- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 449
- Messages
- 7,173
- Reaction score
- 5,327
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
বেশ্যার ছেলে মাওলানা
মূল লেখকঃ লেখকের নাম অজানা
- আমার মা ছিলেন পতিতা। দৌলতদিয়ার পতিতা। কিন্তু উনি দৌলতদিয়ায় কীভাবে গেলেন, সেটা আমার জানা নাই।
মাওলানা খুব স্বাভাবিকভাবে কথাগুলো আমার দিকে ছুড়ে দিল।
এই ধরনের কথার পর মানুষ সাধারণত একটু থামে। গলা শুকায়। চোখ নামায়। নিজের জন্মের ওপর সমাজ যে লজ্জার কাদা ছুড়ে দিয়েছে, সেটা হাত দিয়ে মুছতে যায়।
মাওলানা তা করল না।
যেন কারও মা পতিতা হওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয়। এতে বিব্রত বা ইতস্তত হওয়ার কিছু নেই।
সে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
আজ নদী তার কথার সাক্ষী। বিচারক না।
— আমার মা’র মাথায় আমাকে মাওলানা বানানোর চিন্তা কোথা থেকে আসছিল, জানি না। তবে পতিতা-বেশ্যাদের নাকি জানাজা হয় না। ওই সময় আমার মা নিয়ত করলেন, তার ছেলেকে মাওলানা বানাবেন, আর মেয়েকে হাফেজা। যাতে ছেলে তার জানাজা পড়াতে পারে। আর মেয়ে মরার পরও তার জন্য দোয়া করতে পারে।
নৌকা নদীর পানি ছুরির ফালার মতো দুই টুকরা করে এগিয়ে যাচ্ছিল।
আমার মনে হলো, নৌকাটা নদী কাটছে না। মাওলানার স্মৃতিই নদীকে কেটে দুই ভাগ করে দিচ্ছে।
এক ভাগে পাপ।
অন্য ভাগে তার বিচার।
আর মাঝখানে আমরা।
________
মাওলানার সাথে আমার পরিচয় কাকরাইল মসজিদে। এক তাবলিগ জামাতের সাথে উনি ছিলেন।
আপনারা অনেকেই জানেন না...তাবলিগ জামাতে যে খিঁচুড়িটা রান্না হয় সেটা অসম্ভব মজাদার এবং সুস্বাদু। যদিও পুরা আয়োজনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন নারীর ছোঁয়া থাকে না। কিন্ত খাবার সময় মনে হবে আপনার স্নেহময়ী মা নিজ হাতে আপনার জন্য রান্না করেছে।
সেবার পুলিশ ছাড়াও আরো দুয়েকটা এজেন্সি গরু খোঁজা খুঁজছিলো আমাদের। তিন দিনের ক্ষুধার্ত আমরা ধাওয়া খেয়ে কাকরাইল মসজিদে ঢুকে পড়লাম।
আমার কোমরে মেশিন গোঁজা। চুল উস্কখুস্ক।
কিছু মানুষ থাকে, পুলিশ দেখার আগেই পুলিশের গন্ধ পায়। কিছু মানুষ থাকে, পাপ দেখার আগেই পাপীর হাঁটার শব্দ চিনে ফেলে।
মাওলানা ছিল দ্বিতীয় জাতের মানুষ।
মাওলানা সাহেব আমাদের দেখেই ঘটনা আঁচ করে নিলেন। আলাদা সাইড করে নিয়ে খাওয়াতে বসিয়ে দিলেন।
পুলিশ তখন আর মসজিদে বেশি ঝামেলা করে নাই।
হাসিনা তখন এই তাব্লিগ পার্টিকে ক্ষেপাতে চাচ্ছিলো না।
________
- তারপর...আপনি মাওলানা হইলেন? ওই খান থেকেই?
- কোথা থেকে? পতিতালয়? না গো ভাইজান। আমার মাওলানা হওয়া হয় নাই। মানুষ আমাকে মাওলানা ডাকত, এই পর্যন্ত।
- তাইলে?
- আমার মা আমাকে আর আমার বড় বোনকে এক খদ্দেরের মাধ্যমে বাইরে পাচার করে দিলেন। সেই খদ্দের আমাদের নিয়ে গেলো এক ইমাম সাব এর কাছে। তার দায়িত্ব...আমাদের দ্বীনের রাস্তায় রাখা।
- ইমাম সাব আপনাদের পরিচয় জানতেন না?
- না। জানলে হয়তো নিতেন না। মানুষ দয়া করতে চায়, কিন্তু দয়ারও একটা সামাজিক পরিচয় লাগে।
- আচ্ছা।
- এরপর দিন যায়। আমি মাদ্রাসায় ভর্তি হইলাম।।আর আমার বোন হিফজ খানায়। আমার বোন ছিলো অপরূপ সুন্দরী। নিজের বোন বলে বাড়াইয়া বলতেছি না। ইমাম সাহেবের বউ আমাদের নিজের সন্তানের মতোই দেখতেন।
- উনার ছেলে মেয়ে?
