- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 445
- Messages
- 7,050
- Reaction score
- 5,052
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
বিলেতে সাড়ে সাতশো দিন
মূল লেখকঃ মুহম্মদ আব্দুল হাই
মূল লেখকঃ মুহম্মদ আব্দুল হাই
পর্ব - ১
পাখীর মতো ডানা মেলে দিয়ে জীবনের প্রথম আজ নিজের দেশের আকাশে উড়ছি। নিজের দেশের শ্যামশোভা এমন করে দেখার সুযোগ হয়নি কোনদিনও। নীচে ফসলের মাঠ আর তরুলতার সবুজ। ওপারে নীল শূন্য আকাশ। সাদা-কালো রঙ-বেরঙের মেঘমালার ছোঁয়া লাগছে শরীরে ও মনে। ওপর থেকে মাঠঘাট দেখে মনে হচ্ছে কে যেন পাশার ছক পেতে রেখেছে। মানুষ ও মানুষের ঘরবাড়ীগুলো দেখে গালিভারের লিলিপুটের কথা মনে পড়ছে। অনন্তকাল-স্রোতের মধ্যে বুদ্বুদের মতো মানুষের জীবন–অবিরত ফুটছে ও ঝরছে। দুনিয়ার খেলাঘরে কয়টি মুহূর্ত কাটিয়ে দেবার জন্যে তার কত আয়োজন–আর নিজের শক্তির পরিচয়ে কি তার আনন্দ! কিন্তু ওপর থেকে এমন নির্লিপ্তভাবে দেখলে মানুষের ক্ষুদ্রতার কথা আশ্চর্যভাবে মনে পড়ে যায়। কি অদ্ভুত ছোট ছোট দেখাচ্ছে সব কিছু। ঘরবাড়ী লাগছে শিশুদের খেলাঘরের মতো। বাস-ট্যাক্সী ট্রেনগুলোকে মনে হচ্ছে যেন তাদের খেলনা। পদ্মাকে মনে হচ্ছে যেন খেয়ালী মেয়ের হাত থেকে খসে পড়া এক টুকরো রূপালী ফিতী।
কিন্তু শোভা দেখলাম পূর্ব বাংলার মাটির আর আকাশের। সবুজে সবুজ আর নীলিমায় নীল সারা পূর্ব বাংলা। আদিকাল থেকেই প্রকৃতির যে বৈশিষ্ট্যের জন্যে বাংলা দেশের খ্যাতি, র্যাডক্লিফ রোয়েদাদ মতে পূর্ব বাংলার সবটাতেই পাই তার ছাপ। মেঘের এমন সমারোহ, আকাশের বুকে মেঘরাজ্যের এমন খেলা, মুহর্মুহু মেঘমালার এত বিচিত্র রূপবদল, ধীরভাবে মুগ্ধ দৃষ্টিতে না দেখলে তার সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায় না। সাদা, কালো, অসিমানি, ফিরোজা, সবুজ, নীল, ধূপছায়া, বেগুনি, লালচে ও লাল, ফিকে ও গাঢ় কত রঙের মেঘের কি সুন্দর কৌতুক লীলা। দেখে দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো। নিজের দেশকে এমনভাবে দেখবো একথা কোনদিন ভাবিনি। মনে পড়ছে ইবনে বতুতার ভ্রমণ বৃত্তান্ত। আজ থেকে দু’শ বছর আগে তিনিও দেখেছিলেন পূর্ব বাংলার এ সবুজ রূপ অনাস্বাদিতপূর্ব পিপাসা নিয়ে। মরুদেশের মানুষ তিনি। পূর্ব বাংলার স্নিগ্ধ সবুজরূপ সে দিন তাঁর চোখে মায়ার পরশ বুলিয়েছিলো! পূর্ব বাংলায় প্রবেশ করে পৃথিবী তার কটিদেশে সবুজ মেখলা জড়িয়েছে। তার সেই সবুজ স্রস্ত বসনাঞ্চল বার্মা-মালয় হয়ে লুটিয়ে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার দিকে। সবুজের সবটুকু গাঢ়তা অকৃপণভাবে উপচে পড়েছে পূর্ব বাংলায়। সিলেট এবং চাটগাঁ থেকে আরম্ভ করে ঢাকার রমনা হয়ে আকাশের পথে উত্তর-পশ্চিমে যতই বিচরণ করা যায়, প্রকৃতির সবুজের প্রবাহ ততই কমে আসতে থাকে। পশ্চিম বাংলার বর্ধমান বিভাগে প্রবেশ করলেই দেখা যায় সবুজ ফিকে হয়ে পেছনে সরে পড়েছে।
