Collected বাজারের ব্যাগ এবং এক পথচারীর গল্প

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
419
Messages
6,400
Reaction score
3,446
Points
3,963
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
"বাজারের ব্যাগ এবং এক পথচারীর গল্প"

মূল লেখকঃ মুস্তাকিম বিল্লাহ






‘পোকা হবে নাতো?'

সবজি বিক্রেতা বেগুন হাতে নিয়ে দেখিয়ে বললো, গ্যারান্টি দিয়ে বলছি কোনো পোকা হবে না।

আমার পাশে থাকা ভদ্রলোক রাগী চোখে বলেন, তোমার বেগুনে পোকা। যদি বিশ্বাস না হয় কেটে দেখাতে পারি। সবজি বিক্রেতা যেনো চুপসে গেলেন।

এবার ভদ্রলোক আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি বেছে দিচ্ছি সেগুলো নাও। তিনি একটা একটা করে সবজি তুলে পলিথিনে রাখলেন।

যাক আমি একটু ভরসা পেয়ে গেলাম, সবজি কিনে ঠকে যাবার ভয়টা আপাতত নেই।

ভদ্রলোক কয়েকটা বেগুন বেছে একটা পলিথিনে দিলেন।

আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, স্টুডেন্ট? ব্যাচেলর থাকো বুঝি? আমি বললাম হ্যাঁ।

বাজার করবার অভ্যাস তেমন একটা নেই বললেই চলে। বাড়িতে থাকতে বাবা বাজার করেন। তবে শহরে আসবার পরে নিজেকে বাজার করতে হয়। দরদাম করতে পারি না বললেই চলে, কখনো নষ্ট সবজি গছিয়ে দেওয়া হয়। বেশ কয়েকবার ঠকে গেছি। বাজার করাও যে একটা দক্ষতা এসব বাজারে না আসলে কোনোদিন বুঝতে পারতাম না।

যাক বেগুন কিনতে এসে এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয়। কথায় কথায় জানলাম তার বাসা আমি যে গলিতে থাকি সেখানেই। তার বাজার শেষ হয়ে গেছে আগেই আমরা দুজনে হাঁটা শুরু করি।

আমার পাশে লোকটার নাম শামসুল আলম। বয়স কতো হতে পারে, আমার বাবার বয়সী বা দুই এক বছর বেশি হতে পারে।

শামসুল আলম নামের ভদ্রলোক বললেন, বাজার নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে আমার জীবনে শুনবে? যেহেতু আমি গল্প লিখি মানুষের জীবনের গল্প শুনতে আমার একপ্রকার আগ্রহ আছে। আমি বললাম জ্বি বলেন।

শামসুল আলম বলেন, চলো একটা চায়ের দোকানে বসি। আমরা চায়ের দোকানে বসি তখনই বৃষ্টি শুরু হয়। আমাদের হাতে চায়ের কাপ।

শামসুল আলম বলেন তখন ১৯৯৩ সন। আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। একটা বাসাতে লজিং থাকি। ইউনিভার্সিটির একটা মেয়ের সাথে ভাব হয়। মেয়েটার নাম নাজনীন। নাজনীনের সাথে পরিচয়ের পরে জানতে পারি ওর বাবা মা দুজনেই আমাদের ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। তখনকার সময়ে ভালোবাসা বিষয়টা আজকালকার মতো সহজ ছিলো না। ভার্সিটি এড়িয়াতে আমরা কখনো একসাথে হাঁটতে পারতাম না, যেহেতু নাজনীনের বাবা মা এখানকার সবার পরিচিত কারো চোখে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিলো। তাছাড়া নাজনীনের পরিবারকে অনেকে চিনতেন।

আমরা ইউনিভার্সিটি এড়িয়া থেকে দূরে চলে যেতাম। পাঁচ টাকায় রিক্সা নিয়ে ঘুরতাম শহরে। নদীর পাশে যেতাম। মাসে একবার আমাদের দেখা হতো। নাজনীনের বাসাতে টেলিফোন ছিলো, তবে আমার নিজস্ব কোনো ফোন ছিলো না। যে বাসাতে লজিং থাকতাম সেখানে অবশ্য একটা টেলিফোন ছিলো। তবে তাদের টেলিফোন যদি আমি ধরতাম কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাতো, পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো। নাজনীনের সাথে বেশি কথা বলতে পারতাম না, শুধু হ্যালো। তারপর কেমন আছো? এই পর্যন্তই। কেবল মাত্র নাজনীনের গলার শব্দ শুনতে পারতাম। তবে আমরা যা করতাম ক্যাম্পাসের পাশে ছাতিম গাছের নিচে পলাশ ভাইয়ের চায়ের দোকানে দুজনে চিঠির খাম রেখে আসতাম। নাজনীন পলাশ ভাইর চায়ের দোকান থেকে খাম নিয়ে যেতো, আমিও আমারে লেখা চিঠি নিয়ে আসতাম।