- উনার এক মেয়ে ছিলো।মেয়েটা একটু প্রতিবন্ধী টাইপের।
- আচ্ছা।
- খোদার ফজলে আমার পড়াশুনা ভালোই চলতেছিলো। মাদ্রাসায় আমার সাথে মিয়া বাড়ির এক ছেলেও পড়তো। আমি ছাত্র ভালো ছিলাম। তাই আমার সাথে তার একটা খাতির ও হয়ে গেলো।
- হুম।
- একদিন আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলো। সেখানেই আমার আয়েশার সাথে প্রথম দেখা। তাকে দেখার আগ পর্যন্ত আমি জীবনে কোন পাপ করি নাই হাসান ভাই। বিশ্বাস করেন। আমার জ্ঞানত আমি কোন পাপ করি নাই। একটা মিথ্যা কথা বলি নাই। একটা পিঁপড়া পর্যন্ত অকারণে মারি নাই। কিন্ত তার সাথে দেখা হবার পর আমি প্রথম পাপ করলাম হাসান ভাই। আমি....প্রেমে পড়ে গেলাম।
- মহাপাপ।
- হ্যা হাসান ভাই। মহা মহা পাপ। আমার কাছে সব কিছু উল্টা-পাল্টা লাগা শুরু করলো। সাদারে সাদা লাগে না। কালারে কালা লাগে না।
মাওলানা আমাদের অবাক করে দিয়ে গাইতে শুরু করলো
" সাদাটারে... কালা দেখি...কালাটারে সাদারে..
বন্ধু আমার...রসিক বড়...ভীষণ ঝাকা-নাকা রে....
.........
.........
ফুলের উপর রোদ পরিলে...শিশির কোথায় থাকে?
তার পিরিতে পইরা আমার আউলা-ঝাউলা লাগে।"
_________
মাওলানা একজন বেশ্যার ছেলে। এবং সে একজন মাওলানা। তার আরেকটা পরিচয় আছে।
ঝিনাইদহ বেল্টে যে কয়জন সর্বহারা নেতাকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দেবার জন্য সরকার পুরস্কার ঘোষণা করেছিলো...মাওলানা তাদের মাঝে দুই নাম্বার।
এক নাম্বার জন মারা গিয়েছিলো। তাকেও মাওলানাই মেরেছিলো।
মানুষের জীবন কখনো কখনো গল্প না। সাক্ষ্য।
________
- তারপর...আপনি প্রেমে পড়লেন।
- হ্যা। প্রেমে পড়লাম।।মাদ্রাসায় যাই না। খেলতে যাই না। খাওয়া-দাওয়াতে মন নাই। জাস্ট তার বাড়ির পাশে ঘুর ঘুর করি। যদি এক নজর দেখতে পাই।
- আয়েশা টের পায় নাই?
- ভাই, মেয়েরা এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। তারা ঠিক বুঝতে পারে...কোন পুরুষ তাকে কি নজরে দেখে। মাস তিনেক পর আয়েশা খবর পাঠাইলো..যদি তার আর আমার জান নিরাপদ রাখতে চাই...তাইলে যেন বাড়ির চারপাশে ঘোরা বন্ধ করি।
- আপনি বন্ধ করলেন?
- করলাম।।কিন্ত লাভ হইলো না।।কারণ ততোদিনে সবাই জানে...মাওলানা প্রেমে পড়ছে। পাপ করছে।
- তারপর?
মাওলানা নদীর পানির দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যায়।
তারপরের গল্প আমি জানি। তবুও আমি মাওলানার মুখ থেকেই শুনতে চাই।
কিন্ত মাওলানা মুখ খুলে না।
_______
আয়েশার বাবারা ছিলো এলাকার আদি বড়লোক। ধর্মে-কর্মে তাদের বিশেষ মন ছিলো তা না। কিন্ত কি মনে করে বাড়ির একজনকে মাদ্রাসায় পাঠালেন।
তো আয়েশার বাবা যখন জানতে পারলেন...এলাকার এক ছেলে আয়েশার প্রেমে পড়েছে...এবং আয়েশাও দুর্বল হয়ে পরেছে...উনি খোঁজ লাগালেন।
ইমাম সাহেব এর কাছে মাওলানা আর তার বোন থাকতো বোনের ছেলে-মেয়ে পরিচয়ে। কিন্ত.. আয়েশার বাবা একটু খোঁজ - খবর করার পরেই জানতে পারলেন...ঘটনা সত্য না।
আরেকটু খোঁজ করার পর...উনি মাওলানা আর তার বোনের আসল পরিচয় জানতে পারলেন।
বেশ্যার ছেলে!
