Collected চকোলেটে রহস্যের জট

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
443
Messages
6,930
Reaction score
4,857
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
চকোলেটে রহস্যের জট

মূল লেখকঃ রাশেদুল হাসান






ঈদের উৎসবমুখর আমেজটা আমাদের বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেল তৃতীয় দিন সন্ধ্যায়। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আমরা তখন সবাই চা খাচ্ছিলাম, এমন সময় দরজা খুলে বড় আপু ঘরে ঢুকল।

সাধারণত প্রতি বছর ঈদের পরদিন বড় আপু আর দুলাভাই নিয়ম করে কোথাও না কোথাও বেড়িয়ে আসে, তারপর ফেরে বাপের বাড়িতে। এটাই তাদের ঈদের রুটিন। কিন্তু এবার রুটিন ভেঙে বড় আপু এসেছ একা। সাথে দুলাভাই নেই, এমনকি তার আট বছরের বুকের ধন, আদরের মেয়ে টুকিও নেই।

আপুর চেহারা দেখে মায়ের হাতের চায়ের কাপ ছিটকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আপুর চোখদুটো জবা ফুলের মতো লাল, চুল উষ্কখুষ্ক, আর দৃষ্টিতে রাজ্যের শূন্যতা। মনে হচ্ছে যেন কোনো ভয়াবহ নারকীয় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সে এইমাত্র পার হয়ে এসেছে।

"কী রে! তুই একা? জামাই কোথায়? টুকি কোথায়?" মা প্রায় হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।

বড় আপু কোনো জবাব দিল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে মায়ের দিকে একটা শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল, তারপর একপ্রকার টলতে টলতে নিজের পুরনো ঘরের ভেতর ঢুকে সশব্দে দরজা আটকে দিল।

পুরো বাড়িতে নেমে এল এক ভয়ংকর, থমথমে নীরবতা। কী এমন প্রলয়ংকরী ঘটনা ঘটল যে একটা মেয়ে নিজের সন্তানকে ফেলে এভাবে একা ছুটে আসে? আমরা দুলাভাইয়ের নাম্বারে বারবার ফোন দিতে লাগলাম। রিং হচ্ছে, কিন্তু ভদ্রলোক ফোন ধরছেন না। কোনো ম্যাসেজেরও রিপ্লাই নেই।

রাত গড়িয়ে সকাল হলো। বড় আপু ঘরের দরজা খুলে বাথরুমে ঢুকল এবং আমরা সবাই আঁতকে উঠে শুনলাম, সে বিকট শব্দে বমি করছে।

মায়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। "মেয়েটার কি কোনো বড় অসুখ করল? নাকি পেটে বাচ্চা? নাকি ওই ছেলে রাগের মাথায় ওকে কোনো উল্টাপাল্টা ওষুধ খাইয়ে দিয়েছে?"

আপুর মুখে কোনো কথা নেই। সে দানাপানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। খাবার সাধলে হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। শুধু জানালার গ্রিল ধরে বাইরের দিকে পাথরের মতো তাকিয়ে থাকছে।

এরই মাঝে দৃশ্যপটে হাজির হলো মেজো আপু। আমাদের মেজো আপুর আবার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে সুনাম আছে। অপরের সংসারে আগুন লাগলে সে সেখানে আলু পুড়িয়ে খেতে দারুণ পছন্দ করে। সে বড় আপুর পাশে বসে পান চিবোতে চিবোতে তার পরামর্শের ভাণ্ডার খুলে বসলো।

"আমি তো বিয়ের দিনই লোকটার চোখ দেখে বুঝছিলাম, এর মধ্যে একটা সাইকোপ্যাথ ক্রিমিনাল ব্যাপার আছে। আমার জামাই দেখ, ছাগলে মতো বাইন্ধা রাখলে ওভাবেই থাকবে, শ্রেষ্ঠ জামাই। আর তোর জামাইর যে দেমাগা, যাহোক, তুই কোনো চিন্তা করিস না বুবু, ডিভোর্স দিয়ে দে! এমন জানোয়ারের সাথে সংসার করার চেয়ে বাপের বাড়িতে একা থাকা অনেক সম্মানের। তুই শুধু একবার মুখ ফুটে বল লোকটা তোর গায়ে হাত তুলেছে কি না, আমি আজকেই নারী নির্যাতনে মামলা ঠুকে দিচ্ছি। ওর চৌদ্দগোষ্ঠীকে আমি জেলের ভাত খাওয়াব!"

