Collected দ্বায়িত্ব

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
450
Messages
7,191
Reaction score
5,373
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
দ্বায়িত্ব

মূল লেখকঃ মতিউর নিজামী






দেখতে দেখতে পাঁচ বছরে তিনবার পদোন্নতি হয়েছে। মাসে পঁচিশ হাজার টাকা বেতন দিয়ে যে চাকরি শুরু করেছিলাম, আজ সেই বেতন প্রায় দুই লাখ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে।

এই পাঁচ বছরে জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। একসময় ছোট্ট একটা ভাড়া বাসায় থাকতাম, এখন বসুন্ধরায় নিজের পাঁচ রুমের ফ্ল্যাট। প্রতিটি রুমেই এসি। অফিস থেকে একটি লাল রঙের গাড়িও পেয়েছি। অফিসের কাজের বাইরে ছুটির দিনেও ড্রাইভারসহ গাড়িটা আমার কাছেই থাকে।

সময় বদলেছে, বদলেছে নীলা—আমার স্ত্রীর জীবনও। বিয়ের সময় তার কানে ছিল ছোট্ট এক জোড়া দুল। এখন আলমারিতে বিভিন্ন ডিজাইনের চারটি নেকলেস, কয়েক জোড়া বালা, আর আংটির সংখ্যা হাতের আঙুলের চেয়েও বেশি। বেশিরভাগই দুবাই থেকে আনা।

আমার এই পরিবর্তন দেখে সেদিন গ্রাম থেকে আসা জব্বার চাচা হাসতে হাসতে বললেন,

—আল্লাহ যখন দেন, দুই হাত ভরে দেন। আমার অনেক ইচ্ছা অভাবের কারণে পূরণ হয়নি। কিন্তু তোর এই সুখ-সমৃদ্ধি দেখে আমারও শান্তি লাগে।

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝেছেন, টাকার অভাব আমার নেই। বসুন্ধরায় যার নিজের ফ্ল্যাট আছে, তাকে অভাবী বলা যায় না।

তবে একটা বিষয় খেয়াল করেছেন? এতক্ষণ আমি আমার সন্তানদের কথা একবারও বলিনি।

আমার এক ছেলে, এক মেয়ে।

সেদিন বিকেল পাঁচটায় অফিস থেকে ফিরতেই নীলা বলল,

—শোনো, রায়হান বলেছে সে এবার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবে না।

আমি চমকে উঠলাম।

—কেন?

—ও কিছুতেই খুলে বলছে না।

রায়হানকে আমি চিনি। সে একবার যা ঠিক করে, সহজে সেখান থেকে সরে না। গত পাঁচ বছরে ছেলে বা মেয়ে যা চেয়েছে, সাধ্যের মধ্যে থাকলে কখনো ফিরিয়ে দিইনি।

পরদিন সকালে ওর ঘরে গেলাম। তখনও ঘুমিয়ে ছিল। কপালে হাত রাখতেই চোখ মেলে তাকাল।

আমি হাসিমুখে বললাম,

—শুনলাম পরীক্ষা দেবে না?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,

—মাকে তো কারণ বলেছি। আপনাকে বলেনি?

—না।

সে মোবাইল বের করে একটি গাড়ির ছবি দেখাল।

—এই মডেলের একটা লাল গাড়ি চাই। আমার কয়েকজন বন্ধুর আছে। আমার থাকবে না কেন? যদি না পাই, তাহলে পরীক্ষাও দেব না।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

মুখে বলতে চেয়েছিলাম, "ঠিক আছে, কিনে দেব।" কিন্তু কথাটা আর বলতে পারলাম না।

পরের দুই সপ্তাহে বিষয়টা আমার ঘুম কেড়ে নিল।

খোঁজ নিয়ে জানলাম, গাড়িটির দাম এমন যে কিনতে হলে আমাকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হবে। ঋণ হয়তো একদিন শোধ হয়ে যাবে। কিন্তু আজ এই বয়সে ছেলের এমন বিলাসী চাহিদা পূরণ করলে, আগামী দিনের আরও বড় চাহিদাগুলো কি সামলাতে পারব?

