Collected দ্বিধা

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
425
Messages
6,740
Reaction score
4,462
Points
3,963
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
দ্বিধা

মূল লেখকঃ সুবর্না শারমিন নিশী






ঢাকার উত্তরের এক অভিজাত ফ্ল্যাটে আজ যেন রণক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। খাটের ওপর পাহাড় সমান কাপড়ের স্তূপ। লাল বেনারসি, ফিরোজা রঙের কাতান, দুধসাদা জামদানি আর মভ কালারের এক ভারী কাজের লেহেঙ্গা। ঐশী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গলার কাছে একবার বেনারসিটা ধরছে, আবার সেটা সরিয়ে লেহেঙ্গাটা গায়ে দিয়ে দেখছে।

তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার ছোট বোন তিশা আর মা রেহানা বেগম। রেহানা বেগমের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।

-মা ঐশী, কাল তোর আকদ। আজ অন্তত ড্রেসটা ফাইনাল কর। পার্লার থেকে লোক আসবে সাজাতে, তারা জানতে চেয়েছে তুই কি পরবি। গয়না তো ওভাবেই সেট করা হবে।

ঐশী আয়নার দিকে তাকিয়ে মুখটা একটু কুঁচকে বলল,
-মা, বেনারসিটা পরলে কেমন যেন খুব ট্র্যাডিশনাল লাগে। সামিরের মা আবার সেকেলে পছন্দ করেন। কিন্তু আমার মনে হয় কাতানটা পরলে আমাকে অনেক স্লিম লাগবে। আবার দেখো, লেহেঙ্গাটা তো এখন ট্রেন্ড। একবার মনে হচ্ছে লেহেঙ্গা পরি, আবার মনে হচ্ছে বিয়েতে শাড়ি না পরলে কি চলে?

তিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
-আপু, তুই গত ছয় দিনে দশবার মত বদলেছিস। কাল যখন সামির ভাইয়ারা আসবে, তখন কি তুই তোয়ালে জড়িয়ে বসে থাকবি?

ঐশী ঝাড়ি দিয়ে উঠল,
-তুই বুঝবি না। বিয়ে মানুষ একবারই করে। আমি কি হুটহাট যা ইচ্ছা পরে ফেলব?

নিচতলার ড্রয়িংরুমে ঐশীর বাবা মনসুর সাহেব ফোন কানে দিয়ে ঘামছেন। ওপাশে সামিরের বড় ভাই রিয়াদের গম্ভীর কণ্ঠস্বর।
-চাচা, ডেকোরেশনের লোকজন এসে বসে আছে। ওরা জানতে চাইছে স্টেজের ব্যাকড্রপ নীল হবে না কি গোল্ডেন? ঐশী নাকি কাল রাতে ফোন করে বলেছে ওটা চেঞ্জ করতে। অথচ কার্ডে আমরা নীল থিম দিয়েছি।

মনসুর সাহেব কুন্ঠিত গলায় বললেন,
-বাবা রিয়াদ, কিছু মনে করো না। মেয়েটা আমার একটু বেশি খুঁতখুঁতে। ও বলছিল নীল রংটা নাকি ওর গায়ের রঙের সাথে ঠিক যাবে না। তোমরা যদি একটু কষ্ট করে গোল্ডেনটা করে দাও...

-চাচা, এটা কি ইয়ার্কি! রিয়াদের গলায় বিরক্তি স্পষ্ট। গয়না পাল্টানো হলো, খাবারের মেনু থেকে বিরিয়ানি বাদ দিয়ে কাচ্চি করা হলো কারণ ঐশী নাকি ডায়েট করবে। এখন স্টেজও পাল্টাতে হবে? সামির কিন্তু খুব আপসেট।

মনসুর সাহেব ফোন রেখে কপালে হাত দিয়ে বসে রইলেন। তিনি জানেন সামির ছেলেটা হীরের টুকরো। শান্ত, ধৈর্যশীল এবং সফল একজন ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু ঐশীর এই "একবার এটা, একবার ওটা" স্বভাবটা যে বিড়ম্বনার পর্যায়ে চলে গেছে, সেটা তিনি কাউকে বোঝাতে পারছেন না।

রাত বারোটা। হঠাৎ ঐশী ডুকরে কেঁদে উঠল। সে এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে বিয়েতে সবুজ জামদানি পরবে। কিন্তু ওটা তো কেনা হয়নি! সে এখন চায় এই রাতেই কোনোভাবে কোনো দোকান খুলে জামদানিটা আনা হোক।

মা রেহানা বেগম চিৎকার করে উঠলেন,
-তুই কি পাগল হয়েছিস ঐশী? রাত বারোটায় এখন জামদানি কোত্থেকে আসবে? তোর জন্য কি এখন সব শাড়ির দোকান খোলা হবে?

