- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 439
- Messages
- 6,909
- Reaction score
- 4,834
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
দমদমের ঐতিহাসিক চায়ের দোকান
(জনাব শরীফ হাসানের লেখা, ফেসবুক হতে সংগৃহীত)
(জনাব শরীফ হাসানের লেখা, ফেসবুক হতে সংগৃহীত)
দমদম রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুকে বসে আছি। জুতার তলায় কাচের গুঁড়ো মচমচ করছে। চারিদিকে ধ্বংসের চিহ্ন—একটা সাইক্লোন যেন একাট্টা হয়ে শুধু দোকানপাট গুলোর ওপর দিয়েই গিয়েছে।
ইট-পাথরের স্তূপ, টিনের তালি দেয়া তক্তার ভীড়, ছেঁড়া ত্রিপল হাওয়ায় উড়ছে আর নামছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই সর্বনাশের মধ্যেও কিছু মানুষের মুখে চাপা হাসি লেগে আছে। ফিকফিক করে হাসছে সবাই যেন দারুণ কোনো মজার ব্যাপার ঘটে গেছে। ব্যাপারটা কী, বুঝতে একটু সময় লাগল।
সেই সাত সকাল বেলায় শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে দমদম নেমেছি। উদ্দেশ্য একটাই—ইতিহাস বিখ্যাত চা খাওয়া। কলকাতায় বেড়াতে এসে বন্ধু ইন্দ্রজিত বলেছিল, “দমদম স্টেশনে একটা চায়ের দোকান আছে, কেবল চা না, তুই দেখবি একশো বছর আগের বিজ্ঞাপন।” শুনেই টিকিট কেটে বসে পড়লাম লোকাল ট্রেনে।
স্টেশনে নেমেই চক্ষু চড়কগাছ। প্ল্যাটফর্মের প্রায় সব দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একেবারে কিছুই বাদ রাখে নাই। যে যার জিনিসপাতি সরাচ্ছে, কেউ ভাঙা শোকেসের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকাচ্ছে, কেউ বা জোড়াতালি দিয়ে বেঞ্চ বানানোর চেষ্টা করছে।
পাশে দাঁড়ানো এক চা-দোকানের মালিক বললেন, কাল রাতে ‘তাণ্ডব’ বয়ে গিয়েছে। কী তাণ্ডব? শুনলাম পুরো ব্যাপারটা। ব্যাকগ্রাউন্ড না জানলে মজাটা বোঝা যাবে না, তাই আগে সেটাই বলে নেই।
গত কয়েক বছর ধরে দমদম স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দোকানপাট এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে ট্রেন আসার সময় হাঁটার জায়গা পাওয়া যেতো না। ফুল, ফল, চা, সিঙাড়া, জুতার ফিতা, মোবাইল রিচার্জ—সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল ইকোসিস্টেম।
রেলওয়ে বারবার বলে আসছিল, বেআইনি দখল করা দোকান সব ভাঙা হবে। কিন্তু স্থানীয় নেতা থেকে শুরু করে প্ল্যাটফর্মের কুকুরটা পর্যন্ত কেউ তাদের কথা কানে তুলেনি।
শেষমেশ গত সপ্তাহে রেলওয়ে বোর্ড থেকে কড়া নির্দেশ এল, যে করেই হোক প্ল্যাটফর্ম ক্লিয়ার করতে হবে, নাহলে কর্মকর্তা সবার কপালে শনি আছে।
কাল রাতে হঠাৎ করেই ভয়ংকর এক অভিযান শুরু হলো। পুলিশ, রেলওয়ে, শ্রমিক বাহিনী—যেন যুদ্ধ ঘোষণা করে দিল। অনেক দোকানদার আগে থেকে খবর পেয়ে মালপত্র সরিয়ে নিয়েছিল।
যারা পায়নি, তাদের কপালে জুটেছে ইট আর পাথর। কিন্তু এই তাণ্ডব চলাকালীন সময়ে নাকি আচমকা একটা ফোন কল এসেছিল।
জানা যায়, কলকাতার এক হেরিটেজ-পাগল কর্মকর্তা নাকি খবর পেয়ে রেলওয়ের বড় কর্তাকে ফোন করে বলেছিলেন, “স্যার, দমদমের দুই আর তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে যে চায়ের দোকানটা আছে, ওটার ভেতরে ইংরেজ আমলের চায়ের বিজ্ঞাপন লাগানো আছে। ওটা একদম ছোঁবেন না, ঐতিহাসিক জিনিস।”
