Collected গাভী বিত্তান্ত - আহমদ ছফা

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
423
Messages
6,710
Reaction score
4,398
Points
3,963
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
গাভী বিত্তান্ত


আহমেদ ছফা






পর্ব - ১


আবু জুনায়েদের উপাচার্য পদে নিয়োগপ্রাপ্তির ঘটনাটি প্রমাণ করে দিল আমাদের এই যুগেও আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ফ্যাকাল্টির সদস্যবৃন্দ আবু জুনায়েদের উপাচার্যের সিংহাসনে আরোহণের ব্যাপারটিকে নতুন বছরের সবচাইতে বড় মজার কাণ্ড বলে ব্যাখ্যা করলেন। আবু জুনায়েদ স্বয়ং বিস্মিত হয়েছেন সবচাইতে বেশি। আবু জুনায়েদের বেগম নুরুন্নাহার বানু খবরটি শোনার পর থেকে আণ্ডাপাড়া মুরগির মতো চিৎকার করতে থাকলেন। তিনি সকলের কাছে বলে বেড়াতে লাগলেন যে তার ভাগ্যেই আবু জুনায়েদ এমন এক লাফে অত উঁচু জায়গায় উঠতে পারলেন । কিছু মানুষ অভিনন্দন জানাতে আবু জুনায়েদের বাড়িতে এসেছিলেন। নুরুন্নাহার বানু তাদের প্রায় প্রতিজনের কাছে তার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর থেকে কী করে একের পর এক আবু জুনায়েদের ভাগ্যের দুয়ার খুলে যাচ্ছে সে কথা পাঁচকাহন করে বলেছেন । অমন ভাগ্যবতী বেগমের স্বামী না হলে, একদম বিনা দেন-দরবারে দেশের সবচাইতে প্রাচীন, সবচাইতে সম্ভ্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদটি কী করে আবু জুনায়েদের ভাগ্যে ঝরে পড়তে পারে। যারা গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই মুখে কিছু না বললেও মনে মনে মেনে নিতে দ্বিধা করেননি যে একমাত্র স্ত্রী ভাগ্যেই এরকম অঘটন ঘটতে পারে।
শিক্ষক হিসেবে আবু জুনায়েদ ছিলেন গোবেচারা ধরনের মানুষ। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ডিপার্টমেন্টে বা ডিপার্টমেন্টের বাইরে তার সঙ্গে কারো বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল না। আর আবু জুনায়েদ স্বভাবের দিক দিয়ে এত নিরীহ ছিলেন যে তার সঙ্গে শত্রুতা করলে অনেকে মনে করতেন, শত্রুতা করার ক্ষমতাটির বাজে খরচ করা হবে। তাই গোটা বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় তার বন্ধু বা শত্রু কেউ ছিলেন না।

