Collected অযাচিত ভালোবাসা

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
429
Messages
6,771
Reaction score
4,541
Points
3,963
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
অযাচিত ভালোবাসা

মূল লেখকঃ নিতু ইসলাম








আম্মার ছিলো গাছপালার শখ। বাড়িতে এক ইঞ্চি জায়গা পতিত থাকবে , আম্মা কেন জানি সইতে পারতেন না। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জামরুল ব্যতীতও
প্রচুর গাছ ছিলো আমাদের। ফলগুলো সকলের মুখের
আনন্দ দেয়া ছাড়াও, বাড়তি কিছুটা বিক্রি হতো। আম্মা খুব অল্প মূল্যে সুপারি বা ফল বিক্রি করে আমাদের স্কুল কলেজের যাতায়াত বা খাতা কলম কিনে দিতেন।

টিফিন বলতে তখন কোন শব্দ ছিলো না। গরম ভাত খেয়ে স্কুলে যেতাম। ফিরে এসে দেখতাম, আম্মা ভাত আগলে বসে আছেন।

টিফিন টাইমে ফুটবল খেলা ছিলো আমাদের অন্যতম আনন্দের বিষয়। ছোলা বুট, বাদাম বা হজমি যারা কিনে খেতো। আমাদের চোখে তারা ছিলো ভাগ্যবান। খুব গরমে যখন আইসক্রিমের ঘণ্টি শুনতাম। আমার আর ছোট ভাইয়ার তখন কেমন একটা উশখুশ ভাব চলে আসতো।

আম্মা তার জমানো শিশি বোতল থেকে বেছে বেছে দুয়েকটা বের করে দিতেন। আমি আর ভাইয়া দৌড়ে গিয়ে আইসক্রিম আনতাম। ডগায় নারিকেল দেয়া কী যে মজার আইসক্রিম! আমরা দু'জন, কিন্তু আইসক্রিম একটা । আমি বলতাম - ভাইয়া তুমি আগে খাও সে বলতো না না তুমি ছোট, তুমি আগে খাও।

বেশ খানিকটা বড় হবার পরেও আমি মায়ের আঁচল ধরা ছিলাম। দশ এগারো বছর বয়স পর্যন্ত অন্য চার ভাইবোনের মন খারাপের কারণ হয়ে আমি মায়ের কাছে ঘুমাতাম। অন্যরা ঘুমাতে পারতো না কারণ তারা সবাই আমার বেশ ক'বছরের বড়। তবে তারা কেউ ঈর্ষা করতো না।

ঈর্ষা শব্দটি আমাদের পরিবারের সাথে ঠিক যায় না। আব্বা আম্মা আমাদের সেভাবেই গড়ে তুলছিলেন। আব্বার চোখে আমি ছিলাম 'বোকা বালক'। নিজের পাতের ডিম বা ভালো মাংসের টুকরোটা অনায়াসে আমি ভাইদের পাতে তুলে দিতাম।

আম্মা বলতেন 'রাজা ব্যাটা, তুমিও খাও, পুষ্টি তো তোমারও দরকার '। মা আদর করে 'রাজা ব্যাটা' ডাকতেন। এক সকালে আম্মা ভাত রান্না করেছেন, লাউ শাক আর মাছ দিয়ে, আমি আনমনে খেয়ে যাচ্ছি। ভাই বোনেরা হাসছে, বড় ভাই তো রীতিমত জোড়ে হেসে ফেললেন, ছোট আপা হাসতে হাসতে তার আঁচল লুটিয়ে গেলো।

এত্তো হাসির কারণ ! আমি নাকি শুধু সালাদ দিয়েই ভাত খেয়ে যাচ্ছি, তরকারি নেবার কথা মনে নেই।
বড় আপা দ্রুত বেশ খানিকটা মাছ আমার পাতে দিলেন। কী মনে করে কাঁটাও বেছে দিলেন। আব্বা শুধু
মুচকি হাসি দিয়ে বললেন - বোকা ছেলে।

