- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 445
- Messages
- 7,082
- Reaction score
- 5,081
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
তুলি নামক এক কিশোরীর গল্প
(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)
(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)
এটি তুলি নামক এক কিশোরীর গল্প। গল্পটি কাল্পনিক হতে পারে। তবে, অসংখ্য বাস্তব তুলিদের আত্মকথা।
কিরে প্রতিদিন সকালে উঠেই বাহানা ধরিস কেন?
" খালি মাথা ব্যাথা, মাথা ব্যাথা" । সারা দিন তো কিছু বুঝি না। কলেজ না যাওয়ার বুদ্ধি। ঘুম থেকে উঠেই মাথা ব্যাথা। চোখে ঝাপসা দেখা, আরো কত রকম নাটক।
এত খাইলে তো মাথা ব্যাথা করবেই। খায় আর মোটা হয়। যা রেডি হয়ে কলেজ যা।
তুলির মা প্রায় প্রতিদিন কথা শুনায়।
তুলি কিছুতেই তার বাবা মা কে বোঝাতে পারে না, তার সকালে ঘুম থেকে উঠার পর প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করে। মাঝে মাঝে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ইদানীং তার বারবার প্রস্রাবের চাপ আসে৷
অথচ, তুলি চায় কম করে খেতে। কিন্তু, তারপরেও যেনো পারে না। সে কি করবে বুঝে উঠতে পারে না।
রাতে, বাবা ঘরে আসে।
মা-রে, একটু হাটাহাটি করিস। ওজন টা অনেক বেড়ে যাচ্ছে। সবাই কি কি বলা বলি করে। শুনতে ভালো লাগে না মা। বড় হচ্ছিস। কিছু বিষয় তো তোকেই বুঝতে হবে।
বাবা, আমি তো তোমার ই মেয়ে। চাইলে তুমি আমাকে মেরে ফেলো বাবা। আমার তোমার প্রতি কোনও অভিযোগ নাই। আমি আর শরীর নিয়ে খোটা সহ্য করতে পারি না বাবা। কালকে পাশের বাসার রিতা আন্টি এসে অনেক খারাপ কথা বলছে বাবা। মা কিছু বলে নাই। আমি নাকি বেলী-র ( তুলির ছোট বোন) খাবার সহ খেয়ে ফেলি। তাই বেলী শুকায় আর আমি আরো মোটা হই। বাসায় যেই আসে, কেও জিজ্ঞেস করে না বাবা, আমি কেমন আছি। প্রথম দেখাতেই বলে, কি ব্যাপার তুলি। তুমি এত মোটা হইছো ক্যান। সাথে থাকে তাচ্ছিল্য - অবজ্ঞার ইঙ্গিত।
কথা গুলো, বলেই, তুলি দরজা বন্ধ করে দেয়। একা একা শুধু কাঁদে। সে মোটা হতে চায় না। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও যেনো একটু বেশী ক্ষুধা লাগে।
সে মনে মনে ভাবতে থাকে, আমি কি তাহলে অপরাধী দের চেয়েও খারাপ কেও? কারণ আমি মোটা। আমার গায়ে স্বাভাবিক জামা আটে না।
গতকাল, বড় চাচী এসে কথা শুনায় গেছে। এরকম মোটা মেয়ে কে, কে বিয়ে করবে। কেও তো দেখতেও আসবে না। এই কথা শুনে তুলির র মায়ের চোখে পানি চলে এসেছিল। তুলির চোখ তা এড়ায় নি।
দিন দিন তুলি নিজেকে অপরাধী ও বোঝা ভাবতে শুরু করে।
তুলির মামীর সাথে তার সখ্যতা ভালো। সে তার মামীকে বললো, আমাকে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবা। যদি কোনও মেডিসিন দিয়ে ওজন টা কমানো যায়। তুলির মামী নিজেও খুব একটা শিক্ষিত না। সে তার সাধ্যের মধ্যে যা পারলো করলো। উপজেলায় একজন আছে। তাকে সবাই ডাক্তার বলে, তবে, "প্রশিক্ষিত MBBS ডাক্তার নয়" । আর একটা ঔষধের দোকান ও আছে তার। সেখানে, তার কাছে নিয়ে যাবার পথেই হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলো। ধরাধরি করে নিয়ে গেলো সেই পল্লী চিকিৎসক এর কাছে৷ সে তার দোকান থেকে কিছু মেডিসিন দিলো। কিন্তু, সে তারপরেও বলে দিছিলো। পারলে যেনো একটু শহরে নিয়ে বড় ডাক্তার দেখায়।
কিন্তু, কে নিয়ে যাবে। মধ্যবিত্ত ঘরের এক নিদারুন সাধারণ চিত্র। যখন অনেক দেরী হয়ে যাবে তখন MBBS ডাক্তারের কথা মনে পড়ে। টাকা খরচা করে পরীক্ষা করায়।
বাসায় তুলির বড় বোন আসছে। সে এসে বলে গেছে শোন, ২ মাস পড়ে বিদেশ থেকে আমার পরিচিত এক ছেলে তোকে দেখতে আসবে। তাড়াতাড়ি ওজন কমা। একটু কমায়া খা। আয়নায় নিজের চেহারা টা একবার দেখ। একটা মেয়ে মানুষ এত মোটা হইলে চলে না এত অল্প বয়সে। বিয়ে শাদী দেয়া লাগবো না তোরে? যে অবস্থা, এই অবস্থায় কাপড় ও খুজে পাই কিনা।
আপু, একটা কথা বলি? আমি কি তোমার সৎ বোন?
