- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 429
- Messages
- 6,771
- Reaction score
- 4,541
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
দ্যা সানগ্লাস
মূল লেখকঃ সাইফুল আলম
মূল লেখকঃ সাইফুল আলম
টার্কিশ এয়ারের ইকোনমি ক্লাশে রায়হানুর রহমান,আর মিসেস লাবণী রহমান অসলো যাচ্ছেন।
একমাত্র পুত্র আজ বহু বছর ধরে নরওয়ে প্রবাসী!
অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে ছেলেটা কোন মতে ইউরোপে টিকে আছে।
আজ থেকে বহু বছর আগে ওর স্ত্রী ওকে ছেড়ে চলে যায়।একা যায়নি মেয়েটা;একমাত্র পুত্র সন্তানটিকেও
সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।
ছেলেটাকে আর বিয়ে করানো গেলনা।রায়হান সাহেব এ জন্য নিজে অপরাধ বোধে ভুগেন।
ডিভোর্সের এক দুই বছরের মধ্যেই ঠিক মত চেপে ধরা গেলে পুত্র ইমরানুর রহমানকে বিয়ে করানো সম্ভব হত হয়ত।
২৬সেপ্টেম্বর ২০৪৯ইং!
রায়হানুর রহমানের একাশিতম জন্মদিন!ইমরানের খুব ইচ্ছে বাবার জন্মদিনটা এবার অসলোতে পালন করবে।
রায়হান সাহেবের এসব জন্মদিন টন্মদিন ভাল লাগে না।প্রতিদিনই মানুষ এক পা এক পা করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় তার জন্য এতসব আয়োজন পুরাই বৃথা!
পুত্রের মনে আর কি আছে কে জানে!অনেকদিন ধরে তার মাকে চাপাচাপি করছে বাবাকে নিয়ে পাকাপাকি অসলো চলে আসতে।
রায়হানুরের পরদেশে বেড়াতে ভাল লাগে বসবাসে নয়।’কাঁচা হোক পাকা হোক নিজ ঘর খাসা’ তার কাছে।
এই বয়সেও রায়হান সাহেবের ফিজিক্যাল ফিটনেস মন্দ না।
শুধু মাঝে মাঝে পরিচিতদেরও নাম সহসা মনে করতে পারেন না।তার হাল্কা স্মৃতিভ্রম আছে।
তবে পুরোনো সব স্মৃতি থরে বিথরে মস্তিষ্কের গোপন চেম্বারে এখনো আগের মতই সুরক্ষিত আছে।
তার টাইপ টু ডায়াবেটিস;এক বেলা ইন্সুলিন নিতে হয়।কঠোর খাদ্যাভাস,
হাঁটাহাঁটি,নিয়মিত চেক আপ আর মেডিসিন সেবনের অভ্যাস রায়হান সাহেবকে এখনো ফিট রেখেছে হয়ত।
লাবণী রহমানও মাশাল্লাহ ভালই ফিট আছেন এখনো।গত বছর তার গলব্লাডার অপারেশন হয়েছে,তারও বছর দুই আগে তার ইউটেরাস রিমুভ করা হয়েছে।থেকে থেকে তার
হটফ্লাশ হয়।
মিসেস রহমান নিয়ম করে ওরাল হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নেন ও ভিটামিন ডি ওরাল সলুউশন খান।
প্রতিদিন উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবন করেন।
ঢাকা টু অসলো ভায়া ইস্তাম্বুল ট্রানজিট সহ প্রায় সতের ঘন্টার জার্নি।এত বড় জার্নি সাধারনত বোরিং লাগে কিন্তু আজ রায়হান সাহেবের কেমন পুলক পুলক লাগছে!
এর সঠিক কারন তিনি জানেন না।
হতে পারে আজ অনেক বছর পর আপন আত্মজের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তার মন উম্মুখ হয়ে আছে।
ঢাউস আকৃতির টার্কিশ এয়ারের বোয়িং বিমানটি হুম হুম শব্দে মেঘ কেটে কেটে উড়ে যাচ্ছে!
