো। ভাই আমার সাথে দেখা করলেন, অনেক কথা বললেন,সেদিনের একটা কথা এখন ভীষণ করে মনে পড়ছে। শিমুল ভাই কথায় কথায় বলেন, শোন কেউ তোরে ছুড়ে ফেলছে আবার দেখবি কেউ গভীর যত্নে তোরেই বুকে টেনে নিবে। শিমুল ভাইয়ের কথা তখন বিরক্ত লেগেছে, এখন মনে হচ্ছে শিমুল ভাই সত্যি বলেছেন। আয়েশা রান্নাঘরে, চুলায় তরকারি বসিয়েছে, আমি রান্নাঘরে যেয়ে আশেপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলি, আয়েশা ভালোবাসি। আয়েশা হাসে,লজ্জা পায়। মেয়েটার হাসি সুন্দর। রান্নাঘরে যখন গরমে ওর মুখে ঘাম জমে তখন অদ্ভুত সুন্দর লাগে। আয়েশাকে কখনো কথাটা বলা হয়নি। আজকে একটা চিঠি লিখলে কেমন হয়? আয়েশাকে একটা প্রেমের চিঠি লিখবো। যেখানে ওর সৌন্দর্যের গুণগান থাকবে, ওর বোকামি নিয়ে অভিমান থাকবে, থাকবে দরকারী দুটো শব্দ। লিখে দিবো, আয়েশা চিঠিতে অনেক কথা লিখেছি তবে তরকারিতে যেমন লবন দরকারী তেমনি এই চিঠিতে একটা লাইন খুব দরকারী তা হলো, ‘আয়েশা তোমাকে ভালোবাসি’। তারপরই চিঠি শেষ। আয়েশা হয়তো সারাজীবন চিঠিটা যত্ন করে রাখবে।
 
Back
Top