তুলি ভাল ছাত্রী ছিলো। কিন্তু, দিন দিন তার পড়াশুনা কমে গেছে। মাথা ব্যাথা, চোখে ঝাপসা দেখা এসব কারণে আর আগের মত পড়তে পারে না।
শেষ পর্যন্ত তার বাবা র দয়া হয়। সে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। ওখানে ডাক্তার রা বেশ কিছু রক্ত পরীক্ষা দেয়। বিশেষ করে হরমোন পরীক্ষা গুলো জেলা শহর থেকে করাতে বলে। তারা কিছু একটা সন্দেহ করে। কিন্তু, টাকা পয়সার অজুহাতে আর হরমোন সহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট আর করানো হলো না।
তুলি ভাবে কার কাছে যাবে সে। এই নিম্নমধ্যবিত্ত সংসারে ১০০ টাকার মূল্য তুলির মত মোটা মেয়ের চাইতে অনেক বেশী।। রিক্সা ডাকে। রিক্সাওয়ালা মামাও তাকে ব্যাঙ্গ করে বলে, মামা, আপনি তো দুইজনের ওজন। ভাড়া দশ টাকা বাড়ায় দিয়েন। তুলি শুধু তাকিয়ে ছিলো। তার পর হেটে হেটে কলেজ গেলো।
সে তার কলেজের এক বায়োলজি ম্যাডাম কে অনুরোধ করে একটু কথা বলার জন্য। সে সব খুলে বলে । ম্যাডাম সব শুনে খুব অবাক হয়। সে বলে আমি তোমাদের বাসায় যাবো একদিন। তুমি চিন্তা করো না। তুমি এখন যাও। এই কথা বলতে বলতেই তুলি হঠাৎ রুম থেকে বেরিয়ে মাঠে গিয়ে বমি করে দেয়। ম্যাডাম ভয় পেয়ে যায়। কিছুক্ষণ মাথায় পানি দিয়ে বাসায় নিয়ে যায় নিজেই।
বাসায় গিয়ে দেখে, তুলির দুই দু:সম্পর্কের আত্মীয় আসছে। একজন তার খালা সম্পর্কে । আরেক জন কে দাদী ডাকে।
সব শুনে দাদী বিচারের রায় দিয়ে দিলো।
দেখো গিয়া, কোথায় কি আকাম করছে। আজকাল কার মাইয়া। নাইলে এই বয়সে বমি, মাথা ঘুরায় আর চোখ ঝাপসা হইবো কে। এটা শুনে তার দু:সম্পর্কের খালা আরো ভয়ংকর কথা বলে বসে।
কি যে কন, যে শরীর। এই শরীর নিয়ে.... উহু।
তুলির তখন বেচে থাকার ইচ্ছা টুকুও আর বাকি নাই।
কিন্তু, একজন প্রতিবাদ করেছিলো।
সেই বায়োলজী ম্যাডাম। তিনি যতটা সম্ভব বললেন, আপনাদের মেয়ে, নাতনী। এই কথা গুলো বলতে গলা কাপলো না। মেয়ে টার তো কোনও অসুখ হতে পারে। এটা একবারো ভাবতে পারেন না। ছি।
এই কথা শেষ হবার আগেই তুলির খিচুনী শুরু হয়। হয়তো, এটাই ছিলো একটা কিশোরীর জীবনের শেষের শুরু।
এবার টনক নড়ে মায়ের। বাবার। ভাই এর। বোনের।
এবার তারা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু, দেরী হয়ে গেলো কি?
