- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 445
- Messages
- 7,082
- Reaction score
- 5,075
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
একজন জহুর হোসেন চৌধুরী
(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)
(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)
ভারতবর্ষের সাংবাদিকতা, পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিকতা, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা। পুরোটাজুড়ে জহুর হোসেন চৌধুরীর ছিলো চূড়ান্ত আধিপত্য। যার অবিশ্বাস্য বিশ্লেষণধর্মী ভাষ্য, প্রজ্ঞা মেধায় পূর্ণ হয়েছে পুরো সাংবাদিকতা জগতই।
তাঁর লেখা দরবার-ই-জহুর যতবার পড়ি ততবারই মুগ্ধ হই। মুগ্ধ হই তাঁর অবিস্মরণীয় বয়ানে, ক্ষুরধার লেখনীতে।
যিনি সমকালীন চিরায়ত সাংবাদিকতাকে ছেড়ে সাংবাদিকতাকে তুলে এনেছেন গণমানুষের ভাষ্যে। রাষ্ট্রের অনাচার, অন্যায়, অবিচার, দুঃশাসন, স্বৈরাচার আর রাষ্ট্রীয় অপশাসনের বিরুদ্ধে যার কলম হয়ে দাঁড়ালো তরবারির চেয়েও তীক্ষ্ণ।
একজন জহুর হোসেন চৌধুরী হয়ে উঠেছিলেন সময়ের মুখপাত্র। হয়ে উঠলেন এক উজ্জ্বলতম ব্যক্তিত্ব। যার প্রজ্ঞা, মেধা, বিশ্লেষণধর্মী ক্ষমতা, কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা তাঁকে করে তুলেছে আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম অধ্যায়রূপে।
কামাল লোহানী এক লেখায় লিখেছিলেন, ‘আবদুস সালাম, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী ছিলেন বাংলার সাংবাদিকতা জগতের শ্রদ্ধেয়, সাহসী ও দেশপ্রেমিক তিন সম্পাদক। তাঁদের এই সংহতি পশ্চিম কিংবা পূর্ব পাকিস্তানি শাহি ব্যক্তিবর্গের কাছে যেন 'ত্রাস' ছিল; এমনকি সেকালের পাকিস্তানে জবরদস্ত সামরিক শাসক ফিল্ড মার্মাল আইয়ুব খানও সচকিত ও তটস্থ থাকতেন। কারণ কেউই ছেড়ে কথা বলতেন না।’
এই যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে কঠিন সত্যটা জানিয়ে দেয়া। সত্য আর মিথ্যের মধ্যে পার্থক্যটি জানিয়ে দেয়ার তীব্র প্রচেষ্টা তা আমাদের আজকের বাংলাদেশে অসম্ভবই ঠেকে। আজকের দিনে আমরা একজন জহুর হোসেন চৌধুরী, একজন মানিক মিয়া কিংবা একজন আবদুস সালামের মতো সম্পাদকের অভাব ভীষণভাবে লক্ষ্য করি। যারা নির্দ্বিধায় সত্যকে তুলে ধরবেন। নিজেদের প্রাজ্ঞ ও জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণী ক্ষমতায় অনুধাবনের শক্তি যোগাবেন।
জহুর হোসেন চৌধুরীর সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি হয়েছিলো তাঁর খালাতো ভাইয়ের হাতে। তিনি আর কেউ নন কিংবদন্তীতুল্য রাজনীতিবিদ, লেখক, ফুটবলার হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। তাঁর সম্পাদিত বুলবুলে সাংবাদিকতার সূচনা। এরপর একে একে কাজ করেছিলেন স্টেটসম্যান, কমরেড ও স্টার অব ইন্ডিয়া পত্রিকায়। শেষদিকে সরকারী চাকরি। কিন্তু ততদিনে দেশভাগ হয়ে গেল। কলকাতা ছেড়ে তিনি চলে এলেন ঢাকায়। যোগ দিলেন পাকিস্তান সরকারের জনসংযোগ দপ্তরে।
কিন্তু সাংবাদিকতা ছিল তাঁর রক্তে। তাই সরকারী চাকরিতে স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। সরকারী চাকরি ছেড়ে ‘উপাত্ত’ ও ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকায় বেশ কিছুদিন কাজ করেছিলেন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে খায়রুল কবিরের সম্পাদনার দৈনিক ‘সংবাদ’ বের হলে জহুর হোসেন চৌধুরী সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দিলেন তাতে।
তিন বছর পর তাঁকেই দেয়া হলো সম্পাদকের দায়িত্ব। সেই সংবাদ এ একটানা ১৭ বছর সম্পাদক ছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের পঁচিশে মার্চ ‘সংবাদ’ সাময়িকভাবে বন্ধের আগ পর্যন্ত সম্পাদক ছিলেন তিনিই।
