- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 451
- Messages
- 7,198
- Reaction score
- 5,399
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
চলো হাঁটি
মূল লেখকঃ ফারহানা কবির মানাল
মূল লেখকঃ ফারহানা কবির মানাল
বহু ঝঞ্জাট পেরিয়ে যেদিন বড় আপার বিয়ে ঠিক হয় সেদিন তার বয়স বত্রিশ বছর তিন মাস দু'দিন। ঘটক খুব হিসেব করে বয়স মেলালেন। চাপা গলায় বললেন, “মকবুল সাহেবের মেয়ের কপাল ভালো। এত বয়সে এসেও নধর পাত্র জুটিয়ে ফেলেছে। ছেলের বয়স মাত্র ছত্রিশ। আগে-পরে বিয়েসাদী করেনি। এমন কপাল সবার হয় না।”
বড় ফুফু দাঁত চিবিয়ে হাসলেন। কৃতজ্ঞ গলায় বললেন, “সবকিছু আপনার জন্য। আপনিই তো সব ব্যবস্থা করে দিলেন।”
ঘটক বললেন, “তা করলাম বটে। তবে আমার পাওনাটা একটু বাড়িয়ে দিতে হবে।”
“বাড়িয়ে দিতে হবে কেন? সাত হাজার ঠিক হয়েছিল। ওইটাই তো অনেক বেশি।”
“অনেক বেশি? নাহ! মোটেও বেশি না। লোকেরা মেয়ের বয়সের হিসাবে হাজার টাকার নোট গোনে। তা-ও যদি মেয়ে একটু লেখাপড়া জানত। টেনেটুনে এসএসসি পাশ। গায়ের রং ময়লা।”
ঘটকের এই কথা ভুল। আপার গায়ের রং ময়লা না। উজ্জ্বল শ্যামলা, চোখ দু'টো দেখলে মনে হয় পুরো একটা বিল আপা চোখের ভেতর ঢুকে আছে। শান্ত, কোমল। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। আপা চোখের সৌন্দর্য লোকের নজরে পড়ে না। তারা শুধু বয়সটা দেখে। টাকার তর্কাতর্কি শেষ পর্যন্ত বিয়ে ভাঙা পর্যন্ত গড়ালো। ঘটক পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে বললেন, “মেয়ে বয়স বত্রিশ পেরিয়ে গেছে।”
ছেলে বাবা উঠে দাঁড়ালেন। তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, “আপনি বলেছিলেন মেয়ের বয়স সাতাশ বছর। সংসারে দায়িত্ব পালন করতে করতে চেহারায় অমন ছাপ পড়ে গেছে। ক’দিন যত্ন-আত্তিতে থাকলে ঠিক হয়ে যাবে।”
“না ভুল বলেছি। আমার কাছেও লুকানো হয়েছিল।”
“পাঁচ বছর কমবেশি মানে তো অনেক।”
তার কথায় বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। বড় মামা পাশে বসে ছিলেন। ছেলের বাবা তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার এমন ফ্রড বুঝতেই পারিনি। এই সোহেল ওঠ! এই বিয়ে হবে না।”
সোহেল আমার হবু দুলাভাইয়ের নাম। ভদ্রলোক বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। অত্যন্ত সহজ গলায় বলল, “কাজী সাহেব, বিয়ে পড়ান।”
তার কথায় সবাই এমন করে চমকে উঠল যেন ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। সবকিছু ভেঙেচুরে যাচ্ছে।
“এইসব তুই কী বলছিস? বিয়ে পড়াবে মানে?”
