- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 419
- Messages
- 6,400
- Reaction score
- 3,446
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
চন্দ্রমল্লিকার এক দিন
মূল লেখকঃ মুস্তাকিম বিল্লাহ
মূল লেখকঃ মুস্তাকিম বিল্লাহ
‘মাহমুদ সাহেব চুপ হয়ে গেলেন কেন? কার কল আসলো?’
‘এসেছে...
এসেছে বলেই মাহমুদ থেমে যায়। টেবিলে রাখা পানির গ্লাস থেকে পানি খায়। মাহমুদ পাশে তাকিয়ে বলে, হাতে কাজ আছে আপনার? চলেন চা খেয়ে আসি।
আমি বললাম, কি হয়েছে কার কল বললেন না?
মাহমুদ বললো, নিচে চলুন তারপর বলছি।
এই সময়ে আমার হাতে কাজ নেই। অফিসের একটা মিটিংয়ে বাইরে যাবার কথা ছিলো, মিটিং ক্যান্সেল হয়েছে। আপাতত ব্রেকে আছি মাহমুদের সাথে চা খেতে নিচে যাই।
মাহমুদ বলে, গফুর চাচা আমার বন্ধুর বাবা। তবে তাকে নিয়ে একটা চমৎকার স্মৃতি আছে। একবার কি হলো বাড়ি থেকে রাগ করে বের হয়ে গেলাম। আমার বাবা অবশ্য কঠিন মানুষ। রাগ ভাঙানোর মতো লোক তিনি না। গেছো যাও, বাইরে ঘুরে দেখো দুনিয়া কেমন তবে জীবন কি বুঝবে। মায়ের এতোটা সাহস নেই বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি কিছু করবেন। আমার নানাবাড়ির সবাই-ই বাবাকে ভয় পেতেন। বাড়িতে হইচই চলছে সেই মুহুর্তে যদি বাবা নানাবাড়ির উঠানে পা রাখতেন পুরো বাড়ি নিরব হয়ে যেতো।
রাগ করে বের হলাম তবে কোথায় যাবো ঠিক করতে পারিনি। পথে গফুর চাচার সাথে দেখা। তখন দুপুর। আমাকে স্কুলের পাশে দেখেই দূর থেকে ডাক দিলেন। কাছে যেয়ে দাঁড়ালাম। জিজ্ঞেস করলেন কেমন আছি এমন টুকটাক প্রশ্ন৷ শুকনো মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এই দুপুরে বাইরে কি? আমি বললাম এমনিতে হাওয়া খেতে এসেছি। শুকনো মুখ তিনি কি করে যেনো আমার বাড়ি থেকে রাগ করবার ঘটনা বুঝে যায়। বাজারের ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, চলোতো আমাদের বাড়িতে।
আমি তার সাথে তাদের বাড়িতে গেলাম। শিবলু আমার স্কুলের বন্ধু, শিবলুদের বাড়িতে আসা আমার কাছে আনন্দেরই। ঘরের ভিতরে আসতেই গফুর চাচা শিবলুর মাকে ডেকে বলেন, আছমা ওরে এক গ্লাস লেবুর শরবত দাও। আর বাড়ি থেকে রাগ করে এসেছে, ও দুপুরে আমাদের সাথেই খাবে।
সেবার তিনদিন আমি শিবলুদের বাড়িতে ছিলাম। তিনদিন পরে অবশ্য বড় আপা আমাকে এসে শিবলুদের বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। মায়ের তখন জ্বর, মায়ের অসুখের খবর দিয়েই আপা বাড়িতে নিয়ে যায়।
গফুর চাচাকে আমি অনেক পছন্দ করতাম। হয়তো সেদিন দুপুরে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কারণেই পছন্দের জায়গা তৈরি হয়েছে।
একটু আগে কার কল আসলো জিজ্ঞেস করলেন না? আমার বন্ধু শিবলুর। গফুর চাচা আজকে ভোরে মা রা গেছেন। বিকাল পাঁচটায় জানাজা হবে। ঢাকা থেকে দুই ঘন্টার পথ, ভাবছি একটু পরেই বের হবো।
