- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 458
- Messages
- 7,356
- Reaction score
- 5,837
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
অবিরাম
মূল লেখকঃ রিফু
মূল লেখকঃ রিফু
"প্রতিদিন মনে হচ্ছে জানিস, মনে হচ্ছে যে হেরে যাচ্ছি!"
আমি চুপ করে রইলাম। নিতুর বয়স খুব বেশি না। সাতাশ? কিংবা হয়তো ছাব্বিশ। প্রতিদিন ভাজাপোড়া খেতে খেতে ওজন বেড়ে গেছে ধ্যারধ্যার করে। সামান্য গরমেও হাসফাঁস করে৷ ঘামের বিশ্রি গন্ধ এড়াতে কড়া পারফিউম ব্যবহার করেছে। চোখের দুধারের চামড়ার ভাজ স্পষ্ট হয়ে চেপে বসেছে। মায়ে হারিয়ে গেছে চোখমুখ থেকে। পরিশ্রম করছে মেয়েটা৷ ভীষণ পরিশ্রম। তাতে ঘরভাড়া আর খাওয়াদাওয়ার যোগান হচ্ছে৷ কিন্তু, বাঁচাটা বোধহয় হচ্ছে না।
"আমি বাড়ি যাই না, মনে হয় সাত মাস হয়ে যাবে।"
"আন্টির শরীর ভালো?"
নিতু মাথা নাড়লো। চেহারা ম্লান হয়ে এলো ওর। বলল, " বিছানায় আছে। উঠতে পারে মাঝে মাঝে। "
"এখনও কথাবার্তা হয় না?"
দীর্ঘশ্বাসে পরিবেশটা ভারী হয়ে এলো। ভাঙ্গা হাসিতে ওর মুখটা ছেয়ে গেলো। হাত দুটোকে বুকের কাছে নিয়ে জড়ো করে বলল, " আগের চাইতে বেশি হয়। টাকা চাইতে ফোন দেন। তার আর উপায় নেই। ডায়ালাইসিস করাতে টাকা লাগে। আমি ছাড়া আর কে দেবে তাকে অতো টাকা?"
"কেন, তোর ভাইয়েরা?"
" ভাবীর কথা তো জানিস। তার সঙ্গে ভাইয়া পারে না। তার দোকানের আয়ও বেশি না। ছেলে আছে দুটো। চাইলেও সম্ভব না।"
" হিমেল কিসে পড়ে এখন?"
" ভর্তি হয়েছে তেজগাঁতে। সমাজতত্ত্ব পড়ছে। রাজনীতি করে, ঘুরেফিরে, ঘরের খোঁজ নেই। ফেরে শুধু ঘুমাতে। মার কাছে শুনলাম, প্রায় রাতে নেশা করে করছে। ভাইটাকে ঠিক পথে রাখতে পারলাম না, খারাপ লাগে বুঝেছিস! "
বিষণ্ণ হয়ে এলো নিতুর গলা। আমি ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম, "তুই এখনও কেন দেখছিস ওদের?"
নিতু জবাব দিলো না। একসময় দিতো। যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম। চোখ বড়বড় করে বলতো, "দেখবো না কী করে বল, ওরা আমার রক্ত না? "
পঁচিশের পরে সম্ভবত রক্ত সম্পর্কীয় টান পলকা হতে শুরু করে।
"শোন, আমার মনে হয়, তুই অনেক করেছিস সবার জন্য। এখন বিয়েশাদি করে একটু থিতু হ।"
নিতুর চোখে অব্যক্ত ধরণের একটা অভিমান দেখতে পেলাম। আমি ধীর গলায় বললাম, " তুই কি এখনও হাসনাতের সঙ্গেই?"
ও কিছু বলছে না দেখে আবার বললাম৷ "ও চাকরি পায় নি এখনও?"
নিতু জবাব দিতে পারলো না। আমার মেজাজটা কিছুটা খারাপ হয়ে গেলো। শক্ত গলায় বললাম, " ওর পরিবারের তো টাকা পয়সা আছে। বিয়ে করতে ঝামেলা কী?"
