Collected বোকা

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
476
Messages
7,967
Reaction score
7,526
Points
4,113
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
বোকা

মূল লেখকঃ উদয় রহমান
​






আমার ছোট ভাই বোকা। এইটা আমাদের পরিবারে একটা প্রতিষ্ঠিত সত্য, যেভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য, আমি বুদ্ধিমান।

ও ক্লাস টেনে পড়া ছেড়ে দিয়েছিল। তিনবার এস এস সি দিয়ে পাশ করতে পারে নি। প্রতিবার গনিতে ফেল। এখন রাজমিস্ত্রির কাজ করে। সাভারে নিজের একটা দল আছে পাঁচজনের। আমি পিএইচডি করি বার্লিনে, এমন একটা বিষয়ে যেটার নাম বললে মানুষ মাথা নাড়ে জোরে জোরে কিন্তু বোঝে না।

আমি তেমন একটা বাংলাদেশে যাই না। আমার ভাই বছরে দুইবার আমাকে ফোন করে, রোজার ঈদে আর জন্মদিনে।

এদেশে কিছু বাংলাদেশি আর ভার্সিটির কলিগ ছাড়া আমার পরিচিত কেউ নেই। একজন ছিল। ভেনেসা।
দুই বছর পরে ও একদিন এসে বলল, আমাদের সম্পর্কটা আর আগের মতো নাই। সেই থ্রিলটা হারিয়ে গেছে। তাই আলাদা হওয়াই ভালো।

ও একটা বাক্য বলে ব্যাগ গোছানো শুরু করলো যেভাবে মানুষ একটা নেটফ্লিক্স সাবস্ক্রিপশন বাতিল করে।

আমার মনে হলো আমি অথৈ সাগরে পড়েছি। ভেনেসাকে আমি খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরেছিলাম, সেটা আমি তখন প্রথম বুঝলাম, যখন খড়কুটোটাও ভেসে গেল। আমি বুদ্ধিমান মানুষ হয়েও দুই বছরে বুঝিনি আমি ডুবে আছি। ভেবেছিলাম সাঁতার কাটছি।

কাউকে কিছু বলতে পারলাম না। বার্লিনের পার্কগুলোতে গিয়ে বসে থাকতাম হোমলেস মানুষের মত। জীবনটা অর্থহীন লাগতো। জীবনানন্দের মত রাস্তায় ট্রামের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে ইচ্ছা হত।

প্রতি রোজার ঈদের মতই আমার ভাই ফোন করেছিল, "ভাইয়া ঈদ মোবারক! ভালা আছস?"
আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ রে!

ও বলেছিল, "আচ্ছা। মন খারাপ নাকি?"

“না রে। ঠান্ডা লাগছে একটু। পরে কল দেই তোকে!”
ও কেটে দেয়নি। ফোন ধরে চুপ করে ছিল কয়েক সেকেন্ড।

তারপর বলল, "ভাইয়া, আমার একটা শখ হইছে। জার্মানির বিল্ডিং দেখমু। আমি আসি?"

আমি বললাম, "তুই বিল্ডিং দেখতে বার্লিন আসবি?"
ও বলল, "হ। রাজমিস্ত্রি গ্রুপের লিডার আমি, বিল্ডিং দেখা লাগে। আমার টিমরে শিখাইতে হবে!”

আমি প্রথমে ভেবেছিলাম মজা করছে। কিন্তু পরের সপ্তাহেই ফোন করে বলল, “ভাইয়া, ভিসার লাইগা একটা ইনভাইটেশন লেটার লাগবো।”

আমি পাঠালাম। ও নিজের কাজের কাগজপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট জোগাড় করে ভিসার আবেদন করল। প্রায় দুই মাস পরে ভিসা হলো।

তখনো ভেবেছিলাম, ও সত্যিই জার্মানির বিল্ডিং দেখতে আসছে। রাজমিস্ত্রি মানুষ, বিদেশে গিয়েও ইট-সিমেন্টের চিন্তা!