কর্তা একটু থতমত খেয়ে নির্দেশ দিলেন, ওই নির্দিষ্ট দোকানটা বাদ দিয়ে বাকি সব গুঁড়িয়ে দিতে। এই কারণেই স্টেশনের বাকি দোকান ভ্যানিশ, আর ওই একমাত্র দোকানটা অক্ষত।
ব্যাস, এই খবরটা জানাজানি হতেই সকালবেলা লোকজনের মুখে চাপা হাসি ফুটেছে। বোঝেন নীতি—কুমিরের পেটে হাতি, নখের ডগায় রেহাই। ধ্বংসের মহড়ায় ছাড়পত্র পেয়েছে স্রেফ কয়েকটা ফ্রেমবন্দি কাগজ।
আমিও সেই বিশেষ চায়ের দোকানে বসব বলেই কষ্ট করে এতদূর এসেছি। এই দোকানটি ঠিক দুই ও তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের মাঝ বরাবর অবস্থিত।
প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে এখনো ভেকু মেশিনের দাঁতের দাগ তাজা। কিন্তু ওই দোকানের কাঠের কাঠামোটা কীভাবে যেন টিকে আছে, যেন ঝড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাহসী বুড়ো।
দোকানের নাম বলে তেমন কিছু নেই, অনেকের কাছে ‘সি দে-র চায়ের দোকান’ নামেই পরিচিত। গবেষক দেবদত্ত গুপ্ত লিখেছিলেন—‘রেলের ইংরেজ আমলের ক্যাটারিং কন্ট্রাক্টর এইচ সি দে দমদমের এই দোকানটি চালাতেন। তিনি বিনিপয়সায় চা-ও দিতেন রেলযাত্রীদের। তাঁর সময় থেকেই বিজ্ঞাপনগুলি রয়ে গিয়েছে এখানে।’
কথাটা পড়েই আমার ভেতরকার ইতিহাস-পোকা নড়েচড়ে বসেছিল। ভাবলাম, বিনা পয়সায় চা খাওয়ানোর যে সংস্কৃতি, সেটাও তো চমৎকার।
এইচ সি দে বাবু বোধহয় মানবতায় বিশ্বাস করতেন, কিংবা মার্কেটিং কায়দায় ফ্রি চা খাইয়ে ব্র্যান্ড বানাতেন—যা-ই হোক, আমার শ্রদ্ধা জানাইতে তো আপত্তি নাই।
এতক্ষণ ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বুকের ভেতর উৎকণ্ঠাটা দলা পাকিয়ে ছিল। দোকানের ভেতরের দেয়ালে সেই চারটি প্রাচীন বিজ্ঞাপন টাঙানো আছে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।
রাতের তাণ্ডবে যদি গায়েব হয়ে যায়! দোকান তো টিকে গেল, কিন্তু বিজ্ঞাপনগুলো যদি কেউ ছিঁড়ে ফেলে থাকে, তাহলে আমার এতদূর আসা একেবারে মাটি।
দোকানের ভেতরে একটু ঠাহর করে দেখি—পিছনের কাঠের দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে চারটি বিজ্ঞাপন ঠিক আগের মতোই টাঙানো আছে। চারদিকের ধ্বংসলীলার মাঝে এই সামান্য অক্ষত অবস্থাটুকু দেখে কেমন যেন নিশ্চিন্ত অনুভূতি হলো।
বিজ্ঞাপন চারটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমি সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটছি।
প্রথমটার শিরোনাম, ‘চা পানের উপকারিতা’। নিচে একেবারে ঊনিশ শতকী বাংলায় লেখা, চা কীভাবে হজমশক্তি বাড়ায়, শরীর সতেজ রাখে আর বাঙালির মেজাজ চাঙ্গা করে—একেবারে বুলেট পয়েন্ট। যেন আজকের দিনের হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ডের পূর্বপুরুষ।
দ্বিতীয়টা, ‘চা প্রস্তুত করিবার প্রণালী’, তাতে চা বানানোর স্টেপ-বাই-স্টেপ গাইড, পাত্র ধোয়া থেকে শুরু করে দুধের পরিমাণ—সবিস্তারে বর্ণনা করা।
তৃতীয়টিতে লেখা, ‘গরম চা: যাহাতে নাহিক মাদকতা দোষ / কিন্তু পানে করে চিত্ত পরিতোষ।’ কী দারুণ ছন্দ! চায়ের কোনো মাদকতা নেই, অথচ মনকে পরিতৃপ্ত করে—এই সরল অথচ জোরালো বার্তা। (ক্যাফেইনের ব্যাপারটা তখন ওভাবে কেউ জানতো না আর কি!)