নিতু কৈফিয়ত দেয়ার মত করে মিনমিন করলো, " পরিবারের আছে, কিন্তু ওর তো নেই। বিয়ের কথাটা কিভাবে তুলবে বল। আর আমার যা অবস্থা, ও ভালো কিছু না করলে কি আমাকে মানবে ওর ফ্যামিলি!"
বিরক্তিতে কপালটা কুঁচকে গেলো আমার। গোপন না করেই বলে উঠলাম, "তোর কি অবস্থা মানে? তুই তো চিরকাল এমনই ছিলি। "
নিতুকে অপ্রস্তুত মনে হলো। আমি কড়া গলায় বললাম, "ও এখনও তোর কাছ থেকে টাকা পয়সা নেয়?"
"মাঝে মাঝে নেয়...", আমতা আমতা করলো ও। আমি এর মানে বুঝলাম। মাঝে মাঝে মানে প্রায়শই। ছেলেটা জুয়ারি। অনলাইনে জুয়া খেলে বেড়াতো আগে। পরিবারে পয়সার ছড়াছড়ি থাকলেও হাতে বিশেষ পয়সা দিতো না সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষ থেকেই। এর ওর কাছ থেকে ধার করে জুয়া খেলে বেড়াতো। ধারের টাকা মেটাতে আরও ধার করতো। সেসব ধার ধীরে ধীরে পরিশোধ করতো নিতু।
" শোন, তুই হাসনাতকে ছাড়। জুয়ারিরা জুয়া ছাড়ে না কখনও।"
"আমি ওকে ছাড়লে ওর আর কেউ থাকবে না।"
আমি মেজাজ খারাপ করে ঝাড়ি দিয়ে বললাম, " তোর সমস্যা কী?"
নিতু মিইয়ে গেলো। আমার হাতদুটো ধরে বলল, "ও চাকরি খুঁজছে। বলেছে, জুয়া ছেড়ে দিবে। আগের মত আর খেলেও না। অনেক কমে গেছে।"
"তুই ওকে ছাড়বি না তাহলে?"
আমার কণ্ঠ সূচালো হয়ে উঠলো বাড়াবাড়ি রকমের। নিতু সম্ভবত কষ্ট পেলো। হাতটা ছেড়ে দিয়ে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, " আমি পারবো না বীথী। এটা আমি পারবো না। "
আমি তীব্র গলায় বললাম, "কেন পারবি না? "
ও মাথা নিচু করে অস্পষ্টভাবে বলল, " আমার আর সময় নেই। আমাকে দেখ। আমাকে কে নেবে? কে পছন্দ করবে? কে বিয়ে করবে? "
আমার কান দুটো গরম হয়ে এলো। ও বিপন্ন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, " এমন কিছুই আমার কাছে আর নেই, যা আমি নতুন কাউকে দিতে পারবো। হাসনাত ছাড়া আমার কোনও গতি নেই রে দোস্ত!"
গলার কাছটা ভারী হয়ে এলো আমার। চোখ দুটোয় অসহায় বিষবাষ্প। মুখটাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলাম। নিতু আমার হাত দুটো ধরলো আবারও। মৃদু গলায় বলল, " মন খারাপ করিস না পাখি, আমি ভালো থাকবো। এইসব দিন ফুরিয়ে যাবে। হাসনাত একটা কিছু করলেই দাওয়াত দিবো তোদের। বড় কিছু করতে পারবো না হয়তো।"
শরীর ভেঙ্গে আমার কান্না পেলো। নিতু আমাকে এক হাতে নিজের দিকে টেনে নিলো। আমি নিজেকে সামলে নিতে বললাম, " আজকে উঠি। কাল অফিস আছে। আর দেরি হলে বাবা ঝামেলা করবে। তুই আসিস বাসায়। আসিস তো না!"