প্রথমবার বিমানে উঠে এসেছে। আমি ওকে এয়ারপোর্ট থেকে তুলে নিলাম।

ও গাড়িতে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, "ভাই, এইখানে একেক বিল্ডিং দেখি একেক ডিজাইনের।"

আমি বললাম, হ্যাঁ। কিছু ভিক্টোরিয়ান, কিছু মর্ডান।
ও বলল, কারা বানায় এগুলি?

আমি বললাম, জানি না।

ও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। তুই এতদিন থাকস, জানস না কে বানায়?

আমি জানি না এই বিল্ডিংগুলো কোন কোম্পানি বানায়। তবে আমি জানি এই শহরের ইতিহাস, এই দেশের রাজনীতি, এই মহাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, আমি জানি পৃথিবীর তাপমাত্রা কত বাড়বে আর কোন দেশ ডুববে আর কোন যুদ্ধ কেন লাগতে পারে। কথাটা আর ওকে বললাম না। বললে মাথা চুলকে হাসবে।

ও দশদিন আমার বাসায় ছিল। দশদিনে আমি কিছু জিনিস খেয়াল করলাম।

ও সকালে ওঠে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা খায়, আর চায়ের দিকে তাকিয়ে হাসে একা একা।

আমি সকালে উঠেই ফোনে খবর পড়ি সারা বিশ্বের, সোশ্যাল মিডিয়া দেখি, তারপর কফি খাই, দেখি ঠান্ডা হয়ে গেছে কফি। আর তেমন স্বাদ পাই না।

ও রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে থামে। একটা দেয়াল দেখে। হাত দিয়ে ছোঁয়। বলে, "ভাই, সিমেন্ট প্লাস্টার না। এইটা পাথর কাটা। ধরে দেখ। এটা বানাইতে নিশ্চয়ই খবর হয়ে গেছে।"

আমি না ধরেই দেখি। আমি বহু বছর এই রাস্তায় হেঁটেছি। পাথরের দেয়ালটা দেখিনি। আমি হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, ভাবতে ভাবতে পৌঁছাই, পৌঁছে মনে থাকে না কোন রাস্তা ধরে হেঁটে এসেছি।

ও রাতে ঘুমায় দশটার মধ্যে। আমি রাত তিনটায়ও জেগে থাকি। কারণ আমার মাথায় একটা প্রশ্ন ঢুকেছে যেটার উত্তর তিনটা বইয়ে তিন রকম, এখন আমি চতুর্থটা খুঁজছি।

চতুর্থ দিন রাতে আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম।
"তুই সবসময় এত খুশি ক্যান?"

ও অবাক হলো। বলল, "আমি খুশি?"

"হ্যাঁ। তুই সকালে চা খাস আর একা একা হাসিস বারান্দায় দাঁড়িয়ে। রাতে বিছানায় পড়েই ঘুমিয়ে যাস।”

“আমারও চিন্তা আছে ভাই। পাঁচজন মিস্ত্রি আমার লগে কাম করে। কাম না থাকলে ওগো বেতন দিমু কই থেইকা? কী করমু? চিন্তা কইরা তো ঘরের দেয়াল উঠবো না। সকালে উঠতে হবে, কাজকাম করতেই হবে।”

একটু পরে ও বলল, “তোর সমস্যাটা কী জানস? তোর চিন্তার সবকিছু অনেক দূরে। কাছে যা আছে, ওইগুলা দেখস না।”

আমি বললাম, "তাইলে জানা খারাপ?"

ও বলল, "তুই দশটা দেশের খবর জানস, কিন্তু তোর পাশের ফ্ল্যাটের লোকটার নাম জানস না। তুই আমার চাইতে হাজার গুণ বুদ্ধিমান, ভাই। তুই তোর বুদ্ধি খরচ করস এমন কিছু জিনিসে যেইটা তোরে ফেরত কিছু দেয় না।"

আমি কিছু বলতে পারিনি এর উত্তরে।

এক দিন আমরা বাইরে বের হচ্ছি। এমন সময় ও পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় টোকা দিল।

আমি বললাম, কী করছিস? বিরক্ত হবে।

বলল, পাশের বাসায় কে থাকে, জানস?

