- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 447
- Messages
- 7,164
- Reaction score
- 5,318
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
রক্ত
মূল লেখকঃ সুবর্না শারমিন নিশী
মূল লেখকঃ সুবর্না শারমিন নিশী
আমি একই সাথে বিস্মিত এবং হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম আমার বাবা আর তার পাশে দাঁড়ানো লাল সালোয়ার কামিজে মোড়ানো মেয়েটির দিকে। অথচ মাত্র পাঁচ মিনিট আগেও এই ধরনের কোন চিন্তা মাথাতেও ছিল না।
কলিং বেলের শব্দে আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। দুপুর আড়াইটার সময় মানুষ অন্য কারো বাসায় আসে? বাইরে প্রচণ্ড গরম, ঘরের ভেতর ফ্যান ঘুরছে নিজের মতো করে, আমি বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপে গেম খেলছিলাম। ঠিক তখনই, টিং টং।
একটু বিরক্ত হলাম। রান্নাঘর থেকে মায়ের গলার শব্দ আসবে, সেটা আমি আগেই জানতাম।
-শ্রাবণ, দরজাটা খোল তো। দেখ কে এসেছে?
আমি গেমটা বন্ধ করে উঠে বসলাম। মায়ের আরেকবার চিৎকার করার আগেই দরজা খুলে দেওয়াই ভালো। কারণ মা একবার ডাক দিলে দ্বিতীয়বার ডাকার আগে অন্তত পাঁচটা অভিযোগ করে ফেলেন।
"এই ছেলে সারাদিন ঘরে বসে থাকে, দরজা খুলতেও এত সময় লাগে..."
এই কথাগুলো শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগে না।
আমি ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোলাম।
এর মধ্যেই আবার বেল বাজল।
টিং টং।
আমি মনে মনে বললাম, "মানুষটার কি ধৈর্য বলে কিছু নেই?"
দরজা খুলে আমি কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারলাম না।
বাবা! কিন্তু তিনি তো অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে ছিলেন। কাল ফেরার কথা।
মানুষের মস্তিষ্ক এক সেকেন্ডে অনেকগুলো কথা ভেবে ফেলতে পারে। ঠিক সেই ভাবেই আমি ভেবে নিলাম বাবার কাজ হয় তো শেষ তাই ফিরে এসেছেন। কিন্তু তবুও আমি অবাক হয়েছি। কারণ বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে, সাধারণ লাল রংয়ের সালোয়ার কামিজ পরনে। মাথায় ওড়না। আফসানা! আমি ওকে খুব ভালো করে চিনি। আমরা ভার্সিটিতে একই ইয়ারে একই ডিপার্টমেন্টে পড়াশোনা করি। ঠিক বন্ধু না তবে খানিকটা সখ্যতা আছে ব্যাচমেট হিসেবে। আমরা মাঝেমধ্যে সবাই একসাথে ক্যান্টিনে বসে নাস্তা করি, চা খাই আবার নোটস আদান-প্রদান করি। কিন্তু আফসানা এভাবে বাবার সাথে এখানে কেন? মাথার মধ্যে অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরঘুর করছে। অপ্রস্তুত হয়ে দরজায় আগলে দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাবা গলা পরিষ্কার করে বলল,
-ভেতরে আসতে দিবি না নাকি?
আমি যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরলাম।
-আ... আসো।
আমার নিজের গলার শব্দও আমার কাছে অপরিচিত লাগছিল।
আফসানা একবার আমার দিকে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি। এই মুহূর্তটা যে আমাদের দুজনের জন্য ভীষণ রকম অস্বাভাবিক তা বলাটা বাহুল্য।
বাবা ঘরে ঢুকল। আফসানাও ধীরে ধীরে তার পেছনে ঢুকল।
আমি দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
মাথার ভেতর শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরছিল,
আফসানা এখানে কেন?
আর বাবার সঙ্গে কেন?
রান্নাঘর থেকে মা বেরিয়ে এলেন। হাতে এখনো রান্নার গন্ধ লেগে আছে। গা ঘামে ভিজে আছে।
-কে এসেছে শ্রাবণ?