ও আমাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ম্লান হাসলো, বলল, " যাবো একদিন। সময় পাই না একদম। কোনও একটা ছুটির দিনে যাবো। আন্টিকে বলিস ধূন্দুল আর কই মাছের ঝোলটা করতে। আসবো একদিন।"
আমি ওকে আলিঙ্গন দিয়ে আলাদা হয়ে হয়ে বললাম, "আয় আগে। বাকি সব হয়ে যাবে।"
ও হেসে মাথা ঝাঁকালো।
এরপর বহুদিন ওর সঙ্গে আর দেখা হলো না। করোনা এলো। একুশ সালে আমি চলে এলাম ফিনল্যান্ড। ব্যস্ত জীবন। তার উপর, কাজ নেই হাতে। দেশের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে কমে গেলো। ফেসবুক চালানো কমলো সবচেয়ে বেশি কারণ এখানে পরিচিতজনেরা কেউ ফেসবুক ব্যবহার করে না। সবাই, ইন্সটা কিংবা স্ন্যাপ। আরেকটু কমবয়সীরা, ডিসকর্ড।
আরও বছর দুয়েক পরে দুই হাজার তেইশের জুনে আমি বাড়ি দেশে বেড়াতে গেলাম। সঙ্গে ক্ল্যারিস। সুন্দরী বান্ধবী। সাউথ এশিয়ান দেশগুলো ঘুরে বেড়াবার ইচ্ছে খুব ওর। গরীবি দেখার প্রতি আগ্রহ অস্বাভাবিক মাত্রার। ওকে নিয়ে উঠলাম আমাদের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে। বারান্দায় দাঁড়ালে লেক দেখা যায়। সুন্দর সিনারিও। নিচের তলায় থাকেন জামালপুর দুই আসনের এমপি। পরিবার সমেত। আমাদের ডেকে দাওয়াত দিলো দুবার। বিশাল অবস্থা। ভদ্রলোকের স্ত্রী রাঁধেন চমৎকার। আমাদের জন্য করেছেন বহুপদ। তার ভেতর একটি পদে আমার দৃষ্টি আটকে গেলো। বাইশ সালে মা মারা গেছেন। তারপরে আর কারও হাতে ধূন্দুল আর কই মাছ খেতে পাই নি।
মনটা অনেকটা খারাপ হয়ে গেল। মাকে আমি দেখতে আসতে পারি নি। কারণ কেউই আমাকে জানায় নি। বিয়ে না করে বিদেশ গমনে বাবা শুরু থেকেই রাগ ছিলেন। মা, হতাশ। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা এক প্রকার বন্ধ ছিলো। ফেসবুকেও ছিলাম না। হোয়াটসএপে দু চারটি কল করেছে কাজিনরা। কেউই পায় নি। কারণ, তখন আমি পাহাড়ে বেড়াতে গেছি। নেটওয়ার্কের অনেকটা বাইরে ছিলাম।
মাকে দেখতে এসেছিলো নিতু। বাবার কাছে শুনেছি পরে। মা অসুস্থ হবার পরেও বেশ কবার এসেছে। মা ওকে বিশেষ পছন্দ করতো না। তার শুচিবায়ু ছিলো। নিতুকে তার সবসময় ভীষণ অপরিচ্ছন্ন, অপরিষ্কার মনে হতো। দুঃসময়ে নিতুকে তার কেমন লেগেছে জানি না। ভালো লাগার কথা না। আমার মা এমন মহিলা ছিলেন না যিনি সহজে নিজের মতামত অল্পদিনের উপকারে পরিবর্তন করবে। অবশ্য শেষ দুই সপ্তাহ তার জ্ঞান ছিলো না। কভিড সার্ভাইভ করেছিলেন। কিন্তু শরীর নিতে পারে নি। ফুসফুসে পানি জমে বুকের এক্সরে সাদা হয়ে গেছিলো। বেঁচে থাকার কোনও সম্ভাবনাই ছিলো না। হাসপাতালগুলোতে তখন ভারী চাপ। নিতু একরকম নাওয়াখাওয়া ভুলে থেকেছে। ওর নিজেরও কভিড পজিটিভ এসেছিলো।
সেই নিতুর সঙ্গে আমার আর দেখা করা হয় নি। ইচ্ছে হয় নি। সময়ও পাই নি। বাবা সত্যি বলে, আমি বেশ স্বার্থপর!