এ সময়ে জহুর হোসেন চৌধুরী সংবাদ পত্রিকাকে গড়ে তুলেছেন এক প্রগতির মুখপাত্র হিসেবে। সংবাদ পত্রিকায় নিয়মিত বের হতো তাঁর লেখা বিখ্যাত কলাম দরবার- ই-জহুর। যেখানে জহুর হোসেন চৌধুরী তুলে এনেছিলেন কঠিন সময়ের কঠিন বাস্তবতা। চরম সত্যকে তিনি তুলে ধরেছিলেন প্রাঞ্জল ও সহজবোধ্য ভাষায়। তাঁর অনন্য বিশ্লেষণ ধর্মী লেখায় উঠে আসতো সমসাময়িক সময়ের কঠিন পরিস্থিতি। বাস্তবতার নিপুণ চিত্রণ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক গভীর জ্ঞান, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ তাঁর রচনাকে দিয়েছিলো ব্যতিক্রমী সুষমা।
পাকিস্তান শাসনামলে একবার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লিখেছিলেন, ‘Democracy has never been given a chance in this country.’ অর্থাৎ এদেশে গনতন্ত্রকে কোন সুযোগই দেওয়া হয়নি। জবাবে জহুর হোসেন চৌধুরী সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, ‘গনতন্ত্র কেউ কাউকে দান হিসেবে দেয়না, গণতন্ত্র সংগ্রাম করে পেতে হয়।’
জহুর হোসেন চৌধুরীর বক্তব্য ছিল, ’আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা না করে কেবল জোড়াতালি, কেবল শ্লোগানের মারফতে আমাদের জীবনে কোনদিন কোন ধরনের গণতন্ত্র আসিবে না। গনতন্ত্রের দর্শন ও মূল্যবোধ সম্বন্ধে আমাদের নেতৃত্বের ও কর্মীদের অজ্ঞানতা কিংবা জেনেশুনে পরিষ্কার অবজ্ঞা এদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বারবার ব্যর্থতার প্রধান কারণ।’ উচিৎ কথা বলতে এক চুল পরিমাণ ও দ্বিধা করতেন না জহুর হোসেন চৌধুরী। আবার সেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি ছিলো তাঁর অসীম শ্রদ্ধা।
দরবার-ই-জহুর এর একটি লেখায় তিনি লিখেছিলেন, ‘একমাত্র শহীদ সাহেবের আমলেই এদেশের জেলগুলো রাজবন্দী শূন্য ছিল।’ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন,
‘এই দু’নেতারই একটি মহৎগুণ ছিলো তাঁদের দুজনের কেউই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ন ছিলেন না। মানুষ হিসেবে তাঁরা সত্যি সিংহ হৃদয় ছিলেন।’
দরবার-ই-জহুর কলামে জহুর হোসেন চৌধুরী একধারে তুলে ধরেছেন রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, সাহিত্য, ইতিহাস থেকে শিক্ষা, সমসাময়িক কালের নানা উপলব্ধি নিয়ে। যেখানে এক জায়গায় তিনি জাতির আত্মউপলব্ধির অনুসন্ধান প্রসঙ্গে আক্ষেপের গলায় বলেছেন, ‘গত আটাশ বছর ধরে আমরা বারবার এক পা এগিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেছি কেন এই প্রশ্ন সম্বন্ধে কোন সত্যিকারের অনুসন্ধান এখন পর্যন্ত হয়নি।’
কেবল রাজনৈতিক লেখাই স্থান পায়নি জহুর হোসেন চৌধুরীর কলামে। উঠে এসেছে তাঁর চিরায়ত রসবোধ ও রসাত্মক বর্ণনায় উঠে এসেছে নানা সময়কালের কথা। দরবার-ই-জহুরে তিনি লিখেছিলেন,
‘কলকাতার আজাদ অফিসে ১৯৪৬ সালের ভয়াল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে কারফিউর পরও থেকে গিয়েছিলাম গরুর গোস্ত ও তন্দুরি খাওয়ার লোভে। সন্ধ্যার পর যারা কাজ করেন তাঁদের জন্য ঐ ভীষণ ঝাল কিন্তু পরম উপাদেয় ডিনারের বন্দোবস্ত কর্তৃপক্ষ করেছিলেন। লোভের ফল হাতে হাতেই পেয়েছিলাম। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরেই একটা ছোট পটকা ‘আজাদ’ অফিসে কারা যেন মেরে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আজাদের প্রেসের লোকেরা ‘আল্লাহু আকবর’ বলে লাঠিসোটা নিয়ে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হলো। আরে বার্তা বিভাগের সদানন্দ ব্যানার্জি টেলিফোন করতে লাগলো তালতলী থানায়। ঐ দাঙ্গার মধ্যেও পুলিশের রসিকতাজ্ঞান যে অটুট ছিল তার প্রমাণ পেলাম দারোগার কথায়। সদানন্দ বললো, ‘দেখো ব্যাটা বলে কিনা। বোমা মেরেছে তো টেলিফোন করছেন কি করে? আর একটা বোমা সহ্য করতে পারেন না তো আপনারা এতগুলো লোক। যাক ঘণ্টা দুয়েক পরে পুলিশ এসেছিলো। ঐ প্রথম ও শেষ বোমা।’