তারপর চোখ পড়ল বাবার ওপর। মায়ের মুখের হাসিটা এসেও যেন মিলিয়ে গেল আফসানাকে দেখে।
-তোমার তো কাল আসার কথা, এত তাড়াতাড়ি এলে যে? সব ঠিক আছে? সাথের এই মেয়ে কে?
বাবা সোফায় বসে খুব শান্ত গলায় বলল,
-তোমাদের সঙ্গে একটা কথা ছিল।
আমার বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা আশঙ্কা তৈরি হলো। বাবার এই গলাটা আমি চিনি।
মা বসে পড়লেন।
-কি কথা?
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
-আমি বিয়ে করেছি। ওর নাম আফসানা।
মনে হলো ঘরের সব শব্দ হঠাৎ থেমে গেছে। ফ্যানের আওয়াজও যেন দূরে চলে গেল। আমি মায়ের দিকে তাকালাম। মা প্রথমে বুঝতেই পারলেন না। তারপর খুব ধীরে বললেন,
-কি বললে?
এবার বাবা চুপ করে রইলেন।
মা নিজেও আর দ্বিতীয়বার প্রশ্নটা করলেন না।কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তিনি আবার বললেন,
-তুমি এই মাত্র যেই কথাটা বললে তা কি সত্যি?
-তুমি শান্ত হয়ে বসো তারপর আমি আসল ঘটনা বলছি। বাবা আমতা আমতা করে বলে উঠলেন।
-তুমি আমার সঙ্গে আটাশ বছর ধরে সংসার করছো। তারপর একদিন দুপুরে এসে বললে তুমি আরেকটা বিয়ে করে ফেলেছ। আর আমি শান্ত হয়ে বসে শুনব?
বাবা চুপ। আমি বাবার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
এই মানুষটাকে আমি সবসময় শান্ত, দায়িত্বশীল একজন মানুষ হিসেবে দেখেছি। আজ প্রথমবার মনে হলো, আমি হয়তো বাবাকে পুরোপুরি চিনতাম না। গতবছর বাবা যখন হজ্ব করে গেলেন, তখনও মা বলেছিলেন "মনে পাপ থাকলে হজ্ব বল আর গঙ্গাস্মান বল কিছুতেই কিছু হয় না।" আমি তখন মায়ের ওপর রেগে গিয়েছিলাম। কই আমার ছোট চাচা যখন হজ্বে গেলেন তখন তো মা তার জন্য আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া করেছিলেন। আচ্ছা মা কি বাবা সম্পর্কে অন্য কিছু জানে, যা আমি জানিনা?
আফসানা সোফার একপাশে বসে ছিল। তার মুখে অপরাধবোধ। হয়তো সেই অপরাধবোধ শুধুমাত্র বাবার বয়সী একজনকে বিয়ে করার জন্য না বরং তারই ক্লাসমেটের বাবাকে বিয়ে করার জন্য। আর আমার ভেতরটা তখন রাগে পুড়ছে।
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে প্রায় বাজখাঁই গলায় বললেন,
-তুই এরকম সাপের মতো ফোসফোস করছিস কেন?
-তাহলে কি তোমাকে অভিনন্দন জানাবো বাবা? আমিও দ্বিগুণ তেজে উত্তর দিলাম।
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল। আমার নিজের কথাই নিজের কাছে কঠিন লাগছিল। কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল, আমার ভেতরের সবকিছু কেউ একজন এলোমেলো করে দিয়েছে।
আর সেই এলোমেলো জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আফসানা...আমার ক্লাসমেট...আমার বাবার নতুন স্ত্রী।
সেদিন দুপুরের পর থেকে আমাদের বাসার পরিবেশটা কেমন যেন বদলে গেল। যে ঘরটাতে প্রতিদিন মায়ের হাসির শব্দ শোনা যেত, বাবার সঙ্গে আমার টুকটাক কথা হতো, সেই ঘরেই সেদিন সবাই যেন অপরিচিত হয়ে গেল।
আমি নিজের ঘরে চলে এসেছিলাম। দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে ছিলাম অনেকক্ষণ। মাথার ভেতর শুধু একটা দৃশ্য ঘুরছিল। দরজা খুলে বাবার সাথে আফসানাকে দেখা।
