Collected অবচেতন প্রতিশোধ

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
440
Messages
6,912
Reaction score
4,834
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
অবচেতন প্রতিশোধ

মূল লেখকঃ রাশেদুল হাসান






এগারো তলা বহুতল ভবনটির 'আর্ক কনসোর্টিয়াম'-এর প্রধান কার্যালয়। ছয় শতাধিক কর্মীর এই বিশাল কর্পোরেট সাম্রাজ্য যার ইশারায় চলে, তার নাম অনীশ মাহমুদ। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই মানুষটিকে অফিসের সবাই আড়ালে ‘আয়রন ম্যান’ বলে ডাকে। নাহ, মারভেল সিনেমার আয়রন ম্যান নয়। আসলে তার হাবভাবে কোনো আবেগ নেই। সবকিছু হিসেবী আর পেশাদারি দৃষ্টিতে মাপা হয় এই অফিসে। তার কেবিনে ঢোকার আগে সিনিয়র ম্যানেজাররাও অন্তত দুবার নিজেদের টাইয়ের নট চেক করে নেন। সকালে ক্লিনিং স্টাফরা কাজ শেষ করার পর তিনি বাকিদের আগে অফিসে পৌঁছে যান। বাকিরাও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চলে আসে, তবে তার আগে কেউ অফিসে পৌছায়না সাধারণত।

এই অফিসেই কয়েক মাস আগে ট্রেইনি হিসেবে যোগ দিয়েছিল রাইসা। চব্বিশ বছরের চটপটে, মেধাবী এক তরুণী। ইন্টার্নশিপে অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে ম্যানেজমেন্ট টিমের নজরে পড়ে যায় সে। নিয়ম অনুযায়ী, সেরা কয়েকজন ট্রেইনিকে বেছে নিয়ে স্পেশাল রিক্রুট হিসেবে সিনিয়রদের সাথে সরাসরি কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। রাইসাও সেই সুযোগ পেল। কিন্তু এই প্রমোশনটাই যে তার জন্য একটা দম আটকে দেয়ার মতো হয়ে দাঁড়াবে, তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। সিনিয়র ম্যানেজারদের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব দেয়া আছে। রাইসাকে তার টিমের সাথেই টিম মিটিং গুলোতে অংশগ্রহণ করতে হতো।

অনীশ মাহমুদ যেন শুরু থেকেই রাইসাকে পছন্দ করতে পারছিলেন না। মেয়েটির উপস্থিতিতেই তার কপালের রগ ফুলে উঠত। রাইসার প্রতিটি কাজে তিনি অকারণে খুঁত ধরতেন।

প্রথম ঘটনাটা ঘটেছিল একটা সাপ্লাই চেইন মিটিংয়ে। রাইসা সিনিয়রদের সাথে মিলে একটা চমৎকার প্রেজেন্টেশন তৈরি করেছিল। কিন্তু স্লাইড দেখানোর সময় একটা ডেটায় সামান্য টাইপিং মিস্টেক থাকায় অনীশ মাহমুদ সবার সামনে তাকে তীব্র ভাষায় অপমান করেন। "তোমার কে স্পেশাল টিমে কে রিক্রুট করেছে? একটা ডেটা চেক করার যোগ্যতা নেই, তুমি এসেছ কর্পোরেট ডিল সামলাতে!" রাইসা সেদিন মাথা নিচু করে অপমানটা হজম করেছিল। সে ভেবেছিল, হয়তো বস হিসেবে তিনি একটু কড়া। ডিপার্টমেন্টের বাকী সবাই অবাক, স্যারের এই চেহারা তো কখনো দেখেনি তারা। মানে কঠোর হলেও, ঝড়ঝাপটা সব সিনিয়রদের উপর দিয়েই যায়। জুনিয়র কারো সাথে তিনি কথা বলেননা আর নতুন রিক্রুটরা তো তার ধর্তব্যের মধ্যে আসেনা কখনো।