রায়হানুর রহমান জানালা দিয়ে তার ক্ষীন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন।
তার কাছে অপসৃয়মান সব কিছুই কেমন ঝাপসা ঝাপসা লাগছে।
কিছুক্ষন আগেই পাইলটের ঘোষনা শোনা গেল-আমরা এখন ছত্রিশ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে যাচ্ছি।
কী মিষ্টি আর ভরাট গলা পাইলটের!
রায়হানুর রহমান ঢাকা থেকে নিয়ে আসা পত্রিকা প্রায় মুখস্ত করে ফেলেছেন।
আজকাল পত্রিকাগুলোর ছাপার মান,কালার,সবই উন্নত হয়েছে কিন্তু রিপোর্টিংয়ের মান ক্রমশ নিম্নগামী।
পুর্বাচলের কোন শ্যূটিং স্পটে মডেলকন্যা সারা শ্যূটিং করতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছে।কোন এক পলিটিশিয়ানের বারিধারার বাড়ি থেকে জার্মান শেফার্ড জাতের কুকুর চুরি গেছে।
ওটিটি প্লাট ফর্মের হালের জনপ্রিয় নায়ক রাকিব খানের জন্মদিনে কে এই বিশেষ অতিথি?
এসব একটা জাতীয় দৈনিকের হেডলাইন হতে পারে?দেশে হাজারো সমস্যা;এসব বাদ দিয়ে লীডনিউজ
করা হচ্ছে এসব।রাবিশ!
টার্কিশ এয়ারের একটানা হুম হুম শব্দে কেমন ঝিমুনি পাচ্ছে।
এরই মধ্যে লাবণী রহমান রায়হান সাহেবের কাঁধে ঘাড় ফেলে দিয়েছেন।
বাহ!বেশ আরামেই আছে লাবণী।
কি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে মহিলা।
রায়হানুর রহমানেরও কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছে।একটু চিনি ছাড়া গ্রীন টী হলে মন্দ হত না।তিনি হাত উঁচু করে স্টুয়ার্ড মেয়েটাকে ডাকলেন,
-আম্মা!একটা গ্রীন টী দিতে পারবা চিনি ছাড়া?
টার্কিশ মেয়েটা ভালই ইংরেজী বুঝে মনে হল।ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের
স্টুয়ার্ড ইংরেজি জানবে না তা কেমন করে হয়?
লম্বা ফর্সা নীল নয়না মেয়েটি মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে চলে গেল।
ওর নাম জানতে খুব লোভ হচ্ছে রায়হানুরের।মেয়েটি গ্রীন টী নিয়ে আসলে তার নাম জিজ্ঞেস করতে হবে!
_________________________
বেশ সুখীই ছিলেন রায়হান লাবণী দম্পতি।অসম্ভব মেধাবী এক পুত্র কন্যার জনক জননী হতে পেরেছিলেন তারা।পুত্র কন্যার দু’জনেরই বিবাহ দিয়েছেন।
পুত্রের সংসারটা ভেঙ্গে গেল-এই কষ্ট সারাজীবন রায়হান সাহেবের পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হবে;এটাই হয়ত বিধিলিপি।
তিনি দাদা হয়েছিলেন কিন্তু নাতীর স্পর্শ পাননি।নাতীর একান্ত সান্নিধ্য কারে কয় তা তিনি জানেন না।
নাতীর দুষ্টুমী কী জিনিস বিমুগ্ধ নয়নে তা দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি।
মাঝে মাঝে ডিভোর্সি বৌমার কাছে ভিক্ষুকের মত ভিক্ষা চাইতে হয় নাতীকে দেখতে।
নাতী দর্শনে গিয়ে ওর সাথে তার টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো খুব মনে পড়ে।এইসব তার সারা জীবনের সঙ্গী হয়েই রইল।
ইস্তাম্বুল পেতে আর কত সময় লাগবে কে জানে!লাবণী রহমান নাক ডাকতে শুরু করেছেন।এত ঘুমাতে পারে লাবণীটা!