চতুর্থ বিজ্ঞাপনটিতে সম্ভবত চায়ের দাম আর পাওয়ার ঠিকানা দেওয়া ছিল, ধুলো জমে কিছু অংশ ঝাপসা হয়ে গেছে।
আমি দোকানের বেঞ্চে বসে ভাবছি, এই যে গরম চা খেতে খেতে একশো বছর আগের বাঙালি যাত্রীরাও দাঁড়িয়ে থাকতেন, তারা কি কখনো ভেবেছিলেন তাঁদের বিজ্ঞাপন একদিন বাংলাদেশ থেকে আসা এক টুরিস্টের মন ভালো করে দেবে?
ইতিহাস যে কত অদ্ভুত জিনিস। বিজ্ঞাপনগুলো তো আসলে ভারতবর্ষে চা জনপ্রিয় করার এক বিশাল কৌশলের অংশ। চিন থেকে চা এনে প্রথমে সাহেবরাই খেতেন, পরে বাঙালির রক্তে চা মেশাতে শুরু হয় উনিশ শতকের শেষভাগে।
রেলস্টেশন ছিল সেই ক্যাম্পেইনের জমজমাট ময়দান। দমদমের এই বিজ্ঞাপনগুলো সেই চা-বিপ্লবের নীরব সৈনিক।
আমি এক কাপ চা অর্ডার করলাম। দোকানের বর্তমান মালিক, ছোটখাটো এক মাঝবয়সি লোক, হাসিমুখে চা বানালেন।
কাপে চুমুক দিয়ে মনে হলো, ইতিহাস পান করছি। মিষ্টি ঠিকঠাক, লিকারও দারুণ। ফ্রি তে না পেলেও দাম এতটাই সামান্য যে বুঝলাম, এইচ সি দে-র উত্তরসূরিরা এখনো রবিনহুডগিরি ভোলেননি।
দোকানের ভাঙাচোরা প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম, রাতে ভয় পাননি?
প্রশ্ন শুনে তাঁর মুখেও সেই একই চাপা হাসি। ব্যাপারটা পরিষ্কার, উনার দোকান বেঁচে গেছে কেবল দেয়ালে টাঙানো ওই চারটি কাগজের কল্যাণে। এই জিনিসই তাঁকে শিল্ড দিয়েছে ভেকুর হাত থেকে।
ভাবতে খারাপ লাগছে, একই রাতে কেউ হারিয়েছে তার দশ বছরের রোজগারের ঠিকানা, আর কেউ বেঁচে গেছে শুধুমাত্র চারটি অ্যান্টিক পোস্টারের সুবাদে। পৃথিবীটা বড় অদ্ভুত আর অবিচারে ভরা।
কিন্তু এই বেঁচে থাকাটা নিজের ভেতর এক অদ্ভুত আশার জন্ম দেয়। ধ্বংস যখন চারপাশে তাণ্ডব চালায়, তখনো কিছু ইতিহাস নিজের জোরে টিকে যায়। আর সেই ইতিহাস টিকে থাকলে সাধারণ মানুষের স্বপ্নগুলোও বেঁচে যায়!
চা শেষ করে দোকানের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। মোবাইলে ছবি তুললাম, পিছনদিকে সারিবদ্ধভাবে চারটি বিজ্ঞাপন ফ্রেমবন্দি হলো।
ঢাকায় ফিরে গিয়ে ইন্দ্রজিতকে বলব, ইতিহাস বাঁচাতে এক কাপ চা-ই যথেষ্ট, কিন্তু তার জন্য দরকার সাহসী বিজ্ঞাপন আর সাহস করে ফোন দেয়ার মতো একজন ইতিহাসপ্রেমী কর্মকর্তা।
স্টেশনের স্পিকারে ঘোষণা হলো, ব্যান্ডেল লোকাল আসছে।
ছুটতে ছুটতে ভাবলাম, দমদম জংশনের ধ্বংসলীলার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই চা-দোকানটা আসলে একটা টাইমলেস মিউজিয়াম, যা কিনা বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়েও নিজের মাথা নত করে নাই।