এভাবেই সবকিছু চলছে। তবে হঠাৎ একদিন নাজনীন জানায় ওর বিয়ে ঠিক করেছে। তখন আমার ইউনিভার্সিটি জীবন শেষ হয়নি, সামনে পরীক্ষা। একটা গবেষণার জন্যে কাজ করছি, সুযোগটা পেয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র যেতে পারবো। তখনই নাজনীন জানায় ওর বিয়ে ঠিক করেছে।

আমি স্বভাবগত ভিতু ছিলাম। ইউনিভার্সিটিতে দুবার মারামারি করতে যেয়ে মার খেয়ে এসেছি। তবে আমার রুমমেট ছিলো তখনকার তুমুল জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। মার খাওয়ার খবর শুনে, হামিদ ভাই তার ছেলেপেলে নিয়ে ওদের পিটিয়ে আসে৷

নাজনীন আমাকে বলে ওর বাবা মায়ের সাথে দেখা করতে। আমি নাজনীনকে কিভাবে না করবো বুঝতে পারি না। এদিকে ওর বাবা মায়ের সাথে দেখা না করলে নাজনীনের বিয়ে হয়ে যাবে।

তখন বর্ষাকাল। বিকাল থেকে বৃষ্টি। সন্ধ্যায় একটা ছাতা নিয়ে বের হয়ে নাজনীনদের বাসাতে যাই। বৃষ্টিতে শার্ট প্যান্ট অর্ধেক ভিজে যায়।

নাজনীনদের তখন ঢাকাতে একটা চারতলা বাড়ি ছিলো। দোতলায় ওরা থাকতো। আমি বসবার ঘরে বসি। কিছুসময় পরে নাজনীনের বাবা আসেন, তারপর বলেন তোমার নামই শামসুল আলম? কোন ডিপার্টমেন্ট?

আমি ডিপার্টমেন্টের নাম বলি। তিনি বলেন চা খেয়ে যাও। আমার জরুরী কাজ আছে বের হতে হবে। আর হ্যাঁ আগামীকাল সকালে তুমি একবার আসবে, ঠিক নয়টায়। নয়টা মানে নয়টা।

নাজনীনের বাবা বাসা থেকে বের হয়। চা আমার খাওয়া হয়না। ভয়ে ভয়ে বের হই। মনে মনে ভাবলাম এবার হয়তো আমার আর ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে বের হওয়া হবে না। গবেষণার কাজটাও হয়তো শেষ করতে পারবো না কোনোদিন।

খুব ভোরবেলা হল থেকে বের হয় নাজনীনদের বাসাতে ঠিক আটটায় এসে উপস্থিত হই। বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। আটটা চল্লিশে গেটের ভিতরে আসি।

নাজনীনের বাবা একটা বাজারের ব্যাগ আমার হাতে দিয়ে বলেনে যাও বাজার করে নিয়ে এসো। লিস্টে সবকিছু লেখা আছে। লিস্ট অনুযায়ী সবকিছু কিনবে। আর লিস্টের সাথে টাকা আছে।

শেষে কিনা এখন বাজার করতে হবে? নাজনীন বাবা লোকটা অদ্ভুত শুনেছি। তবে এতটা অদ্ভুত বুঝিনি। বাজার করতে দেওয়া কি তার কোনো শাস্তি?

আমি বাজার করতে বের হই। ছোটোবেলায় বাবার সাথে বাজারে যেতাম। তাই পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। লিস্ট অনুযায়ী বাজার করি। যে টাকা দিয়েছে সেই টাকা থেকে কিছু টাকা রয়ে যায়। নাজনীনের পছন্দ কবুতরের মাংস, আর ফুলকপি যা লিস্টে লেখা নেই। যেহেতু টাকা রয়ে গেছে তাই একজোড়া কবুতরের বাচ্চা আর ফুলকপি কিনে নেই সাথে।

বাজার নিয়ে বাসায় পৌছাই। নাজনীনদের বাসায় রান্নাকরে জয়নব খালা। তাকে সব বাজার দেখতে বলা হয় ঠিক আছে কিনা। লিস্ট অনুযায়ী সব বাজারই ঠিকঠাক হয়েছে।

দুপুরে আমাকে নাজনীনদের বাসায় খেতে বলা হয়। যাক ভদ্রলোক বাজার করানোর শাস্তি দিলেও অন্তত অতিথি হিসেবে আমাকে অন্তত একটু হলেও আপ্যায়ন করেন।