আমাদের দেশের সবচাইতে প্রাচীন এবং সবচাইতে সম্ভ্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি হাল আমলে এমন এক রণচণ্ডী চেহারা নিয়েছে। এখানে ধন প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা মোটেই নিরাপদ নয়। এখানে যখন তখন মিছিলের গর্জন কানে ঝিম ধরিয়ে দেয়। দুই দলের বন্দুক যুদ্ধে যদি পুলিশ এসে পড়ে সেটা তখন তিন দলের বন্দুক যুদ্ধে পরিণত হয়। কোমলমতি বালকেরা যেভাবে চীনা কুড়াল দিয়ে অবলীলায় তাদের বন্ধুদের শরীর থেকে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে, সেই দক্ষতা ঠাটারি বাজারের পেশাদার কশাইদেরও আয়ত্ত করতে অনেক সময় লাগবে। এখানে যত্রতত্র সে সকল বিস্ময় বালকের সাক্ষাৎ মিলবে যারা কিমিয়া শাস্ত্রের গোপন রহস্য জানার মতো করে সেই চমৎকার রোমাঞ্চকর তথ্যটি জেনে ফেলেছে। রিভলবারের ট্রিগারে একবার চাপ দিলে একটি গুলি বেরিয়ে আসে, সে-একটিমাত্র গুলি একজন মানুষের বুকে আঘাত করে সে মানুষটিকে জগৎ থেকে পত্রপাঠ বিদায় নিতে হয়। উপন্যাস রচনা করা কিংবা উচ্চাঙ্গের ট্র্যাজেডি লেখার চাইতে অনেক সুন্দর এবং কঠিন এই কর্ম। একবার দক্ষতা অর্জন করতে পারলে কাজটি কিন্তু অতি সহজে নিষ্পন্ন করা সম্ভব। সকলের দৃষ্টির অজান্তে এখানে একের অধিক হনন কারখানা বসেছে, কারা এন্তেজাম করে বসিয়েছেন সকলে বিশদ জানে। কিন্তু কেউ প্রকাশ করে না। ফুটন্ত গোলাপের মতো তাজা টগবগে তরুণেরা শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পর হনন কারখানার ধারেকাছে বাস করতে করতে নিজেরাই বুঝতে পারেন না কখন যে তারা হনন কারখানার কারিগরদের ইয়ার দোস্তে পরিণত হয়েছেন। তাই জাতির বিবেক বলে কথিত মহান শিক্ষকদের কারো কারো মুখমণ্ডলের জলছবিতে খুনি খুনি ভাবটা যদি জেগে থাকে তাতে আঁতকে ওঠার কোনো কারণ নেই। এটা পরিবেশের প্রভাব। তুখোড় শীতের সময় সুঠাম শরীরের অধিকারী মানুষের হাত-পাগুলোও তো ফেটে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কোনো কাজ অত সহজে হওয়ার কথা নয়। সহজে ভর্তি হওয়ার উপায় নেই, সহজে পাস করে ছাত্ররা বেরিয়ে যাবে সে পথ একরকম বন্ধ। এখানকার জীবনপ্রবাহের প্রক্রিয়াটাই অত্যন্ত জটিল। এই জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে তরুণ-তরুণীর হৃদয়াবেগ পর্যন্ত টকে যাওয়া দুধের মতো ফেটে যায়। একজন তরুণ শিক্ষককে কোনো ছাত্রাবাসের আবাসিক শিক্ষকের রদ্দি মার্কা কাজটি পেতেও জুতোর সুখতলা ক্ষয় করে ফেলতে হয়। কোনো শিক্ষক যখন অবসর নেন, তার বাসাটি দখল করার জন্য শিক্ষকদের মধ্যে যেভাবে চেষ্টা তদবির চলতে থাকে, কে কাকে ল্যাঙ মেরে আগে তালা খুলবে, সেটাও একটা গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পারে। পরীক্ষার খাতা দেখার বেলায়, কে কার চাইতে বেশি খাতা হাতিয়ে নিয়েছে তা নিয়ে যে উত্তাপ, যে ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলতে থাকে তা একটা স্থায়ী অসুখ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা যুদ্ধে নাহি দেগা সূচাগ্র মেদিনী’ এটা একটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ বিনা প্রয়াসে বলতে গেলে একরকম স্বপ্ন দেখতে দেখতে উপাচার্যের আসনটি দখল করে বসবেন, সেই ঘটনাটি সকলকে বিস্ময়াবিষ্ট করে ছেড়েছে। আবু জুনায়েদের স্ত্রী নুরুন্নাহার বানুর কাহিনীটিকে সঠিক বলে মেনে নিলে মাথা ঘামানোর বিশেষ প্রয়োজন পড়ে না। ধরে নিলাম সতীর ভাগ্যে পতির জয় হয়েছে। তারপরেও ভাগ্যচক্রের হাতিটি কোন পথ দিয়ে আৰু জুনায়েদকে পিঠে করে বয়ে এনে এই অত্যুচ্চ আসনে বসালো তার একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানো প্রয়োজন। তা নইলে নবীর মেরাজ গমন, যীশুর স্বর্গারোহণের মতো আবু জুনায়েদের ব্যাপারটি একটি অলৌকিক কাণ্ড বলে মেনে নিতে হবে।