কলকাতাও ছাড়লাম। উড়ছি ভারতের উপর দিয়ে। তখতে সোলায়মানে ব’সে ভারতবর্ষ পরিক্রমণ করছি। ‘নদ-নদী-নগরী বাহিয়া’ উড়ে যাচ্ছে সোলায়মানের হাওয়াই সিংহাসন। মানুষ আর প্রকৃতির গড় নিদর্শনগুলো একে একে আমাদের চোখের সামনে থেকে দ্রুত অপসৃত হয়ে যাচ্ছে। এলাম নয়াদিল্লী। ওপর থেকে ছবির মতো লাগছে। দিল্লীর পালাম বিমান বন্দর ছাড়লাম। করাচীর দিকে উড়ে চলেছি। রাত্রি তখন গোটা দশেক হবে। কারাচী বিমান বন্দরের আলো চোখে পড়লো। প্রাচ্যে প্রবেশ করার রাজতোরণ এই করাচী। বিমান বন্দরটি প্রকাণ্ড। তেজগাঁ থেকে লণ্ডন পর্যন্ত যতগুলো বিমানবন্দর রয়েছে, একমাত্র আমষ্টার্ডম ছাড়া অন্যান্যগুলোর তুলনায় করাচীর বিরাটত্ব ও গাম্ভীর্য লক্ষ্য করার মতো। প্রাচ্যের তোরণ হিসেবে আর দুনিয়ার সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের বিমান বন্দর হিসেবে করাচী তার বৈশিষ্ট্য রক্ষা করেছে। নিজের দেশ পাকিস্তানের তদানীন্তন রাজধানী করাচী দেখে নিলাম। করাচীর প্রধান যে জিনিস পূর্ব পাকিস্তানীদের চোখে পড়ে, তা তার প্রচুর চওড়া পথ আর উটের গাড়ী। কদাকার প্রাণী উটের প্রয়োজন ও উপযোগিতার শুরু ভারতের যুক্তপ্রদেশ থেকে। উটকে বলা হয় ‘মরুজাহাজ’। শুকনো মাটির দেশ আর মরুভূমিতে উটের মতো উপকারী প্রাণী খুব কমই আছে। পানি-কাদার দেশ আমাদের পূর্ব পাকিস্তান। গরু-মোষই আমাদের যানবাহনোপযোগী প্রধান জন্তু। বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে বিহার পেরিয়ে যতই উত্তর-পশ্চিমে এগুনো যায় উটের প্রয়োজনীয়তার কথা ততই মনে পড়ে। করাচীতে দেখলাম উট বোঝা বয়, গাড়ী টানে, লাঙ্গলও বয়, তাছাড়া মানুষের খাদ্যের একটা মোটা উপকরণও বটে।আমার আশেপাশের সেরা রেস্টুরেন্ট
করাচীতে চোখে পড়লো সেখানকার ফল। পথে পথে ফলের দোকান। ফলও অত্যন্ত সস্তা। যেখানে যা নেই, কথা আছে, সেখানে তার কদর বেশী। পশ্চিম পাকিস্তানে আনারস আর পানি নেই। পশ্চিম পাকিস্তানের আমীর লোকদের জন্যে অনেক সময়ে তাই হওয়াই জাহাজে আসে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আনারস আর পান। আমাদের এগুলো প্রচুর, তাই এসবের প্রয়োজন বুঝলেও কদর আমরা তেমন বুঝি না। আঙুর, বেদানা, সেব ইত্যাদির জন্যে আমরা জিভের পানি ফেলি। আমাদের ওখানে এ সবের যা সের দর তাতে মধ্যবিত্তরা এ সব ফল খাওয়া বিলাস বলে মনে করে। আঙুর, বেদানা ও সেবের কথা মনে হ’লে ইচ্ছে করে রোগী হয়ে থাকতে। বেলুচিস্তান, সিন্ধু ও কাশ্মীরে এ সব ফল প্রচুর পরিমাণে জন্যে। তাই করাচীতে এগুলোরই প্রাচুর্য।
১৯শে সেপ্টেম্বর। করাচীর ঈদগাহ ময়দানে গেলাম। নীল স্বচ্ছ আকাশ, চারিদিকে ধূ ধূ করছে শুকনো রোদ। জাতির পিতা কায়েদে আযমকে দেখলাম অনন্ত বিশ্রাম-রত। জীবনে বিশ্রাম নেবার সুযোগ তার ঘটেনি। জাতিকে গড়তে গিয়ে তিলে তিলে নিজের জীবন ক্ষয় করে পাকিস্তানী জাতির চলার পথ তৈরী করে দিয়ে তবেই তার শোবার সময় এলো। যেখানে তার মাজার সে জায়গাটি বেশ উঁচু এবং খুব চওড়া। চারিদিকের মাটি ও কাকর পাথরের মত শক্ত। তারই ওপরে রচনা করা হচ্ছে কায়েদের স্মৃতিসৌধ। জীবনে তার জাতিকে উঁচু করে গড়ে তোলার জন্য তিনি তাঁর মাথা যেমন কারও কাছে নীচু করেন নি, তেমনি তার হাতে গড়া জাতি মৃত্যুতেও তাঁকে উঁচু করে তুলে ধরবার জন্যে উঁচু