২
খাওয়া শেষ করে উপরে ফেরার পথে ক্ল্যারিস চিন্তিত গলায় আমাকে বলল, "বীঠী, আর ইউ ওকে? ইউ সিম, আনইউজুয়াল! "
আমি হালকা চালে ইংরেজিতে বললাম, " একজনের কথা মনে পড়ছে। আমার একটা বন্ধু। অনেকদিন খোঁজ নেয়া হয় না। "
"খুব কাছের কেউ?", ক্ল্যারিসের বড়বড় চোখে নির্ভেজাল কৌতূহল।
আমি মাথা দোলালাম। বললাম, " না, তেমন কিছু না। খুব কাছের কেউ না। একসময় ছিলো।"
ক্ল্যারিস আমাকে আলতো করে ঝাঁকি দিয়ে বলল, "ওয়েল, ডোন্ট বি স্যাড, ইউ ক্যান অলয়েজ মিট দেম, ইউ নো? গুড ফ্রেন্ডস নেভার গিভ আপ অন দেয়ার ফ্রেন্ডস। "
আমি হাসলাম। নিজের পরিচয় পেয়ে আনমনে বললাম, "ওয়েল, দ্যান, আই গেস, আই এম নট আ গুড ওয়ান!"
ক্ল্যারিস যদিও শুনলো না কথাটা৷ আমি সন্ধ্যা কাটিয়ে দিলাম নিতুকে খুঁজে বের করতে। পুরাতন নাম্বারটি বন্ধ। ফেসবুকে পুরাতন বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করলাম। সকলেই আমার মতই ব্যস্ত। পরিবার, পরিজন আর জীবিকার বাইরে পিছিয়ে পড়া কারও খোঁজ রাখার সুযোগ নেই কারও৷
আমি নিরাশ হলাম না। হাসনাতের বাড়ি চিনতাম। পরের দিন সেখানে হাজির হলাম। শান্তিনগরে সারিসারি বাড়ির ভীড়ে ছোট্ট, ছিমছাম বাড়ি। কলিং বেল টিপতেই খুলল মিষ্টি চেহারার একটি মেয়ে। আমি বললাম, " হাসনাত করিম আছে কি?"
মেয়েটি অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইলো।
আমি আবারও বললাম, "হাসনাত করিম, এটা হাসনাতের বাসা না?"
ভেতর থেকে বৃদ্ধ মহিলার গলার স্বর শুনতে পেলাম। ভদ্রমহিলা দূর থেকেই বললেন, "রিদ্ধ, কে এসেছে?"
মেয়েটি আমার দিকে একবার তাকিয়ে গলা উচু করে বলল, "চিনি না, দাদী। হাসনাত মামাকে খুঁজছে।"
ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন। চেহারায় বনেদিভাব প্রবল। চোখে ভারী চশমা। আমাকে দেখে বললেন, "তুমি কে মা?"
আমি সালাম দিয়ে জানালাম, হাসনাতের বন্ধু। ভদ্রমহিলা আমাকে ভেতরে নিয়ে বসালেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে জানলাম, হাসনাত বিদেশ গেছে। অস্ট্রেলিয়া। চিরস্থায়ীভাবে। ভদ্রমহিলা বার দুই জানতে চাইলেন, আমার বিয়ে হয়েছে কী না। আমি এড়িয়ে যাওয়ায় হাল ছেড়ে দিলেন। জানালেন, ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছেন, পেলে যেন জানাই।
আমি সম্মতি দিয়ে বিদায় নিলাম। ভদ্রমহিলার কাছ থেকে আইডি নিলাম তার ছেলের। জানতাম, এমন কিছুই হবে। জানোয়ারটা কোনওদিনও নিতুকে বিয়ে করবে না। নিতুই বুঝলো না শুধু ব্যাপারটা!
হোয়াটস এপে মেসেজ দিয়ে রাখলাম। রাতের দিকে রিপ্লাই এলো। হাসনাত লিখেছে, নিতুর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছে আরও আগেই। এখন আর কিছু জানে না ও।
উপায়ন্তর না দেখে নিচতলার এম্পি চাচার সহায়তা নিলাম। ভদ্রলোক শুনে বললেন, এ আর এমন কী। ওয়ান-টুয়ের বিষয়।
সত্যিই দুদিনের মাথায় চাচা আমাকে ঠিকানা জোগাড় করে দিলেন। চাঁদপুরের একটি গ্রামে। ফোন নাম্বার শুদ্ধো দিলেন। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বাসায় ফিরে উত্তেজিত হয়ে কল দিয়ে ফোন কানে ঠেকিয়ে বসলাম। কয়েকবার রিং হতেই ওপাশ থেকে ভারী কণ্ঠে একজন সালাম দিলেন। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।
"হ্যালো, কাউরে খুঁজতেছেন?"