শুরুতে আবু জুনায়েদের দুয়েকটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছি। কিন্তু ও থেকে আবু জুনায়েদ মানুষটি সম্বন্ধে কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত গঠন করা সহজ হবে না। পৃথিবীতে নিরীহ মানুষের সংখ্যাই অধিক। এমনকি আমাদের এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতেও তারা এখনো বিরল প্রজাতির প্রাণীতে পরিণত হয়ে যাননি। তত্ত্ব-তালাশ করলে আরো দু-পাঁচজন এমন মানুষের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব হবে না। এই নিরীহ মানুষেরা এখনো পর্যন্ত কী করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে কোনোরকম বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া টিকে আছেন, সেটা কম আশ্চর্যের ব্যাপার নয়।

আবু জুনায়েদের দৈনন্দিন জীবনের ছকটা চলুন পর্যালোচনা করে দেখি। তিনি খুব সকালে বেলা পাঁচটার দিকে ঘুম থেকে উঠেই এক চক্কর হেঁটে আসেন। প্রাতভ্রমণ সেরে আসার পর গোসল করতে বাথরুমে ঢুকতেন। মেজাজ ভালো থাকলে কোনো কোনোদিন ফজরের নামাজটা পড়ে ফেলতেন। এমনিতে আবু জুনায়েদ নামাজি বান্দা ছিলেন না। তবে তার একটা ধারণা গজিয়ে গিয়েছিল সকালবেলার নামাজ দিয়ে শুরু করলে সারাটা দিন নির্ঝঞ্ঝাট কাটে। সব দিন এই নামাজ পড়ার নিয়মটা রক্ষা করতে পারতেন না। তাকে নামাজের বিছানায় দেখলে বেগম নুরুন্নাহার বানু বেজায় রকম ক্ষেপে যেতেন। ইদানীং নুরুন্নাহার বানুর মনে একটা সন্দেহের রেখা উঁকিঝুঁকি মারতে আরম্ভ করেছে। আবু জুনায়েদ যে ডিপার্টমেন্টটির শিক্ষক সেখানে বেশ কয়েকজন মহিলা শিক্ষিকা কাজ করেন। তাদের মধ্যে বেশ কজন সুন্দরী। এই সুন্দরীদের একজন আবার অবিবাহিতা। তাকে নিয়ে সব সময় নতুন নতুন গুজব রটতে থাকে। নুরুন্নাহার বানুর মনে একটি চাপা আশঙ্কা আছে। তার স্বামীটি ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না। এই রকম দুর্বল শিরদাঁড়াসম্পন্ন মানুষেরাই খুব সহজে ডাকিনিদের খপ্পড়ে পড়ে যায়। নুরুন্নাহার বানুর বয়স বাড়ছিল এবং তলপেটে থলথলে মেদ জমছিল। এটা একটুও অস্বাভাবিক নয়। এরই মধ্যে নুরুন্নাহার বানু বুড়িয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু জুনায়েদ দেখতে এখনো তরুণ। মাথার একগাছি চুলেও পাক ধরেনি। নুরুন্নাহার বানুর সঙ্গে সঙ্গে আবু জুনায়েদের শরীরে কেন বার্ধক্য আক্রমণ করছে না, এটাই ছিল নুরুন্নাহার বানুর অসন্তোষের একটা বড় কারণ। নুরুন্নাহার বানু মনে করতে আরম্ভ করছিলেন, আবু জুনায়েদ নিশ্চয়ই অন্য কারো সঙ্গে একটা গোপন সম্পর্ক তৈরি করেছে এবং সেটাই তার সতেজ সজীব থাকার একমাত্র কারণ। নিয়মিত নামাজি না হয়েও যে আবু জুনায়েদ মাঝে-মাঝে ফজরের নামাজ পড়তেন, দেখে নুরুন্নাহার বানু মনে করতেন, তিনি যে তাকে সন্দেহ করছেন ওটা কেমন করে টের পেয়ে গেছেন, তাই কখনো-সখনো নামাজের পাটিতে দাঁড়িয়ে তার কাছে প্রমাণ করতে চাইছেন, দেখো আমি নামাজ পড়ি এবং আমার মনে প্রবল ধর্মবোধ বর্তমান, সুতরাং অন্য স্ত্রীলোকের উপর আমি কোনো আসক্তি পোষণ করতে পারি নে। কিন্তু নুরুন্নাহার বানু মনে করতেন, আবু জুনায়েদ অন্য মেয়ে মানুষের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছেন সেটা গোপন করার জন্য মাঝে-মাঝে নামাজ পড়ে দেখিয়ে থাকেন। আসলে আবু জুনায়েদের এই লোক দেখানো নামাজ পড়া ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। তাছাড়া অনেকদিন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাস করে নুরুন্নাহার বানুর মনে একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে এখানে মেয়ে পুরুষ মাঠে ছেড়ে দেয়া গরু-মোষের মতো ঘুরে বেড়ায়, তাই যেকোনো সময়ে তারা যেকোনো কিছু করে ফেলতে পারে। সব মেয়েমানুষ কি আর নুরুন্নাহার বানুর মতো!