বেশ্যার ছেলের এতো বড় সাহস। তার মেয়েকে ভালোবাসতে চায়?
এলাকায় বিচার বসে।
ইমাম সাহেব এর উপর অভিযোগ আনা হয়। যে মাওলানা এর বোনের সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক আছে। সত্য গোপন করে বেশ্যার ছেলে-মেয়েকে মাদ্রাসায় পড়ানোর অপরাধে তার চাকরি চলে যায়।
২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। মাওলানা আর তার বোনকে এলাকা ছাড়তে হবে।
_______
মাওলানা আর তার বোন এলাকা ছাড়ার জন্য নৌকা নিয়ে যাত্রাও করেছিলো। কিন্ত নৌকা ভিড়ে অন্য ঘাটে।
সেখানে অপেক্ষা করছিলো আয়েশার আপন ভাই।
এখানে কি ঘটেছিলো... ঘটতে পারে তা আপনারা হয়তো অনুমান করতে পারেন।
আর আমি জানি।
কিন্ত পুরো ঘটনা ঘটেছিলো মাওলানার চোখের সামনে।
যেহেতু মাওলানার মা একজন বেশ্যা...বেশ্যার মেয়ের আবার সম্মান কি? এর শরীর তো সরকারি সম্পত্তি।
মাওলানার পাপ ছিলো প্রেম করা। আর মাওলানার বোনের পাপ ছিলো অতিমাত্রায় সুন্দরী হওয়া।
সব কিছু দেখতে মাওলানাকে বাধ্য করা হয়।
মাওলানাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল।
যেন সে দেখে।
যেন সে মনে রাখে।
যেন সে আর কোনোদিন মানুষ না থাকে।
..........
তিন দিন পর ওদের আবার নৌকায় তুলে দেওয়া হলো।
গন্তব্য—দৌলত দিয়া।
________
মাওলানার বোন কিভাবে মারা গিয়েছিলো সেটা একটা রহস্য। কেউ বলে আত্মহত্যা। কেউ বলে বোনের অনুরোধে মাওলানাই তার বোনকে মেরে ফেলেছিলো।
নদীতে ভেসে উঠা এক মেয়ের লাশ নিয়ে সেবার তোলপাড় পরে গিয়েছিলো। মফস্বলের কোন এক সাংবাদিক তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সংবাদ করলো: নদীতে ভাসছে অনিন্দ্য সুন্দরী এক নারীর লাশ।
মাওলানার গ্রামের কেউ একজন লাশটা শনাক্ত করেছিলো।
- এটাতে বেশ্যার মেয়ের লাশ।
মাওলানার বোনের ও জানাজা হয়নি।
_______
এরপর মাওলানা ফেরত আসে নিজ গ্রামে।
এক রাত্রে আয়েশার বাড়ির বাইরে থেকে সব গুলো ঘরের।ছিটকানি তুলে দেয় সে। এরপর তেল ছড়িয়ে আগুন।
এক বাড়িতে আগুনে ২১ জন মারা যাবার ঘটনা সেবার জেলায় আলোড়ন তুলেছিলো। তবে ৯৬ এর রাজনৈতিক অস্থিরতায় যথেষ্ট আলোড়ন তুলেনি।
মারা যাওয়াদের মাঝে মাওলানার প্রথম আর শেষ ভালোবাসা...আয়েশাও ছিলো।
_________
মাওলানাকে থানায় নিয়ে আসা হয়।
সেই রাত্রেই থানায় এসে হাজির হয় কমরেড সুখেন মাস্টার। লাল পতাকা জনযুদ্ধ টাইপ কোন একটা সর্বহারা দলের সদস্য।থানা ঘেরাও করেছিলো ১৫০ এর উপর লোক। থানায় লোক ছিলো সর্বসাকুল্যে ২২ জন।
ওসিকে বন্দুকের সামনে রেখে সে মাওলানার সাথে আলাপ করে
- মিয়া বাড়িতে আগুন তুমি দিছো?
- জ্বী।
- আগুন কেন দিলা?