“আব্বা আপনি ঠিকই শুনেছেন। কাজী সাহেব, বিয়ে পড়ান। রাত বাড়ছে।”
তার কথায় দৃঢ়তা আছে। পাত্রপক্ষের তীক্ষ্ণ, বিস্ফোরিত দৃষ্টি এড়িয়ে কাজী সাহেব বিয়ে পড়াতে শুরু করলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিয়ের কাজ শেষ হলো। আপা একটা কাগজে গোটাগোটা অক্ষরে নিজের নাম লিখল। ছোট ফুফু বলল, “ছেলের করুণায় বিয়ে হয়েছে। স্বামীর পায়ে পড়ে থাকিস ঝুমুর।”
আপা শান্ত চোখে ফুফুর দিকে তাকাল। তারপরই চোখ ফিরিয়ে নিলো। আমি বললাম, “আপা, এইবার উঠতে হবে। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।”
আপা উঠে দাঁড়াল। আমার হাত ধরে বলল, “ভালো থাকিস।”
আপাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলাম। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপার একটা হাত খুব শক্ত করে ধরে ছিলাম। কিছু বলতে পারিনি। গলা ধরে আসছিল বারবার।
নয়ন আর লিখতে পারল না। ডাইরি বন্ধ করে জানালার দিকে তাকালো। ঘড়িতে রাত এগারোটা বাইশ। এতক্ষণে ঝুমুরের গাড়ি শ্বশুর বাড়ি পৌঁছে গেছে। নয়ন চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার কপল বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
রাত বাড়ছে। বিছানায় ফুল ছড়ানো। ফুলের মিষ্টি গন্ধ নাকে লাগছে। ঝুমুর দু'হাতে চোখের পানি মুছল। নরম গলায় বলল, “সবার বিরুদ্ধে গিয়ে আমাকে বিয়ে করলেন কেন?”
সোহেল বিছানায় বসে পা ঝুলিয়ে রেখেছে। সে পা খাটের উপর পা তুলে বসল। অন্যরকম গলায় বলল, “অ'ত্যা’চা’র করতে।”
বলেই ফিকফিক করে হেঁসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “মজা করেছি।”
ঝুমুর বলল, “আমি কিন্তু মজা করছি না।”
“জানি। আপনার কাছে এই ব্যাপারটা একটুও মজার না।”
“জানলে বলুন। আমায় বিয়ে করলেন কেন?”
“সত্যি বললে বিশ্বাস করবেন?”
“করব।”
“আপনাকে খুব পছন্দ করি। অথবা বলতে পারেন ভীষণ ভালোবাসি।”
“আপনি আমাকে আগে থেকে চিনতেন?”
“হ্যাঁ, চিনতাম।”
ঝুমুর ভীষণ অবাক হলো। বিস্মিত মুখে বলল, “কীভাবে চিনতেন?”
“আপনার হয়তো মনে থাকবে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত লোকেরা এসব কথা খুব সহজে ভোলে না।”
“কী মনে থাকার বলছেন?”
“সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। সদর হাসপাতালের পাশে মাঝবয়েসী ভিক্ষুক মহিলা বৃষ্টিতে ভিজে ভিক্ষা করছিল। আপনি তার সামনে দাঁড়ালেন। কোমল গলায় বললেন– এভাবে ভিজলে আপনার জ্বর এসে যাবে। মহিলা বলল– কী করব মা? ঘরে দু'টো ছেলেমেয়ে আছে। ভিক্ষে না করলে তারা না খেয়ে ম'র'বে। এইতো এতক্ষণে যা পেয়েছি তাই নিয়ে বাড়ি ফিরব। একটা ছাতা থাকলে বৃষ্টিতে ভিজতে হতো না। কিন্তু কী করব? ছাতা কেনার টাকা নেই। আপনি মহিলাকে নিজের ছাতাটা ধরিয়ে দিলেন। গলার স্বর অনেকখানি নিচু করে বললেন– আজকে জন্য আমার ছাতাটা নিয়ে যান। বৃষ্টি কমলে আগামীকাল দোকানে রেখে যাবেন। আসলে আমার এই একটা ছাতা। আর কেনার সুযোগ নেই।”
সোহেল থামল। ঝুমুর মাথা নিচু করে আছে। ছাতার কথা সে ভোলেনি। হাসপাতালের সামনের দোকানগুলোতে বহুবার গিয়ে ছাতার খোঁজ করেছে। ওই মহিলাকেও খুঁজেছে। পায়নি। সোহেল ঝুমুর দিকে একটু এগিয়ে এলো। শান্ত গলায় বলল, “ওই মহিলা ভিকারি না। বাড়ি ফিরতে ছাতার দরকার ছিল তাই ওই নাটকটুকু করেছে।”
“আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
“মহিলার পরনের পোশাক দেখলে বোঝা যায়। তাছাড়া সে চায়ের দোকানের এক লোকের সাথে বাজি ধরেছিল। কাউকে মুরগী বানিয়ে ছাতা নিতে হবে। সে সময়ে আমি তাদের পাশে বসা ছিলাম।”
“ওহ আচ্ছা।”
“সেদিন ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। বাচ্চা মেয়েদের খুব সহজে বোকা বানানো যায়। আপনার মতো প্রাপ্তবয়স্ক একজন এত সহজে বোকা বনে যাবে ধারণা করতে পারিনি। কৌতূহল হলো। আপনার ব্যাপারে খোঁজ খবর শুরু করলাম।”
“খোঁজ খবর করে কী জানলেন?”