জায়গাতেই তাকে শুইয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছে। মানীর মান খোদা কিভাবে রক্ষা করেন, তার অপূর্ব সমন্বয় দেখলাম কায়েদে আযমের মাজারে। বহুদূর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়, ঐ ওখানে শুয়ে থেকে হযরত ওমরের মতো, খালেদের মতো তার জাতিকে এগিয়ে যাবার কি অপূর্ব প্রেরণা তিনি যোগাচ্ছেন। কবরের শিরানায় পাথর ফলকে কোরানের আয়াত লেখা রয়েছে। তার বাম দিকে মেয়েদের ও ডানদিকে পুরুষদের যিয়ারতের ব্যবস্থা। দুপাশেই কোরান শরীফ রয়েছে। ইচ্ছা করলেই যে কেউ সেখানে কোরান তেলাওয়াত করে তার রূহের মাগফেরাতের জন্যে বখশে দিতে পারে। কায়েদে আযমের সৌভাগ্যে মন ভরে উঠলো। তার জন্যে শুধু পাকিস্তানেই নয়, সারা মুসলিম জাহানে যতো কোরান-খতম হয়েছে, ইসলামের শুরু থেকে আজ অবধি কারুর একার জন্যে এতোবার কোরান খতম হয়েছে কি-না সন্দেহ। মাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম ঘিরে যে স্মৃতিসৌধ গড়ে উঠবে, তার চিহ্ন আকা হয়েছে দেখলাম। করাচীর প্রান্তভাগে এই ঈদগাহ ময়দান। দূর সমুদ্র থেকে হু হু করে বাতাস বয়ে এসে কায়েদে আযমের মাজার চুমে যাচ্ছে।
আরব সাগরের কূলে-করাচীর সুবিখ্যাত ক্লিফটন বীচ। নগরবাসীদের সমুদ্রস্নানের ও যুগল মিলনের এমন উপযুক্ত জায়গা সারা পাকিস্তানে আর দ্বিতীয়টি নেই। করাচীর এক ধনী পারসীর টাকায় গড়ে উঠেছে এই বীচটি। বলতে গেলে একেবারে সমুদ্র থেকে একটু একটু করে বেঁধে তোলা হয়েছে এই বীচের রাজপথ। ট্যাক্সি নিয়ে কি পায় হেঁটে পাড় থেকে সামনে যাতে পানির ধার পর্যন্ত নেমে যাওয়া যায় তার সুন্দর ব্যবস্থা আছে। পাথর বাঁধানো পথ পাড়ের ওপর থেকে নীচে নেমে গেছে। পথের ওপরেই রোদ থেকে বাচবার আশ্রয় বিশ্রাম শিবির। আর মাঝে মাঝে রচা সুন্দর কৃত্রিম অথচ মনোহর তরুলতা ও ফলের বাগান। মরুভূমির বালির উপর কচি ঘাসের চোখ জুড়ানো সবুজ ছোঁয়া। পায়ে হেঁটে পথ বেয়ে নেমে গেলাম একেবারে পানির ধারে। জোয়ার ভাটায় বালির বহুল আমদানীতে পথ মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যায়; সেজন্যে বালি সরিয়ে দেবার যথারীতি ব্যবস্থাও দেখলাম। ক্লিফটন বীচ থেকে অনতিদুরেই দেখা যায় আরব সাগরের বুক ভেদ করে স্ফিংসের মতো পাহাড় উঁচু হয়ে উঠেছে। তার চারপাশে এসে দিগন্ত জোড়া অথৈ পানির কলেজ্জিাস ও অনন্ত গর্জন আছাড় খেয়ে ভেঙে পড়ছে, তবু সেই পর্বত চূড়া উন্নত মহিমায় আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেখলাম অভিসারকামী যুগলের দল। সাগরের অনন্ত মত্ততার আভাসে দুরন্ত প্রাণ বন্যায় তারাও তরঙ্গিত হচ্ছে। দু’হাত তুলে তাদের আশীর্বাদ করলাম। মনে মনে বললাম, আমার দেশের এ অনন্ত যৌবন অক্ষয় হোক। যে দেশের যুবকেরা এমনি করে জীবন উপভোগ করতে পারে তারাই হাসতে হাসতে দেশের জন্যে প্রাণও দিতে পারে। যুবতীরা দেয় প্রেরণা; যুবকেরা দেয় প্রাণ। যে দেশে অক্ষয় যৌবনের দুর্বার অভিযান আধুনিক জগতে সে দেশের উন্নতিই অবশ্যম্ভাবী; ইউরোপ তার সাক্ষ্য।