কেবল সাংবাদিকতাই নয় রাজনীতিও ছিলো জহুর হোসেন চৌধুরীর এক গভীর মূল্যবোধের স্থান। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী। পঞ্চাশের দশকে তিনি ন্যাপের প্রাদেশিক কমিটির সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ষাটের দশকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গঠিত ঐক্য মোর্চা গঠনেও রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আইয়ুব খানের আমলে ১৯৬৩ সালে প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স জারি হলে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিরুদ্ধ এই কালাকানুনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী সহ সাংবাদিকেরা।
জহুর হোসেন চৌধুরীর কলাম একাধারে যেমন ছিলো প্রাঞ্জল, সহজবোধ্য। ঠিক তেমনি ভাবে সরস ও সুখপাঠ্য। গল্পচ্ছলে তাঁর অসাধারণ বিশ্লেষণধর্মী ক্ষমতা, কঠিন সত্যকে অবলীলায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। সময়ের পাঠ হয়ে উঠেছিলো তাঁর লেখা।
জহুর হোসেন চৌধুরীর কলামে উঠে এসেছে একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা প্রবাহের বর্ণনাও। যেখানে তিনি লিখেছেন
‘একুশে ফেব্রুয়ারি নবাবপুর রোডে সকাল নয়টায় দেখলাম, ছাত্ররা দলে দলে বিভক্ত হয়ে দোকান বন্ধ করার জন্য মালিকদের অতি বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করছে, কিন্তু অধিকাংশ দোকানের মালিক পশ্চিমা হওয়ায় তারা সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করছে…। এগারোটার সময় টেলিফোনে শুনলাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পরিস্থিতি গরম হয়ে উঠেছে। সত্যি বলতে কি, আমার পরিষ্কার মনে হচ্ছিল যে কোনো সময় গুলি চলতে পারে। অফিসের দরজায় রিকশা থামার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের মতো একজন সাইকেলে এসে খবর দিল, পুলিশ গুলি করেছে। অনেক ছাত্র মারা গিয়েছে।’
ঠিক ২৪ বছর পর ১৯৭৬ সালের ২১শে ফেবুয়ারিতে জহুর হোসেন চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘আমার একেক সময়ে মনে হয় মৌলিক জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারেও দলীয়, উপদলীয় এবং ব্যক্তি স্বার্থের উপরে উঠে চিন্তা করাটা অন্ততঃ আমাদের মধ্যবিত্তের ধাতেই নেই। এ ব্যাপারে দেখে আসছি পশ্চিম পাকিস্তানী আমলের প্রথম থেকে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মতবিরোধ এবং বিভিন দোল থাকবেই। গণতান্ত্রিক জীবনধারার এটি একটি পূর্বশর্ত। কিন্তু এই শর্তকে আমরা কোনদিনই মেনে চলিনি। সরকারবিরোধিতাকে দেশদ্রোহীতার সামিল করতে যখন যে দল ক্ষমতায় গেছে তাদেরই দেখেছি।’
জহুর হোসেন চৌধুরী গভীর ও প্রখর অন্তঃদৃষ্টি দিয়ে একটি কালকে যেমন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন ঠিক তেমনি তিনি তাঁর লেখায় সম্পাদনায় তুলে ধরেছেন নানা অসংগতির চিত্র। দলমত নির্বিশেষে সাংবাদিকতার ঊর্ধ্বেও বরাবরই জহুর হোসেন চৌধুরীর কাছে সর্বাগ্রে প্রাধান্য পেয়েছে দেশ।
যিনি সাংবাদিকতাকে অবলম্বন করেই পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছেন, সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের জাতীয় জীবনকে। তাইতো আজকের বাংলাদেশে তাকালে আমরা একজন জহুর হোসেন চৌধুরীর মতো সাংবাদিকের অভাব ভীষণভাবে অনুধাবন করি। সাংবাদিকতায় জহুর হোসেন চৌধুরী এক অনন্য আদর্শ ও অনুপ্রেরণার নাম।
লেখাটি জনাব আহমাদ ইশতিয়াক এর ফেসবুক পেইজ থেকে সংগৃহীত