এসএসসি পাশ করে দেখি, আমার শহরে গিয়ে থাকা খাওয়া সহ, পড়ার খরচ চালিয়ে যাওয়া আব্বার জন্য বেশ কঠিন। ছোট ভাইয়া তখন ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বেড়াচ্ছে। বড় ভাইয়া ঢাকায় ভালো একটা কলেজে অনার্স পড়ছে । ছোট আপাও ডিগ্রি পরীক্ষার্থী। শুধু বড় আপার বিয়ে হয়েছে। আপা দুলাভাইয়ের সাথে চিটাগং থাকেন।

আম্মা প্রায়ই বলেন - রাজা ব্যাটা তুমি শহরে চলে যাও। আল্লাহ একটা না একটা ব্যবস্থা করবেনই। আব্বা জায়নামাজে আজকাল অনেক বেশি সময় দেন।

- ইয়া গাফুরুর রাহিম, তুমি আমার এই ছোট সন্তানের
জন্য যা কিছু উত্তম তাই দান করো। আমি চুপচাপ থাকি।

আমার বন্ধু হাসান প্রায়ই আমাদের বাড়ি আসে। ওর অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। ওর বাবাই নেই। দুই বন্ধু স্কুলের মাঠে চুপচাপ বসে থাকি। পাশাপাশি 'দুজন কিশোর 'কেউ কোন কথা বলছি না। অথচ আমি জানি হাসান কী ভাবছে। হাসানও জানে আমি কী ভাবছি ।

এই সময়ে বড় আপার চিঠি এলো। মুনিম তুমি চিঠি পাওয়া মাত্র চিটাগং চলে আসো। এখানেই কলেজে ভর্তি হবে। আবেগে আমি কাঁপছি। ভালো কলেজে পড়ার এমন একটা সুন্দর সুযোগ আসবে ভাবিনি।

আম্মা কাঁদেন আর পিঠা বানান। আম্মার হাতে নকশী পিঠাগুলো অন্যরকম সৌন্দর্য পায়। আম্মা চাল গুড়া করেন। সুগন্ধি আতপ চাল ব্যাগে তুলে দেন। পরিশ্রমে আম্মার নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে।

ছোট আপা কলেজ থেকে এসে আম্মার কাজে হাত লাগান। কলসি কলসি পানি তোলা আর রান্নার যোগান দেয়ার দায়িত্ব তার। ওদের পরিশ্রম দেখে আমার চোখে পানি আসে। আমি মানুষ হবোই। এইসব কষ্ট সেদিন থাকবে না। যাওয়ার আগের দিন ছোট আপার 'রাতা' মোরগটা জবেহ হয়। আমি হাসানকে ডেকে নিয়ে আসি।

আমাদের দুজনকে যত্ন করে আম্মা খাবার বেড়ে দেন।
হাসানকে ভর্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। হাসান চুপচাপ খায়। ওর মুখে আমি বিষণ্নতা দেখি। রাতে আব্বা বলেন - ব্যাটা, কাল যাচ্ছো? আমি মাথা নাড়ি।
কিছু বলতে গেলে গলা কেঁপে যাবে। তাই চুপ থাকি।

ছোট ভাইয়া শহর থেকে বাড়ি এসেছে। উনি আমাকে চিটাগং পৌঁছে দিয়ে আসবে। আব্বা বলেন ব্যাটা তুমি ভর্তি হবা, হাসানের ব্যাপারে কিছু ভাবছো? এবারেও আমি মাথা নাড়ি। শূণ্য চোখে তাকাই।

পরদিন সকালে হাসান আবার আসে, আমার গোছগাছ মনোযোগ দিয়ে দেখে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আমি ওর পিঠে হাত রাখি। ও বলে - তুই ভালো কলেজে পড়বি। ওখানে বন্ধুদের সাথে কতো মজা করবি, কত্তো কিছু শিখবি, তাই না রে ! আমার চোখে পানি এসে যায়।

বলি - আমি গিয়ে টিউশনি করবো, তারপর তোকে টাকা পাঠাবো। তুই তখন কলেজে ভর্তি হবি। ওর চোখে অবিশ্বাসের ছায়া।