***
ভাবতে ভাবতে শূন্য আকাশের বুকে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। উড়ন্ত বিমান হঠাৎ ‘বাম্প’ করলো। তবু রক্ষা। আকাশ থেকে মাটিতে নামবার ব্যবস্থা হচ্ছে। ভোর ছ’টা। বাগদাদে নামলাম। রাত্রির অন্ধকারে আর জড়িমাজড়িত মনের ভাবে আমি বেঁচেছিলাম কি না জানিনা। কখন আফগানিস্তান ও ইরান পার হয়ে এসেছি টের পাইনি।
মুসলিম-সভ্যতার গৌরব নিকেতন খলিফা হারুনর রশীদের দেশ ইরাকের রাজধানী এই বাগদাদ। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ ফল খুরমা ও খেজুর দেখলাম। মধ্য এশিয়া সম্পর্কে আমাদের দেশে যে ধারণাঁ তা মোটেই মধুর নয়। মধ্যযুগীয় মনোবৃত্তি মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোতে আজও যে নেই তা নয়। তবু এরা এগুচ্ছে বর্তমান যুগের বিজ্ঞান-শাসিত সভ্য ইউরোপকে অনুসরণ করে। মানুষের প্রকৃতিতে দেশের মাটির ছাপ থাকে সুস্পষ্ট। বাগদাদ বিমানঘাঁটি দেখলাম। বড়ো নোংরা লাগলো। সেই থুথু। সেই চেঁচামেচি। বাংলা দেশের স্টীমার কি রেল স্টেশনের মতো মনে হলো। অন্যান্য বিমানঘাটির মতো বাগদাদ বিমান ঘাটি শহর থেকে তেমন দূরে নয়। বিমান ঘাঁটির পাশ দিয়ে রাস্তা শহরের দিকে চলে গেছে। দু’পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে গাছপালা। আমাদের দেশের মতো এত সবুজ নয়, সরসও নয়। একটা রুক্ষতার ছাপ প্রকৃতির যুতটুকু চোখে পড়ল তাতে আর মানুষগুলোর চেহারায় স্পষ্ট দেখতে পেলাম। ভাঙা আরবীতে এখানকার দু’চার জনের সঙ্গে কথা বললাম। পাকিস্তান থেকে আসছি শুনে খুব খুশী হলো ওরা। পাকিস্তানের বাইরে মুসলিম দেশগুলোতে পাকিস্তানের জন্যে দরদ দেখে বুক ভরে উঠলো। একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখলাম। আরবী সাহিত্যের বিস্মৃতপ্রায় রহস্যময় চরিত্র বদিউজ্জামান হামদানী 1 আবুল ফাহল এস্কান্দরী’র কথা মনে হলো। আমরা কৈশোর জীবনের পরিচিত সেই চরিত্রকে বাগদাদে এসে এমন অপ্রত্যাশিতভাবে দেখবো একথা ঘুণাক্ষরেও কোনদিন ভাবিনি। আমার কাছে সে হলো হঠাৎ আবির্ভুত। জোব্বাজোব্বি পরিহিত ভদ্রলোক অনর্গল আরবীতে কি বকছে। বক্তৃতা শুনবার জন্যে কাছে গেলাম। আমাদের মতো নতুন মুখ দেখে আরবী বুঝবো না মনে করে ফারসী ভাষা বলতে লাগলো। দুই-ই হলো আমাদের কাছে সমান দুর্বোধ্য। অঙ্গভঙ্গী থেকে যতটুকু বুঝলাম তাতে মনে হলো বেচারা ভুগছে কোনো অসুখে। যে কারণেই হোক তার অর্থের প্রয়োজন। আমার কল্পনা আর বাস্তবের এস্কান্দারীর মধ্যে তফাৎ দেখে মনটা ভারী হয়ে উঠলো। এমন সময়ে কালো পোশাক পরিহিত দৈর্ঘপ্রস্থে সমান টানা বাগদাদী পুলিশের হ’লো অতর্কিত আবির্ভাব। বেচারাকে চেঁচানোর আর সুযোগ দিল না। দিল বিমানঘাঁটির বাইরে বের করে। আমাদের দিকে চেয়ে ওর অতি বড়ো আশা বোধ হয় শূন্যে মিলিয়ে গেল।