এক সপ্তাহ থাকার পর তার রোগ ধরা পড়লো
" ব্রেইন টিউমার"।
তুলির শরীর খারাপ থেকে খারাপ হয়েছে। কিন্তু, আজ এই খবর টা শুনার পর কেনো যেনো হাসছিলো।
ম্যাডাম বলে, তুলি। কি হয়েছে তোমার। হঠাৎ, হাসছো?
তুলির উত্তর টা বড্ড কঠিন ছিলো,
" ম্যাডাম, আজ থেকে আমি মুক্ত। আমাকে কেও মোটা বললে আমি বলতে পারবো, আমি ইচ্ছা করে খেয়ে খেয়ে মোটা হইনি। আমার ব্রেইন টিউমারের জন্য আমি মোটা হইছি"
সে ম্যাডাম কে বলে, ম্যাডাম, আমার মা - বাবা কি আমাকে এবার একটু আদর করবে? আমাকে কেও অনেক দিন কাছে ডেকে আদর করে না।
আসলে, তুলির শরীর টা সমাজের চোখে কদাকার ছিলো, কিন্তু তার হৃদয় টা নিষ্পাপ। সবাই শরীর টাই দেখেছে, কষ্ট টা দেখেনি। সেজন্যেই হয়তো তুলির চোখের পানি শুকিয়ে হৃদয়ে জমেছে অশ্রু। মুখে তার মলিন হাসি।
ম্যাডাম আর এবার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না। বায়োলজী ম্যাডাম, তুলির বাবা - মা কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
আপনারা তার উত্তর টা দিয়েন। আমি পারলাম না।
প্রফেসর আসলেন, আর একটা একটা কারন ভেঙে বলতে লাগলেন। তুলির বাবা - মা - বড় বোন সবাই ছিলো।
বাবা : ডাক্তার। আমার মেয়েটার কি হয়ে গেলো। হঠাৎ করে?
ডাক্তার : হঠাৎ বলছেন? সে তো আপনাদের অনেক দিন ধরে বলছিলো তার মাথা ব্যাথা করে। তার ওজন বেড়ে গিয়েছে। সে তো জন্ম থেকেই মোটা হয়ে আসে নি। কিছুদিন হলো ওজন বেড়েছে।
আপনার মেয়ের ব্রেইন টিউমারের নাম " Craniopharyngioma ". এটা আপনাদের বুঝা কঠিন। জাস্ট শুনানোর জন্য, যে কষ্ট তুলি পেয়েছে, এটা এই টিউমারের প্রাপ্য , তুলির না। যদিও এটা আরো ছোট বয়স কিংবা আরো বড় বয়সে বেশী হয়, তবে, যে কোনও বয়সে হতেই পারে।
মা - আমরা তো ভাবছি সারা দিন ঘরে মন মরা হয়ে থাকে। বেশী বেশী খায়। হাটে না।তাই মোটা হইছে।
ডাক্তার : হ্যা। সে রোগের লক্ষণ গুলো প্রকাশ করেছিলো। আপনারা আরেকটু গুরুত্ব দিতে পারতেন। এই টিউমার যখন তার পাশের আরেকটি অংশ " Hypothalamus / pituitary " তে চাপ দেয়। তখন রোগীর খাবার গ্রহণ অত্যধিক বেড়ে যেতে পারে। যা তাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে। তাই সে বেশী খেতো৷ আর ওজন বেড়ে যাচ্ছিলো। এটাকে আমরা অনেক সময় "Hypothalamic Obesity " বলি।
হতাশা বা Depression চলে আসে। তাই একা একা মন মরা হয়ে ঘরে থাকতো।
বোন - আর বমি, চোখে ঝাপসা এগুলোও টিউমারের জন্য? আমি তো ভাবছি মেয়ে মানুষ। মোটা শরীর। আয়রনের ঘাটতি। তেমন কিছু না।
ডাক্তার - টিউমার যত বড় হতে থাকে তত আশে পাশের জিনিস গুলোকে চাপ দেয়। তেমনি চোখের নার্ভ কে চাপ দিতো। তাই, দৃষ্টি ঝাপসা হতো। ব্রেইন এ চাপ তৈরী হতো। তাই বমি ও হয়েছে। আর এই চাপের ব্যাথা অনেক ক্ষণ শুয়ে থাকার পর আরো বাড়ে বলেই সকালে ঘুম থেকে উঠার পর সবচেয়ে বেশী লাগে।
মা - তাহলে সে যে সকালে উঠেই খালি বলতো মাথা ব্যাথা, এটা কলেজ ফাকি দেয়ার জন্য না? আমার ভাই আছে একজন, সে বলছিলো, মাইগ্রেন হইতে পারে।
ডাক্তার - মাইগ্রেইন এর ব্যাথা শুনেও তো একবার ভালো ডাক্তার দেখাতে পারতেন। আপনার ভাই কি ডাক্তার?