এমন সময় আম্মা আসেন ঘরে। ওর দিকে আম্মা তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর বলেন - রাজা ব্যাটা শুনে যাও। আমি কাছে গেলে আম্মা তার আঁচল থেকে ১০ টাকা পাঁচ টাকা এমনকি দুইটাকার কিছু খুচরো নোট হাতে দিয়ে বলেন - দ্যাখেন তো ব্যাটা এখানে কয় ট্যাকা। আমি গুণে দেখি দুইশ বাইশ টাকা। আম্মা দ্রুত পাশের বাড়ির গনি কাকাকে ডেকে আনতে বলেন।

গনি কাকা আসলে আম্মা মাথার কাপড়টা আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে বলেন - ভাইজান, আমার গাছ ভর্তি জলপাই আর কিছু নারিকেল আছে। খাটের নিচ থেকে নারিকেলগুলো বের করে বলেন, সব মিলিয়ে কতো দাম দিতে পারবেন!

গনি কাকা পাকা ব্যবসায়ী, তিনি বলেন - ভাবি বিশটা নারিকেল দুইশ আর জলপাই গাছ ৩৫০ আম্মা বলেন
আরেকটু বাড়ান। গনি চাচা হাসেন, ছেলে কলেজে পড়তে যাবে, তাই বুঝি খুব তাড়াহুড়া?

আম্মা চুপচাপ থাকেন গনি চাচা পাঁচশো সত্তর টাকা আম্মার হাতে দিয়ে বলেন - এর বেশি পারলাম না।
আম্মা আমাকে বলেন দশটা টাকা দাও তো আব্বা।
ছোট আপার পায়ে হেঁটে কলেজ গিয়ে রিক্সাভাড়া বাঁচিয়ে বিশটি টাকা আমার হাতে দিয়েছিলেন। রাস্তায় খিদে পেলে টিফিন কিনে খেতে। আমি সেখান থেকে দশ টাকা আম্মার হাতে দিলাম।

আম্মা পুরো আটশো টাকা আমায় দিয়ে বললেন - যাও
হাসানকে দিয়া আসো। তুমি কলেজে পড়বা আর তোমার বন্ধু মন খারাপ করে ঘুরবে, এইটা কোন কথা !
কারো মনে কষ্ট থাকবে, আর কেউ সুখ ভোগ করবে ; সেই সুখ বুকে যেন কাঁটা হয়ে না বেঁধে আব্বা !

আমি আম্মার সামনেই হাসানকে ডাকলাম। ওর হাতে টাকাটা দিয়ে বললাম - যা তুই ও ফর্ম তুলে আন। কাল'ই কলেজে ভর্তি হ । হাসান খানিকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে দেখলো। তার চোখে খানিকটা আনন্দময় অবিশ্বাস।

সে খুশি হবার বদলে বোকার মতো আমাকে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকলো। আমিও কাঁদতে কাঁদতে বললাম - কী করছিস! ছাড় ছাড় আমার ইস্ত্রি করা শার্টটা ! দিলি তো তার বারোটা বাজিয়ে !

এরপর অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে। ভার্সিটি শেষ করে, আমি ভালো চাকরি পেয়ে গেলাম। হাসান পড়া শেষে হোমড়াচোমরা এক সরকারি কর্মকর্তা হয়ে গেলো।

এখনো বাড়ি গেলে দু'বন্ধু সন্ধ্যার পরে লুকিয়ে স্কুল মাঠে বসে থাকি। আমার দুজন মধ্যবয়সী পুরুষ । আমরা কোন কথা বলি না। কিন্তু আমি জানি হাসান কী ভাবছে। হাসান জানে আমার মনের সব কথাগুলি।

ঠিক এই সময়টাতে আমরা দুজন আবার দুর্দান্ত কৈশোরে ফিরে যাই। যে কৈশোর আদরের, যে কৈশোর অনেক কিছু না পাওয়ার, আবার অনেক অযাচিত ভালোবাসার।
 
Back
Top