বাগদাদ ছাড়লাম। জেগে-উঠা ভোরের আলোয় বিমানের সব শুদ্ধ পঞ্চাশ জন লোক আকাশ-বিহার করছি, এবারেই তা প্রথম বুঝলাম। নানা দেশের নানা রকমের নরনারী মূল থেকে উৎপাটিত হয়ে আকাশের বুকে এমন সখ্যবন্ধনে আবদ্ধ হবো তা কি কখনও ভেবেছিলাম? আশে-পাশে যে মুখগুলো দেখছি সবই যেন সুন্দর মনে হচ্ছে। আমাদের পাশের সিটে দেখলাম একটি যুগলকে। পরিচয়ে জানতে পারলাম তারা আসছে শ্যামদেশ থেকে। একজন সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানীর অধ্যাপক, আর একজন তারই বান্ধবী। বয়সে দু’জনেই তরুণ। তার সঙ্গিনীর নাম জিজ্ঞাসা করলাম। মেয়েটি ইংরেজী ভালো বুঝে না, কিন্তু যুতটুকু বুঝলো তাতেই অত্যন্ত মিষ্টি করে তার নামটি উচ্চারণ করলো ‘pa-নি’। ‘প’ এর পরের আকারের দীর্ঘতা তার বলার ভঙ্গী থেকে অত্যন্ত মধুর হয়ে বাজলো আমার কানে। বর্মী, মালয়ান, শ্যামদেশী, জাপানী আর চৈনিক মেয়েদের মুখের গড়ন কিছুটা চেপ্টা। আমাদের দেশের সৌন্দর্য-বিচারে অভ্যস্ত আমাদের চোখ এদের কোনদিনই ভালো চোখে গ্রহণ করেনি। কিন্তু এ মেয়েটির চেহারায় স্নিগ্ধ সারল্যের ছোঁয়া স্পষ্ট অনুভব করলাম। মাধুর্যের উপকরণ যে দুনিয়ার সব দেশেই আছে, একে দেখে বার বার সে কথাই মনে হচ্ছিল।
একটি সুন্দর কচি মেয়েকে দেখলাম। তার পাশের সিটে ছিল ষাটের অধিক বয়স্ক এক বুড়ো। দু’জনের চেহারায় কোন সামঞ্জস্য নেই। তবু তাকে বুড়োরই মেয়ে ঠাওরালাম। পরে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, বুড়ো আর কেউ নয়। সে বাগদাদের এক শ্রেষ্ঠীর মেয়ে। বিলেতে যাচ্ছে পড়তে। বয়স তার বছর এগার হবে। নাম লায়লা। তার কচি মুখের ওপর জ্যোত্সা-নম্র রূপের স্নিগ্ধ চমক মন ভরে দেবার মতো। বাগদাদের মুসলমান ঘরের ঐ ছোট্ট কচি মেয়েটি কি অপূর্ব মনোবল নিয়ে একা চলেছে বিলেতে! ঐ বয়সের আমাদের দেশে ছোট্ট ছেলেমেয়ের কথা না-ই বললাম। প্রৌঢ় আমাদেরকে নিয়েই একা চলার সমস্যায় আমরা কেমন উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি তা ভেবে কিছুটা যে লজ্জা না পেলাম তা নয়। এয়ার হোস্টেস প্রতি দুঘণ্টা অন্তর খাওয়াচ্ছেন। এটা সেটা হরদম খেয়ে মনে হচ্ছে যেন খাওয়ার ওপরেই আছি। আমরা মদ খাইনা দেখে বুড়োটির বিস্ময়ের শেষ নেই। খোঁজ নিয়ে বুঝলাম সেও মুসলমান। জীবনের কোন বন্ধন নেই তার। বয়স ভাটার টানে গড়াচ্ছে, পয়সা আছে প্রচুর। বয়সে বুড়ো হলেও তাই মন বুড়ো হয়নি। সে প্যারিস যাচ্ছে, জীবন। উপভোগ করতে। বাগদাদের এ বুঝি আর এক রূপ।।
আমরা উড়ছি সিরিয়ার মরুভূমির উপর দিয়ে। এর যেন আর শেষ নেই। যেদিকে তাকাই শুধু ধু ধু প্রান্তর। বালির তরঙ্গের পর তরঙ্গ, তার ছোঁয়ায় রোদ শুকিয়ে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। যতই চলছি মনে হচ্ছে মহাপিপাসার রঙ্গভূমি পড়ে পড়ে ধুকছে। পৃথিবীর অবয়ব যে কতো আশ্চর্য উপাদানে গড়া এমন করে পৃথিবী পরিক্রমণ না করলে তা বোঝা যায় না।
বেলা তখন দশটা। কায়রের ফারুক এয়ারপোর্টে নামলাম। ইরাক, সিরিয়া, মিশর এই তিনটি দেশের বুকের উপর দিয়ে উড়ে মধ্য এশিয়া সংক্রান্ত ছেলেবেলার ভূগোলের জ্ঞান ঝালিয়ে নেবার সুযোগ হলো। দেশগুলো যে শুকনো, আমাদের দেশের মত এমন ভিজা নয়, বীজ ফেললেই এমন সোনার ফসল ফলে না, তা বেশ বুঝতে পারলাম। এখন বুঝি যুগে যুগে এ জন্যেই ভারত বিশেষ করে বাংলাদেশকে বলা হয়েছে ঐশ্বর্যের লীলাভূমি। মধ্য এশিয়ার শুকনো দেশগুলোর সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের তুলনা করলে এর সত্যতা ভালো করে উপলব্ধি করা