মাওলানা জবাব দেয় না।
- নিরীহ মানুষ ও তো ছিলো।
মাওলানা চুপ।
সুখেন মাস্টার ওসির দিকে তাকায়। ওসি উস্খুস করতে থাকে। মাস্টার তার সংগীকে নির্দেশ দেয়
- আর্মস গুলা নিয়ে চল।।আর হাজত খালি করে দে।
এরপর ওসি'র দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দেয়
- ওসি...অনেক দিন নাচ-গান দেখি না। গানের সাথে একটা নাচ দেখাও তো।
সেবার রাত্রে রেঞ্জ অফিসে জরুরি তারবার্তা আসে।
- থানা লুট। অস্ত্র ছিনতাই। পুলিশ সদস্যদের উলংগ করে মারধর করে আসামি ছিনিয়ে নিয়েছে সর্বহারারা।
আসামিটা ছিলো মাওলানা।
এটাই মাওলানার সর্বহারা হয়ে উঠার গল্প।
_______
মুরুব্বি যখন আমাকে ডেকে মাওলানাকে খুঁজে বের করার কাজ দিলেন...সেটাকে খুব বেশি কঠিন মনে হয় নাই।
এরপর আরো গুরুত্বপূর্ণ দুইটা কাজ দিলেন।
১। মাওলানাকে তার মায়ের মৃত্যু সংবাদ জানানো।
২। একটু পরে বুঝবেন।
________
মাওলানার মা মারা গেছেন। নেত্রকোণার ছোট্ট এক গ্রামে শেষ জীবনে থাকতেন তিনি।
মাওলানার সাথে আমরা তিনজন যাচ্ছি সেই মায়ের কাছে।
________
ধর্ম-কর্মে আমি একটা কাজের না।
শেষ কবে জানাজার নামাজ পরেছি...সেটাও মনে নাই।
আমি কি নাস্তিক? খুব সম্ভবত না।
আস্তিক? মে বি।
ধার্মিক? একদমই না।
আমি যে কি...সেটা আমি জানি না।
কিন্ত মাওলানা যখন আমাকে অনুরোধ করলো
- ভাই...আমার মায়ের জানাজাটাতে শরিক হবেন? এলাকার লোকজন তো হবে না। একজন দিয়ে তো জানাজা হবে না।
আমি কোন কারণ ছাড়াই রাজি হয়ে যাই।
পৃথিবীতে খোদা কাকে কখন কোন কাজের জন্য মাফ করে দেন...সেটা কেউ জানে না।
একজন বেশ্যার জানাজায় তার ছেলের অনুরোধে শামিল হবার জন্য খোদা আমাকে মাফ করবেন কি না জানি না...কিন্ত খুব সম্ভবত এই কাজের জন্য শাস্তিও দিবেন না।
এরচেয়ে অনেক বড় বড় পাপ আমি প্রতিদিন করি।
মাওলানার পেছনে আমরা তিনজন দাঁড়াই।
আশেপাশে থেকে মানুষজন উঁকি দেয়। যেন অদ্ভুত কোন প্রাণী গ্রামে এসেছে।
_______
মাওলানার মা এর শেষ দাফন তার গ্রামে হয়নি।।ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন নামে তার দাফন করতে হয়েছে।
_______
আমরা ফিরছি।
আমরা ফিরছি। কিন্ত মাওলানা না।
মাওলানার খাবারে খুব শক্তিশালী ঘুমের ওষুধ মেশানো আছে। ওষুধের প্রতিক্রিয়া এর মাঝেই শুরু হয়ে গেছে।
মাওলানার কথা জড়িয়ে আসছে।
এরপর আস্তে করে সে পানিতে পরে যাবে। টুপ করে একটা শব্দ হবে।
শব্দ হবার আগে আমি মাওলানার দিকে এগিয়ে যাই।পাশে বসে কাঁধের উপর হাত তুলে দেই।
— সরি, ভাই।
মাওলানা আমার দিকে তাকাল। তার চিন্তা ভাবনা ঘোলাটে হয়ে আসছে।
— মুরুব্বির নির্দেশ.....আপনার আর ফেরা লাগবে না।
মাওলানা মিষ্টি একটা হাসি দেয়। এরপর কাঁদতে শুরু করে।
মাওলানার চিন্তা-ভাবনা জড়িয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে সে আমাকে তার মা ভেবে অভিযোগ করতে থাকে:
- মা...তুই আমাদের তোর কাছে রাইখা দিতি মা। কেন বেশ্যাখানা থেকে বের করলি আমাদের? কেন আমাকে মাওলানা বানাইতে গেলি?