যা হোক, আবু জুনায়েদ গোসল সারার পর নামাজ পড়ন, না পড়ন, নাস্তা খেতে বসতেন। নাস্তার পর পত্রিকার পাতায় চোখ বুলোতেন এবং সম্পাদকীয়, উপ সম্পাদকীয় কলামগুলো ভালো করে পড়তেন। তারপর ধীরে-সুস্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। এ সময়ে কোনো উপলক্ষ নিয়ে নুরুন্নাহার বানু চটাচটি করলে তিনি মেজাজ খারাপ করতেন না। অ্যাটাচি কেসটা দুলিয়ে ডিপার্টমেন্টের দিকে হাঁটা দিতেন। ডিপার্টমেন্টে তিনি দেড়টা, কখনো কখনো দুটো অবধি কাটাতেন। বিভাগীয় মিটিং বা অন্য কোনো ব্যাপার থাকলে তাকে আরো দেরিতে ফিরতে হতো। আবু জুনায়েদ যেদিন দেরিতে ফিরতেন, নুরুন্নাহার বানুর মেজাজ খিঁচিয়ে থাকত। তিনি মনে করতেন, আজ তার স্বামী সে অবিবাহিতা শিক্ষিকার সঙ্গে লটর-ফটর কোনো একটা কাণ্ড করছেন, নইলে এত দেরি কেন?

ডিপার্টমেন্ট থেকে ফিরে অ্যাটাচি কেসটা টেবিলের উপর রাখতেন, জামা-কাপড় ছাড়তেন। তারপর খেতে বসতেন। যেদিন নুরুন্নাহার বানুর মেজাজ ভালো থাকত পাতে এটা সেটা তুলে দিতেন। পাশে বসে মাছি তাড়াতেন। মেজাজ খারাপ থাকলে রান্নাঘরে থালাবাসন, খুন্তি, হাঁড়ি নিয়ে প্রলয় কাণ্ড বাধিয়ে তুলতেন এবং আবু জুনায়েদের পেয়ারের মাদী বেড়ালটাকে ধরে আচ্ছা করে পেটাতেন। আবু জুনায়েদ ডানে বামে কোনো দিকে না তাকিয়ে খাবার গলাধঃকরণ করে যেতেন। খাওয়ার পর বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে হাতমুখ ধোয়ার পর শব্দ করে কুলি করে নিতেন। অবশেষে বিছানার উপর শরীরটা ছেড়ে দিয়ে বেলা পাঁচটা অবধি ঘুমোতেন।