দুপুরে খাবার টেবিলে বসেছি। খাবারের ভিতরে আমার হাত, যদিও সবার সামনে খাবার খেতে সংকোচ লাগছে। কোনরকমে চুপচাপ খাচ্ছি, একবার নাজনীনকে দেখছি আরেকবার খাবারের প্লেট।

নাজনীনের বাবা বলেন, শামসুল বিয়ের পর তো তোমাকে বাজার করতে হবে। তাই একটা ছোটো পরীক্ষা নিলাম। আমার ইচ্ছা ছিলো যে আমার মেয়েকে বিয়ে করবে তাকে বাজার করতে পাঠানোর ছোটো পরীক্ষা নিবো৷ তুমি হয়তো অবাক হয়েছো, অবাক হবারই কথা। ঠিকঠাক বাজার অধিকাংশ মানুষই করতে পারে না, আমার কথাই যদি বলি, ইউনিভার্সিটির অনেক বড় শিক্ষক তবু বাজারে গেলে সবজি বিক্রেতা মাছ বিক্রেতার কাছে ঠকে যাই। নাজনীনের মায়ের কথা শুনতে হয় সেসব নিয়ে। তবে বেশ সুন্দর করেই তুমি বাজার করলে। অবশ্য এখানে আরেকটা পরীক্ষা ছিলো। নাজনীনের পছন্দের খাবার সম্পর্কে লিস্টে লেখা ছিলো না। আমি দেখতে চেয়েছি তুমি আমার মেয়েকে কতটা পছন্দ করো, ওর পছন্দ সম্পর্কে কতটা জানো। তবে কবুতরের বাচ্চা, ফুলকপি দেখে মনে হয়েছে না তুমি নাজনীনের জন্যে পারফেক্ট, ওর পছন্দের গুরুত্ব তোমার জীবনে থাকবে।

যাক মনে মনে আশ্বাস পেলাম। কপাল ভালো ছিলো তাই বাড়তি টাকা দিয়ে নাজনীনের পছন্দের সবজি কিনেছিলাম।

আমার শ্বশুরই হয়তো একমাত্র ব্যাক্তি ছিলেন। যার সাথে মেয়ের প্রেমিক দেখা করতে আসবার পরে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাজারে করতে পাঠিয়ে দিয়েছে।

নাজনীনের সাথে আমার বিয়েটা হয়, সবচেয়ে ভালো খবর ছিলো বিয়ের পরে আমার গবেষণা সিলেক্ট হয়ে যায়৷ এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। নাজনীন নামের সেদিনের আমার প্রেমিকা এখন সে আমার স্ত্রী। সেই ৯১ সন থেকে একসাথে আছি, দুই কন্যা এক ছেলে সন্তান আমাদের। কন্যাদের বিয়ে হয়েছে, ছোটো ছেলে পড়াশোনার জন্যে দেশের বাইরে আছে।

বৃষ্টি থামে। আমরা চায়ের দোকান থেকে বের হয়ে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করি। শামসুল আলমের হাতে বাজারের ব্যাগ, তিনি হাসতে হাসতে বলেন বাজার করতে আসলে এখনো অন্যরকম একটা আনন্দ লাগে। তোমাকে দেখে মনে হলো আমার জীবনের কথাগুলো বলি, তোমাদের বয়সী ছেলেদের দেখলে নিজের সেই জীবনে কেন যেনো বারবার ফিরে যাই। যদি আবার সেই দিন আসতো। আমার কাঁধে হাত রেখে বলে, জীবনে কেউ আছে? আমি হাসলাম। শামসুল আলম হেসে বলেন, হাতটা ধরলে শক্ত করে ধরবা, কোনো ছাড়াছাড়ি নেই। সংসারে টাকা পয়সার টানাপোড়েন হলেও খেয়াল রাখবা যেনো ভালোবাসার অভাব না হয়, টাকা পয়সার অভাবে একবেলা ডাল আলু ভর্তা খেয়ে কাটানো যায় তবে ভালোবাসার অভাব হলে একা ছাদের নিচে থাকা কঠিন বুঝলা? আমি হেসে বললাম, বুঝলাম

শামসুল আলম বলেন ওই যে নীল বাড়িটা ওইটাই আমার, এখন আসি। বাজারের ব্যাগ হাতে এক ভদ্রলোক নীল বাড়িটার দিকে হেঁটে যাচ্ছেন, হাতে একটা বাজারের ব্যাগ। বাজারের ব্যাগের সাথে যে এমন সুন্দর ঘটনা লুকিয়ে থাকে জানা ছিলো না, কতো গল্প এখানে। ভালোবাসার মানুষের সাথে একজীবন থাকবার আনন্দ সবাই পায় না। শামসুল আলম পেয়েছেন, তার চোখেমুখে সেই আনন্দ দেখলাম।
 
Back
Top