- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 449
- Messages
- 7,173
- Reaction score
- 5,327
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
এক কাপ ঠান্ডা চা
মূল লেখকঃ ফারহানা কবির মানাল
মূল লেখকঃ ফারহানা কবির মানাল
দুপুরে খাওয়ার সময় শাশুড়ি মা বললেন, ‘এটা তোমার বাপের বাড়ি না। আগে আগে খেতে বসবে না। সবার খাওয়া শেষ হলে তারপর খাবে।’
সরু চোখে তাকালাম। বিরক্ত গলায় বললাম, ‘আপনার কথায় আমার পেট চলবে না। আমার যখন খিদে পাবে তখনই খাব। খিদে সহ্য হয় না।’
তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, ‘এই মেয়ে! এটাকে কী তুমি তোমার বাপের বাড়ি পেয়েছ? যা মুখে আসছে বলে দিচ্ছো! তোমার বাবা মা তোমাকে কিছু শেখায়নি?’
আমি একটুও মাথা গরম করলাম না। অত্যন্ত শান্ত গলায় বললাম, ‘এটা আপনারও বাপের বাড়ি না। তাছাড়া আপনাকে কেউ শেখায়নি যে একটা মানুষকে না খাইয়ে কষ্ট দেওয়া উচিত না। কেউ খেতে বসলে তাকে বাজে কথা বলতে হয় না?’
‘কি বললে তুমি? এত সাহস তোমার! আমার মুখেমুখে তর্ক করছ?’
‘কথার পিঠে কথা বলছি। এখানে সাহসের তো কিছু নেই।’
‘ঠিকই! শুধু সাহসই না। তোমার ভেতরে সামান্য ভদ্রতাটুকুও নেই। মা'য়ের বয়সী একজন মহিলার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটাও জানো না।’
‘মায়ের বয়সী মহিলারা যদি মায়ের মতো আচরণ করতে না পারে তাহলে মায়ের মতো সম্মান আশা করে কীভাবে? যতদূর মনে পড়ছে আমার এত বছরের জীবনে আমার মা কখনোই আমার খাওয়া নিয়ে কিছু বলেনি। খেতে বসলে চিৎকার চেঁচামেচি করেনি। তার সম্মানটা অন্য কাউকে দিলে তাকে অপমান করা হবে।’
শাশুড়ি মা কথা বাড়ালেন না। কাঁপতে কাঁপতে নিজের ঘরে চলে গেলেন। বহুকষ্টে খাওয়া শেষ করলাম। হঠাৎই ভীষণ বিরক্ত লাগছে। এই ঘটনা এখানেই শেষ হবে না। হাত পা গজিয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠবে। বাড়ির বাকি সদস্যদের আলোচনা সমালোচনার কারণ হবে। একান্নবর্তী পরিবারে এমন মুখরোচক ঘটনা দু-এক কথায় শেষ হয়ে যায় না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালাম। হাত ধুয়ে নিজের ঘরে চলে এলাম। আসার পথে শুনলাম শাশুড়ি মা বলছেন, ‘আজকালকার মেয়েরা চরম বে’য়া’দ’ব। বড়দের মুখেমুখে কথা বলাটাকে স্মার্টনেস মনে করে।’
তিনি বেশ আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছেন। কথাগুলো কাকে বলছেন বুঝতে পারলাম না। আগ্রহ নিয়ে দেখতেও গেলাম না। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। মাসখানেক আগে আমার বিয়ে হয়েছে। আমার স্বামীরা তিন ভাই, দুই বোন। সে সবার বড়। বাকি ভাই-বোনদের এখনও বিয়ে হয়নি। একসাথে থাকে। আমার বিয়েটা দেখেশুনেই হয়েছে। ভদ্রলোক সবেমাত্র বিসিএস পরীক্ষায় পাশ করেছেন। মফস্বলের সাধারণ পরিবারের বাবারা এমন পাত্র হাতছাড়া করে না। আমার বাবাও করেননি। বিনা যৌতুকের প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে পারাটাকে তিনি সারাজীবনের পূণ্যের ফল মনে করতে লাগলেন। তড়িঘড়ি খোঁজ খবর করে সপ্তাহ দুয়েক মধ্যেই বিয়ে কাজ শেষ করে ফেললেন। বাবা আমার বিয়েকে কতটা পূণ্যের ফল ধরেছেন জানি না। তবে আমার স্বামী যথেষ্ট ভদ্রলোক। বিনাকারণে গালম’ন্দ করেন না। অহেতুক বাজে কথা বলেন না। স্ত্রী এবং তার সম্মানের ব্যাপারেও তিনি বেশ যত্নশীল। এইতো কয়েকদিন আগে আমার খালা শাশুড়ি এসেছিলেন। তিনি বেশ আক্ষেপ নিয়ে বললেন, “মানিকের বিয়ে আরও ভালো জায়গায় হতে পারত। বউটা ওর সাথে মানায়নি। মেয়ের গায়ের রংটা বেশ চাপা। আহামরি বড়লোক ঘরেরও না। কী দেখে যে তোমরা এমন মেয়ে পছন্দ করলে বুঝি না বাপু!”
এতটুকু বলেই ক্ষ্যান্ত হলেন না। আমায় শুনিয়ে শুনিয়ে নানান ধরনের কথা বলতে লাগলেন। তার কথাগুলো এতটাই কুৎসিত যে মুখে তুলতে রুচিতে বাঁধে। মানিক তার কথায় ভীষণ রেগে গেলেন। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “কোন সাহসে আপনি আমার বউকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করেন? আমার বউকে ছোট করার অধিকার আমি কাউকে দিইনি। কাউকেই না।”
খালা শাশুড়ি বললেন, “মিথ্যে বলেছি নাকি? তুই চাইলে এর চেয়ে হাজার গুণ ভালো মেয়ে বিয়ে করতে পারতি।”
“কি পারতাম না পারতাম সে কথা আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই না। যদি আমার স্ত্রীকে সম্মান না করতে পারেন, যদি তাকে মেনে নিতে আপনার খুব বেশি অসুবিধা হয় তাহলে আমার বাড়ি থেকে চলে যান।’
খালা শাশুড়ি সেদিনই চলে গেলেন। শাশুড়ি মা তাকে থামানোর অনেক চেষ্টা করেছিলেন। তিনি থাকেননি। কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিয়েছেন। এই ঘটনার পর থেকেই শাশুড়ি মা আমায় চোখে দেখতে পারেন না। উঠতে বসতে আমার ভুল ধরতে ব্যস্ত হয়ে যান। আগে-পরে সহ্য করেছি। আজ হঠাৎ কীভাবে যেন ওসব কথা বলে বসলাম।
আকাশে মেঘ জমেছে। ফিনফিনে বাতাস বইছে। বরফ শীতল বাতাস। গা ছুঁয়ে গেলে শরীর শিউরে ওঠে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। মেঘের রং কালচে সাদা। সূর্যের দেখা-সাক্ষাৎ নেই। আলতো হাতে জানালার কপাট লাগিয়ে পর্দা টেনে দিলাম। বিকেল পড়ে গেছে। চা নাস্তা বানাতে হবে।
রান্নাঘরে গিয়ে চুলায় চায়ের পানি বসালাম। পানিতে দু’টুকরো দারুচিনি ভেঙে দিয়ে দুটো কাপ বের করলাম। এই মুহুর্তে বাড়িতে কেউ নেই। বড় ননদ হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। ছোটজন টিউশনিতে গিয়েছি। ছেলেদের কেউ দিনের বেলায় বাড়িতে থাকে না। কাপে চা ঢেলে শাশুড়ি মায়ের ঘরে গেলাম। শাশুড়ি মা বিছানায় শুয়ে ছিলেন। আমায় দেখে উঠে বসলেন। থমথমে গলায় বললেন, “তুমি এখানে কী করছ?”