"জ্বী, এটা নিতুর নাম্বার না?", ইতস্তত করে বললাম।
"জ্বী। আপনি কে বলতেছেন?"
আমার মুখটা হাসি হাসি হয়ে গেলো। ক্ল্যারিসের মুখে ছড়িয়ে পড়লো আনন্দ। ও আমার পাশেই বসে বসে দেখছিলো ব্যাপারগুলো।
"আমি বীথী, নিতুর বান্ধবী। ওকে কি একটু দেয়া যাবে?"
"বান্ধবী? কেমন বান্ধবী?"
" ভার্সিটির ফ্রেন্ড। ও কী আছে?"
"দাঁড়ান। "
কয়েক মুহূর্তের বিরতি। আমার মুখ থেকে হাসি সরছেই না। ওপাশ থেকে পরিচিত মোটা কণ্ঠে ভেসে এলো, "হ্যালো..."
আমি বললাম, "নিতু, আমি বীথী। চিনেছিস আমাকে?"
ওপাশটা নীরব হয়ে গেলো। আমি আবার বললাম, " নিতু...হ্যালো...শুনতে পাচ্ছিস? "
নিতু নিঃশব্দে কাঁদছে, টের পেলাম আমি। আমার চোখ দুটোও ভারী হয়ে আসতে শুরু করলো। ক্ল্যারিস দেখলাম, ফোন বের করে ভিডিও করতে শুরু করেছে। ওর চোখ দুটোও ভিজে গেছে।
"তোর কোনও খোঁজ নেই, বিদেশ গিয়ে একেবারে ভুলে গেলি আমাদের! "
নিতু হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। আমার বুকের ভেতর উথাল-পাতাল হলো। উঠে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, " সরি রে। আমার ভুল হয়েছে...", বলতে বলতে কেঁদে ফেললাম। কাঁদতে কাঁদতেই বললাম, " তুই চাঁদপুরে কোথায় আছিস? আমি আসবো। আমার ফ্লাইট ছাব্বিশ তারিখ। তোর সঙ্গে দেখা করবো।"
নিতু ঠিকানা দিলো। বিস্তর কথা বলার সুযোগ পেলাম না। নিতু জানালো ওর ছেলের শরীর ভালো না। জ্বর দুদিন ধরে। যেতে হবে।
চমৎকৃত হয়েই ফোন রাখলাম। নিতু বিয়ে করেছে। অবাক হবার মত কোনও ব্যাপার নয়। তবু, ওর ছেলে আছে শুনে অবাক লাগলো। ক্ল্যারিস তখনও ভিডিও করছে। আমি ওর দিকে তাকাতেই ও উত্তেজিত গলায় বলল, "সো, হোয়েন আর ইউ লিভিং? "
আমি হেসে ফেললাম।
পরদিনই চাঁদপুরে হাজির হলাম। ফরিদগঞ্জের একটা চারতলা ভবন। তার দোতলায় নিতুর বাসা। বেল নেই। কড়া নাড়ার খানিক পরে নিতুই খুলল। কোলে, বছরে দেড়েকের শিশু। ছেলেটা আমাকে দেখে হা করে তাকিয়ে রইলো। আর আমি নিতুর দিকে। বিশেষ পরিবর্তন হয় নি ওর। কিন্তু, আগের চাইতে, কিছুটা সুখী মনে হচ্ছে।
ঘরে নিয়ে নিতু আমাকে এটা ওটা দেখালো। ছোট ফ্ল্যাট। অনেক কিছুই এলোমেলো। ঘর জুড়ে শিশুর গায়ের গন্ধে কিছুটা দমবন্ধও লাগলো। নিতু ব্যাপারটা জানে, আমাকে হেসে বলল, "তোর তো বাচ্চাকাচ্চা পছন্দ না। আমার ছেলেটালে একটু কোলে নে তো। ছবি তুলে রাখি।"
আমি হেসে ফেলে কোলে নিলাম। নিতু হাত মুছে ঘরে ঢুকে ফোন বের করে একটা ছবি তুলল। আমি বললাম, তুইও আয়। ও এলো, তোলা হলো সেল্ফি। ছবি পর্ব শেষ করে রান্না ঘরে গেলাম। দেখি, মুরগির মাংস মেরিনেটে দিয়েছে। ফালি ফালি পেয়াজ বাটির উপর। দা খাড়া করে রাখা। আমি ঝুঁকে বসে গেলাম সেখানে। নিতু হাহাকার করে উঠলো, বলল, "তুই ঘরে যা, আজকে কিছু করতে হবে না। আমাকে আপ্যায়ন করতে দে।"