আমি বলার আগেই দরজা খুলল একজন বুড়ি মহিলা, জার্মান, চশমা পরা মোটা ফ্রেমের। আমার ভাই জার্মান জানে না।

ও হাত বাড়িয়ে ভাঙা ইংরেজিতে বলল, "হ্যালো। হাউ ডু ইউ ডু? দিস মাই ব্রাদার।"

আমাকে দেখাল। মহিলাটি হাসল। আমার ভাইও হাসল। দুইজন এক মিনিট হাসাহাসি করল, কোনো ভাষা ছাড়া। মহিলার নাম ফ্রাউ হাইডেনরিস। আমি এত বছর পরে জানলাম। এখন উনি আমাকে সিঁড়িতে দেখলে মাথা নাড়েন। গুটেন টাগ বলেন। আগে বলতেন না।

একদিন ও আমার ফ্রিজ খুলে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। ভেতরে দুইটা বাভারিয়ান বিয়ারের বোতল, পাউরুটি, বাটার, ডিম, চিজ, লেবু।

ও বলল, "তুই এইগুলা খাস?"

আমি বললাম, “সময় হয় না। বাইরেই খাই বেশিরভাগ সময়!”

ও কিছু বলল না। ও সুপারশপে গেল, আর ফিরে এলো চাল, ডাল, পেঁয়াজ, একটা মুরগি নিয়ে। এরপর রান্না শুরু করলো। আমার রান্নাঘরে প্রথম ভুনা খিচুড়ির গন্ধ।

ও বলল, ভেনেসা আপার লাইগা রান্ধিস নাই কোনোদিন? রান্নাঘরের দেয়ালে কোন রান্নার নিশানাই নাই।

আমি চমকে গেলাম। ও ভেনেসার নাম জানে?

ও নিজেই উত্তর দিল, ফেসবুকে ছবি দেখছিলাম।
আরেকদিন দিন বৃষ্টি। আমি বললাম, আজ বের হওয়া যাবে না।

ও বলল, "ক্যান?"

“বাংলাদেশের মত আরামের বৃষ্টি না এটা। হাড় কাপিয়ে দিবে এই পানি!”

ও আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি বলেছি আজ নিঃশ্বাস নেওয়া যাবে না। ও আমার রেইনকোট পরে বের হলো।

আমি জানালা দিয়ে দেখলাম, ও রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা বিল্ডিংয়ের দেয়ালে হাত রেখেছে, ভেজা পাথরে, আর মুখ তুলে উপরে তাকিয়ে আছে, বৃষ্টিতে,

ও ফিরে এসে বলল, "ভাই, বৃষ্টিতে পাথর অন্য রং হয়ে যায়। তুই জানস?" আমি জানতাম না।
আরেকদিন ও আমার বইয়ের তাক দেখল। তিনশো বই।

ও একটা টানল, খুলল, দুই পাতা দেখল, রেখে দিল।

বলল, "এইগুলা সব পড়ছস?"

আমি বললাম, হ্যাঁ বেশিরভাগই পড়ছি।

ও বলল, "কোনটা পইড়া তোর ভালো লাগছিল?"
আমি অনেকক্ষণ ভাবলাম। তারপর বললাম, ভালো লাগার জন্য আমি পড়ি না, আমি জানার জন্য পড়ি।
গল্প পইড়া ভাল লাগবে না কেন তোর?

এখানে নন ফিকশন বেশিরভাগ, ফিকশন পড়ে তেমন কোন লাভ নাই।

ও বললো, ও আচ্ছা।

কি বুঝলো জানি না।

বইয়ের তাকের নিচের খোপে ও একটা কাগজের পাখি বানিয়ে রেখে গেল আমার খাতার পাতা ছিঁড়ে। আমি জানি না কেন। ওইটা এখনো ওইখানে।

ও যাওয়ার আগের দিন আমাকে বলল, "ভাই, তোর রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে পানি জমে। আমি ঠিক করছি। দেখে যা।

আমি দেখলাম ও আসলেই ঠিক করেছে। তিন মাস ধরে ওইখানে পানি জমত, আমি একটা বড় বালতি রেখে দিয়েছিলাম নিচে, প্রতি সপ্তাহে খালি করতাম, আর ভাবতাম, একদিন কাউকে ডাকব ঠিক করাতে।

ও সিঙ্কের নিচ থেকে মাথা বের করে বলল, "এইখানে লিক ছিল পাইপে। ঠিক করলাম এজন্য।"

আমি তখন ওকে জিজ্ঞেস করলাম।

"তুই সত্যিই বিল্ডিং দেখতে আসছিলি?"