মা : না। বাজারে ঔষধের দোকান আছে।
সবাই একসাথে তুলির বিছানার পাশে যায়। সে ডাক্তার কে একটা প্রশ্ন করে আর একটা অনুরোধ করে।
প্রশ্ন : ডাক্তার, আমি না হয় মোটা ছিলাম। আমার ওজন বেশী ছিলো। তাই বলে এই সমাজ আমাকে কথা দিয়ে ছিড়ে খেতে পারে?
আমি তো কোনও অন্যায় করিনি। কারো ক্ষতি করিনি। তাও আমার মা - বাবা - আপন বোন আমাকে এতটা ঘৃণার চোখে দেখতে পারে?
অনুরোধ : ডাক্তার, দয়া করে আমাকে মেডিসিন দিয়ে ভালো করার চেষ্টা করবেন না, প্লিজ।
তুলির শরীরের শক্তি একদম কম। এখন তার খাওয়া দাওয়া করার শক্তি ও নি:শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে তার মা কে শুধু একটি কথা বলে,
" মা, আমি ইচ্ছা করে মোটা হইনি মা। আমি বেলীর খাবার খেয়ে ফেলিনি মা। আমার বিয়ে নিয়ে তোমাদের আর ভাবতে হবে না।
শুধু আমি মারা গেলে বাবা কে বলো, "শেষ বারের মত আমার মোটা শরীর টা কে মাটিতে ফেলে দিয়ে আসতে। "
আমি আল্লাহ র কাছে গিয়ে কারো নামে বিচার দিবো না।
বিদায় মা...
এরকম শত শত তুলি রা শুধু মানুষের কথায় রক্তাক্ত হচ্ছে প্রতিদিন। বাস্তব জীবন কিংবা ভারচুয়াল কোথাও তাদের বুলিং থেকে মুক্তি নেই। সবার হয়তো তুলির মত ব্রেইন টিউমার নেই, কিন্তু আরো অনেক অসুখ আছে যাতে মানুষের ওজন বাড়ে। মোটা হতে পারে। আর তাও যদি না থাকে আপনি কি একজনের শরীর নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন?
একে বলা হয়, " বডি শেমিং " ( BODY SHAMING)
অর্থাৎ, কারো শরীরের গঠন, গায়ের রঙ, উচ্চতা, ওজন তথা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাসাহাসি, ঠাট্টা - বিদ্রুপ, সমালোচনা বা অপমান করা। এটি কথা বলার মাধ্যমে, ইঙ্গিত এর মাধ্যমে কিংবা লিখেও হতে পারে।
এটি অত্যন্ত বাজে একটি সামাজিক অপরাধ। কাউকে Body shaming করলে কতটা আঘাত লাগতে পারে, তার জায়গায় নিজেকে না দাড় করালে কখনও বুঝতেই পারবেন না।
আপনাকে আল্লাহ একটা সুন্দর রঙ আর গঠন এর শরীর দিয়েছে । আপনি সৌভাগ্যবান ভাবতেই পারেন নিজেকে। এবার আপনার কি উচিত নয় আপনার চোখের দৃষ্টি, মনের চিন্তা ও মুখের ভাষা কেও সুন্দর করা। যেনো, সৃষ্টিকর্তার অন্য সৃষ্টি গুলোকেও আপনি সুন্দর ভাবে ভাবতে পারেন।
আসুন, Body Shaming কে " না " বলি।কাউকে কথা দিয়ে রক্তাক্ত না করি।