বড় আপু এবারও কোনো জবাব দিল না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল।

পরিস্থিতি ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আরও দুই দিন পর আমাকে পাঠানো হলো আপুর শ্বশুরবাড়িতে। আপার মনে শান্তি ফেরাতে ভাগনি টুকিকে উদ্ধার করে আনা। আমার মায়ের ধারণা, মেয়েকে কাছে পেলে হয়তো বড় আপুর পাথর গলে পানি হবে।

বুকভরা শঙ্কা নিয়ে দুলাভাইয়ের ফ্ল্যাটের কলিংবেল চাপলাম। আমি প্রস্তুত ছিলাম যেকোনো ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য। হয়তো দেখব আসবাবপত্র ভাঙা, ঘর লণ্ডভণ্ড, কিংবা দুলাভাই অনুশোচনায় মাথা নিচু করে বসে আছেন।

কিন্তু দরজা খুলতেই আমার চোখ কপালে উঠে গেল।

ড্রয়িংরুমের এসি ফুল স্পিডে চলছে। দুলাভাই একটা হাফপ্যান্ট আর টি-শার্ট পরে, সোফায় পা তুলে চরম রিলাক্সড ভঙ্গিতে নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখছেন। টেবিলে কফির মগ আর মুখে পপকর্ন। বউ রাগ করে সন্তান ফেলে চলে গেছে, তা নিয়ে অপরাধবোধের কোনো ছিটেফোঁটাও ভদ্রলোকের চেহারায় নেই!

"আরে শ্যালক মশাই! আসেন আসেন, সারপ্রাইজ ভিজিট নাকি?" দুলাভাই বেশ ফুরফুরে গলায় বললেন।

আমি হতভম্ব হয়ে আমতা আমতা করে বললাম, "দুলাভাই, আপু তো কোনো কথা বলছে না। কিছুই খাচ্ছে না। টুকটুকির জন্য খুব কান্নাকাটি করছে। ওকে নিতে আসলাম।"

দুলাভাইয়ের ভেতর বিন্দুমাত্র হেলদোল হলো নাই। তিনি মুচকি হেসে বললেন, "অবশ্যই! মায়ের কাছে মেয়ে যাবে না তো কোথায় যাবে? টুকি, মামার সাথে যাও।"

যাওয়ার সময় দুলাভাই টুকির হাতে পেল্লায় সাইজের একটা শপিং ব্যাগ ধরিয়ে দিলেন। উঁকি দিয়ে দেখলাম—ভেতরে দামি দামি সব ইমপোর্টেড চকলেট, প্রিংগেলস চিপস, বিদেশি জুস আর নানান রকম মুখরোচক খাবারের এক বিশাল সমাহার।

টুকিকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। মেয়েকে দেখে বড় আপু একবার শুধু জড়িয়ে ধরে কাঁদল, তারপর আবার সেই মৌনব্রত। সে খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। সারা দিনে শুধু কয়েক টুকরো ফল আর একটু ডাবের পানি খাচ্ছে। তাকে দেখলে মনে হয়, সংসারের সব মায়া ত্যাগ করে সে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

অন্যদিকে, টুকি আছে মহা আনন্দে। সে বাড়ির ভাত-মাছ কিছুই খাচ্ছে না। বাপের দেওয়া ওই বিশাল ব্যাগটা সারাক্ষণ বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে বসে আছে। আমরা সবাই মিলে তাকে জেরা করার চেষ্টা করলাম।

"মা টুকি, বল তো তোর আব্বু-আম্মুর মধ্যে কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছে? আব্বু কি আম্মুকে মেরেছে?"

টুকি মুখে একটা বড় কিটক্যাট পুরে, নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, "আমি কিছু জানি না।"

এর মধ্যে মেজো আপু টুকির পাশে বসে আদর করার ছলে বলল, "আহা রে, আমার মা-টার মুখটা শুকিয়ে গেছে। দে তো মা, তোর ব্যাগ থেকে আমাকে একটা চকলেট দে, দুজনে মিলে খাই।"

চকলেটের প্যাকেটে হাত দেওয়ার সাথে সাথেই টুকি এমন এক বিকট চিৎকার দিল, যেন তাকে জান কেড়ে নিচ্ছে! সে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে ড্রয়িংরুম মাথায় তুলে ঘোষণা করল, "আমি কাউকে আমার চকলেটের ভাগ দেব না! একদম না! কেউ আমার ব্যাগে হাত দেবে না!"

