- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 441
- Messages
- 6,920
- Reaction score
- 4,842
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
বাদশার গামলা
মূল লেখকঃ পারভীন রহমান
মূল লেখকঃ পারভীন রহমান
প্রতি কুরবানীর ঈদে দেখি আশেপাশের অন্যান্যদের গরু থেকে আমাদের কুরবানীর গরু সবচেয়ে ছোট। অন্যদের গরু দেখলে আমার চোখ আটকে যায়। কী বিশাল শরীর, কী চকচকে পশম! যেন গরু নয়, রাজ্যের রাজা।
আর আমাদের গরু?
শুকনো, রোগাপাতলা, কম দামের।
পিন্টু, রুবেল, বাদল ওরা গরু দেখেই হাসাহাসি করে। আমি জানি, তারা গরুকে নয়, আসলে আমাদের অভাবকে নিয়েই হাসাহাসি করে।
আমি চুপ করে থাকি ।
গরিব হওয়ার কষ্ট গরিবরাই বোঝে।
আমাদের গরু সব সময় সাত ভাগে কুরবানি হয়। বাবা চাইতেন না ভাগ কম হোক। ভাগ কম হলেই টাকার পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই কুরবানির ঈদের আগে বাবা, মা আর দাদুর সবচেয়ে বড় চিন্তা —সাতজন শরিক জোগাড় করা।আর
আমার বালক মন ,আমি মনে মনে চাই, শরিক কম হউক! তাহলে তো আমাদের ঘরে গোশত বেশি থাকবে।
কিন্তু সে কথা কাউকে বলতাম না। এখন একটু বড় হয়েছি।
আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। কুরবানির কয়েক মাস আগে বাবা একটি ছোট বাছুর কিনে আনলেন।
হেসে বললেন, — "এখন লালন-পালন করলে ঈদের সময় বেশ বড় হয়ে যাবে।"
বাবার বুদ্ধিটা আমার খুব পছন্দ হলো।
আমরা সবাই মিলে বাছুরটার যত্ন নিতে শুরু করলাম। কলার খোসা, কাঁঠালের খোসা, তরকারির খোসা, ভাতের মাড়—কিছুই আর ফেলে দেওয়া হয় না।
সব জমা হতো ওর জন্য।
আমি হাত দিয়ে কলার খোসা খাওয়াই। খোসা ধরলেই ও লম্বা জিভ বের করে টেনে নেয়। তৃপ্তি করে খায়। আমি ওর লম্বা জিভটা অনেক টুক পর্যন্ত দেখি।
দেখতে দেখতে ও আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠল।
আমি ওর নাম দিলাম— বাদশা।
নামের মতোই ওর হাঁটা। মাথা দুলিয়ে, বুক ফুলিয়ে এমনভাবে চলত যেন পুরো উঠানের মালিক সে-ই। মশার সময় মশারি টানিয়ে দেই। গরমের সময় হাত পাখা দিয়ে বাতাস করি।
কয়েক মাসের যত্নে বাদশা বেশ তাজা হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই শুরু হলো টানা বৃষ্টি।
বাবা অসুস্থ। ঘাস কাটতে যেতে পারছেন না।
একদিন দেখলাম পিন্টুদের বাড়িতে দুটো বড় পাকা কাঁঠাল এসেছে। মনে মনে খুশি হয়ে গেলাম।
ভাবলাম, কাঁঠালের খোসাগুলো বাদশাকে খাওয়াব।
পিন্টুর মায়ের সামনে পিন্টুকে বললাম, — "তোদের তো গরু নেই। কাঁঠাল খাওয়া হলে খোসাগুলো আমাকে দিবি?"
পিন্টু অদ্ভুত একটা হাসি দিয়ে বলল, — "আচ্ছা।"
আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম।
একদিন গেল, দুদিন গেল।
তারপর বিকেলে দেখি, ওদের বাড়ির পেছনে কাঁঠালের খোসাগুলো ফেলে রাখা। মাছি ভনভন করছে।
আমাকে দেয়নি।
সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
নষ্ট করে ফেলবে, তবু দেবে না!