আমার মনে হচ্ছিল, এটা নিশ্চয়ই কোনো অদ্ভুত স্বপ্ন। একটু পর ঘুম ভাঙবে, সব আগের মতো হয়ে যাবে।
যখন ঘরে ফিরে আসছিলাম তখন একবার মায়ের চোখে চোখ পড়েছিল। তার চোখ আমাকে বুঝিয়ে দিল কষ্টটা শুধু স্বামীকে হারানোর নয়, তিনি হারিয়েছেন তার বিশ্বাসের জায়গাটা।
আমি আমার ঘরে আর মা মায়ের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসেছিলাম।
সন্ধ্যার দিকে বাবা আমাকে আর মাকে ডাকলেন। ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখি বাবা আর আফসানা বসে আছে। আফসানা আমার দিকে তাকাল না। হয়তো তাকাতে পারছিল না।
বাবা বলল,
-বসো তোমরা, আসল ঘটনা শোনো।
আমি অথবা মা কেউই বসার আগ্রহ দেখালাম না। তবুও বাবা নীরবতা ভেঙে বললেন,
-আমি জানি আমার এই সিদ্ধান্ত তোমাদের জন্য মেনে নেওয়া সহজ না। কিন্তু এই মেয়েটি কিছুদিন আগে তার বাবা মাকে হারিয়েছে। কোন আত্মীয় স্বজন নেই। আমার সাথে মাত্র কিছুদিন আগে পরিচয় হয়। মেয়েটিকে আমি বানের জলে ভাসিয়ে দিতে চাইনি। তাছাড়াও দ্বিতীয় বিয়ে করা এমন কোন বড় অপরাধ নয়।
মা টলমল পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি শক্ত করে মায়ের হাত চেপে ধরলাম। তারপর মুখ খুললাম,
-বাবা, মেয়েটির নাম আফসানা এটা তুমি আমাকে বলেছ। তবে এই মাত্র যা যা বললে তার সব মিথ্যা। ওর বাবা-মা কিছুদিন আগে মারা যায়নি। ওর বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়েছে যখন ও ক্লাস এইটে পড়ে। ও ওর মায়ের সাথে থাকে। আর আমার সাথেই আমার ইউনিভার্সিটিতেই পড়াশোনা করে। অতএব তুমি এতক্ষণ ধরে যা বললে সবটাই মিথ্যা।
বাবা মাছের মত ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমি বুঝলাম যে আফসানা এতক্ষণেও তাকে বলেনি যে সে আর আমি দুজন পরিচিত।
বলাই বাহুল্য এরপরে আমি আর মা দুজন দুই ঘরে চলে গেলাম। বাবা তার নতুন বউকে নিয়ে বসে রইলেন ড্রয়িং রুমে। মা নিজের রুম থেকে আমাকে ফোন দিলেন, আমি রাতে কিছু খাবো কিনা জানতে কারন আমি দুপুরেও খাইনি। আমি অবাক হইনি, কারন আমি জানি একজন মা যে কোন পরিস্থিতিতে সন্তানের খেয়াল রাখেন। আমিও মাকে বললাম যে আমার কিছু লাগবে না।ঘরে শুকনা খাবার আছে আমি খেয়ে নিব আর মাও যেন পারলে কিছু খেয়ে নেন।
রাত প্রায় একটা বাজে। পানি খাওয়ার জন্য বাইরে বের হলাম। ড্রয়িংরুমে আলো জ্বলছিল। দেখলাম আফসানা একা বসে আছে। তার নতুন স্বামী তাকে একা ফেলে এত রাতে কোথায় গেছে তা জানতে আমার একেবারেই ইচ্ছা হলো না।
-শ্রাবণ, একটু বসবে। আফসানার কন্ঠে আকুতি।
-বসতে হবে না ,বলো আমি শুনছি। আমার গলার স্বর শুনে আমি নিজেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কবে কখন এতটা রুক্ষ হয়ে গেল আমার গলার শব্দ।
-তুমি তো জানোই আমি ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে। বাবা মায়ের যখন ডিভোর্স হয়, দেনমোহর বাবদ বাবা এক লক্ষ টাকা দিয়ে, আমার কোন ভরণপোষণের চিন্তা না করে নতুন বিয়ে করে বিদেশে পাড়ি জমান।
-আর তাই তুমি নতুন ভাবে আমার বাবাকে বিয়ে করে আমাদের বাড়িতে ঘাটি জমিয়েছো তাইতো?