মাওলানার চোখে-মুখে অভিমান।।সেই অভিমান কি নিজের মায়ের উপর না নিজের সেষ্টার উপর তা আর জিজ্ঞাসা করার সুযোগ নেই।
আমি আলতো করে ধাক্কা দেই।
মাওলানা পানিতে তলিয়ে যায়।
টুপ।
নদী শব্দটা গিলে ফেলে।
মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তার চোখে-মুখে ফুটে উঠে কৃতজ্ঞতা।
এই নিষ্ঠুর জীবন থেকে সে হয়তো পালাতে চাচ্ছিলো। এতোটুকু সাহায্য তার দরকার ছিলো।
মাওলানা সেই দেশে যাচ্ছে, যেখানে তার মা আছে, বোন আছে, আয়েশাও হয়তো আছে।
_________
নদীর বুক কেটে নৌকা এগিয়ে যায়।
নৌকার আঘাতে ফালাফালা হয়ে যায় রাত, স্মৃতি, আর মানুষের বানানো সব বিচার।
মূল লেখকঃ লেখকের নাম অজানা
- আমার মা ছিলেন পতিতা। দৌলতদিয়ার পতিতা। কিন্তু উনি দৌলতদিয়ায় কীভাবে গেলেন, সেটা আমার জানা নাই।
মাওলানা খুব স্বাভাবিকভাবে কথাগুলো আমার দিকে ছুড়ে দিল।
এই ধরনের কথার পর মানুষ সাধারণত একটু থামে। গলা শুকায়। চোখ নামায়। নিজের জন্মের ওপর সমাজ যে লজ্জার কাদা ছুড়ে দিয়েছে, সেটা হাত দিয়ে মুছতে যায়।
মাওলানা তা করল না।
যেন কারও মা পতিতা হওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয়। এতে বিব্রত বা ইতস্তত হওয়ার কিছু নেই।
সে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
আজ নদী তার কথার সাক্ষী। বিচারক না।
— আমার মা’র মাথায় আমাকে মাওলানা বানানোর চিন্তা কোথা থেকে আসছিল, জানি না। তবে পতিতা-বেশ্যাদের নাকি জানাজা হয় না। ওই সময় আমার মা নিয়ত করলেন, তার ছেলেকে মাওলানা বানাবেন, আর মেয়েকে হাফেজা। যাতে ছেলে তার জানাজা পড়াতে পারে। আর মেয়ে মরার পরও তার জন্য দোয়া করতে পারে।
নৌকা নদীর পানি ছুরির ফালার মতো দুই টুকরা করে এগিয়ে যাচ্ছিল।
আমার মনে হলো, নৌকাটা নদী কাটছে না। মাওলানার স্মৃতিই নদীকে কেটে দুই ভাগ করে দিচ্ছে।
এক ভাগে পাপ।
অন্য ভাগে তার বিচার।
আর মাঝখানে আমরা।
________
মাওলানার সাথে আমার পরিচয় কাকরাইল মসজিদে। এক তাবলিগ জামাতের সাথে উনি ছিলেন।
আপনারা অনেকেই জানেন না...তাবলিগ জামাতে যে খিঁচুড়িটা রান্না হয় সেটা অসম্ভব মজাদার এবং সুস্বাদু। যদিও পুরা আয়োজনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন নারীর ছোঁয়া থাকে না। কিন্ত খাবার সময় মনে হবে আপনার স্নেহময়ী মা নিজ হাতে আপনার জন্য রান্না করেছে।
সেবার পুলিশ ছাড়াও আরো দুয়েকটা এজেন্সি গরু খোঁজা খুঁজছিলো আমাদের। তিন দিনের ক্ষুধার্ত আমরা ধাওয়া খেয়ে কাকরাইল মসজিদে ঢুকে পড়লাম।
আমার কোমরে মেশিন গোঁজা। চুল উস্কখুস্ক।
কিছু মানুষ থাকে, পুলিশ দেখার আগেই পুলিশের গন্ধ পায়। কিছু মানুষ থাকে, পাপ দেখার আগেই পাপীর হাঁটার শব্দ চিনে ফেলে।
মাওলানা ছিল দ্বিতীয় জাতের মানুষ।
মাওলানা সাহেব আমাদের দেখেই ঘটনা আঁচ করে নিলেন। আলাদা সাইড করে নিয়ে খাওয়াতে বসিয়ে দিলেন।
পুলিশ তখন আর মসজিদে বেশি ঝামেলা করে নাই।
হাসিনা তখন এই তাব্লিগ পার্টিকে ক্ষেপাতে চাচ্ছিলো না।
________
- তারপর...আপনি মাওলানা হইলেন? ওই খান থেকেই?
- কোথা থেকে? পতিতালয়? না গো ভাইজান। আমার মাওলানা হওয়া হয় নাই। মানুষ আমাকে মাওলানা ডাকত, এই পর্যন্ত।
- তাইলে?
- আমার মা আমাকে আর আমার বড় বোনকে এক খদ্দেরের মাধ্যমে বাইরে পাচার করে দিলেন। সেই খদ্দের আমাদের নিয়ে গেলো এক ইমাম সাব এর কাছে। তার দায়িত্ব...আমাদের দ্বীনের রাস্তায় রাখা।
- ইমাম সাব আপনাদের পরিচয় জানতেন না?
- না। জানলে হয়তো নিতেন না। মানুষ দয়া করতে চায়, কিন্তু দয়ারও একটা সামাজিক পরিচয় লাগে।
- আচ্ছা।
- এরপর দিন যায়। আমি মাদ্রাসায় ভর্তি হইলাম।।আর আমার বোন হিফজ খানায়। আমার বোন ছিলো অপরূপ সুন্দরী। নিজের বোন বলে বাড়াইয়া বলতেছি না। ইমাম সাহেবের বউ আমাদের নিজের সন্তানের মতোই দেখতেন।
- উনার ছেলে মেয়ে?