ঐশী জেদ ধরল,
-তাহলে আমি বিয়ের আসরে বসব না। আমার মনে হচ্ছে বেনারসি পরলে আমাকে দেখতে কুৎসিত লাগবে।

এই খবর যখন সামিরের কানে পৌঁছালো, তখন সে তার বন্ধুদের সাথে আড্ডায় ছিল। সে ফোনটা নিয়ে সোজা ঐশীকে করল।
-ঐশী, তুমি কি সিরিয়াস? একটা কাপড়ের জন্য তুমি বিয়েতে বসবে না বলছ?

ঐশী ওপাশ থেকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
-সামির, তুমি বুঝছ না কেন? আমার ইমেজটা নষ্ট হয়ে যাবে। একবার মনে হচ্ছে লেহেঙ্গাটাই ঠিক ছিল, কিন্তু বেনারসিটা বেশি দামী...

সামির শান্ত গলায় বলল,
-ঐশী, কাপড়ের রঙের চেয়ে মানুষের মনের স্থিরতা বেশি জরুরি। তুমি আজ আট মাস ধরে শুধু ড্রেস, গয়না আর ভেন্যু নিয়ে আমাদের সবাইকে নাচিয়েছ। তুমি আসলে সামিরকে বিয়ে করতে চাও না, তুমি সম্ভবত একটা পারফেক্ট লোক দেখানো বিয়ে চাও। কিন্তু জীবনের সব কিছুতে অপশন থাকে না ঐশী। আমি তোমাকে এই অনিশ্চয়তার হাত থেকে মুক্তি দিচ্ছি। এই বিয়েটা হচ্ছে না।

লাইনটা কেটে গেল। ঐশী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার মনে হলো যাক, জামদানিটা আর কিনতে হলো না। কিন্তু যখন বুঝতে পারল সামির আসলেও আর ফিরবে না, তখন কান্না শুরু করল। সেই কান্না সামিরের জন্য নয়, বরং সব ভন্ডুল হয়ে যাওয়ার অস্বস্তিতে।

সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। আট বছর অনেক লম্বা সময়। সামির এখন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কান্ট্রি হেড। তার স্ত্রী তুবা একজন শান্ত প্রকৃতির স্থপতি। তাদের ঘর আলো করে এসেছে দুই সন্তান , ছয় বছরের আরিয়ান আর চার বছরের সারা।

শনিবারের রাত। তারা সবাই এসেছে বনানীর নামকরা রেস্টুরেন্ট ‘হেরিটেজ ডাইন’ এ। এখানকার পরিবেশটা বেশ রাজকীয়। ঝাড়লণ্ঠন আর হালকা সেতারের সুর বাজছে।
সামির মেনু হাতে নিয়ে এক নজরে চোখ বুলাল। তুবা বলল, -আজ কি আমরা থাই খাব না কি কন্টিনেন্টাল?

সামির হেসে বলল,
-আরিয়ান যেহেতু পাস্তা পছন্দ করে, আমরা কন্টিনেন্টালই নিই। আর তোমার তো স্টেক ভালো লাগে।

দশ মিনিটের মধ্যে অর্ডার কমপ্লিট। সামির সবসময়ই দ্রুত পারফেক্ট সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করে। সে জানে সময় নষ্ট করা জীবনের সবচেয়ে বড় বিলাসিতা।

খাবার আসার অপেক্ষা করছে তারা। ঠিক তখনই সামিরের চোখ গেল তাদের সামনের বড় টেবিলটার দিকে। সেখানে একজন নারী একা বসে আছেন। সামনে একটা মেনু কার্ড খোলা। সামির চমকে উঠল। ঐশী!

আট বছর আগের সেই মেয়েটি। চেহারায় বয়সের হালকা ছাপ পড়েছে, চোখে চশমা। কিন্তু সেই চিরচেনা অস্থিরতা এখনো তার চোখেমুখে।

ঐশী একা নয়, তার ফোনে কেউ একজন আছে। সে উচ্চস্বরে কথা বলছে, সম্ভবত স্পিকারে।
-শোন রিনি, আমি কি মাটন রেজালা অর্ডার দেব? কিন্তু আমার তো আবার এসিডিটির সমস্যা। আচ্ছা, যদি চিকেন কারি নিই? না না, ওটা তো বাসায়ই খাওয়া হয়। একবার মনে হচ্ছে স্যুপ আর সালাদ খেয়ে উঠে যাই, আবার মনে হচ্ছে একটু হেভি কিছু খাই। ওয়েটার! শুনছেন?