চিন্তা নাই;তাই এমন গভীর ঘুম আসে লাবণীর।রায়হানুরের মত এতসব ঝামেলা মাথায় থাকলে ঘুম পালাত ছাদ ফুটো করে।
কত সাধ ছিল বৃদ্ধ বয়সে পৌত্র নিহানের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাবেন চিড়িয়াখানা দেখতে যাবেন।
নিহান বাঘের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে বলবে,
-দাদা!দিস ইজ টাইগার!টাইগার!
ডোন্ট বী ঠু ক্লোজ!
-আই নো!আই নো এন্ড থ্যাংক ইউ!
নিহান দাদাকে টেনে টেনে বানরের খাঁচার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
-দাদা!দেখ দেখ বানর!
-রেসাস বান্দর!
-বান্দর?হোয়াটস দিস?
-বান্দর মীনস বানর।
-হোঃহোঃহো।
মিরপুর চিড়িয়াখানার মত এত সুন্দর চিড়িয়াখানা আছে কি আর একটিও দুনিয়াতে?রায়হানুর রহমানের বাপ দাদা চৌদ্দগুষ্ঠী মিরপুরের।
তিনি দুনিয়ার অনেক দেশ ঘুরেছেন;
মিরপুরের লালমাটি আর উঁচুনিচু টিলা নাম না জানা বৃক্ষ,লতাগুল্ম তাকে কেবলই আকর্ষন করে।
চিড়িয়াখানা ঘেঁষা বোটানিক্যাল গার্ডেন,হিজল গাছ,বোটলব্রাশ ট্রি,
পাইন গাছের সারি-আহ!কী যে ভাল লাগে!
পাইনের সারি ভেদ করে যখন
শন শন শব্দে বাতাস বয়-মনটা জুড়িয়ে যায়!ছোট বেলায় মনিপুর স্কুলের ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে এখানে বাংলা সিনেমার শ্যূটিং দেখতে আসতেন রায়হানুর।
গার্ডেনের লেকের ধারে দাঁড়াতেন রায়হান-উদাস নয়নে দূর দিগন্তে চেয়ে থাকতেন।মনে হত জার্মেনীর রাইন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
এলোমেলো হাওয়ায় উড়ছে তার চুল।নায়ক রাজ্জাকের মত কপাল থেকে অবাধ্য চুল সরান রায়হানুর।
-দাদা!দাদা!
সম্বিৎ ফিরে পান রায়হানুর রহমান,
-ইয়েস নিহান ব্রো!
-চল ময়ূর দেখব চল।
-চল!
ছোট্ট নিহান হাত ধরে টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দাদাকে!
মিরপুর চিড়িয়াখানার বিশেষ একটা বৈশিষ্ট্য হল-এখানে নাতিবৃহৎ টিলার উপরে,নিচে,খাঁড়িতে বিভিন্ন জীবজন্তুর শেড!
যে জন্তু যে পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে তাকে সেই পরিবেশই দেয়া হয়েছে!ফলে দর্শনার্থীদের কখনো উঁচুতে উঠতে হয়-কখনো বা নিচে নেমে আসতে হয়।
নিহান তিড়িং বিড়িং করে উঠতে পারছে-রায়হানুরের অবস্থা কাহিল।
-দাদা ভাই আস্তে চল,পড়ে যাবা তো!
-দাদা তুমি কি টায়ার্ড?
-অ্যা লিটল বিট!
-ওকে দ্যান টেক রেস্ট!
-নিহান ভাইয়া!রেস্টের দরকার নাই একটু আস্তে গেলেই হবে।
রায়হানুর রহমানের কানের কাছে কে যেন মিষ্টি করে বলছে!
-স্যার!উঠুন প্লিজ!আমরা ট্রানজিটে আছি!
