- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 422
- Messages
- 6,699
- Reaction score
- 4,363
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
ধূসর বৌভাত
(ফেসবুক হতে সংগৃহীত)
(ফেসবুক হতে সংগৃহীত)
বৌভাতের দিন সন্ধ্যেবেলায় পার্লার থেকে ব্রাইডাল মেকআপ আর্টিস্ট এসে সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়ার সময় আচমকা একটা জোরে হেঁচকি তুলে মুখে চাপা দিয়ে বাথরুমের দিকে ছুটে যায় নববধু নীলাঞ্জনা। তাড়াহুড়োতে মাথার পরচুলা খুলে পড়ে যায় ধবধবে সাদা মার্বেলের মেঝেতে। দৌড়ে এসে সেটা কুড়িয়ে নিজের হাতে তুলে রাখেন অনিমাদেবী।
আমন্ত্রিত আত্মীয় পরিজনরা তখন একে একে আসতে শুরু করেছেন উপহার সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে। ওদিকে সৌরভ ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়নে। যদিও সৌরভ হুইল চেয়ারে, তবু আজ ও শেরওয়ানি পড়েছে, ফেসিয়াল করেছে। নতুন ফ্রেমের চশমাটা পড়েছে। আজ ওর আর নীলাঞ্জনার বৌভাত।
দেরী হচ্ছে দেখে মেকআপ আর্টিস্ট মধু বেশ খানিক্ষণ পর বাথরুমের সামনে গিয়ে দেখে অনিমাদেবী অপেক্ষারত দরজার বাইরে। তখনই দরজা খুলে বেরিয়ে আসে নীলাঞ্জনা। দরজার বাইরে নীলাঞ্জনার মাথায় পরচুলা পরিয়ে দিয়ে ওর থুতনিতে একটা স্নেহের চুমু খান অনিমাদেবী। তার মুখটা হাসি হাসি কিন্তু চোখদুটো ছলছল করছে।
খুব অল্প সংখ্যক মানুষের সমাগমে সান্ধ্য আয়োজন নান্দনিকতায় ভরে উঠলেও ইতিমধ্যেই প্রায় পাঁচটা সাদা রুমাল লাল হয়ে গেছে রক্তে। অনেক চেষ্টা করেও নীলাঞ্জনা নিজেকে সামলাতে পারেনি একটা সন্ধ্যে। প্রবল যন্ত্রণায় কাতর হয়েও সবটা সামলেছে সৌরভ। এই সন্ধ্যেটা ওর প্রেমের পরিণতি তাই ওর দায়িত্ব অনেক। সবাই জানে এ এক অন্য বৌভাত আর এ যেন ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, প্রেমের এক বেনজির উদাহরণ।
একটু রাতেই শেষ হল বৌভাতের অনুষ্ঠান। নরম বিছানার উপর ছড়িয়ে থাকা হাজার গোলাপের পাপড়ির ওপর একাত্ম হল মৃত্যুপথযাত্রী এক নবদম্পতি।
নিজের ঘরে এসে চোখ বন্ধ করে শেষ দু'বছরের স্মৃতির পাতায় আঁচড় কাটেন সম্ভ্রান্ত বনেদি পরিবারের সুশিক্ষিতা গৃহবধু অনিমাদেবী। মনে পড়ে অনেক কিছুই। অল্প বয়সে বিধবা হওয়ার পর একমাত্র ছেলেকে আঁকড়ে বেঁচে থাকতে পেরেছিলেন এতগুলো দিন। টাকা পয়সা নিয়ে কোনওদিন কোনও সমস্যা না থাকলেও একাকিত্বের বেদনা ছেড়ে যায়নি কখনও। নিজের মনের শক্তিকে ব্যবহার করে নিজের মনেই একলা হেসে ওঠেন অনিমাদেবী। একমাত্র ছেলেটা তার, সেও ছেড়ে চলে যাবে আজ নয় কাল চিরতরে। চোখ দুটো মুছে একগ্লাস জল খেয়ে শুতে যাবার সময় নীলাঞ্জনার বাবা শশীবাবু ফোন করলেন।
শশীবাবু- “দিদি, ওরা কি ঘরের ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করেছে?”