ওয়েটার এগিয়ে আসতেই ঐশী আবার তাকে থামিয়ে দিল। -এক সেকেন্ড। আপনি যে স্পেশাল প্লাটারটার কথা বললেন, ওটাতে কি ঝাল বেশি? আমি আবার ঝাল একদম নিতে পারি না। যদি ঝাল কম হয় তাহলে নেব। না থাক, তার চেয়ে বরং আপনি একটু ওয়েট করেন, আমি আরেকটু দেখি।

সামির দেখল, প্রায় পনেরো মিনিট ধরে ঐশী শুধু মেনুর পাতা ওল্টাচ্ছে। একবার সে ভেজিটেবল দেখছে, একবার গ্রিল। ওয়েটারটা কয়েকবার এসে ঘুরে গেল, তার মুখে বিরক্তির আভা স্পষ্ট।

সামিরের টেবিলে খাবার চলে এল। গরম ধোঁয়া ওঠা স্টেক আর পাস্তা। বাচ্চারা আনন্দ করে খেতে শুরু করল। তুবা গল্প করছে তাদের সামনের বাগানটা নিয়ে। কিন্তু সামিরের অবচেতন মন ঐশীর অস্থিরতার দিকেই পড়ে ছিল।

খাওয়ার মাঝখানে সামির খেয়াল করল, ঐশী এখনো ফোনে তর্ক করছে।
-রিনি, আমার লাইফটা এমন কেন বল তো? কোনো কিছুই যেন ঠিকঠাক মেলে না। এই যে দেখ, আজও ডিনার করতে আসলাম, কিন্তু এখনো বুঝে উঠতে পারছি না কি খাব? আচ্ছা, আমি কি সিঙ্গেল আছি বলেই আমার সিদ্ধান্ত নিতে এত সমস্যা হয়? সঙ্গে কেউ একজন থাকলে হয়তো সে আমাকে পরামর্শ দিতে পারতো।

সামির চমকে উঠল। ঐশী এখনো সিঙ্গেল! তার মানে বিয়ের সেই ঘটনার পর সে হয়তো আরও কত মানুষকে এভাবে দোটানায় ফেলে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তাদের কেউই হয়তো তার এই অস্থিরতার সাথে মানিয়ে নিতে পারেনি।

সামিরদের খাওয়া শেষ। বিল মেটানো হলো। তুবা বাচ্চাদের নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারা যখন ঐশীর টেবিলটা পার হয়ে যাচ্ছিল, তখনো ঐশী ওয়েটারকে ডেকে বলছে,
-ভাই, শুনুন। চিকেনটা থাক, আপনি বরং আমাকে মাশরুমের ওই আইটেমটা দিন... না না, দাঁড়ান! ওটাতে কি রসুন বেশি? তাহলে মাটনটাই দেন। আচ্ছা দাঁড়ান...

ওয়েটার অসহায়ের মতো মাথা চুলকাচ্ছে। ঐশীর চোখ একবার সামিরের দিকে পড়ল, কিন্তু সে চিনতে পারল না। সে তখন মেনু কার্ডের চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে। তার কাছে এখন খাবারের স্বাদের চেয়ে সঠিক খাবার বাছাই করাটা একটা বিশাল যুদ্ধ।

রেস্টুরেন্টের বাইরে শীতল বাতাস বইছে। সামির বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল। গাড়ির কাছে গিয়ে সে তুবাকে দেখল। তুবা বাচ্চাদের সিটবেল্ট বেঁধে দিচ্ছে। তার প্রতিটি নড়াচড়ায় একটা স্থিরতা আছে, একটা নিশ্চয়তা আছে।

সামির আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে পড়ে গেল আট বছর আগের সেই দিনটির কথা। সেদিন ঐশী ড্রেস নিয়ে দোটানায় ছিল বলে সামির কষ্ট পেয়েছিল। আজ সে বুঝতে পারছে, ওটা ছিল সৃষ্টিকর্তার এক অশেষ রহমত।
যদি সেদিন সামির ঐশীর অস্থিরতাকে এক পাশে সরিয়ে গদগদ হয়ে বিয়েটা করত, তবে আজ হয়তো সে-ও ওই ওয়েটারটার মতো কোনো এক রেস্টুরেন্টে বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। তার পুরো জীবনটা কাটত "একবার এটা, একবার সেটা" করার পেছনে। জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো হয়তো এভাবেই ঝুলে থাকত।সামির মনে মনে স্রষ্টাকে অশেষ ধন্যবাদ দিল। সে বুঝতে পারল, সঠিক সময়ে ভুল মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে আসাটাও এক বড় নেয়ামত।

গাড়িতে উঠে সে তুবার হাতটা আলতো করে ধরল।
তুবা অবাক হয়ে বলল,
-কি হলো হঠাৎ!
সামির মিষ্টি হেসে বলল,
-কিছু না। শুধু ভাবছি, আমি কতটা ভাগ্যবান যে তুমি আমার জীবনে এসেছো।

গাড়ি স্টার্ট দিল সামির। পেছনের রেস্টুরেন্টের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ঐশী এখনো মেনু কার্ডের পাতা ওল্টাচ্ছে। রাত বাড়ছে, কিন্তু তার অর্ডার দেওয়া আর শেষ হচ্ছে না।
 
Back
Top