মাহমুদ গফুর চাচার কথা বলতে যেয়ে চোখ মুছে। মাহমুদ চোখ মুছতে মুছতে বলে এখন অসময়ে বন্ধুদের কল আসলে ভয় লাগে। একে একে সবার বাবা মা চলে যাচ্ছে। এই দেখেন আমার বাবা মা দুজনকে হারিয়েছে তিনবছর আগে। বাসায় ফিরে বাবা কিংবা মা বলে ডাক দিতে পারি না। কেমন বুকটা খালি লাগে। বাবার বয়সী কাউকে দেখলে মন খারাপ হয়, চুপচাপ তাকিয়ে দেখি। সেদিন এক লোককে দেখি লাঠিতে ভর দিয়ে ছেলের হাত ধরে রাস্তা পাড় হচ্ছেন। হাসপাতাল থেকে কেবল নেমেছে তারা। আমার বাবা ডায়াবেটিসের রোগী ছিলেন, কিছুদিন পরপর হাসপাতালে নিয়ে যেতে হতো। বাবার হাতটা যখন ধরতাম তখন বুঝতাম বড় হয়ে গেছি, একদিন ভরসা নিয়ে আমি বাবার হাত ধরতাম, এখন বাবা আমার হাত ধরে একই ভরসা নিয়ে। চোখে পানি জমে গেলো বুঝলেন সৌরভ ভাই।
আমরা চা খেয়ে অফিসে আসি। মাহমুদ সত্যি বলেছে, আজকাল এমন বয়সে আছি বন্ধুদের বাবা মায়ের মৃত্যুর খবর আসে অনেক। মনটা ভারী হয়ে যায়। মাহমুদের গফুর চাচার মতো আমাদের এক আন্টি ছিলো। তখন আমরা লাকসাম থাকি। পাশের বাসাতেই থাকতেন পলাশের মা, রেনু আন্টি। রেনু আন্টির বাসায় ভালো কিছু রান্না হলেই পলাশ আমাকে ডেকে নিয়ে যেতো। দুই মাস আগে একবার রেনু আন্টি ঢাকা এসেছিলো ডাক্তার দেখাতে, আমার স্ত্রী মিরা রেনু আন্টির খুব যত্ন করলো। শৈশবে তাদের বাসার কতো খাবার খেয়েছি। গত সপ্তাহে রেনু আন্টি মা রা গেলো।
রেনু আন্টির কথা মনে উঠতেই মনে উঠলো বাবার কথা। মাহমুদের বাবার মতো আমার বাবাও ডায়াবেটিসের রোগী। কয়েকদিন ধরেই বলছেন, তাকে নিয়ে একবার হাসপাতালে যেতে। আমি অনেক অজুহাত দেখিয়ে প্রতিদিন পিছিয়ে দিচ্ছি। অফিস শেষে হাসপাতালে যেতে বিরক্ত লাগে। এদিকে বাবাও একা হাসপাতালে যাবার মতো সাহস পায়নি।
বুকের ভিতরে কেমন খচখচ করে। একবার মিরাকে কল দেই।
‘হ্যালো মিরা কল ধরতে এতো দেরি কেন?'
‘এখন কটা বাজে? আর এই সময় আমার কি ফোনের কাছে থাকবার কথা?
‘এমন করে কথা বলছো কেন?’
‘তো তোমার সাথে মিষ্টি করে কথা বলতে হবে এখন? চুলায় রান্না। কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো।’
‘মিষ্টি করে কথা বলতে বলিনি। কি করছো জানতে কল দিলাম। বাবু আসছে স্কুল থেকে?'
‘হ্যাঁ এসেছে। রান্না পুড়ে যাবে আমি রাখছি। আর হ্যাঁ শুনো আজকে যদি পারো একটু তাড়াতাড়ি বাসায় এসো। বাবাকে তুমি কতোদিন ধরে ঘুরাচ্ছো হাসাপাতালে নিয়ে যাবে বলে, তোমাদের ছেলেদের স্বভাব একটাই বড় হয়ে গেলে বাবা মা লাগে না আর। উদাসীন হয়ে যাও। আমার ভাই একজন তিনিও তোমার মতো।'
মিরার রাগের কারণ আমি বুঝতে পারি। মিরার সাথে আমার প্রেমের বিয়ে। তিন বছর নয়দিনের প্রেমের পরে, আজকে চার বছরের সংসার। গুনে গুনে সাতবছর একসাথে আমরা।
মিরা ফোন রাখে অফিসের কিছু কাজ করেই বের হই। অর্ধেক বেলার ছুটি নিয়েছি আজকে। দুপুরে বাসায় যেয়ে ভাত খাবো। মিরা চমকে যাবে হয়তো। এক কাজ করা যায় মিরার জন্যে একটা ফুল নিয়ে নেওয়া যায়। যদিও আজকে বিশেষ কোনো দিন না, মিরার জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী না। ফুল দিতে বিশেষ দিনই বা কেন লাগবে? কারণে অকারণে প্রিয় মানুষকে ফুল দেওয়া যায়।
অফিস থেকে বের হয়ে রিক্সা নিয়ে ফুলের দোকানে আসলাম। দুটো চন্দ্রমল্লিকা একটা গোলাপ কিনে নেই। যেহেতু আজকে তিন তারিখ। তিনটা ফুল।