রায়হান সাহেব পিটপিট করে চোখ মেললেন।জেরিন নামের সেই নীলনয়না স্টুয়ার্ড মেয়েটা!টার্কিশ এয়ার থেমে আছে কেন?বাইরের অন্ধকার সব কোথায় গেল?
কী সুন্দর ঝলমলে রোদ এখন বাইরে!বাহ!দারুন একটা ঘুম হল তো!অনেক দিন তার এমন ঘুম হয়না।ইস্তাম্বুলে ট্রানজিট চলছে।
একমাত্র পুত্র দেশের বাইরে,তার ঢাকার ফ্ল্যাট খাঁ খাঁ শূণ্য পড়ে রয়।
নিহানের সাথে দেখা নেই আজ প্রায় দুই যুগ।কোথায় আছে জানপাখিটা?
বিমানের প্রায় সব যাত্রীই নেমে গেছে।আলতো করে লাবণীকে ডেকে তুললেন রায়হান সাহেব।
তিনি নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।সীট ছেড়ে উঠতেই দেখেন তার সামনে সুদর্শন এক যুবক দাঁড়িয়ে!
-আমি মুহাম্মদ বিন রহমান!এই বিমানের পাইলট!
চমৎকার ইংরেজী বলে ছেলেটা।প্রায় ছয় ফুট লম্বার বিন রহমানকে কেমন ইজিপ্টশিয়ান ইজিপ্টশিয়ান লাগে!
মাথায় ঘন কালো কেশ,কাঁচা হলুদের মত গায়ের রঙ,চোখে দামী রেবন সানগ্লাস!পাইলটের ড্রেসে ওকে অপুর্ব লাগছে!
-নাইস টু সি ইউ!তোমাকে তুমি করেই বললাম ভাই!
-শিওর!আপনারা আমার দাদুর বয়সী!
লাবণী রহমান হঠাৎ অসভ্যের মত কি শুঁকতে শুরু করেছেন?বিব্রত রায়হান সাহেব শুধান,
-এনিথিং রং?
-না!
-কি শুঁকছ অমন করে?
লাবণী রহমান রায়হানুরের কানে কানে ফিসফিস করে কিছু
বললেন!তার ভ্রু কুঁঞ্চিত হল।
বিন রহমান ছেলেটি অতিশয় ভদ্র।
হাত ধরে বুড়োবুড়িকে নামতে সাহায্য করছে সে!
অতি সাবধানে বিমান থেকে নামছেন লাবণী দম্পতি।
লাবণী রহমান আবার লম্বা করে শ্বাস নিলেন।তিনি একটা মিষ্টি ঘ্রান পাচ্ছেন!
সুদর্শন পাইলট ছেলেটি কিঞ্চিৎ বিরক্ত হল মনে হচ্ছে।সে চোখের সানগ্লাস খুলে ফেলে!
-গ্রান্ড মম!এনি প্রবলেম?
লাবণী রহমান তার কথার কোন জবাব দিলেন না!মানুষও এত সুন্দর হয়?তিনি অপলক চেয়ে আছেন বিন রহমানের দিকে!
ছেলেটা স্লাইটলি লক্ষ্মীট্যারা!
অনেকক্ষন ধরে দেখলে বুঝা যায়!
এটা তাকে বাড়তি সৌন্দর্য্য দিয়েছে।
লাবণীর হাতের কব্জি ধরে আছে সুঠাম দেহের সুঠাম কব্জিওয়ালা বিন রহমান!
রায়হান সাহেব একাই নামছিলেন তবু জেরিন মেয়েটা এসে তার হাত ধরল।টার্কিশ এয়ারের সেবার মান অতি উচ্চ-বলতেই হয়।
লাবণী মনে মনে ভাবেন এত সুন্দর ছেলের মা-না জানি কত সুন্দর!তার বাবা দেখতে কেমন কে জানে!অবশ্য ইজিপ্টশিয়ানরা দেখতে এমনিতেই সুন্দর।ইউসুফ নবী তাহলে কত যে সুন্দর ছিলেন!