পাঁচটার পর ঘুম থেকে উঠে তিনি আবার ডিপার্টমেন্টের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। ছাত্রছাত্রীদের টিউটোরিয়াল খাতা দেখতেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করতেন, অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের রিপোর্ট লিখতেন। এসব করতে করতে সন্ধ্যে নেমে আসত। অন্য শিক্ষকেরা এই সময়টিতে ক্লাবে গিয়ে কেউ কেউ টেনিস খেলতেন, কেউ কেউ দাবার সামনে বসে যেতেন। কেউ কেউ গোল হয়ে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলুদ, ডোরাকাটা, বেগুনি দলের নির্বাচন নিয়ে তর্ক জুড়ে দিতেন। কে কাকে ডিঙিয়ে প্রমোশন পেলেন, কার ছেলেমেয়ে বখে যাচ্ছে, কে আধারাতে বউকে ধরে পেটায়, চাকরাণী মেয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে গিয়ে আচ্ছা নাকাল হয়েছে কে, সরকারি দলে নাম লিখিয়ে কে গুলশানের প্লট বাগিয়ে নিল ইত্যাকার বিষয় ক্লাবে নিত্যদিন আলোচিত হতো। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদকে কেউ কখনো ক্লাবের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেখেননি। সন্ধ্যাটি যখন গহন হয়ে নামত জুনায়েদ সেই পুরনো ব্যাগটি নিয়ে হেঁটে হেঁটে বাজারে চলে যেতেন।