মানুষ এমন কেন?কয়েকদিন পর বাদলদের বাড়িতে গেলাম।
বাদলের মাকে বললাম, — "চাচি, আপনাদের ভাতের মাড়টা ফেলে দেবেন না। আমি নিয়ে যাব।"
তিনি মুচকি হেসে বললেন, — "আচ্ছা, রেখে দেব।"আমি কি একটি বালতি দিয়ে যাব? না দরকার নেই আমি ঠিক মতই রেখে দিব চিন্তা করোনা।
আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না।
মনে হচ্ছিল, পিন্টুদের মতো তিনিও হয়তো ইচ্ছে করেই ভুলে যাবেন।
কিন্তু পরদিন বিকেলে তিনি নিজেই ডাকলেন, — "শুভ, এদিকে এসো।"
আমি দৌড়ে গেলাম।
একটা বালতিতে ভাতের মাড়। তার ওপর কিছু টুকরো লাউয়ের খোসা ভাসছে।
আর হাতে একটা সুজির প্যাকেট।
তিনি বললেন, — "ডেট পার হয়ে গেছে। আমরা খাব না। পানি দিয়ে জ্বাল করে গরুটাকে খাইয়ে দিও। একটু লবণও দিও।"
কথাগুলো শুনে আমার গলা ভারী হয়ে গেল। চোখ ভিজে গেল।
ধন্যবাদও দিতে পারলাম না।
বালতি আর প্যাকেট নিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে এলাম।
সেদিন বুঝেছিলাম, পৃথিবীতে শুধু পিন্টুরা জন্মায় না।
বাদলের মায়ের মতো মানুষও জন্মায়।
বাদশা মাড় চেটে চেটে খাচ্ছিল। আমি ওর গলায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
ও নিশ্চয়ই বুঝতে পারত আমি ওকে কত ভালোবাসি।
রাতে প্রায়ই স্বপ্ন দেখি—কুরবানির দিন চলে গেছে, কিন্তু বাদশা আমাদের বাড়িতেই আছে। আমি ওকে নিয়ে মাঠে ঘুরছি।
ঘুম ভাঙলেই বুকটা হুহু করে উঠে।
কারণ জানতাম, স্বপ্ন কখনো সত্যি হবে না।
ঈদ যত কাছে আসছিল, আমার মন তত খারাপ হচ্ছিল।
দাদু আমাকে কুরবানির ইতিহাস শোনালেন। বললেন, ত্যাগের শিক্ষা, আল্লাহর সন্তুষ্টি, হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর পরীক্ষা।
আমি মন দিয়ে শুনলাম।
তবু বাদশাকে হারানোর কষ্ট কমল না।
কুরবানির আগের দিন থেকে মনে হচ্ছিল, বাদশাও যেন সব বুঝতে পারছে।
ওর বড় বড় চোখ দুটো অদ্ভুত বিষণ্ন লাগছে।
ঈদের সকালে উঠান ভরে গেল মানুষের কণ্ঠে।
আমি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
যখন বাদশাকে নিয়ে যাওয়া হলো, সে একবার আমার দিকে তাকিয়েছিল।
সেই দৃষ্টিটা আমি আজও ভুলিনি।
জবাইয়ের সময় ওর চিৎকার শুনে আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি।
ঘরের ভেতর চলে এলাম।
এবারও গরু সাত ভাগে কুরবানি হলো।
তবে আমাদের ভাগ ছিল দুই ভাগ।
প্রতি বছর কুরবানির দুপুরে আমাদের ঘরে একটা ছোট্ট উৎসব হয়। সাদা রুটি, পাতলা খিচুড়ি আর গরুর গোশত।
আমরা তিন ভাইবোন, বাবা, মা আর দাদু মেঝেতে বসে একসঙ্গে খাই।
খাবার সামান্য হলেও মনে হয় রাজকীয় ভোজ।
কিন্তু এবার আমি খেতে পারলাম না।
মা বারবার ডাকলেন।
দাদু ডাকলেন।
বাবা কিছু বললেন না।
অন্যদিন হলে বাবা বকাঝকা করতেন। কিন্তু সেদিন তিনি চুপ ছিলেন।
হয়তো তিনিও কষ্ট পাচ্ছিলেন।
বাবারও তো মায়া পড়েছে বাদশার ওপর।
বাদশার গোশত আমি মুখে তুলতে পারিনি।
দুই দিন ঘর থেকে বের হইনি।
তৃতীয় দিন বিকেলে উঠানে এলাম।
বাদশা যে গামলাটায় পানি খেত, ভাতের মাড় খেত, সেটা এখনো আগের জায়গায় পড়ে আছে।
চারপাশে বড় বড় মাছি ভনভন করছে।
শেষ দিন যে ঘাসগুলো খেয়েছিল, সেগুলোর কিছু অংশও পড়ে আছে।
আমি জানি, বাবা চাইলে সব পরিষ্কার করতে পারতেন।
কিন্তু করেননি।
হয়তো বাবাও চেয়েছেন, বাদশার স্মৃতিগুলো আরও কিছুদিন উঠানে বেঁচে থাকুক।
আমি গামলাটার পাশে বসে থাকি।
হাত বুলিয়ে দিই।
মনে হয়, এই তো একটু আগে বাদশা এখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
দাদুর কথা মনে পড়ে।
"আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না পশুর গোশত কিংবা রক্ত; পৌঁছায় মানুষের তাকওয়া আর ত্যাগ।"
সেদিন কথাটার অর্থ বুঝিনি।
আজ যেন একটু একটু করে বুঝতে পারছি।
কুরবানি শুধু বাদশার ছিল না।
আমাদেরও ছিল।
আমি কুরবানি দিয়েছি আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটাকে।
চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
তবু আজ আর আগের মতো কষ্ট লাগে না।
কারণ বুঝতে শিখেছি, কিছু ভালোবাসা কাছে রেখে নয়, ছেড়ে দিয়েই পূর্ণতা পায়।
গামলাটার ওপর শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে আমি ঘরের দিকে হাঁটতে থাকি।
পেছনে তাকাই না।
মনে হয়, কোথাও না কোথাও বাদশা এখনো হেলেদুলে হাঁটছে—
রাজা বাদশার মতোই।