যায়। দিগন্ত জোড়া মরুভূমির মধ্যে ফারুক এয়ারপোর্ট। ইসরাইলের সঙ্গে মিশর যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। তার বিমান বন্দরের চারিদিকে অসংখ্য বিমান ডানা-ভাঙ্গা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলাম। শুকনো ঠনঠনে কাকরের মতো মাটি। উপরে উড়ছে মিশরের আলহেলালী ঝাণ্ডা। মিশরের মাটিতে পা দিয়ে অজ্ঞাত আত্মীয়তার সুরের আভাস পেলাম। বাগদাদের মতো এখানকার মানুষগুলোকে তেমন। শুকনো মনে হলো না। এদের কথা আরবী শুনতে ভাল লাগলো। কথ্য আর লেখ্য ভাষায় তফাৎ যে কতোখানি, আমরা যারা বিদেশী ভাষায় লেখ্যরূপ শিখি তার কথ্যরূপ না শুনলে তা যথাযথ বুঝতে পারি না। আমাদের জ্ঞান ক্লাসিকাল আরবীতে- তা অপরিবর্তনীয়; বর্তমান কালে আরবী ভাষা পরিবর্তনের স্রোতে কোথায় ভেসে এসেছে, মিশরে এসে তার টের পেলাম। মনে হচ্ছে যেন ফারসী ভাষা শুনছি। মা আর মাতৃভাষা প্রত্যেকেরই অতি আপনার, সে জন্যেই মিষ্টি। বিদেশী হওয়া সত্ত্বেও তুমদুনিক সংযোগের জন্যে এদের ভাষার মিষ্টতা আমার হৃদয় স্পর্শ করলো।
***
মধ্য এশিয়া ছেড়ে যাচ্ছি। ভূমধ্যসাগরের উপরে আমরা উড়ছি- তিরিশ হাজার ফিট উঁচু দিয়ে। নীচ থেকে বহু উপর দিয়ে পাখী উড়তে দেখে কতোদিন কতো কথাই তো মনে করেছি, আজ আকাশের বুকে এমন ভাবে উড়তে গিয়ে সুদে আসলে তার সব শোধ করে নিচ্ছি। পৃথিবীর অগণিত বৈচিত্র প্রতিভাত হচ্ছে আমার চোখে। সবটা মিলিয়ে কিসের যেন মোহ জাগছে।
ছেড়ে গেলাম ক্রীট। ছাড়লাম আদ্রিয়তিক সাগর। সামনে দেখা যাচ্ছে আল্পস পর্বতমালা। অষ্ট্রিয়া, ইটালী, সুইজারল্যাণ্ড, ফ্রান্স ও জার্মানীর প্রান্তদেশ জুড়ে পড়ে আছে ইউরোপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলানিকেতন আল্পস পর্বতমালা। আমাদের বিমান ক্রমেই উঠে যাচ্ছে উঁচুতে আরও উঁচুতে। মনে হচ্ছে নমরুদী সিংহাসন মাংস-লুব্ধ শকুনির সাহায্যে খোদার খোদকারী ধূলিসাৎ করবার জন্যে অভিযানে বেরিয়েছে। তাই সে যেন আর নীচুতে নামতে চায় না। ভাবছি রক্ষা পেলে হয়। আল্পসের মেঘমালার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আমরা এগুচ্ছি। আর কিছু দেখা যায় না। মেঘরাজ্যে হারিয়ে গেলাম। ভয়ে আতঙ্কে প্রাণ শিউরে উঠছে। মনে হচ্ছে এ দুর্জয় প্রকৃতির অপরিসীম রহস্যের মধ্যে তলিয়ে গেলাম। এখান থেকে বেরুনোর আর কোন আশা নেই। জীবনের বৃন্তটুকু হতে প্রকৃতির গভীর অন্ধকারে খসে যাচ্ছি। পিছনে পড়ে রইলো জীবনের সুখ দুঃখের স্মৃতি। আর কোনদিন। সেখানে ফিরবার অবসর হবে না। কি গভীর মেঘান্ধকারে এতগুলো প্রাণী মরণের অভিসারে চলেছি ভাবতে পারছি না। সকলের মুখেই গভীর আতঙ্কের ছাপ। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে যাচ্ছে। হঠাৎ তারি আলোর ঝলকানিতে অমানিশার চেয়েও থমথমে গাঢ় কালো মেঘের রূপ চোখে এসে ধাক্কা দিচ্ছে। কি ভীষণ সুন্দর! কি মৌন মহিমা তার! অনন্ত-জোড়া কালো মেঘ পাহাড়ের গায়ে গায়ে কি জমাটবাধা ভীষণতা ধারণ করছে। ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের অতলে ডুবে গেলাম। ক্ষণে ক্ষণে মনে হচ্ছে এর হাত থেকে মুক্তি পাবো কি?