কিন্তু পরিস্থিতি দিন দিন মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে লাগল। ম্যানেজমেন্ট টিমের সিনিয়র জুনিয়র সবার কাজের ট্রেস থাকে ডকুমেন্টে। মানে ভুল করলেও কে করেছে ধরা পড়ে। রাইসার করা নিখুঁত কাজগুলোও অনীশ মাহমুদ ফাইল ছুড়ে ফেলে দিয়ে রিজেক্ট করে দিতেন। তার তিরস্কারের ভাষা এতটাই ব্যক্তিগত আর রূঢ় হতো যে, রাইসার আত্মসম্মানবোধ প্রতিদিন একটু একটু করে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল।

চূড়ান্ত ঘটনাটা ঘটল অ্যানুয়াল অডিটের আগে। রাইসাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একটা ফাইল রেডি করার। ফাইলটা সিনিয়র কেউ দেয়ার কথা ছিলো। রাইসা ফাইল নিয়ে অনীশের টেবিলে দেওয়ার পর তিনি হাতে নিয়ে বললেন , “ দাড়াও” তারপর ডেস্কের উপর মেলে ধরলেন। একনজর চোখ বুলিয়ে তাকালেন রাইসার দিকে, “তুমি আসলে কাজ শিখতে আসোনি, তুমি এসেছ সময় নষ্ট করতে। চেহারা দেখিয়ে এই অফিসে থাকা যাবেনা। সময় এবং অফিসের রিসোর্স দুটোই অনেক মূল্যবান। গেট আউট ফ্রম মাই অফিস!"

রাইসার কানের কাছে সবকিছু ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। অপমানে তার দুই গাল লাল হয়ে গেছে, লজ্জায় তার দুচোখে পানি চলে এসেছে। নীরবে নিজের ডেস্কে ফিরে গেল। ড্রয়ার থেকে নিজের দরকারি জিনিসপত্র ব্যাগে ভরল, একটা সাদা কাগজে এক লাইনের পদত্যাগপত্র লিখে এইচআর-এর ডেস্কে ফেলে দিয়ে সোজা লিফটের দিকে হাঁটা ধরল।

রাইসা চলে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে।

একদিন অফিস শেষে অনীশ মাহমুদ তার কেবিনে একা বসে আছেন। সামনে বেশ কয়েকটা ফাইল। ট্রেইনিদের ইন্টার্নশিপ শেষ, এবার তাদের পার্মানেন্ট জব অফার করার আগে এমডির ফাইনাল রিভিউ দরকার। এক্সেপটেড আর রিজেক্টেড ক্যান্ডিডেট দুটো ফোল্ডার ছিলো।

ফাইলগুলো উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটা ফাইলে এসে অনীশের হাত থেমে গেল। রাইসার ফাইল। কাগজের ঠিক ওপরে ক্লিপ দিয়ে আটকানো রাইসার একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি।

অনীশ ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। রাইসার হাসিমুখ। ঠোঁটের কোণের ওই সূক্ষ্ম বাঁক, চোখের ওই গভীর দৃষ্টি। হঠাৎ অনীশের বুকের ভেতরটা প্রবল এক ধাক্কায় যেন দুমড়েমুচড়ে গেল। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল। এত দিন রাইসাকে সামনে থেকে দেখে তার ভেতরে যে অযৌক্তিক রাগ আর ক্ষোভের জন্ম হতো, আজ এই স্থিরচিত্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন তার আসল কারণ।



এই মুখটা, এই চোখের চাহনিটা তার খুব চেনা। বড্ড বেশি চেনা। স্মৃতিগুলো তাকে টেনে নিয়ে গেল অনেকগুলো বছর পেছনে।

পরদিন সন্ধ্যায় মুষলধারে বৃষ্টি নামল ঢাকা শহরে।

রাইসা নিজের বাসার ড্রয়িংরুমে বসে কফি খাচ্ছিল। হঠাৎ বেজে উঠল। দরজা খুলতেই সে পাথরের মতো জমে গেল। দরজার ওপাশে বৃষ্টিতে ভেজা এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। অনীশ মাহমুদ!