ঠেলেঠুলে পাঠিয়ে দিলো। দুপুরের আগে আগে ওর স্বামী এলো। জানলাম, ভদ্রলোকের মুদি দোকান আছে। বয়স্ক লোক। পঞ্চাশের উপরে হবে। মাথায় টুপি। আমাকে দেখে বিশেষ প্রীত হয়েছে বলে মনে হলো না। কিছুটা বরং বিরক্তই মনে হলো। টুকটাক আলাপচারিতার পরে সে বিদায় নিয়ে দোকানে ফিরে গেলো। আমি নিতুর কাছে জানতে চাইলাম, "কিরে, জামাই কেমন?"
নিতু গা এলিয়ে বিছানায় বিশ্রাম করছিলো। হালকা গলায় বলল, "আলহামদুলিল্লাহ!"
"হাসনাতের থেকে ভালো?"
ও চোখ ছোটছোট করে আমার দিকে তাকালো। আমাকে একটা গুতো দিয়ে বলল, " অনেক ভালো। জুয়া টুয়া খেলে না। বয়সটা একটু বেশি। কিন্তু ভালো মানুষ।"
আমি মাথা দোলালাম। নানারকমের কথা হলো। জানলাম, ওর বিয়ের দুবছর হয়ে যাচ্ছে। ওর মামা সম্পর্কটা এনেছিলো। না করে নি আর। ও ভদ্রলোকের দ্বিতীয় স্ত্রী। আগের স্ত্রী মারা যাওয়ার বছর তিনেক পরে বিয়ে করেছেন। আগের ঘরের সন্তানেরা যে যার মত আছে। বাপের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে নি। এখন, এটাই তার সংসার।
কথা প্রসঙ্গে মায়ের কথা এলো। নিতু আমাকে বলল, " আন্টি একেবারে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পরে একেবারে শেষ দিনে কিছুটা জ্ঞানে ছিলেন। তখন উনি মাফ চাইলেন। বললেন, আমাকে সবসময় দূরের ভাবতেন। ভুল ভাবতেন।"
আমি ওর ছেলের মাথায় আঙ্গুল বুলাতে বুলাতে বললাম, " আমাকে নিয়ে কিছু বলে নি?"
নিতু আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। ওর হাসির অর্থটা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। আবার বললাম, "হাসছিস?"
ও আমার হাতটা ধরে বলল, "তোর প্রশ্ন শুনে হাসলাম। তুই একমাত্র মেয়ে তার। তোর কথাই উনি সবচেয়ে বেশি বলতেন। বলতেন, মেয়েটার উপর রাগ করে কথা বলি নি। এখন রোজ কথা বলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু, হয় না আর কী!"
আমি মাথাটা ঝুঁকিয়ে করে বসে রইলাম। নিতু আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, " আংকেলের বয়স হচ্ছে। তুই তার সঙ্গে কিছুদিন থাক। তারপর যেখানে যাওয়ার যাস।"
আমি জবাব দিলাম না। রাতের টিকিট কাটাই ছিলো। আশা করেছিলাম, ও অন্তত থাকতে বলবে। কিন্তু সেসব কথা তুললই না। কিছুটা অভিমান জন্মালো ভেতরে। আমাকে এগিয়ে দিতে ও যখন বোরকা গায়ে দিচ্ছে, তখন হালকা চালে বললাম, "বাহ!"