“জানলাম আপনার বাবা নেই। মা, দুই বোন আর ভাইকে নিয়ে সংসারের সব দায়িত্ব আপনার। হাসপাতালে ছোটখাটো একটা চাকরি করেন। বাবার মা'রা যাওয়ার পর নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারলেও বোনকে পড়িয়েছেন। তাদের বিয়ে দিয়েছেন। ভাইকে পড়াচ্ছেন, সংসারের সব দায়িত্ব আপনার উপর। এই যুগে এসে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে এমন করে পরিবারের দায়িত্ব সবাই নিতে পারে না। যাদের মন খুব পরিষ্কার শুধু তারাই এমন আত্মত্যাগ করতে পারে। এইতো এভাবেই ভালো লেগে গেল। তারপর কবে যেন ভালোবেসে ফেললাম। হিসাব মিলিয়ে দেখলাম– আমার নিজের বয়সও খুব একটা কম না। আপনার চেয়ে প্রায় চার বছরের বড়। আমাদের বিয়ে হলে খুব একটা খারাপ হবে না।”
ঝুমুর কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। মিনমিনে গলায় বলল, “সে না হয় বুঝলাম। আপনি এই বয়সে এসেও বিয়ে করেননি কেন?”
“আপনার মত করে পরিবারের দায়িত্ব নিতে গিয়ে সময় পেরিয়ে গেছে। আমার কথা ছাড়ুন। পরে কখনো বলব। আজ পূর্নিমা। আকাশে থালার মতো গোল চাঁদ উঠেছে। বাইরে খুব জোছনা। হাঁটতে যাবেন?”
ঝুমুর মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বলল৷ রাতে হাঁটতে তার খুব ভালো লাগে। তবে সাহস পায় না। ভূতের ভয়ে নাকি মানুষের ভয়ে সে হিসাব কখনো মেলাতে পারেনি। তার বাসার সামনে বুড়ো মতো দু'জন লোক ঝুমুরকে খুব বাজে নজরে দেখত। কখনো সখনো ইশারা ইঙ্গিতও দিয়েছে। ঝুমুর সে-সব গায়ে মাখেনি। জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে এসব তুচ্ছ বিষয় গায়ে মাখতে নেই। তবে রাত নামলে তার ভয় করত। ভীষণ ভয়। ঘরে বাইরে পা রাখলে মনে হতো বুড়ো দু'টো দুই পাশ থেকে তার দিকে এগিয়ে আসছে। সে রাতের বেলা বাইরে নামত না। রাতে হাঁটার স্বপ্ন মনের মাঝে তিন হাত গর্ত করে ক'ব'র দিয়ে ফেলেছিল। এতদিনে কেউ তাকে রাতদুপুরে হাঁটতে ডাকছে। পরপুরুষ কেউ না। ঝুমুরের স্বামী। ঝুমুর তাকে এড়িয়ে গেল না। খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। সদর দরজার সামনে এসে সোহেল বলল, “বাইরে কী সুন্দর জোছনা দেখেছ? মনে হচ্ছে চাঁদের সৌন্দর্য তার গা গলে গলে পৃথিবীতে নামছে।”
ঝুমুর হাসল। সোহেল অসম্ভব কোমল গলায় বলল, “চলো হাঁটি।”
কথাটা বলেই সে ঝুমুরের হাত ধরল। ঝুমুর চমকে তার দিকে তাকাল। কী অদ্ভুত! তার চোখ জ্বালা করছে। চোখে পানির আসার আগে এমন করে চোখ জ্বালা করে। ঝুমুর বুঝল– তার চোখ ভিজে উঠেছে। সে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করল না। পৃথিবীর সব খুশি তো হাসিতে প্রকাশ পায় না। সবচেয়ে সুখের মুহুর্তগুলো কাঁদতে হয়। খুব করে কাঁদতে হয়।
সমাপ্ত