বিমান থেকে নেমে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে ক্রু বহনকারী গাড়িতে চড়ে বসে পাইলট মুহাম্মাদ বিন রহমান।
লাবণী রহমানের বুকটা ধ্বক করে উঠে!এক গাদা গরম নিঃশ্বাস ছাড়েন তিনি।অকারনেই চোখ দু'টো ঝাপসা হয়ে আসে।ঢাকা ফিরে চশমার কাঁচ বদলাতে হবে এবার।
_________________________
পড়ন্ত বিকেল!
কী সুন্দর ঝকঝকে স্বচ্ছ পরিষ্কার নীলাকাশ।আহা কী শান্তির দেশ নরওয়ে!রায়হান সাহেবের ছেলে অবশ্য বলে ভিন্ন কথা।
তার মূল্যায়ন নরওয়েজিয়ানরা খুবই কনজারভেটিভ,তারা বিদেশীদের সাথে খুব একটা মিশেনা!মনের গভীরে কঠিন বর্ণবাদ লুকিয়ে রাখে।
যৌবনে একাকী দম্ভ নিয়ে চলে।
বুড়া হলে যখন কেউ আর 'পুছে' না তখন যারে কাছে পায় তারে হাতে পায়ে ধরে পানশালায় নিয়ে যায়।
-আমাকে একটু সময় দাও প্লিজ,চল একটু পান করি!
ওরা নিজেরাই নিজেদের দেশকে শান্তির দেশ বলে;বহির্বিশ্ব কেন বলে তা বোধগম্য নয় ইমরানের।হয়ত বৈশ্বিক অন্যান্য সুচকে তারা এগিয়ে!
শুধু বর্ণের কারনে,এশিয়ান 'কালো আদমী' হওয়ার কারনে যোগ্যতা থাকার পরও পুত্র ইমরানের অনেক ভাল ভাল চাকরিগুলো শেষমেষ হয়নি।অথচ ইমরানের গায়ের রঙ ধবধবে সাদা।
হাজার হাজার বিষন্ন,হতাশাগ্রস্ত যুবক যুবতীর দেখা মেলে এই
অসলোতে!তারা ভবঘুরে,ভাদাইম্মা।
রাষ্ট্রের 'ভাদাইম্মা ভাতা' নিয়ে নিয়ে তারা চলে।
বিমান ছুঁয়েছে অসলোর মাটি!
ককপিট থেকে পাইলটের ঘোষনা ভেসে এলো-আজকের এ বিমান যাত্রার ই-সেভেন ও ই-এইট সীটের সম্মানীত সিনিয়র সিটিজেন যাত্রীদ্বয়কে সবার শেষে নামার সনির্বন্ধ অনুরোধ করা হল।
সবার উৎসুক দৃষ্টি লাবণী ও রায়হানুর রহমানের দিকে।
যাত্রীরা সব নেমে গেছে একে একে।
পেসেঞ্জার হোলে এসে দাঁড়ায় সেই বিন রহমান!
-হাউ আর ইউ গ্রান্ড মম?
-ফাইন জাস্ট ফাইন!আই হ্যাড অ্যা গ্রান্ডসন নেমড নিহান!
রায়হান সাহেব এক রাশ বিরক্তি নিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকান।একটু সুযোগ পেলেই নিহানের কথা পেড়ে বসে লাবণী।দিস ইজ ভেরি ব্যাড।
বিন রহমান সবাইকে অবাক করে দিয়ে যে কথাটি বলে;তা শোনার জন্য রায়হান লাবণী দু'জনের কেউ প্রস্তুত ছিলেন না!
-দাদী!তুমি আমাকে চিনতে পারোনি?আই অ্যাম মুহাম্মদ বিন রহমান নিহান ইউর গ্রান্ড সন!
রায়হানুর রহমান ধপাস করে আবার সীটে বসে পড়লেন!
-হোয়াই আর ইউ মেকিং জোক ইয়ং ম্যান?উই আর ইন অ্যা গ্রেট ট্রাবল!