ও লাজুক হেসে বলল, " স্বামীর আদেশ! "
রাস্তার মাথায় নিয়ে এসে আমাকে বিদায় নেয়ার আগে ও দেখলাম কিছুটা উশখুশ করছে। বললাম, "কিছু বলবি?"
ও একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল, " তুই এতো কিছু এনেছিস, আমার তো কিছু নেই। তুই এটা রাখ। "
একটা খাম।
আমি নিতে নিতে বললাম, "এটা কী?"
ও লাজুক গলায় বলল, "তেমন কিছু না।এখন দেখিস না, তোর বার্থডে তে খুলিস। এটা তোর জন্মদিনের গিফট। "
আমি ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর এগিয়ে গিয়ে একপাশ থেকে আলতো করে আলিঙ্গণ করলাম। কোলের শিশুটির হালে ঝুঁকে একটা চুমু খেলাম। বললাম, "আসি রে!"
নিতু মাথা ঝাঁকালো। ওর চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত৷ মুখে যদিও হাসি। সেই হাসি উপচে পড়ে ওর ছেলের ঠোঁটে জমেছে৷ ওদের দেখতে চমৎকার লাগছে!
৩
বাসে যখন চড়ে বসেছি, তখন রাতের দুটো। খামটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা চেইন বের হয়ে এলো। রূপোর সঙ্গে একটি চিঠি। বাসের আলো নেভানো। আমি মোবাইলে একটা ছবি তুলে পড়তে শুরু করলাম।
" পাখি,
অনেক দিন তোর সঙ্গে কথা হয় না। তোর কথাই ঠিক হয়েছে, হাসনাত আমাকে বিয়ে করে নি। কিন্তু, যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, তার সঙ্গে আমি মন্দ নেই। বরং, বলা চলে, জীবনে এই প্রথম একটু বিশ্রাম করার সুযোগ পাচ্ছি।
তুই গতকাল কল দিলি। বাবু অসুস্থ ছিলো দেখে কথা বলতে পারি নি। তোর ভাইয়া একটু কনজারভেটিভ। আমার বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেলামেশা অত পছন্দ করে না। তার নিজেরও তেমন বন্ধু বান্ধব নেই। জীবনে অশান্তি আর চাই না। তাই কথা বাড়াই নি।
তোকে দেয়ার মত আমার কাছে কিছুই নেই। কিন্তু, এই রূপোর চেইনটা আমি তোর কথা ভেবে কিনেছিলাম দুই হাজার একুশ সালে। ভেবেছিলাম, তুই ফিরলে দিবো। কিন্তু তা আর হয়ে উঠে নি।
আমি তোর উপর রাগ নই। কিন্তু আমার তোকে নিয়ে চিন্তা হয়। আন্টি আমার কাছ থেকে মৃত্যু শয্যায় কথা নিয়েছেন যে আমি তোর বিপদে আপদে যেন সবসময় পাশে থাকি। কিন্তু তুই এতো দূরে থাকিস যে সেটি সম্ভব নয়। তবু, যোগাযোগ রাখিস। আমার কথা ভেবে হলেও মেসেজ করিস।
আর, বিয়ে কর। প্রেম করছিস কি না জানি না, কিন্তু করে থাকলে সেটেল কর। আমার বিয়েতে দাওয়াত দিতে পারি নি। কিন্তু তোরটায় যেন পাই। যদিও, আসতে পারবো কী না জানি না। তোর ভাইয়াকে রাজি করাতে হবে।
আংকেলকে আমার সালাম দিস।
আর, সব সময়, ভালো থাকিস।
অনেক দোয়া আর ভালোবাসা তোকে!
ইতি
তোর, নিতু পাখি"
রাতের বাতাসে শীত আসি আসি করছে, আমার চুল গুলো উড়ে মাঝেমধ্যেই মুখে চলে আসছে। তার মাঝেই ফোনটা ব্যাকপ্যাকে রেখে চোখ বন্ধ করতে করতে আমি বিড়বিড় করে বললাম,
তোকেও অনেক দোয়া আর ভালোবাসা, পাখি! সবসময় সুখে থাক! জগতের সমস্ত দুঃখরা তোর বাড়ির পথ ভুলে যাক!
ইতি,
তোর, বীথি পাখি
সমাপ্ত