-শ্রাবণ প্লিজ একটু শোনো। আফসানা দুই সেকেন্ড বিরতি নিল। আবার বলতে শুরু করল,তারপর থেকে শুরু হয় আমার আর মায়ের সংগ্রাম। মামার বাড়িতে জায়গা হলো না, দাদার বাড়িতে যে হবে না সেটা তো বুঝতেই পারছ। আমরা পড়ে গেলাম অথৈ সাগরে। মা সেলাইয়ের টুকটাক কাজ করে সংসারটা কোনো রকম ভাবে টানছিলেন। আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে অনেক চেষ্টা করে কলেজে ভর্তি হলাম। ততদিনে আমাদের অনেক ধার দেনা হয়ে গিয়েছিল। এরই মধ্যে মা আবার হার্ট অ্যাটাক করলেন। তার পক্ষে আর মেশিন চালিয়ে সেলাই করা সম্ভব ছিল না। আমার আর কোন উপায় ছিল না এই কাজ করা ছাড়া।
আফসানা মাথা নিচু করলো। আমি ভুরু কুঁচকে বললাম,
-কোন কাজ?
-আমি একটা এসকর্ট এজেন্সির সাথে যোগ দিই। তারা এটাকে এসকর্ট এজেন্সি হিসেবে পরিচয় দেয় কিন্তু সেখানে আসা পুরুষদের বেশিরভাগই শুধু সঙ্গ না, তারা আসে টাকার বিনিময়ে শারীরিক সুখ কিনতে। আমি বাধ্য হয়েছিলাম সেই অন্ধকার গহবরের নামতে। ওই টাকায় আমার সংসার চলতো, পড়াশোনা চলতো, মায়ের ওষুধ চলতো, ধার দেনা মেটানো হচ্ছিল।
আফসানা আবার মাথা নিচু করে ফেলল। আমি বুঝলাম তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।
-তার সাথে আমার বাবার কি সম্পর্ক? আমার গলা তখন কাঁপছে।
-তোমার বাবা ঐখানকার রেগুলার কাস্টমার। আমরা অনেক সময় উপরি পয়সার জন্য যাদের সাথে আমাদের আলাদাভাবে পরিচয় আছে তাদের সাথে আলাদা সময় কাটাই। আজ সেরকমই একটা দিন ছিল। কিন্তু কিভাবে যেন আজ যে ছোট্ট এক রুমের বাসাটাতে আমরা কয়েকজন মেয়ে পালাক্রমে সময় কাটাই সেই বাড়িটা বেশ কিছু মানুষজন মিলে ঘেরাও করল এবং অপ্রস্তুত অবস্থায় তোমার বাবা আর আমাকে ধরে ফেলল। তারপর তারাই বিয়ে পরিয়ে দিল।
আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। মনে পরল মায়ের কথা, সেই হজ্ব কিংবা গঙ্গাস্নান, সত্যিই তো মনে পাপ থাকলে এই পাপ কি আর ধুয়ে যায়?
আমি আর দাঁড়ালাম না। নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে বের হয়ে দেখি, বাবা একা ড্রয়িং রুমে বসে আছেন। তিনি রাতে কোথায় ছিলেন তা জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করছি না, কখন ফিরেছেন তাও জানার কোন দরকার দেখি না। মায়ের দরজায় নক করলাম,
-মা.. মা..
দরজা খুলে এলোমেলো চুলে মা বের হয়ে এলেন। তার চোখ লাল, হয়তো কেঁদেছেন। তবুও কণ্ঠে একটুও বিচলিত ভাব না রেখে বললেন,
-কি হয়েছে, ডাকছিস কেন?