-দাদা!তুমিও?তুমিও চিনতে পারোনি?মনে পড়ে,বাংলাদেশে তুমি আমার নানুবাড়িতে আমাকে দেখতে যেতে?
আমি তোমার কাঁধে চড়তাম!তুমি গান ধরতে-'কারে দেখাব মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া…'!
-ইয়েস!আই হ্যাভ দ্যাট ভিডিও টেকেন বাই ইউর গ্রান্ড মম।গুগুল ফটোসে সব ব্যাক আপ দেয়া আছে।
-আই হ্যাভ দ্যাট ভিডিও……
-কিন্তু কিভাবে?
-বলছি!আমার বয়স তখন ছয়!
উপুর্যপরি একবারের বেশি দু'বার আমাকে দেখতে গেলে ওরা তোমাদের সাথে দূর্ব্যবহার করত
মনে আছে?
শেষ যে বার ফুপিকে সঙ্গে নিয়ে তোমরা গেলে,কত খেলনা,দামী দামী ড্রেস নিয়ে গেলে আমার জন্য ওরা তোমারে ঘর থেকে বের করে দিল!
তুমি চোখ মুছতে মুছতে পুরোনো সে বাড়ির অপ্রশস্ত অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছিলে!
আমি ঘর থেকে চিৎকার করে বলছিলাম-দাদা!আস্তে নামো,
অন্ধকার,পড়ে যাবা কিন্তু!
সেই তোমাদের সাথে আমার শেষ দেখা-সিকি শতাব্দী আগে।
মা আমাকে চিরদিন বাবা থেকে,
দাদা দাদী থেকে,ফুপি থেকে অদেখা করেই রাখলেন!আমার কচি হৃদয়ের এই কষ্টগাঁথাগুলো তাকে বলা হয়নি-
বলবও না কোনদিন।
হঠাৎ সীটের উপর ভারি কিছু পতনের শব্দ হল।মিসেস লাবণী রহমান এতক্ষন এক ঘোরের মধ্যে ছিলেন।ঘোর কেটে যেতেই তিনি ফেইন্ট হয়ে পড়ে গেলেন।
স্টুয়ার্ড জেরিন এক দৌড়ে কেবিন থেকে ঠান্ডা পানি এনে জল ঝাপটা দিল!নিহান আস্তে আস্তে তার দাদীকে সীটে শুইয়ে দিল।
দাদীর পায়ের তলীতে ঠান্ডা পানি দিয়ে মেসাজ করছে পাইলট নিহান!
তার হার্টবিট,পালস সব স্বাভাবিক।
অকস্মাৎ আনন্দ সইতে না পেরে বুড়ির এই অবস্থা হয়েছে।
নিহান দাদীর পায়ের তলীতে পাগলের মত চুমু দিয়ে যাচ্ছে।
নিহানের সাথে শেষ দেখার দিন দাদী এমনটি করেছিলেন!
_________________________
নিহান আর তার দাদা দাদীকে নিয়ে মাইক্রো ছুটছে!ফাঁকা রাস্তা,
এয়ারপোর্ট থেকে এক ঘন্টার ড্রাইভ ইমরানের বাসা!
আস্তে আস্তে চোখ মেলেন মিসেস লাবণী রহমান!
-কি গো আমরা এখন কোথায়?
-দাদী আমরা এখন তোমার ছেলের ওখানে যাচ্ছি…আর বেশি শুনতে চেওনা তোমার আবার 'প্লেজার স্ট্রোক' হতে পারে-হাঃহাঃহা।
মাইক্রোর স্ট্রেচারে শুয়ে শুয়ে বুড়ি হাসছেন!কী সুন্দর প্রশান্তির হাসি!
রায়হানুর রহমান আস্তে আস্তে শুধান।
-তোর বাবার সাথে কিভাবে সাক্ষাৎ হল বলবি না নিহান?
-বুড়ি যদি স্ট্রোক করে আমার দোষ নাই কিন্ত!