তরিতরকারি, মাছ, মাংসের দোকানে গেলে আবু জুনায়েদ নতুন মূর্তি ধারণ করতেন। ডিপার্টমেন্টে, বাড়িতে, বিশ্ববিদ্যালয় পাড়া সর্বত্র আবু জুনায়েদ মিনমিনে স্বভাবের লোক বলে পরিচিত ছিলেন। কাঁচা বাজারে পদার্পণ করামাত্রই কোত্থেকে একটা পৌরুষ এসে তার অস্তিত্বে ভর করত। লাল চোখ পাকিয়ে তরকারিঅলাকে ধমক দিতে একটুও ইতস্তত করতেন না। বলে বসতেন, মিয়া তোমার সাহস তো কম নয়, এই পচা পটলের কেজি চৌদ্দ টাকা দাবি করছ? তোমার জেল হওয়া উচিত। মাছঅলাকে বলে বসতে কসুর করতেন না, দেশে যদি আইন থাকত তোমার মতো মানুষকে বহু আগেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেত। কাঁটা পর্যন্ত পচে ভর্তা হয়ে গেছে, এমন মাছের চারগুণ দাম বেশি দাবি করছ। কশাইরা তো কশাই, ওদের সঙ্গে রাগারাগি করলে রাগের কোনো মূল্যই থাকে না, তাই আবু জুনায়েদ তাদের সম্পর্কে কোনো মন্তব্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতেন। তিনি মাংস বিক্রেতাদের ধারেকাছে যেতেন না, কারণ নুরুন্নাহার বানু মনে করতেন, আবু জুনায়েদের তাজা মাংস চিনে নেয়ার ক্ষমতা নেই। আবু জুনায়েদ রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক। রসায়নবিষয়ক গবেষণাটা তিনি কাঁচা বাজারেই চালাতেন। কাঁচা বাজারের প্রায় সমস্ত দোকানদার নিত্যদিনের ওই মহামান্য খদ্দেরটাকে চিনে নিয়েছিল। এই ভদ্রলোকের হাঁক-ডাক দরাদরির বহর এত প্রকাণ্ড ছিল যে যদি সম্ভব হতো সকলে মিলে এই আবু জুনায়েদের বাজারে প্রবেশ বন্ধ করে দিত। দোকানদারদের সে রকম কোনো আইন পাস করার ক্ষমতা থাকলে আবু জুনায়েদের বাজারে যাওয়া লাটে উঠত। পাক্কা তিনটি ঘণ্টা কাটিয়ে ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে তিনি বাড়িতে ফিরতেন। আসার সময় তিনি রিকশা চাপতেন। বাজারের ব্যাগ রান্নাঘরে রেখে বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ কোত-কোত শব্দ করে সারা শরীর থেকে কাঁচা বাজারের স্পর্শদোষ মুছে ফেলতে চেষ্টা করতেন।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে তিনি বাড়িতে কাঁচা পাজামা পাঞ্জাবী পরে একটু ফুরফুরে হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেন। টেলিভিশন খুলে বাংলা সংবাদটি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। সংবাদের পরে যখন নতুন কোনো প্রোগ্রামের দিকে দৃষ্টি যোগ করতে চেষ্টা করতেন, সেই সময়ে নুরুন্নাহার বানু কিল চড় দিতে দিতে কলেজ পড়ুয়া মেয়েটিকে খাতা বইসহ আবু জুনায়েদের সামনে বসিয়ে দিতেন। অগত্যা আবু জুনায়েদকে মেয়েটিকে ক্যালকুলাস এবং ইংরেজি ব্যাকরণের ট্যান্স, নাম্বার, জেন্ডার এসব শেখাতে হতো। রাতের খাবার খেতে কোনোদিন দশটা বেজে যেত। খাওয়ার পর তিনি চুক চুক করে এক গ্লাস দুধ পান করতেন। তারপর বাতি নিভিয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়তেন। এই সময়ে নুরুন্নাহার বানু বাসি পাউরুটির মতো থলথলে শরীরখানা মেলে ধরে তাকে উস্কে তোলার চেষ্টা করতেন। সব দিন তিনি সাড়া দিতে পারতেন না এবং পাশ ফিরে ঘুমোতেন। নুরুন্নাহার বানু মনে করতেন সেই ডিপার্টমেন্টের ছেনাল শিক্ষিকার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ইদানীং আবু জুনায়েদ শয্যায় তাকে উপেক্ষা করতে আরম্ভ করেছেন। আবু জুনায়েদ ঘুমিয়েই নাক ডাকতে শুরু করতেন। নুরুন্নাহার বানু ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসতে থাকতেন। আবু জুনায়েদের ঘুমটা গাঢ় হয়ে এলে ঠেলা দিয়ে তাকে জাগিয়ে দিয়ে গণ্ডারের মতো নাসিকা গর্জনের জন্য আধারাতে ঝগড়া লাগিয়ে এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করতেন। আবু জুনায়েদের শরীর লম্বা লম্বা কালো কালো লোমে ভর্তি ছিল। একবার তো ম্যাচকাঠি জ্বালিয়ে লোমের বনে আগুনই ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের এ সকল অসঙ্গতি এগুলো কাল্পনিক হোক বা বাস্তব হোক বেগম নুরুন্নাহার বানু এবং কাঁচা বাজারের দোকানদারেরা ছাড়া অন্য কারো দৃষ্টিতে বিশেষ ধরা পড়েনি। তবে তার বৃদ্ধ শ্বশুর তার বিষয়ে মনের ভেতর একটা চাপা ক্ষোভ পুষে রেখেছিলেন। তার পয়সায় আবু জুনায়েদ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। তিনি মনে করেন বিগত কয়েক বছর ধরে আবু জুনায়েদ যেভাবে কদমবুসি করেন, তাতে ভক্তি শ্রদ্ধার পরিমাণ যথেষ্টভাবে কমে এসেছে। কিন্তু একথা তিনি মুখ ফুটে কারো কাছে প্রকাশ করেননি। আবু জুনায়েদের দৈনন্দিন জীবনযাপন পদ্ধতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করে আমরা তার মধ্যে সামান্য পরিমাণ দোষও আবিষ্কার করতে পারিনি। নুরুন্নাহার বানুর মৌন সন্দেহটুকুকে ধর্তব্যের মধ্যে আনাও উচিত নয় মনে করি। তার সবটাই কাল্পনিক। মেয়ে মানুষ ঘরে বসে থাকলে এবং নিজেকে ক্লান্ত করার প্রচুর কাজ না থাকলে, মাথার উকুনের মতো মনের মধ্যে সন্দেহের উকুন বাসা বাঁধতে থাকে। তরকারিঅলা, মাছঅলা এদের মতামতের কী দাম। তারা তো অহরহ নিরীহ নাগরিকদের পকেট কাটছে।

