- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 425
- Messages
- 6,734
- Reaction score
- 4,445
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
অদৃশ্য শ্রম
মূল লেখকঃ সুবর্না শারমিন নিশী
মূল লেখকঃ সুবর্না শারমিন নিশী
সকাল সাড়ে সাতটা বাজলেই রফিকের ড্রয়িংরুমে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। তার স্ত্রী মালিহা কর্পোরেট অফিসের বড় কর্মকর্তা। নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা পোশাক, হাতে দামি ঘড়ি, হাইহিল আর চোখেমুখে এক ধরণের কৃত্রিম ব্যস্ততা। তাদের দুই বাচ্চা, আরণ্য আর অরণি, মায়ের কাছে যাওয়ার সাহস পায় না। তাদের সব আবদার, স্কুলের ব্যাগ গোছানো থেকে শুরু করে জুতোর ফিতে বেঁধে দেওয়া সবই করে আফরিন।
আফরিন এই বাড়ির ছোট বউ, রাফিনের স্ত্রী। তার দিন শুরু হয় ভোর সাড়ে পাঁচটায়। সবার নাস্তা বানানো, বাচ্চাদের টিফিন রেডি করা, কাপড় গুছিয়ে দেয়া। মালিহা যখন ড্রয়িংরুমে কফির কাপে চুমুক দেয়, আফরিন তখন ঘামে ভেজা অবস্থায় রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
- ভাবী, আজকের কফিটা কি ঠিক হয়েছে?
মালিহা ভ্রু কুঁচকে বলে,
-চিনির পরিমাণ টা এখনো শিখলে না আফরিন। আসলে সারাদিন তো ঘরেই থাকো, বুদ্ধিশুদ্ধি কি আর শানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাও? অফিসের প্রেশার সামলালে বুঝতে ব্রেইন কিভাবে কাজ করে।
আফরিন ম্লান হাসে। কোনো প্রতিবাদ করে না। সে জানে, এই বাড়িতে তার কাজের কোনো আর্থিক মূল্য নেই, তাই হয়তো সম্মানের পাল্লাটাও হালকা।
এক রাতে সবাই খেতে বসেছে। মালিহার মেজাজ খারাপ কারণ অফিসে তার একটা প্রেজেন্টেশন আশানুরূপ হয়নি। আফরিন গরম গরম ইলিশ মাছ ভাজা নিয়ে এলো। মালিহা এক টুকরো মুখে দিয়েই প্লেটে ফেলে দিল।
-এই তেল চপচপে খাবার মানুষ খায়? আসলে তোমাদের মতো হোমমেকারদের সমস্যা এটাই। তেলের দাম যে বেড়েছে সেটা তো বুঝবে না, কারণ টাকা তো আর নিজে কামাও না। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোই তোমাদের কাজ।
রফিক বাধা দিতে দিতে চাইলো কিন্তু মালিহা ঝংকার দিয়ে উঠল,
-রান্না করাটা কি এমন মহান কাজ ?। আমি অফিসে যা করি সেটা হলো প্রফেশনাল স্কিল।
আফরিন মালিহার দুই বাচ্চাকে নিয়ে তপ্ত দুপুরে কোচিংয়ে গিয়েছিল। আফরিনের ফোনটা বাজতেই সে দেখলো স্ক্রিনে মালিহার নাম। ফোনটা ধরে সে জানালো তারা কোথায় আছে। ওপাশ থেকে ভেসে এলো,
-আমার বাচ্চাদের অসুস্থ করে কি লাভ তোমার? এই যে গায়ে কড়া রোদ পড়েছে, এখন যদি জ্বর আসে? তুমি তো এসির আরাম বুঝবে না, কারণ সারাদিন তো কাটাও রান্নাঘরে।
বাড়িতে মালিহার অফিসের কিছু কলিগ এসেছে। আফরিন একা হাতে ৮/১০ পদের রান্না করেছে। মালিহা ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে আর হাসছে। খাবার টেবিলে একজন কলিগ আফরিনের রান্নার খুব প্রশংসা করলেন।
মালিহা তখন তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
-আরে ও তো এসবই পারে। পড়াশোনা তো আর বেশিদূর করেনি, ক্যারিয়ারও নেই। তাই রান্নাবান্নাটাই ওর ধ্যানজ্ঞান। এই যে দেখছেন ঘরটা ঝকঝক করছে, এগুলোই ওর এচিভমেন্ট। এর বাইরে ওর জগতের কোনো অস্তিত্ব নেই।
রাতে শোবার ঘরে রফিক মালিহাকে বোঝানোর চেষ্টা করে।
-মালিহা, আফরিন এই সংসারের মেরুদণ্ড। তুমি যে নিশ্চিন্তে অফিস করো, কারণ তুমি জানো তোমার বাচ্চা আর ঘর নিরাপদ হাতে আছে। ওকে অন্তত ছোট কোরো না।
মালিহা ল্যাপটপ থেকে মুখ না তুলেই বলে,
-রফিক, তুমি ওকে ডিফেন্ড করা বন্ধ করো। ও কি ফ্রিতে কাজ করছে? এ বাড়ির অন্ন ধ্বংস করছে না? আমি টাকা আনি, তাই আমার কথার ভ্যালু আছে। ও যে কাজগুলো করে, সেগুলোর জন্য বাজারে লোক পাওয়া যায়। কিন্তু আমার পজিশনে কাজ করার লোক কজন আছে?
রফিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে দেখেছে আফরিন আড়ালে চোখের জল মোছে। মালিহার অহংকারের পারদ দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এক বিকেলে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। আফরিন চুলায় তরকারি বসিয়ে মালিহার অরণির কান্না থামাতে গিয়েছিল। ওর দুদিন ধরে জ্বর। সেই ফাঁকে তরকারিটা সামান্য পোড়া লেগে যায়। মালিহা অফিস থেকে ফিরে পোড়া গন্ধ পেয়েই রান্নাঘরে ঢুকল। কোনো কথা নেই, বার্তা নেই সে আফরিনের সামনে গিয়ে চিৎকার করে উঠল।
-অপদার্থ! একটা কাজও কি ঠিকঠাক করতে পারো না? আমার কষ্টের টাকার বাজার তুমি এভাবে নষ্ট করলে?
আফরিন কাঁপা গলায় বলল,
- ভাবী, অরণি কাঁদছিল তাই...
-চুপ করো! বাহানা দেবে না। তোমার এই অলসতার কারণে মেজাজ গরম হয়ে যায়, অকর্মণ্য কোথাকার।
-ভাবী, অরণির শরীর টা খারাপ আর ও তো আপনারই মেয়ে...
আফরিনের কথা শেষ হলো না। মালিহা রাগে ফেটে পড়ে বললো,
- তোর মতো একটা রান্নাকরা কাজের লোক আমার সাথে তর্ক করে! বলতে বলতে মালিহা হাত তুলল আফরিনকে চড় মারার জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে রাফিন আর রফিক ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়ে।
রাফিন তার শান্ত স্বভাবের জন্য পরিচিত, কিন্তু আজ সে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে আফরিনকে আড়াল করে দাঁড়ালো ।
-যথেষ্ট হয়েছে ভাইয়া। আমার বৌ এই বাড়ির দাসী নয়। সে যে সেবা দিয়েছে তার কোনো প্রতিদান তোমরা দিতে পারোনি, উল্টো সম্মান কেড়ে নিয়েছো। আমরা আর একসাথে থাকবো না। এই ফ্ল্যাটে তোমরাই থাকো। আমরা পাশের ফ্ল্যাটে শিফট করছি। সেটা তো খালিই। বাবা তো দুই ভাইয়ের জন্য সমান করেই সব রেখে গেছেন। আর হ্যাঁ বাবা মায়ের গড়া সব ফার্নিচার, বাসনকোসন দুই ভাগ হবে। রাফিন আফরিন কে নিয়ে গটগট করে নিজেদের ঘরে চলে যায়। অরণি কাঁদছে,আরেক চুলায় ভাত বসানো ছিল। এখন পোড়া গন্ধ আসছে।
-রাফিন, এটা কি করলে? বড় ভাইয়ের সাথে কেউ এভাবে কথা বলে? আফরিন অসন্তুষ্ট গলায় বলে।
-ভাইয়াই আমাকে গত পরশু এসব শিখিয়েছে।
-মানে!