-তাই সই,তুই বল।
-গেল জুনে ইস্তাম্বুলের আয়া সোফিয়া জামে মসজিদে জুম'য়ার নামাজ শেষে মসজিদের গেটে এক মধ্য বয়সী ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা।
-তুই ইস্তাম্বুলে কি করছিলি?
-মা বাংলাদেশ থেকে তুর্কী সরকারের স্কলারশীপ নিয়ে এম এস করতে এসে তার সহপাঠী এক তুর্কীকে বিয়ে করেন।
মিথ্যা বলব না তুর্কী বাবা রমিজ আলিয়া আমায় ভীষণ ভালবাসেন।
তিনি আমার পড়াশোনার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিলেন।
তিনিই আমায় এতদূর আসতে সাহায্য করেছেন।আমার একটা তুর্কী বোন আছে নাম জিনিয়া!
রমিজ আলিয়া বলেন সন্তান সন্তানই হোক সে সৎ কিংবা আপন!সন্তানের পিছনে ইনভেস্ট করলে সন্তান তা সুদাসলে ফিরিয়ে দেয়-আমিও দিচ্ছি।
যা বলছিলাম আয়া সোফিয়া মসজিদের সেই লোকটা এমন ভাবে আমায় দেখছিল যে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।এ ধরনের 'লুক' বা চেয়ে থাকা ইউরোপীয় কালচারের সাথে যায়না।
আমি তাকে বুঝতে পারছিলাম না,
সে কোন ভিক্ষুক না গুপ্তচর না কি কুর্দী টেরোরিস্ট!
তার চেয়ে থাকার মধ্যে কেমন যেন এতিম এতিম একটা ভাব ছিল।আমি গেট থেকে আবার ফিরে গেলাম!
-আপনি আমায় এভাবে দেখছেন যে?
-সরি!এক্সট্রিমলি সরি!বাংলাদেশে আমার একটা পুত্র সন্তান ছিল বড় হলে অবিকল তোমার মত হত!
আমি আমার বাবার নাম জানতাম।
আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল।
-আপনি নিশ্চয়ই ডাঃইমরানুর রহমান না!
-তুমি নিহান?নিহান তো?রক্ত এভাবেই কথা বলে রে বাপ!
এভাবেই কথা বলে।ওই অত লোকের সামনে বাবা আমায় জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদলেন;
উঁচু করে কোলে নিতে চাইলেন।পারলেন না!
লাবণী কোন ফাঁকে স্ট্রেচার থেকে উঠে বসলেন।নিহানের গন্ড,গ্রীবা চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিচ্ছেন তিনি।
বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে নিহানের গায়ের ঘ্রান শুঁকছেন বুড়িটা!
-ভাই তুই ইস্তাম্বুলে পরিচয় দিস নি কেন?
-বুড়ি কয় কি!আমি তাহলে অসলো পর্যন্ত বিমান নিয়ে আসতে পারতাম?
আমার মনের ভিতর তখন উথাল পাথাল ঢেউ।এমনিতেই কিছুক্ষন পরপর চোখ ঘোলা হয়ে গেছে।
কো-পাইলট আমায় প্রচন্ড সাহায্য করেছেন।
অসলোর রাস্তায় রাস্তায় স্ট্রীট লাইট জ্বলে উঠেছে।বিপনীবিতান গুলো আলোয় ঝলমল করছে।ডিজিটাল সাইনবোর্ড গুলো থেকে বাহারি আলোর বিচ্ছুরণ হচ্ছে!
নিহান ও রায়হান দম্পতিকে নিয়ে মাইক্রোখানি তীব্র বেগে ছুটে চলেছে আপন গন্তব্যে
-যেখানে তাদের একমাত্র পুত্র থাকে।
পুত্র তাদের রিসিভ করতে আসবেনা জানতেন না রায়হানুর রহমান!
পুত্রের বদলে পৌত্র এসেছে যাকে তারা আজ দুই যুগ ধরে খুঁজছেন!