এই পর্যায়ে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের একটি বিশেষ প্রবণতার দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করব। এটাকে দোষ বলব বা গুণ বলব এখনো স্থির করে উঠতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিছাটার সময় আবু জুনায়েদ সাভার, আমিন বাজার, জয়দেবপুর, মাওয়া শহরতলী এসকল অঞ্চলে জমির দালালদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন। অল্প পয়সায় অধিক জমি কোথায় পাওয়া যায় এবং কীভাবে কেনা যায় সে ধান্ধায় মত্ত হয়ে থাকতেন। জমি কেনার আকাঙ্ক্ষা তার মনে মগজে নেশার মতো প্রবেশ করেছিল। তার দৈনন্দিন জীবনযাপন পদ্ধতির মধ্যে ওই একটি বিষয় যেখানে তিনি কোনো শাসন বারণ মানতেন না। আবু জুনায়েদের মনে একটা পেশাগত অহংকার ছিল। সেটা চাপা থাকত। তবু তার যে সমস্ত সহকর্মী নানা প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক জরিপকারকের কাজ করে টাকা-পয়সা করে লাল হয়ে যাচ্ছেন, আবু জুনায়েদ তাদের সম্পর্কে নীচু ধারণা পোষণ করতেন। মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলার অভ্যাস নেই বলে এ-কথাটিও কাউকে বলা হয়নি। তার স্বভাবের মধ্যে পেশাগত অহংকারের সঙ্গে যোগ হয়েছিল একটা জেদ। আবু জুনায়েদ মনে করতেন, তার সহকর্মীরা অনৈতিক উপায়ের আশ্রয় গ্রহণ করে যে টাকা-পয়সা আয় করেন, তিনি সৎ ভাবে চেষ্টা করে অনেক বেশি টাকার মালিক হতে পারবেন। তিনি মনে করতেন, ওই জমিকে আশ্রয় করে একদিন তার ভাগ্য খুলে যাবে। নিশ্চয়ই কোথাও নামমাত্র মূল্যে তার জন্য প্রচুর পরিমাণ জমি অপেক্ষায় আছে। তার কাজ হলো খুঁজে বের করা। খুনোখুনি কিংবা অন্যরকম গণ্ডগোলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে আবু জুনায়েদ ভীষণ খুশি হয়ে উঠতেন। দালালদের নিয়ে তিনি দূর দূর অঞ্চলে জমির সন্ধানে পাড়ি জমাতেন। তার বাড়িতে নানা আকার নানা প্রকারের দালাল হরহামেশা লেগেই থাকত। তাদের কারো কারো পায়ে রবারের পাম্প সু, মুখে গুছি দাড়ি। কেউ ছাতাটি বগলে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে ড্রয়িং রুমে হানা দিত। আবু জুনায়েদ এ ধরনের লোকদের ভারি সমাদর করতেন। পরীক্ষার প্রশ্ন করে, খাতা দেখে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত পরীক্ষক হিসেবে গিয়ে মাস মাইনের বাইরে যে টাকা তিনি আয় করতেন, প্রায় তার সবটাই দালালদের সেবায় ব্যয় করতেন। পারলে মাস মাইনের টাকাটাও দালালদের পেছনে ঢেলে দিতেন। সেটি সম্ভব হয়নি। কারণ, সব টাকাটা নুরুন্নাহার বানুর হাতে তুলে দিতে হতো। দৈনন্দিন হাতখরচ টাকাটাও তাকে স্ত্রীর কাছ থেকে চেয়ে নিতে হতো। দশটা টাকা বেশি দাবি করলে দশ রকম জেরার সম্মুখীন হতে হতো।
 
Back
Top