-কিছু না। তুমি এখন থেকে নিজের সংসার করবে, এত শাবানা সাজার দরকার নাই।
আলাদা হওয়ার পর রাফিন আর আফরিন পাশের ফ্ল্যাটে ওঠে। শুরুতে আরণ্য আর অরণির জন্য কষ্ট হলেও আফরিনের মুখে এখন হাসি। সে এখন শুধু নিজের জন্য আর নিজের ছোট সংসারটুকুর জন্য কাজ করে। তার হাতে এখন অনেক অবসর।
আফরিন তার রান্নার হাতকে কাজে লাগিয়ে একটি অনলাইন ক্যাটারিং বিজনেস শুরু করে। "আফরিন'স কিচেন" নামে তার পেজটি অল্প দিনেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।রাফিন তাকে সব কাজে সাহায্য করে। তাদের ছোট সংসারে এখন শান্তির সুবাতাস।
অন্যদিকে, মালিহার রাজপ্রাসাদে এখন হাহাকার।
মালিহা ভেবেছিল টাকা থাকলেই সব হয়। সে একজন রাঁধুনি রাখল, ঘর মোছার জন্য আলাদা লোক, বাচ্চাদের জন্য টিউটর এবং স্কুল থেকে আনা-নেওয়ার জন্য একজন আয়া।
মাস শেষে যখন হিসেব মেলাতে বসল, মালিহার মাথায় হাত।
রাঁধুনি,আয়া, ড্রাইভারের ওভারটাইম , টিফিন ও বাইরের খাবারের খরচ, সার্বক্ষণিক গৃহকর্মীর বেতন সব মিলিয়ে মালিহার বেতনের বড় অংশ বেরিয়ে যাচ্ছে এই সেবাকর্মীদের পেছনে। এর ওপর আছে অযত্ন। রাঁধুনি ঠিকমতো মসলা দেয় না, আয়া বাচ্চার সাথে রুক্ষ ব্যবহার করে। ঘর আগের মতো ঝকঝকে থাকে না। মালিহা অফিস সেরে এসে দেখে কিচেন সিঙ্কে থালাবাসন জমে আছে।
এক রাতে মালিহা রফিকের কাছে গেল।
-রফিক, সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়ছে। এই মাসে আমার স্যালারির সব টাকা শেষ। আমাকে হাজার বিশেক টাকা দাও।
রফিক শান্তভাবে বলল,
-কেন মালিহা? তুমি না বলেছিলে তুমি কর্মজীবী, তোমার অনেক পাওয়ার? আফরিন তো বিনা বেতনে এসব করত, তখন তো বলেছিলে ওর কাজের কোনো দাম নেই। এখন কেন এতগুলো মানুষকে টাকা দিয়েও কুলোতে পারছ না?
মালিহা রেগে গিয়ে বলল,
-ওরা প্রফেশনাল।
রফিক হাসল।
-ঠিক বলেছো। আফরিন করত ভালোবাসার জন্য, আর এরা করে প্রফেশনের জন্য। তুমি তো প্রফেশনালিজমই পছন্দ করো। এখন কেন হিমশিম খাচ্ছ? যদি টাকা না কুলোয়, তবে লোক ছাড়িয়ে দাও। আমরা দুজন মিলে কাজ ভাগ করে নিই। আমাকেও তো মাসিক বাজার, ফলমূল, দুধ, ডিম, ওষুধ কিনতে হয়। প্রতি মাসে একটা বড় এমাউন্ট যায় তোমার শপিং এর পেছনে। তাছাড়াও বাচ্চাদের স্কুল ফি, কোচিং ফি, প্রাইভেট টিউটর এর বেতন আমাকেই গুনতে হয়। তাই বলছি লোক ছাড়িয়ে দাও।
মালিহা অবাক হয়ে বলল,
-কি বলছ? আমি অফিস সামলে ঘর মুছব, থালাবাটি ধুবো, রান্না করবো!
রফিক তখন ডিটেইলসে বলতে শুরু করল,
-শোনো, কাল থেকে তুমি ভোরে উঠে নাস্তা বানাবে আর আমি ঘর ঝাড়ু দেব। অফিস থেকে ফেরার পথে আমি বাজার করব, তুমি এসে রান্না করবে। রাতে আমি বাচ্চাদের পড়াব, তুমি কাপড় কাচবে। এভাবেই তো চলে, তাই না?