রাইসার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল। কিন্তু অনীশের বিধ্বস্ত, ক্লান্ত চেহারা দেখে সে কিছু বলতে পারল না। নীরবে দরজা ছেড়ে দিয়ে ভেতরে আসার জায়গা করে দিল।

আধুনিক বিল্ডিং হলেও ভেতরটা ভিক্টরিয়ান স্টাইলে সাজানো। নকশাদার আসবাব, শোপিছ। সাজানো বসার ঘর। বাইরে বৃষ্টির ছাট দেয়ালজোড়া বিশাল জানালার কাচ বেয়ে নামছে। সোফায় বসে অনীশ মাহমুদ বেশ কিছুক্ষণ বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীর, কাঁপাকাঁপা গলায় কথা বলতে শুরু করলেন।

"আমি জানি, আমার এখানে আসাটা অনাকঙ্খিত। অফিসে তোমার সাথে আমি যা করেছি, তা আসলে কোনো ভদ্র আচরণ নয়। আমি ক্ষমা চাইতেও আসিনি। আমি কিছু কথা বলতে এসেছি। জানি আমার আচরণের জন্য আসলে কোনো কৈফিয়ত দেয়া সাজেনা।"

রাইসা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে সোফার অন্য প্রান্তে মূর্তি হয়ে বসে রইল।

তিনি এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখের মণি কাঁপছে, যেন চার দশক আগের কোনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন স্মৃতিকে তিনি টেনে বের করে আনছেন। "আমার বয়স তখন সাত। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। কাজে প্রায়ই বাইরে থাকতেন। মা... মা ছিলেন এক অদ্ভুত অস্থিরতার নাম। তিনি প্রায়ই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশ দেখতেন, যেন কোনো এক অচেনা দিগন্ত তাকে ডাকছে। সেই দুপুরেও মা ঠিক তেমনভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি স্কুল থেকে ফিরে দেখলাম, বাড়িটা অদ্ভুত রকমের শান্ত। কোনো রান্না নেই, কোনো শব্দ নেই। আমি গিয়ে মায়ের শাড়ির আঁচল ধরেছিলাম, বলেছিলাম—'মা, খুব খিদে পেয়েছে।' মা আমার দিকে তাকালেন, চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। নিজের একটা ছোট্ট ঘর ছিলো আমার। ঘরে ফিরে বিছানায় শুয়ে খাবার খেতে ডাকার অপেক্ষায় থেকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম "

অনীশ থামলেন। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, কিন্তু তিনি থেমে নেই। " সন্ধায় ঘুম ভাঙলে আমি একা দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই বাড়ির হলওয়েতে। রাত নামল, পাশের বাড়ির মানুষজন এল, বাবা ফিরলেন। আমি জানতাম না যে, সেই রাতেই আমার শৈশবের মৃত্যু হয়েছে। পরের দিনগুলোতে আমি যখন স্কুলে যেতাম, তখন ক্লাসের অন্য ছেলেমেয়েদের তাদের মায়ের হাত ধরে আসতে দেখতাম। তাদের টিফিন বক্সের গন্ধটা ছিল এক অদ্ভুত মায়ার মতো। আমি এক কোণে লুকিয়ে সেই গন্ধ শুকতাম, আর মনে মনে ভাবতাম—আমার মা কি ঠিক এভাবেই অন্য কারো সন্তানকে আদর করছে? সেই না-পাওয়া ক্ষিদেটা শুধু পেটে ছিল না, ছিল আমার সমস্ত চেতনা জুড়ে।"

অনীশ মাহমুদ রাইসার চোখের দিকে তাকাতে পারছেন না। তিনি নিজের আঙুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুমি যখন আমার অফিসে যোগ দিলে, প্রথম দিন তুমি যখন আমার কেবিনে হাসিমুখে ঢুকলে, আমি জানি না কেন, আমার ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। তোমার ওই হাসিটা, তোমার কথা বলার ধরন—সবকিছুতে আমি আমার মায়ের সেই ফেলে যাওয়া ছায়া খুঁজে পাচ্ছিলাম। আমি তোমাকে শাসন করিনি রাইসা, আমি শাসন করছিলাম আমার অতীতকে। আমি তোমাকে যন্ত্রণা দিয়ে আসলে আমার মাকেই শাস্তি দিচ্ছিলাম—যিনি আমাকে চার দশক আগে একা ফেলে গিয়েছিলেন।"