- উনার এক মেয়ে ছিলো।মেয়েটা একটু প্রতিবন্ধী টাইপের।
- আচ্ছা।
- খোদার ফজলে আমার পড়াশুনা ভালোই চলতেছিলো। মাদ্রাসায় আমার সাথে মিয়া বাড়ির এক ছেলেও পড়তো। আমি ছাত্র ভালো ছিলাম। তাই আমার সাথে তার একটা খাতির ও হয়ে গেলো।
- হুম।
- একদিন আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলো। সেখানেই আমার আয়েশার সাথে প্রথম দেখা। তাকে দেখার আগ পর্যন্ত আমি জীবনে কোন পাপ করি নাই হাসান ভাই। বিশ্বাস করেন। আমার জ্ঞানত আমি কোন পাপ করি নাই। একটা মিথ্যা কথা বলি নাই। একটা পিঁপড়া পর্যন্ত অকারণে মারি নাই। কিন্ত তার সাথে দেখা হবার পর আমি প্রথম পাপ করলাম হাসান ভাই। আমি....প্রেমে পড়ে গেলাম।
- মহাপাপ।
- হ্যা হাসান ভাই। মহা মহা পাপ। আমার কাছে সব কিছু উল্টা-পাল্টা লাগা শুরু করলো। সাদারে সাদা লাগে না। কালারে কালা লাগে না।
মাওলানা আমাদের অবাক করে দিয়ে গাইতে শুরু করলো
" সাদাটারে... কালা দেখি...কালাটারে সাদারে..
বন্ধু আমার...রসিক বড়...ভীষণ ঝাকা-নাকা রে....
.........
.........
ফুলের উপর রোদ পরিলে...শিশির কোথায় থাকে?
তার পিরিতে পইরা আমার আউলা-ঝাউলা লাগে।"
_________
মাওলানা একজন বেশ্যার ছেলে। এবং সে একজন মাওলানা। তার আরেকটা পরিচয় আছে।
ঝিনাইদহ বেল্টে যে কয়জন সর্বহারা নেতাকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দেবার জন্য সরকার পুরস্কার ঘোষণা করেছিলো...মাওলানা তাদের মাঝে দুই নাম্বার।
এক নাম্বার জন মারা গিয়েছিলো। তাকেও মাওলানাই মেরেছিলো।
মানুষের জীবন কখনো কখনো গল্প না। সাক্ষ্য।
________
- তারপর...আপনি প্রেমে পড়লেন।
- হ্যা। প্রেমে পড়লাম।।মাদ্রাসায় যাই না। খেলতে যাই না। খাওয়া-দাওয়াতে মন নাই। জাস্ট তার বাড়ির পাশে ঘুর ঘুর করি। যদি এক নজর দেখতে পাই।
- আয়েশা টের পায় নাই?
- ভাই, মেয়েরা এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। তারা ঠিক বুঝতে পারে...কোন পুরুষ তাকে কি নজরে দেখে। মাস তিনেক পর আয়েশা খবর পাঠাইলো..যদি তার আর আমার জান নিরাপদ রাখতে চাই...তাইলে যেন বাড়ির চারপাশে ঘোরা বন্ধ করি।
- আপনি বন্ধ করলেন?
- করলাম।।কিন্ত লাভ হইলো না।।কারণ ততোদিনে সবাই জানে...মাওলানা প্রেমে পড়ছে। পাপ করছে।
- তারপর?
মাওলানা নদীর পানির দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যায়।
তারপরের গল্প আমি জানি। তবুও আমি মাওলানার মুখ থেকেই শুনতে চাই।
কিন্ত মাওলানা মুখ খুলে না।
_______
আয়েশার বাবারা ছিলো এলাকার আদি বড়লোক। ধর্মে-কর্মে তাদের বিশেষ মন ছিলো তা না। কিন্ত কি মনে করে বাড়ির একজনকে মাদ্রাসায় পাঠালেন।
তো আয়েশার বাবা যখন জানতে পারলেন...এলাকার এক ছেলে আয়েশার প্রেমে পড়েছে...এবং আয়েশাও দুর্বল হয়ে পরেছে...উনি খোঁজ লাগালেন।
ইমাম সাহেব এর কাছে মাওলানা আর তার বোন থাকতো বোনের ছেলে-মেয়ে পরিচয়ে। কিন্ত.. আয়েশার বাবা একটু খোঁজ - খবর করার পরেই জানতে পারলেন...ঘটনা সত্য না।
আরেকটু খোঁজ করার পর...উনি মাওলানা আর তার বোনের আসল পরিচয় জানতে পারলেন।
বেশ্যার ছেলে!