দু বছর আগে মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়ালে অস্টিওক্যান্সারের চিকিৎসা করানোর সময় সৌরভের সাথে আলাপ হয়েছিল নীলাঞ্জনার। নীলাঞ্জনা আর সৌরভের ফুসফুসের ক্যান্সার, দুজনেরই থার্ড স্টেজ তখন। স্ট্রেচারে শুয়ে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে যাবার সময় পাশ ফিরে প্রথম দেখা, লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট, পাশাপাশি বেডে কেমোথেরাপি নেওয়ার সময় প্রথম একে অপরের হাত শক্ত করে ধরা, ন্যাড়া মাথায় সেলফি আদান প্রদান, হোয়াটস্যাপে চ্যাট। অনিমাদেবীর মনে পড়ে সেদিনে সৌরভের সেই বিয়ের ইচ্ছে প্রকাশ। পাশের বেডে নাকে নল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা নীলাঞ্জনাকে ইশারায় দেখিয়ে মায়ের প্রতি তার আন্তরিক অনুরোধ। অনিমাদেবীর মনে পড়ে নিজে থেকে শশীবাবুর কাছে গিয়ে নীলাঞ্জনাকে বাড়ির বউ করে নিয়ে আসার প্রস্তাব জানানোর পর শশীবাবুর সেই শিশুসুলভ কান্নার কথা। কিছুতেই ঘুম আসে না অনিমাদেবীর কিন্তু সারাদিনের ধকল আর মানসিক ক্লান্তিতে নিদ্রাচ্ছন্ন হলেন নিজের অজান্তেই।
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ খেয়াল করলেন হাজার হাজার রঙ-বেরঙের রঙিন আলোকছটায় উদ্ভাসিত চারিপাশ, কেউ যেন পালকের স্পর্শে নিদ্রাভঙ্গ করে ওনার। ঘুম ভেঙ্গে উঠে দেখেন আদরের সৌরভ আর স্নেহের নীলাঞ্জনা সামনে দাঁড়িয়ে, ওরা দুজনে মাথা ঝুঁকিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলে- “এবার অনুমতি দাও মা, আমরা চলে যাই তারাদের দেশে।"
ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলে ভেসে রাত পেরিয়ে ভোরের সূর্য উঁকি দেয় উঠোনে। চোখ খুলে মন ছুটে যায় সৌরভ আর নীলাঞ্জনার ঘরে। নিজ মনের কুডাকে সাড়া না দিয়ে নিজেকে ভুল প্রমাণ করতে এগিয়ে যান সৌরভের ঘরের দিকে। ওদের ঘরের দরজা তখন ভেজানো, আলতো টোকায় জানান দিয়ে ফুলসজ্জার পরদিন নিজের ছেলের ঘরে ঢুকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন অনিমাদেবী।
একে অপরের হাত ধরে দুটো ভালোবাসার মানুষ তখন নিজেদের পার্থিব শরীরদুটো ফুলসজ্জায় সাজিয়ে বিলীন হয়ে গেছে অনেক অনেক দূরে। অকালে ও অসময়ে। এমন সময় সেখানে এসে উপস্থিত হলেন শশীবাবু। আস্তে আস্তে জমায়েত হন পাড়া প্রতিবেশী, স্বজন আর বান্ধবরা। বেশ কয়েক ঘন্টা পর শবদেহ দুটো শ্মশানের দিকে যাত্রা করে। অনিমাদেবী দুর থেকে দাঁড়িয়ে দেখেন, অনুভব করেন দু’পায়ের পাতার ওপর সৌরভ আর নীলাঞ্জনার হাতের স্পর্শ। স্পষ্ট শুনতে পান ছেলে বৌমার কাতর আর্জি- "এবার তবে অনুমতি দাও মা। চললাম আমরা না ফেরার দেশে। ভালো থেকো তোমরা। বিদায়।"
বিহ্বল দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করে দুফোঁটা চোখের জল ফেলতে ফেলতে অনিমাদেবী বলে উঠলেন- “আবার নতুন করে আমার কাছে ফিরে আসিস অথবা ডেকে নিস আমায় তোদের কাছে। বেশী দেরী করিস না। আমি তোদের ডাকের অপেক্ষায় থাকলাম।“