বহুক্ষণ কেটে গেলো। চোখ মেলে চাইতেই দেখি এবারে সঘন সাদা মেঘমালার প্রণয়াভিসার। এক একটি মেঘপিণ্ড কি সতেজ, সুডৌল, সুঠাম! পরস্পরের কণ্ঠলগ্ন হয়ে মানুষের লোকালয় থেকে বহু দূরে জীবনের মৌন আকুতি বিবশ আলিঙ্গনে নিবেদন করে চলেছে। তাদের আনন্দের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়ে দিগদিগন্ত উদ্ভাসিত উল্লাসিত করে তুলেছে। তুষার ধবল বরফের রাজ্য। একটার পর একটা। একের গায়ে আর একটা। সে কত! যতদূর চোখ যায় দেখা যায় শুধু বিরাট বরফের পর্বতখণ্ড। মনে হচ্ছে “ন তত্র চন্দ্রোভাতি ন সূর্য তারকা।” আলোর গায়ে আলো ঠিকরে পড়ছে। বজ্রের আলোর চেয়ে সাদা। মৃত্যুর অনুভূতির চেয়ে হিম স্নিগ্ধ। বরফ-হিম-আলোর হাসি যেন থৈ থৈ করছে। বহু নীচে পড়ে রয়েছে আল্পস। মাথায় দুর্গম প্রকৃতির দুর্ভেদ্য রহস্য। তারই ওপর দিয়ে ভেসে চলেছি আমরা। পাশাপাশি কালো ও আলোর একি সমারোহ! নির্বাক বিস্ময়ে চোখ মেলে চাইছি! দেখে দেখে জীবনের অনুভূতি যেন স্তব্ধ হয়ে আসছে। এ দৃশ্য সত্যি দুর্লভ। ইউরোপের পথে বেরিয়ে এ জীবনে প্রকৃতির যে মনোরম শোভা দেখে নিলাম তার কোনো মূল্যই দেওয়া যায় না। সৌন্দর্য-পাগল মানুষেরা এর অতটুকু ছোঁয়া পাওয়ার জন্যে কেন যে জীবন দান করতেও কণ্ঠিত হয় না আজ তা বুঝি!
পূর্ব-পাকিস্তান ছাড়ার পর মেঘের শোভা আর চোখে পড়েনি। আল্পসে এসে মেঘরাজ্যের ভিতরে পড়ে প্রাণ হারাতে বসে দেখলাম মেঘের অনুপম কান্তি। তার নিরুপম ভীষণতা। তার জমাট বাঁধা নিরাভরণ রূপ। সে কী আশ্চর্য সুন্দর!
কায়রো থেকে দীর্ঘ সাত ঘণ্টা আকাশ বিহার করলাম। আকাশের বুকে মহাশূন্যতায় এক নাগাড়ে সাত ঘণ্টা ঝুলবো এ কি কোনদিন ভেবেছিলাম! সুদূর পশ্চিম দিগন্তে দেখতে পাচ্ছি ইটালীর নীল স্বচ্ছ আকাশ; সামনে জার্মানী। মিউনিকে আসা গেলো। মাটির মানুষ মাটিতে পা দিতে পারবো এ আশায় মন উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। মিউনিকের আকাশ ও মাটিতে সবুজের সুস্পষ্ট শোভা দেখা যাচ্ছে। চোখে লাগছে অনেকটা পূর্ব বাংলার নেশা। গোধূলি লগ্নে ইউরোপের মাটিতে পা দিতে হালকা সবুজের সঙ্গে মিউনিকেই প্রথম বারের জন্য চোখের মালা বদল হ’লো। মিউনিক অনেকটা আমাদের রমনার প্রান্তদেশের মতো। সেই বিস্তীর্ণ মাঠ। মাঝে মাঝে সেই রকম ঘরবাড়ী। পার্থক্যের মধ্যে, যেন বরফ না জমে সে জন্যে ছাদগুলো তৈরী হয়েছে আমাদের টিনের দোচালার মতো।
মানুষগুলো দেখে মনে হলোনা যুদ্ধের যাতা এদের বুক পিষে দিয়ে গেছে। স্বাস্থ্য দেখলাম অটুট। প্রাণে তেমনি চাঞ্চল্য। দুর্বার যৌবনের স্থায়ী স্বাক্ষর আজও বহন করছে। এরা। অনন্ত যৌবনের পূজারী জার্মানী। যুগে যুগে নিঃক্ষত্রিয় হয়েও পুনঃ পুনঃ যৌবনের চর্চা করে। তাই মরেও এরা আবার বেঁচে উঠে। মিউনিকের নরনারী দেখে মনে হলোনা এদের সেই তেজ, সেই যৌবন যুদ্ধে হেরে কোনো রকমে স্তিমিত হয়েছে।