বেশ্যার ছেলের এতো বড় সাহস। তার মেয়েকে ভালোবাসতে চায়?
এলাকায় বিচার বসে।
ইমাম সাহেব এর উপর অভিযোগ আনা হয়। যে মাওলানা এর বোনের সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক আছে। সত্য গোপন করে বেশ্যার ছেলে-মেয়েকে মাদ্রাসায় পড়ানোর অপরাধে তার চাকরি চলে যায়।
২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। মাওলানা আর তার বোনকে এলাকা ছাড়তে হবে।
_______
মাওলানা আর তার বোন এলাকা ছাড়ার জন্য নৌকা নিয়ে যাত্রাও করেছিলো। কিন্ত নৌকা ভিড়ে অন্য ঘাটে।
সেখানে অপেক্ষা করছিলো আয়েশার আপন ভাই।
এখানে কি ঘটেছিলো... ঘটতে পারে তা আপনারা হয়তো অনুমান করতে পারেন।
আর আমি জানি।
কিন্ত পুরো ঘটনা ঘটেছিলো মাওলানার চোখের সামনে।
যেহেতু মাওলানার মা একজন বেশ্যা...বেশ্যার মেয়ের আবার সম্মান কি? এর শরীর তো সরকারি সম্পত্তি।
মাওলানার পাপ ছিলো প্রেম করা। আর মাওলানার বোনের পাপ ছিলো অতিমাত্রায় সুন্দরী হওয়া।
সব কিছু দেখতে মাওলানাকে বাধ্য করা হয়।
মাওলানাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল।
যেন সে দেখে।
যেন সে মনে রাখে।
যেন সে আর কোনোদিন মানুষ না থাকে।
..........
তিন দিন পর ওদের আবার নৌকায় তুলে দেওয়া হলো।
গন্তব্য—দৌলত দিয়া।
________
মাওলানার বোন কিভাবে মারা গিয়েছিলো সেটা একটা রহস্য। কেউ বলে আত্মহত্যা। কেউ বলে বোনের অনুরোধে মাওলানাই তার বোনকে মেরে ফেলেছিলো।
নদীতে ভেসে উঠা এক মেয়ের লাশ নিয়ে সেবার তোলপাড় পরে গিয়েছিলো। মফস্বলের কোন এক সাংবাদিক তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সংবাদ করলো: নদীতে ভাসছে অনিন্দ্য সুন্দরী এক নারীর লাশ।
মাওলানার গ্রামের কেউ একজন লাশটা শনাক্ত করেছিলো।
- এটাতে বেশ্যার মেয়ের লাশ।
মাওলানার বোনের ও জানাজা হয়নি।
_______
এরপর মাওলানা ফেরত আসে নিজ গ্রামে।
এক রাত্রে আয়েশার বাড়ির বাইরে থেকে সব গুলো ঘরের।ছিটকানি তুলে দেয় সে। এরপর তেল ছড়িয়ে আগুন।
এক বাড়িতে আগুনে ২১ জন মারা যাবার ঘটনা সেবার জেলায় আলোড়ন তুলেছিলো। তবে ৯৬ এর রাজনৈতিক অস্থিরতায় যথেষ্ট আলোড়ন তুলেনি।
মারা যাওয়াদের মাঝে মাওলানার প্রথম আর শেষ ভালোবাসা...আয়েশাও ছিলো।
_________
মাওলানাকে থানায় নিয়ে আসা হয়।
সেই রাত্রেই থানায় এসে হাজির হয় কমরেড সুখেন মাস্টার। লাল পতাকা জনযুদ্ধ টাইপ কোন একটা সর্বহারা দলের সদস্য।থানা ঘেরাও করেছিলো ১৫০ এর উপর লোক। থানায় লোক ছিলো সর্বসাকুল্যে ২২ জন।
ওসিকে বন্দুকের সামনে রেখে সে মাওলানার সাথে আলাপ করে
- মিয়া বাড়িতে আগুন তুমি দিছো?
- জ্বী।
- আগুন কেন দিলা?