-সবকিছু গুছিয়ে নাও মা, আমি আর তুমি এ বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি।
মায়ের চোখে তখন কেমন একটা আদ্র ভাব চলে এলো।
এরই মধ্যে বাবা উঠে এলেন। তাকে কেমন এলোমেলো বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে।
-আফসানা চলে গেছে, বিড়বিড় করে তিনি বললেন।
-তাতে কি হয়েছে বাবা? আফসানা চলে যাওয়া মানেই তো সব সমস্যার সমাধান হওয়া নয়। তুমি তোমার চরিত্রের কালিমা ঢাকতে পারবে? কাল রাতে আমি সব জেনেছি।
বাবা মাথা নিচু করে ফেললেন। মা চোখ বড় বড় করে কৌতুহল নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি এই মুহূর্তে মাকে আর কিছু বললাম না।
-শোনো বাবা, আমরা আর তোমার সাথে থাকবো না। যেহেতু বাড়িটা তোমার, অতএব এই বাড়ির ইট পাথরের খাঁচায় তুমিই থাকো। আমি আমার মাকে নিয়ে কোনো না কোনো একটা ব্যবস্থা করেই নেব। অন্তত দুইবেলা মায়ের মুখে অন্য তুলে দিতে পারব এইটুকু আশ্বাস আমি আমার মাকে দিতেই পারি।
-তোমারও কি তাই ইচ্ছা ফাতিমা? বাবা সরাসরি মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলেন।
-আমার ছেলের কথাই আমার শেষ কথা। মা কিন্তু বাবার দিকে একবারও তাকালেন না তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বুঝতে পারছি আজ তিনি গর্ববোধ করছেন।
-আচ্ছা, আচ্ছা ঠিক আছে। তোমরা যা ভাল মনে করবে তাই। তবে আমার একটা কথা রাখো, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। দয়া করে আমি ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তোমরা এখানে থাকো। তারপর না হয় যেও। শ্রাবণ, বাবা হিসেবে এইটুকু তো তোর কাছে চাইতেই পারি। জানি আমি খুব খারাপ মানুষ কিন্তু বাবা হিসেবে তো খুব খারাপ ছিলাম না বল। আমার এইটুকু কথা রাখ। বলে বাবা হনহন করে বের হয়ে গেলেন।
আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। এক সময় আমি নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে চা বানিয়ে বিস্কিটের সাথে মাকে খেতে দিলাম, নিজেও খেলাম। গতকাল সকালের পরে তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি। অপেক্ষার সময় যেন কাটছিল না। ধীরে ধীরে দুপুর হয়ে গেল, বাবা ফিরলেন না। আমি বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করে মাকে নিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করলাম। ধীরে ধীরে গোধূলি নেমে এলো কিন্তু বাবা এলেন না। মা বললেন,
-তোর বাবা আর ফিরবে না।
আমি চমকে উঠলাম।
-মানে!
-মানুষটা ভুলের পর ভুল করেছে। তাই শেষ ভুল থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে। আমাদেরকে পথে নামতে দেয়নি, নিজেই চলে গেছে।
আমি মায়ের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকলাম। মা হয়তো ঠিক বলছেন।
কেটে গেছে আট বছর। আমি মাস্টার্স পাশ করে এখন একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে মোটামুটি ভালো মানের, ভালো স্যালারির চাকরি করছি। পড়াশোনা চলাকালীন সময়ে খানিকটা কষ্টের মধ্যে দিয়েই আমাদের কেটেছে। বাড়ি ভাড়া বাবদ যা পেতাম তা দিয়ে টানাটানি করে সংসার চলতো। তবে চলতো, অন্য কারো সাহায্য নিতে হয়নি আমাদের। দিন পনেরো আগেই একটা লোকাল কাগজে এক ব্যক্তির ট্রেনে কাটা পড়া ছবি ছাপা হয়েছিল। মানুষটা আমার বাবা, আমি যাইনি, দরকার মনে করিনি। আর সেই পেপার মায়ের হাতেও পড়তে দেইনি। আমি চাইনা আমার মা নতুন করে আবার কোন কষ্ট পাক। এখন তিনি যথেষ্ট সুখী।
তবে নিউজটা ফেসবুকেও এসেছিল। আমাকে দেখিয়েছিল লতা। মেয়েটা ভারী সুন্দরী, দারুন ফিগার। আমি বেশিরভাগ সময় ওর কাছেই যাই। ও ফ্রী না থাকলে তখন অন্য কোন মেয়ে। আজকালকার সিস্টেম গুলো বেশ ভালো। টাকা খরচ করলে অনেক কিছুই পাওয়া যায়।
তবে যেদিন বাবার ট্রেনে কাটা পড়া ছবিটা দেখলাম সেই রাতে হঠাৎ আমার মনে হয়েছিল,
"আচ্ছা, রক্ত কি কথা বলে!!
সমাপ্ত