ঘরজুড়ে তখন বৃষ্টির ঝাপটা বাড়ছে। অনীশের প্রতিটি শব্দ যেন বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে গিয়ে এক করুণ সুর তৈরি করছে। "আমি সেই সাত বছরের পরিত্যক্ত বালকটি আজও বেঁচে আছি। কর্পোরেট জগতের এই দাপট, এই বিশাল সিংহাসন—এসবই কেবল আমার সেই হাহাকারকে ঢেকে রাখার দেওয়াল। কিন্তু রাইসা, তোমাকে অপমান করার পর যখন তুমি বেরিয়ে গেলে, আমি দেখলাম আমার জীবনের সব অর্জন কত নগণ্য। আমি আসলে আজও সেই সাত বছরের ছেলেটি, যে প্রতিদিন স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকে তার মায়ের অপেক্ষায়।"

অনীশ একটু থামলেন। তার চোখ দুটো ছলছল করছে। " ভার্সিটিতে পড়ার সময় আমার এক ক্লাসমেটের সাথে আমার পরিচয় হয়। সে পাগলের মতো ভালোবেসতো আমাকে। পরিবারের অমতে গিয়ে আমাকে বিয়ে করেছিলো। কিন্তু সেই বিয়ে টিকেছিল মাত্র ছয় মাস। একদিন বাসায় ফিরে দেখি... সে নেই। আমাকে কোনো কারণ না জানিয়ে, কোনো যোগাযোগ না করে সে একেবারে চুপচাপ আমার জীবন থেকে উধাও হয়ে গেল। আমি তন্নতন্ন করে তাকে খুঁজেছি, কিন্তু সে নিজেকে এমনভাবে লুকিয়ে ফেলেছিল যে আমি আর কোনোদিন তার খোঁজ পাইনি।"

রাইসা স্থির হয়ে শুনছে। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো সহানুভূতি নেই, কেবল এক অদ্ভুত নীরবতা।

বাতাসের ঝাপটায় একটা পাল্লা খুলে এলো কিছুটা। "জানলাগুলো বন্ধ করে দাও রাইসা, বৃষ্টির ছাঁট আসছে," অনীশ হঠাৎ অসংলগ্নভাবে বলে উঠলেন। তারপর একটা ম্লান হাসি দিয়ে বললেন, "আমার স্ত্রীর সাথে আমার অনেক মিল থাকলেও একটা অমিল ছিল। আমি বৃষ্টি ভালোবাসতাম। বৃষ্টিতে ভিজতে আমার খুব ভালো লাগত। কিন্তু সে বৃষ্টি একদম সহ্য করতে পারত না। বৃষ্টি নিয়ে তার অদ্ভুত সব ধারণা ছিল। তার ধারণা ছিল, বৃষ্টির পানিতে ভিজলে তার শরীরের ভেতর কোনো একটা পুরোনো অসুখ জেগে উঠবে। এক ফোঁটা বৃষ্টি গায়ে লাগলেই সে মারাত্মক জ্বরে পড়ত। তাই বৃষ্টি এলেই সে জানালা-দরজা সব বন্ধ করে দিত। চলে যাবার আগে তাকে নিয়ে টেনে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম "

অনীশ রাইসার চোখের দিকে তাকালেন। "অফিসে প্রথম যেদিন তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়ালে, আমার মনে হয়েছিল আমি যেন আমার অতীতকে দেখছি। তোমার মুখের আদলে, তোমার চোখের ওই চাহনিতে আমি সেই দুজন নারীকে দেখতে পাচ্ছিলাম, যারা আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তে একা ফেলে চলে গিয়েছিল। আমি তোমাকে অপমান করে, কষ্ট দিয়ে আসলে আমার সেই জমানো ক্ষোভের প্রতিশোধ নিচ্ছিলাম। আমি বুঝতে পারিনি যে, আমি আসলে একজন নিরপরাধ মানুষের ওপর আমার জীবনের সবটুকু আক্রোশ ঢেলে দিচ্ছি।"

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা কচি গলার আওয়াজ ভেসে এল। "মা!"