আমষ্টার্ডামে যখন পৌঁছলাম রাত্রি তখন দশটা। হল্যাণ্ডের তুলনায় তার রাজধানীর বিমান বন্দরটি খুব জাঁকালো বলে মনে হলো। আজও বাইরে বেরোলেই বুঝা যায়। পাসপোর্ট নামক জীবন-পত্রটি কত মূল্যবান। জীবন ওতে বন্দী হয়ে থাকে। ও হারালে বেশ কিছুদিনের জন্য জীবন হারাবারও স্বাদ পাওয়া যায়। কেন বুঝলাম না, জীবনের সেই ছাড়পত্র নিয়ে এরা বেশ কড়াকড়ি করলো। মুক্তি পেলাম, কিন্তু দুর্যোগের জন্য সময় মতো লণ্ডনের পথে রওয়ানা হওয়া গেলো না। শুনতে পাচ্ছি এখানকার আকাশেও আমাদের দেশের আষাঢ়ের মেঘমন্দ্র রব। ভয়ঙ্কর নয়, মিষ্টি। বেশ এক ঝলক বৃষ্টি হয়ে গেলো। মুষলধারে কিংবা প্রবল নয়; মৃদু। নতুন দেশে নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। এই সুযোগে বিমান। কোম্পানী লণ্ডন যাত্রীদের এখানেই খাইয়ে নিলেন। খাবার ঘরে গিয়ে দেখি বিরাট আয়োজন। মিউনিকও এখানকার আসবাব ও উপকরণে হার মেনে গেলো। ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়লো আমাদের আগের দেখা সেই শ্যামদেশী যুগলের অসহায় তরুণীটিকে। সেবারে সঙ্গে ছিল তার বন্ধু, ভাঙা ইংরেজীতে কোনো রকমে জবাব দেওয়া তাই সহজ হয়েছিলো। এবারে বন্ধুহীন প্রবাসে বেচারী কোনো জবাব দিতে পারলো না। দিল একটি স্মিত স্নিগ্ধ হাসি। সহায়হীন অবস্থায় ওকে বড়ো ভালো দেখাচ্ছিল। লাগছিল অনেকটা ভীরু হরিণ-শিশুর মতো। পথের বন্ধু পথ শেষ হবার সঙ্গেই কোথায় গেলো হারিয়ে। শুধু জেগে রইলো প্রভাতী তারার মতো আজো তার স্মিত হাসিটি!
***
রাত্রি তখন গোটা দুই। ইংলণ্ডের আকাশে এসে পৌঁছলাম। দূরে দেখতে পাচ্ছি। আলোর মালা। অথৈ আলোর সমুদ্রে সাঁতার কাটছে সারা লণ্ডন। সারি সারি কত বিচিত্র আলোর তরঙ্গ; তরঙ্গের দোলায় দোল খেয়ে ঝলমল করছে লণ্ডন। নিদ্রিতা সুন্দরী লণ্ডনের শিথিল রূপ এমন করে চোখে পড়বে তা ছিল আমার আশার অতীত। ওপর থেকেও বহু বিচিত্র আলোর সারির অন্ত পাচ্ছিনে। মনে হচ্ছে পৃথিবী মন্থন করে ইংরেজ লণ্ডনকে মায়াস্বর্গের রূপ দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। গভীর নিশীথে দীর্ঘক্ষণ ধরে লণ্ডনের যৌবন জোয়ারের লাবণ্য দূর আকাশ থেকে ধীরে ধীরে হৃদয়ে গেঁথে নিলাম। বিমান থেকে নেমে লণ্ডনের মাটিতে পা দিতেই সংশয়ানন্দের শরীর শিউরে উঠলো। শহরে প্রবেশ করলাম। মুগ্ধ বিবশ চোখ দুপাশে মেলে ধরে এগুতে লাগলাম। যার জন্যে জীবনের এতগুলো দিনকে সযত্নে গুছিয়ে তুলেছি, গভীর রাতে তার স্তব্ধ মধুর রূপ দেখেও তার মুখের আবরণ সম্পূর্ণ অপসারণ করবার সাহস হলো না।