ও রেঞ্চটা রাখল। হাত মুছল প্যান্টে।

বলল, "না।"

"তাইলে?"

"তুই ফেসবুকে কখনোই কিছু লেখস না, ভাই। বছরে একটা ছবি দিলি অনেক দিন পর। ভেনেসার সাথে। সেই তুই গত দুই মাসে তুই এগারোটা রিল শেয়ার দিছস। সব বিচ্ছেদের, হতাশার, জীবনের মানে নাই এমন। কবিতাও শেয়ার দিছিস একা থাকার মানে নিয়া।" ও থামল।

"তোর মত দূর দূরান্তের জিনিস না জানলেও তোরে তো জানি খুব কাছ থেইকা ছোট্টকাল হইতে। তোরে না দেখতে আইসা পারি!"

আমি বললাম, "তোর দলের এত দিন কাজ বন্ধ। লোকসান হবে না তোর ব্যবসায়?"

ও অবাক হয়ে তাকাল।
"দুনিয়ায় এত হিসাব আমি বুঝি না রে ভাইয়া। কয়দিনই বা বাঁচবো।"

ও চলে গেছে দুইদিন আগে। আমি এখনো রাত তিনটায় জাগি। ওই সমস্যাটা যায়নি, যাবে না সহজে হয়তো।

কিন্তু আমি বুঝতে শুরু করেছি, কেন ও সুখী আর আমি এমন।

আমি সারাজীবন হিসাব করেছি। ভেনেসাকে দুই বছর হিসাব করে ভালোবেসেছি, তাই ভেনেসাও একদিন হিসাব নিকাশ করে চলে গেছে।

আর অন্যদিকে আমার বোকা ভাই ফেসবুকের রিল শেয়ার দেখে টিকিট কেটেছে, কোনো হিসাবের খাতা না খুলে।

ও পাশের বাসার দরজায় টোকা দিয়েছে, জার্মান ভাষা না জেনে। ও বৃষ্টিতে বেরিয়েছে, শীতের পরোয়া না করে। ও একটা কাগজের পাখি বানিয়ে রেখে গেছে, কারণ ছাড়া। ও এসে কিছুই ঠিক করেনি, ভেনেসা ফেরেনি, শহরটা আগের মতোই ঠান্ডা ও নির্দয়। তবুও কয়েকটা দিন আমার পাশে থাকতে চেয়েছিল।

মানুষ বলে বোকারা সুখী, কারণ ওরা বোঝে না। আমার মনে হয় ওরাও বোঝে, তবে বোঝার পরেও হিসাব করে না। তাই ভালবাসতে পারে কোন শর্ত ছাড়া।

আমিও এখন ওর মত একটা জিনিস করি। সকালে কফি হাতে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়াই, ফোন খুলি না। আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের শান্তিপূর্ণ জীবনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি কারো কাছে।

পাশের পাথরের দেয়ালওয়ালা বিল্ডিংটার দিকে তাকাই, যেটা বৃষ্টিতে অন্য রং হয়। আমি খুঁজে বের করেছি কে বানিয়েছে এই বাড়ি। উনিশশো সাত সালে একজন স্থপতি, নাম লেখা আছে দেয়ালে, নিচে, ছোট করে, যেটা আমি এত বছর দেখিনি।

আমি ওকে ফোন করে বলেছি কথাটা। ও বলেছে, "দেখলি? পাওয়া যায়। খালি তাকাইতে হয় ঠিকভাবে।"

তারপর ও বলল, "ভাই, খাইছিস রাতে?"

আমি বললাম, "হ্যাঁ। ভুনা খিচুড়ি। তোরটার মতো মজা হয় নাই।"

ও বলল, "প্রথমবার হয় না। পরেরবার হইবো।"

সমাপ্ত
 
Back
Top