মাওলানা জবাব দেয় না।
- নিরীহ মানুষ ও তো ছিলো।
মাওলানা চুপ।
সুখেন মাস্টার ওসির দিকে তাকায়। ওসি উস্খুস করতে থাকে। মাস্টার তার সংগীকে নির্দেশ দেয়
- আর্মস গুলা নিয়ে চল।।আর হাজত খালি করে দে।
এরপর ওসি'র দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দেয়
- ওসি...অনেক দিন নাচ-গান দেখি না। গানের সাথে একটা নাচ দেখাও তো।
সেবার রাত্রে রেঞ্জ অফিসে জরুরি তারবার্তা আসে।
- থানা লুট। অস্ত্র ছিনতাই। পুলিশ সদস্যদের উলংগ করে মারধর করে আসামি ছিনিয়ে নিয়েছে সর্বহারারা।
আসামিটা ছিলো মাওলানা।
এটাই মাওলানার সর্বহারা হয়ে উঠার গল্প।
_______
মুরুব্বি যখন আমাকে ডেকে মাওলানাকে খুঁজে বের করার কাজ দিলেন...সেটাকে খুব বেশি কঠিন মনে হয় নাই।
এরপর আরো গুরুত্বপূর্ণ দুইটা কাজ দিলেন।
১। মাওলানাকে তার মায়ের মৃত্যু সংবাদ জানানো।
২। একটু পরে বুঝবেন।
________
মাওলানার মা মারা গেছেন। নেত্রকোণার ছোট্ট এক গ্রামে শেষ জীবনে থাকতেন তিনি।
মাওলানার সাথে আমরা তিনজন যাচ্ছি সেই মায়ের কাছে।
________
ধর্ম-কর্মে আমি একটা কাজের না।
শেষ কবে জানাজার নামাজ পরেছি...সেটাও মনে নাই।
আমি কি নাস্তিক? খুব সম্ভবত না।
আস্তিক? মে বি।
ধার্মিক? একদমই না।
আমি যে কি...সেটা আমি জানি না।
কিন্ত মাওলানা যখন আমাকে অনুরোধ করলো
- ভাই...আমার মায়ের জানাজাটাতে শরিক হবেন? এলাকার লোকজন তো হবে না। একজন দিয়ে তো জানাজা হবে না।
আমি কোন কারণ ছাড়াই রাজি হয়ে যাই।
পৃথিবীতে খোদা কাকে কখন কোন কাজের জন্য মাফ করে দেন...সেটা কেউ জানে না।
একজন বেশ্যার জানাজায় তার ছেলের অনুরোধে শামিল হবার জন্য খোদা আমাকে মাফ করবেন কি না জানি না...কিন্ত খুব সম্ভবত এই কাজের জন্য শাস্তিও দিবেন না।
এরচেয়ে অনেক বড় বড় পাপ আমি প্রতিদিন করি।
মাওলানার পেছনে আমরা তিনজন দাঁড়াই।
আশেপাশে থেকে মানুষজন উঁকি দেয়। যেন অদ্ভুত কোন প্রাণী গ্রামে এসেছে।
_______
মাওলানার মা এর শেষ দাফন তার গ্রামে হয়নি।।ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন নামে তার দাফন করতে হয়েছে।
_______
আমরা ফিরছি।
আমরা ফিরছি। কিন্ত মাওলানা না।
মাওলানার খাবারে খুব শক্তিশালী ঘুমের ওষুধ মেশানো আছে। ওষুধের প্রতিক্রিয়া এর মাঝেই শুরু হয়ে গেছে।
মাওলানার কথা জড়িয়ে আসছে।
এরপর আস্তে করে সে পানিতে পরে যাবে। টুপ করে একটা শব্দ হবে।
শব্দ হবার আগে আমি মাওলানার দিকে এগিয়ে যাই।পাশে বসে কাঁধের উপর হাত তুলে দেই।
— সরি, ভাই।
মাওলানা আমার দিকে তাকাল। তার চিন্তা ভাবনা ঘোলাটে হয়ে আসছে।
— মুরুব্বির নির্দেশ.....আপনার আর ফেরা লাগবে না।
মাওলানা মিষ্টি একটা হাসি দেয়। এরপর কাঁদতে শুরু করে।
মাওলানার চিন্তা-ভাবনা জড়িয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে সে আমাকে তার মা ভেবে অভিযোগ করতে থাকে:
- মা...তুই আমাদের তোর কাছে রাইখা দিতি মা। কেন বেশ্যাখানা থেকে বের করলি আমাদের? কেন আমাকে মাওলানা বানাইতে গেলি?
মাওলানার চোখে-মুখে অভিমান।।সেই অভিমান কি নিজের মায়ের উপর না নিজের সেষ্টার উপর তা আর জিজ্ঞাসা করার সুযোগ নেই।
আমি আলতো করে ধাক্কা দেই।
মাওলানা পানিতে তলিয়ে যায়।
টুপ।
নদী শব্দটা গিলে ফেলে।
মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তার চোখে-মুখে ফুটে উঠে কৃতজ্ঞতা।
এই নিষ্ঠুর জীবন থেকে সে হয়তো পালাতে চাচ্ছিলো। এতোটুকু সাহায্য তার দরকার ছিলো।
মাওলানা সেই দেশে যাচ্ছে, যেখানে তার মা আছে, বোন আছে, আয়েশাও হয়তো আছে।
_________
নদীর বুক কেটে নৌকা এগিয়ে যায়।
নৌকার আঘাতে ফালাফালা হয়ে যায় রাত, স্মৃতি, আর মানুষের বানানো সব বিচার।