“চা বানিয়েছি। বিকেল পড়ে গেছে। আপনি বিকেলে চা পান করেন। তাই..”
“আমাকে নিয়ে তোমার এত ভাবতে হবে না। গায়েগতরে যা বল আছে নিজের চা-টা বানিয়ে খেতে পারব।”
উনার কথায় বিরক্ত হলাম না৷ কপাল কুঁচকে ফেললাম না৷ শান্ত ভঙ্গিতে বিছানায় বসলাম। হালকা গলায় বললাম, “আপনি কী আমায় অপছন্দ করেন?”
প্রশ্নে শুনে তিনি খানিকটা ভড়কে গেলেন। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে করতে বললেন, “এ কথার মানে কী?”
“জানতে চাইছি আপনি আমাকে পছন্দ করেন নাকি অপছন্দ করেন।”
তিনি কথার জবাব দিলেন না। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রইলেন। অল্প হেসে বললাম, “শাশুড়ি বউয়ের এমন তিক্ত সম্পর্কে জন্য কারা দায়ী আম্মা? কেন সমাজে এই প্রথা চালু আছে?”
“তোমার সাথে কোন কথা বলতে চাই না। আমার ঘর থেকে বের হয়ে যাও।”
“সে আমি বের হয়ে যেতেই পারি। কিন্তু তারপর কী হবে আম্মা?”
“কী বলতে চাইছ?”
“আমি কী বলতে চাইছি সে কথা আপনি খুব ভালোই বুঝতে পারেছেন। তবুও যখন জানতে চাইছেন, বলছি– দুপুরের ঘটনা ব্যাপারে কথা বলছি। শাশুড়িরা কেন সবসময় বউয়ের উপরে এমন খবরদারি করে?”
“শুধু কী শাশুড়িরাই বউয়ের উপর খবরদারি করে? বউয়েরা তাদের মুখেমুখে তর্ক করে না?”
“আমায় কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখিত। প্রয়োজনে পায়ে ধরেও মাফ চাইতে পারি।”
শাশুড়ি মা চোখ বড় করে আমার দিকে তাকালেন। বিস্মিত গলায় বললেন, “হঠাৎ এমন সুমতির কারণ কী? মানিক কিছু বলেছে নাকি?”
“না আম্মা। এই ব্যাপারে আমি তাকে কিছুই বলিনি৷ বলতেও চাই না।”
“তা বলবে কেন? বললে মানিক তোমাকে আস্ত রাখত না। আমার ছেলে আমার অপমান মুখ বুঁজে সহ্য করবে এটা কখনো হতেই পারে না।”
“ঠিক বলেছেন। আপনার ছেলে আপনার অপমান মুখ বুঁজে সহ্য করবে এটা হতে পারে না। হওয়া উচিতও না। কিন্তু আম্মা, আমি কী আপনার ছেলের কিছু হই না? আমার সাথে কী তার কোন সম্পর্ক নেই?”
“মা বউয়ের ল’ড়া’ইয়ে সবসময় মায়ের জিত হয়। অবশ্য হাতেগোনা কয়েকটা কাপুরষ থাকে। যারা বউয়ের আঁচলের তলায় নিয়ে মুখ লুকিয়ে বসে থাকে।”
“আর যে লড়াই করে তার কী হয় আম্মা?”
“মানে?”