শুক্রবারে সাধারণত নীলা আর মেয়েটা শপিংয়ে বের হয়। কিন্তু সেদিন কেউ বের হয়নি।

নীলা এসে বলল,

—রায়হান একদম চুপচাপ। কাল রাতেও কিছু খায়নি। সারাদিন কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলেনি।

সেদিন প্রথমবার নিজেকে সত্যিকারের অসহায় মনে হলো। এত অর্জন, এত সাফল্য—সব যেন ম্লান হয়ে গেল।

মনটা খুব ভারী হয়ে ছিল। তাই ড্রাইভার রফিক ভাইকে বললাম,

—চলেন, কোথাও একটু ঘুরে আসি।

তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,

—স্যার, চলেন সদরঘাটে যাই। নদীর বাতাসে মনটা হালকা হয়ে যাবে।

এক ঘণ্টার যানজট পেরিয়ে আমরা সদরঘাট পৌঁছালাম। কিন্তু নদীর পাড়ে না গিয়ে রফিক ভাই আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন।

দুই রুমের ছোট্ট ভাড়া বাসা। এসি নেই। কিন্তু খোলা জানালা দিয়ে নদীর বাতাস ঢুকে পুরো ঘরটা শীতল করে রেখেছে।

রফিক ভাইয়ের স্ত্রী আর ছোট ছেলে তুহিন আমাকে দেখে খুব খুশি হলো।

হঠাৎ মনে হলো, খালি হাতে চলে এসেছি। লজ্জা লাগল। তাই তুহিনের হাতে এক হাজার টাকার একটি নোট দিতে গেলাম।

সে মাথা নেড়ে বলল,

—না, লাগবে না।

রফিক ভাই ইশারা করার পর অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিল।

খিদে ছিল না। তবু ভাবির জোরাজুরিতে ভাত খেলাম। নদীর ছোট মাছ আর ডিম ভাজি।

খেতে খেতে মনে হচ্ছিল, অনেক দিন এমন তৃপ্তি নিয়ে খাইনি।

খাওয়ার পর জানতে পারলাম, তুহিনের বহু দিনের ইচ্ছা—একদিন বাবার চালানো গাড়িতে বসে পুরো ঢাকা শহর ঘুরবে। কিন্তু সুযোগ হয়নি কখনো।

আমি বললাম,

—চলো, আজ তোমার সেই ইচ্ছা পূরণ করি।

সারাটা বিকেল তুহিনকে নিয়ে শহর ঘুরলাম।

নতুন কিছু দেখলেই সে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। কখনো বলে, "আঙ্কেল, একটু গাড়ি থামাবেন?" কখনো আবার শুধু জানালা দিয়ে মুখ বের করে বাতাস নেয়।

ওর চোখের সেই আনন্দ দেখে আমি রফিক ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম,

—এত অল্পতেই ও এত খুশি হয় কীভাবে?

রফিক ভাই হেসে বললেন,

—ছোটবেলা থেকেই একটা কথাই শিখিয়েছি। আমাদের যা আছে, সেটুকুই অনেক মানুষের স্বপ্ন। তাই যা পেয়েছ, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে শেখো।

রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল।

তুহিনকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে নিজের বাসার পথে ফিরছিলাম। গাড়ির ভেতরে বসে বারবার রায়হানের মুখটা ভেসে উঠছিল।

হঠাৎ নিজের কাছেই প্রশ্ন করলাম—

আমি কি কোনো দিন ছেলেকে শিখিয়েছি, পৃথিবীতে এমন অসংখ্য মানুষ আছে, যাদের কাছে আমাদের এই জীবনটাও স্বপ্নের মতো?

না।

আমি শুধু ভেবেছি, তার সব চাওয়া পূরণ করলেই সে সুখী হবে।

গাড়ি তখন ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত ছুটে চলেছে।

আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে বুঝলাম, সন্তানের জীবনও এই গাড়ির মতো শুধু সামনে ছুটতে শেখালে হবে না। তাকে এটাও শেখাতে হবে—কোথায় থামতে হয়, কতটুকু পেলে কৃতজ্ঞ হতে হয়।

হয়তো সেই শিক্ষাটাই একজন মানুষকে সত্যিকারের মানুষ বানায়। যদি না শেখাতে পারি, তবে সেই দায়ভার আমার, বাবা হিসেবে একান্তই আমার।

সমাপ্ত
 
Back
Top