মেজো আপু চরম অপমানিত হয়ে, মুখ কালো করে সেখান থেকে উঠে গেল।

এভাবেই চরম মানসিক টানাপোড়েন, উৎকণ্ঠা আর রহস্যের মধ্যে দিয়ে কেটে গেল আরও তিন দিন। বড় আপুর শরীর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

চতুর্থ দিন সকালে পরিস্থিতি হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত মোড় নিল। টুকির ব্যাগের চকলেট আর চিপস সব শেষ। সকাল থেকেই সে ঘ্যানঘ্যান শুরু করল, "আমি আব্বুর কাছে যাব। আমার এখানে ভালো লাগছে না। আমি বাড়ি যাব।"

বাধ্য হয়ে দুলাভাইকে আবার ফোন দেওয়া হলো। এবার ভদ্রলোক এক রিংয়েই ফোন ধরলেন। আমি বললাম, "দুলাভাই, টুকি তো আপনার কাছে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করছে। আপনার চকলেট সব শেষ। আপনি কি ওকে নিতে আসবেন?"

ওপাশ থেকে দুলাভাই অত্যন্ত শান্ত আর নিস্পৃহ গলায় বললেন, "আমি তো এখন হাইওয়েতে। একাই তিন দিনের জন্য রিসোর্টে যাচ্ছি রিলাক্স করতে। তোমরা টুকিকে আরও কয়েক দিন রেখে দাও।"

ফোনটা তখন স্পিকারে ছিল। দুলাভাইয়ের ‘একা রিসোর্টে যাওয়া’র কথা বড় আপুর কানে যেতেই ঘরে যেন বিস্ফোরণ ঘটল!

আপুর এতদিনের নীরবতা, স্তব্ধতা, ডিপ্রেশন আর ডাবের পানি খেয়ে সন্ন্যাস জীবন যাপনের সমাপ্তি ঘটল এক সেকেন্ডে। সে হুড়মুড় করে বিছানা থেকে উঠে সোজা ডাইনিং টেবিলে চলে গেল। একটা বড় থালায় পাহাড়সমান ভাত, বাটি ভর্তি গরুর মাংস আর ঘন ডাল মেখে গোগ্রাসে গিলতে শুরু করল। এত ভয়ংকর আক্রোশে সে ভাত মাখাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল সে দুলাভাইয়ের মুণ্ডু চিবিয়ে খাচ্ছে।

খাওয়া শেষ করেই সে হনহন করে নিজের ঘরে ঢুকে ট্রলিব্যাগ গোছাতে শুরু করল।

"আমি এখনই আমার নিজের বাড়ি যাব! লোকটার এত বড় সাহস, আমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে সে একা রিসোর্টে যায় ফুর্তি করতে!" আপু দাঁতে দাঁত ঘষে ফুঁসতে লাগল।

মা, আমি আর মেজো আপু—তিনজনই থম মেরে এই মিরাকল দেখছি। যে মেয়ে গত সাতদিন ধরে ডিপ্রেশনে ধুঁকছিল, সে এখন রীতিমতো রণমূর্তি!

আপু যখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে ট্রলিব্যাগের চেইন আটকাচ্ছে, আমি টুকটুকিকে একপাশে ডেকে নিলাম। রহস্যের জট আজ খুলতেই হবে।

"এবার সত্যি করে বল তো মা, আসল ঘটনা কী? তোর আম্মু বাড়ি থেকে ওভাবে চোখমুখ লাল করে, রাগ করে চলে এসেছিল কেন? সকালে উঠে বমিই বা করল কেন?"

টুকি তার খালি চকলেটের ব্যাগের দিকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকাল। তারপর অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, "আম্মু সেদিন রান্নার পর খুব শখ করে ডাইনিং টেবিলে বসে রোস্ট আর পোলাও খাচ্ছিল। তখন আব্বুর পেটে অনেক গোলমাল চলছিলো, আব্বু পেছন থেকে এসে আম্মুর একদম পাশে দাঁড়িয়ে 'পুত' করে একটা বিচ্ছিরি পচা বাতাস ছেড়ে দিয়েছে। ওই গন্ধে আম্মুর বমি চলে আসছিল। এইজন্যই আম্মু রাগ করে, না খেয়ে চলে আসছে।"

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। সামান্য, একটা ঘটনার জন্য গত এক সপ্তাহ ধরে আমাদের এই বাড়িতে কুরুক্ষেত্র চলছে?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "এতবড় কথা তুই এতদিন আমাদের বলিসনি কেন?"

টুকি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, "কারণ আব্বু আমাকে এক ব্যাগ চকলেট দিয়ে বলেছিল, এই ঘটনার কথা আমি যেন কাউকে না বলি। আর বিশেষ করে ওই ডাইনি খালাকে (মেজো আপুকে) যেন চকলেটের কোনো ভাগ না দিই।"

আমি থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলাম। "তাহলে এখন যে সব ফাঁস করে দিচ্ছিস?"

টুকি তার খালি ব্যাগটা উল্টো করে ঝেড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "এখন তো চকলেট শেষ!"
 
Back
Top