“মানেটা খুব স্পষ্ট। এই শাশুড়ি বউয়ের ঝগড়ায় কে সবচেয়ে বেশি ভোগে জানেন আম্মা? সেই ভদ্রলোক, যার মা বউ নিজেদের প্রতিদন্দী বানিয়ে রেখেছে। এই যেমন আমাদের কথাই ধরুন। আপনার ছেলে বাড়িতে ফিরলেই আপনি তাকে দুপুরের ঘটনার ব্যাপারে বলবেন। আপনি না বললেও আমি বলব। সারাদিন কাজের পর তিনি মা বউয়ের সালিশ করতে বসবেন। হয় বউয়ের কথা শুনে মাকে গালমন্দ করবেন। নয়তো মায়ের কথা শুনে বউকে। এই ব্যাপারটা কেমন হবে আম্মা?”
শাশুড়ি মা মাথা নিচু করে রইলেন। তার চোখ-মুখ নরম হয়ে এসেছে। হুট করে আমি তার হাত ধরে ফেললাম। সরল গলায় বললাম, “বউ শাশুড়ি সম্পর্কের বি'ষ আদিমযুগ থেকে চলে আসছে। সমাজের প্রতিটা ঘরে এই সমস্যা লেগে থাকে। কিন্তু মা! এগুলো কী সত্যিই খুব বেশি দরকার? আমি এ বাড়িতে নতুন। মা বাবা ফেলে নতুন মানুষের কাছে এসেছি। আমি কী আশা করতে পারি না এখানকার মানুষগুলো আমায় ভালোবাসবে? আগলে রাখবে?”
তিনি আমার কথার জবাব দিলেন। মলিন মুখে বললাম, “একটা কথা কী জানেন আম্মা? গাছ তেমনই ফল দেয় যেমন করে আমার তার যত্ন করি। আজ আপনি আমার সাথে যে ব্যবহার করবেন আগামীকাল আপনি আমার থেকে সেই ব্যবহারই ফেরত পাবেন। সত্যি করে বলুন তো, আজ আমার জায়গায় যদি আপনার একটা মেয়ে খেতে বসত তাহলে আপনি কী তাকে ওসব কথা বলতে পারতেন?”
তবুও তিনি চুপ করে রইলেন।
“আপনিও তো একসময় বউ ছিলেন। এখন শাশুড়ি হয়েছেন। আপনার শাশুড়ী আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করত জানি না। কিন্তু সমাজে চলে আসা এই কুৎসিত নিয়মটাকে কী বদলানো যায় না?”
“আমাদের কথায় সমাজ বদলে যাবে না।”
“তা হয়তো যাবে না। কিন্তু আমাদের কাজে আমাদের পরিবারটা বদলে যেতে পারে। এই না লেখা দ’ন্দের জোরে মনের তিক্ততা বাড়বে। তিক্ততা মাত্রা চরম পর্যায়ে গেলে সংসার ভাগাভাগি কথা উঠবে। হয় আপনার ছেলে আমাকে নিয়ে আলাদা সংসার শুরু করবে নয়তো আমায় ছেড়ে দেবে। পরিবারের এই পরিনতির জন্য কে দায়ী থাকবে? আপনি আমি নাকি যুগ যুগ ধরে চলে আসা সমাজের কুৎসিত একটা নিয়ম? সত্যিই কী এই নিয়ম বদলানো যায় না? হ্যাঁ আমরা এই সমাজ পরিবর্তন করতে পারি না। কিন্তু নিজেদেরকেও কী পরিবর্তন করতে পারি না? একে-অপরের সাথে সহানুভূতিশীল আচরণ করতে পারি না?”
শাশুড়ি মা আমার কথার জবাব দিলেন না। চায়ের কাপে হাত রাখলেন। চায়ের ধোঁয়া ওঠা বন্ধ হয়েছে বেশ খানিকক্ষণ আগে। এতক্ষণে ঠান্ডা বরফ হয়ে গিয়েছে হয়তো। তবে তিনি কাপ সরিয়ে রাখলেন না৷ তৃপ্ত ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিতে লাগলেন। তার চেহারার বিরক্তি সরে গিয়েছে। একগুচ্ছ মায়া এসে জড় হয়েছে মুখে। দেখতে ভীষণ ভালো লাগছে।
সমাপ্ত