কলিং বেল চাপতেই মিরা দরজা খুলে দেয়। কেবল গোসল থেকে বের হয়েছে, এখনো চুলে গামছা। চুল বেয়ে পানি ঝরছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি বাবা আছে কিনা। না বাবা এখানে নেই। মিরার হাতে তিনটা ফুল দিয়ে বললাম, আজকে তিন তারিখ তাই তিনটা ফুল তোমার জন্যে। মিরা আমার কান্ড দেখে হেসে ফেলে, হাসির শব্দ শুনেই রোহান ছুটে আসে। রোহানকে কোলে তুলে নেই। অফিস থেকে ফিরবার পরে রোহানকে কোলে না নিলে মুখ ভার করে বিছানার উপর শুয়ে থাকবে।
বাবা আমার সামনেই খাবার টেবিলে বসে আছেন। তবে কোনো কথা বলছেন না। বাবা অভিমান করেছেন। আমার উপরও বাবা অভিমান করতে পারেন? পারেন অবশ্যই৷ ছোটোবেলায় বাবার উপর অভিমান করে আমি ঈদের জামা পরিনি। সবার বাবা আসলেও আমাদের বাবা সেবার ঈদে ছুটি পায়নি। আমিও অভিমান করে বসে থাকি বাবা না আসলে ঈদের জামা পরবো না। ঈদের দিন দুপুরে বাবা বাড়িতে এসে হাজির হয়। সেদির রাতেই যদিও তাকে আবার ফিরতে হয়েছে। বাবার অভিমানী মুখটা বাচ্চাদের মতোই লাগছে।
বিকালের রোদ বারান্দায়, বাসার পাশে বড় একটা কাঁঠালগাছ। সেই কাঁঠালগাছে কয়েকটা শালিক বসে আছে, বসে বসে পালক খুঁটছে ঠোঁট দিয়ে। মিরা ভাতঘুমের পরে উঠেছে, কেবল মুখ ধুয়ে এসেছে। হাতে একজোড়া চন্দ্রমল্লিকা। নাকের সাথে মিশিয়ে সুভাস নিচ্ছে। মিরা হেসে বলে, বিকালের ঘুমের পরে মনটা কেমন শূন্য লাগে, আজকে চন্দ্রমল্লিকার সুবাস অন্যরকম লাগছে। এক কাজ করি চন্দ্রমল্লিকার রঙের সাথে মিলিয়ে একটা শাড়ি পরি?
মিরা আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে ঘরে যায়। আলমারি খুলবার শব্দ হয়। আলমারি থেকে এখন মিরা শাড়ি বের করে পরবে।
বাবাকে নিয়েই আমরা বের হই। প্রথমে যাবো হাসপাতালে, তারপর কোথাও একটা যাবো। কোথায় যাবো ঠিক করিনি এখনো। মিরা শাড়ি পরেছে শাড়ির সাথে কানে একটা চন্দ্রমল্লিকা ফুল। রোহান বাবার কোলে বসে আছে। বাবার অভিমানের মুখটা এখন নেই, রোহানের সাথে হেসে কথা বলছে। হাসিটা স্নিগ্ধ সুন্দর। ডাক্তারের সাথে দুপুরেই কথা বলে রেখেছি। হাসপাতালে ঘন্টাখানেক সময় লাগে।
অনেকদিন কোনো রেস্টুরেন্টে যাওয়া হয়নি। পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম। এই রেস্টুরেন্টটা সাধারণ, পাশেই ছোট্ট একটা ঝর্ণা। তালপাতার বেড়া চারপাশে। রোহান ওইপাশে ছুটছে বাবা রোহানের পাশেই আছেন। মিরা আমার মুখোমুখি বসে আছে, চন্দ্রমিল্লাকার ঘ্রাণ আমার নাকে এসে লাগে। আজকে চন্দ্রমল্লিকার ঘ্রাণটা অন্যরকম, বৃষ্টির পরে দুর্বাঘাসের মাঠে হাঁটলে যেমন ঘ্রাণ আসে চন্দ্রমিল্লাকা থেকে তেমনই ঘ্রাণ এসে ভাসছে। অভিমানের পরে খুশিতে বাবার মুখটাও চন্দ্রমল্লিকার মতো মনে হয়, মিরাও চন্দ্রমল্লিকা, ছুটতে থাকা রোহান যেনো ছুটতে থাকা একটা চন্দ্রমল্লিকা। শহরটা যেনো আজকে চন্দ্রমল্লিকার বাগান হয়ে আছে। কেবল এইটুকু জীবনে চেয়েছি, সবাইকে নিয়ে হাসিমুখে বাঁচতে। চন্দ্রমল্লিকার একদিন বারবার নেমে আসুক আমাদের ঘরে।