মালিহা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। সে ভাবতেও পারছে না এই শারীরিক পরিশ্রম সে কিভাবে করবে। অথচ আফরিন একা হাতে এতদিন ধরে এই কাজগুলোই করে এসেছে।
কয়েক মাস কেটে গেছে। মালিহার চেহারা ভেঙে গেছে। কাজের চাপে সে এখন অফিসেও ঠিকমতো মন দিতে পারছে না। কিন্তু তার অহংকার এখনো চুরমার হয়নি।
একদিন রফিক ডাইনিং টেবিলে বলল,
-মালিহা, এবার কি অন্তত মানবে যে একজন গৃহিণী যে পরিমাণ কাজ করে, তার আর্থিক মূল্য ধরলে তোমার কর্পোরেট স্যালারিও কম মনে হবে? তাদের কোনো ছুটি নেই, বোনাস নেই, এমনকি তোমাদের মতো কারো কাছ থেকে একটা 'থ্যাংক ইউ'-ও পায় না তারা।
মালিহা মুখ শক্ত করে বলল,
-না, ওগুলো কোনো প্রোডাক্টিভ কাজ নয়। আমি আজ সমস্যায় পড়েছি কারণ এখনকার মানুষ কাজ চোর। আফরিন তো বাধ্য হয়ে করত কারণ ওর যাওয়ার জায়গা ছিল না।
রফিক হেসে বললো,
-আফরিনের বাবার বাড়িতে সুন্দর একটা পরিবার আছে। সেটাও বাদ দিলাম, ওর বড় ভাই হিসেবে আমি আছে আর সবচেয়ে বড় কথা ওর পাশে রাফিন আছে । রাফিন আছে মানে ওর আর কাউকেই দরকার নেই। তোমার বাবা নেই, দুই ভাই আলাদা থাকে । মা ছয়মাস এই বাড়িতে বাকি ছয়মাস ঐ বাড়িতে পালা করে থাকেন। আমি যেভাবে আফরিনকে স্নেহ করি, রাফিন কিন্তু তোমাকে সেই সম্মান টা করে না। আর হ্যাঁ এর পেছনেও তুমিই আছো। আর সবচেয়ে বড় কথা তোমার পাশে সবসময় আমি ঐ সাপোর্ট দিতে পারবো না যেটা রাফিন আফরিন কে দেয় কারণ তোমার আর আফরিনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। ছেলে মেয়ে গুলো পর্যন্ত তোমাকে ঠিকঠাক পছন্দ করে না। তোমার সম্বল শুধু একটা চাকরি। ভেবে দেখো , আফরিনের যাওয়ার জায়গা নেই নাকি তোমার?
মালিহা সজোরে একটা কাঁচের গ্লাস ছুঁড়ে মারলো রফিকের উপর। কপাল কেটে রক্ত পড়তে লাগলো। রফিক হাত দিয়ে কাটা অংশ চেপে ধরে একটাও কথা না বলে বেডরুমের দিকে চলে গেল।
তারপর থেকে তাদের কথা বন্ধ। রফিক প্রায়ই ভাবে মানুষের ইগো কত ভয়ঙ্কর হতে পারে।
অন্যদিকে, আফরিনের বিজনেস এখন তুঙ্গে। সে এখন দুজন অসহায় মহিলাকে চাকরি দিয়েছে তার অনলাইন কিচেনে, তিনজন ডেলিভারি ম্যানও আছে তার। সে এখন নিজেই একজন "কর্পোরেট লেডি", কিন্তু তার মনে অহংকার নেই। সে জানে, ঘর সামলানো আর বাইরে কাজ করা দুটোই সমান বীরত্বের।
মালিহা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কালি পড়া চোখের দিকে তাকায়। তার মনে পড়ে আফরিনের সেই হাসিমুখ। সে বুঝতে পারছে সে হেরে গেছে, কিন্তু তার অহংকারী মন আজও পরাজয় স্বীকার করতে রাজি নয়। সে আজ একাই নিজের তৈরি করা এক যান্ত্রিক নরকে বন্দী।