রাইসার তিন বছরের ছোট্ট ছেলেটা ঘুমের ঘোরে চোখ মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল। বাচ্চাটিকে দেখে অনীশ মাহমুদ কথা থামিয়ে দিলেন। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল। তিনি রাইসার দিকে একবার তাকালেন, তারপর আর এক মুহূর্তও সেখানে বসলেন না। খুব ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন।

দরজার দিকে এগোতে এগোতে অনীশ না ঘুরেই বললেন, "অফিসে তোমার ফাইলটা আমি পার্মানেন্ট করে দিয়েছি রাইসা। তুমি চাইলে কাল থেকে জয়েন করতে পারো। তোমার যোগ্যতার জায়গাটা আমি নষ্ট হতে দেব না।"

অনীশ মাহমুদ বেরিয়ে গেলেন। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

রাইসা ছেলেটাকে কোলে তুলে নিয়ে ড্রয়িংরুমের লাইটটা নিভিয়ে দিল। অনীশের কোনো কথায় তার ভেতর কোনো ভাবান্তর হয়নি। সে এই চাকরিতে আর কোনোদিন ফিরে যাবে না, সেটা সে আগেই ঠিক করে রেখেছে।

সে ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর জন্য নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। সিড়ি বেয়ে উঠে হঠাৎ তার চোখ গেল দোতলার খোলা বারান্দার দিকে।

বাইরে তখনো কালবৈশাখীর মতো তুমুল বৃষ্টি। বাতাসের ঝাপটায় বারান্দার গ্রিল কাঁপছে। রাইসা অবাক হয়ে দেখল, তার মা সেই খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন।

মায়ের পরনের সুতির শাড়িটা বৃষ্টির পানিতে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। তার মা, যে মানুষটা সারাজীবন বৃষ্টিকে যমের মতো ভয় পেয়েছে। রাইসা জ্ঞান হওয়া থেকে দেখে আসছে, এক ফোঁটা বৃষ্টি গায়ে লাগলেই মায়ের মারাত্মক জ্বর আসে। আকাশ কালো করলেই মা সারা বাড়ির জানালা-দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতর গুটিসুটি মেরে বসে থাকতেন। শুধু তা-ই নয়, বৃষ্টির দিনে মা যেন কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে যেতেন, যেন কোনো অদৃশ্য বিভীষিকা তাকে তাড়া করে ফিরছে। রাইসা কখনো মাকে বৃষ্টিতে ভিজতে তো দূরের কথা, বৃষ্টির সময় বারান্দায় এসে দাঁড়াতেও দেখেনি। তার মা যেন বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটাকে তার নিজের ধ্বংসের কারণ বলে মনে করতেন।

অথচ আজ, এই কনকনে ঠান্ডা বৃষ্টির ভেতর মা গ্রিল ধরে সম্পূর্ণ একা দাঁড়িয়ে আছেন। তার দৃষ্টি নিচে, পিচঢালা রাস্তার দিকে, যেদিক দিয়ে একটু আগে অনীশ মাহমুদের কালো গাড়িটা বেরিয়ে গেছে।

রাইসা বারান্দার দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো পাথর হয়ে যাওয়া এক জেদ ফুটে আছে চেহারায় , আর এক সীমাহীন, অবদমিত হাহাকার। বৃষ্টিতে ভিজছেন মা, অথচ তার চোখের দৃষ্টি এমন যেন তিনি এই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটাকে তার শরীরে অনুভব করছেন। তার এই ভিজে যাওয়াটা যেন এক দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত শাস্তি গ্রহণ।

রাইসা চুপ করে ছেলেকে জড়িয়ে শোবার ঘরের দিকে ফিরে চললো। অনীশ মাহমুদের ফেলে যাওয়া গল্পের টুকরোগুলো তার মাথার ভেতর একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে শুরু করেছে।
 
Back
Top