Collected প্রত্যাবর্তন

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
474
Messages
7,868
Reaction score
7,262
Points
4,113
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
প্রত্যাবর্তন

মূল লেখকঃ শোয়েব বাশার
​






।
গাড়িটা নষ্ট হলো তিস্তা নদীর ওপর। আর এখানেই যে আমার পুরনো বুয়াকে পেয়ে যাবো, ভাবতেই পারিনি। পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে বললো, 'ভালো আছেন খালাম্মা?'

ছেলেকে নিয়ে এসেছিলাম পাত্রী দেখার জন্য। ছেলের বাবা নানা কাজে ব্যস্ত, আমাকে আর ছেলেকেই পাঠিয়ে দিলেন পাত্রী দেখতে। পাত্রী দেখে ফেরার পথেই সর্বনাশটা হলো। যেখানে গাড়ি খারাপ হয়েছে, তার আশেপাশে একটা বাজারও নেই।

বুয়ার সাথে দেখা হয়েছিলো এসময়ই। মিষ্টি হেসে বললো, 'আমার বাড়ি পাশেই খালাম্মা। আপনি আর ভাই আমার সাথে আসেন। ডেরাইভার কোনো গাড়ির পেছনে আপনাদের গাড়িটা বাইন্ধা নিয়ে যাক। আর আধঘন্টা গেলেই পড়বো বাজার।'

ছেলে ড্রাইভারকে একা ছাড়তে চাইলো না। শেষে ঠিক হলো, আমি গিয়ে বুয়ার বাড়িতে থাকবো। ছেলে আর ড্রাইভার গিয়ে গাড়ি ঠিক করে আনবে। গাড়ি ঠিক হলে এরপর আমাকে এসে নিয়ে যাবে।

বুয়া আমাকে নিয়ে তার বাসার দিকে রওনা দিলো। সূর্য তখন ডিমের কুসুমের মতো রঙ নিয়ে পশ্চিম আকাশে ডুব মা'রছে। একটা টিনের ছাওনি দেয়া খয়েরি রঙা ঘরের সামনে এসে বুয়া বললেন, 'খালাম্মা, এইটাই আমার ঘর। আসেন, আসেন, ভেতরে আসেন।'

আমি নিঃসংকোচে বুয়ার ঘরে ঢুকে পড়লাম। যতদিন আমাদের বাসায় কাজ করেছিলো সে, কোনোদিন তার একটা খুঁতও খুঁজে পাইনি। শুধু একটা আবদার ছিলো তার। প্রতিবছরই তার সেই আব্দারটা আমার রাখতে হতে।

অক্টোবরের শুরুর দিকে সকালটা যখন কুয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে হাজির হয়, সেসময় বুয়া তিনদিনের ছুটি চাইতো। জিজ্ঞেস করলেই বলতো, তার মেয়ে আসবে, তাই যাওয়া লাগবে বাড়ি। সারাবছর কাজ করতো বুয়া, খুব গুছিয়ে নিজের মতো করে বাড়ির সব কাজ করতো, তাই ছুটি দিতে একদম কার্পণ্য করতাম না।

বুয়ার ছোট্ট চারকোনা ঘরটার ভেতর একটা চৌকি পাতা, আর আছে একটা চেয়ার। ঘরের ফার্নিচার এই কয়টাই। বুয়া চেয়ার এগিয়ে দিলো আমার কাছে, আমি বসলাম। বুয়া বসলো চৌকিতে।

বললাম, 'তোমার তো মেয়ে আসবার সময় হয়ে গেছে, তাই না?'
বুয়া হেসে বললো, 'জ্বি খালাম্মা, আইবো আজকে রাতে।' এরপর টুকটাক গল্প শুরু করলো সে।

আমি ওর গল্প শুনতে শুনতে ওর ঘরের চারপাশ দেখতে লাগলাম। এখানেই থাকে বুয়া, যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছে ওর ঘরটা। বাইরে কালো বুলবুলির ঝুটির মতো অন্ধকার নেমেছে, ঘরেও ঢুকেছে সেই অন্ধকার। বুয়া একটা হারিকেন জ্বালালো। হারিকেনের আলোয় অন্ধকার কেটে ঘরটা সোনালী হলুদ আলোয় ছেয়ে গেলো।

বুয়া আবার গল্প শুরু করলো। আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি আর কাজে এলে না কেন সুমাইয়ার মা।'

বুয়া তাকালো আমার দিকে। 'কারণটা তো আপনি জানেন খালাম্মা।'

'তোমাকে তো আমি ছুটি দেই, প্রতিবছরই দিয়েছি। শুধু গতবছরটাম মানা করেছিলাম। বলেছিলাম আমার ছেলে ফিরছে কানাডা থেকে, একটা সপ্তাহ একটু ধকল যাবে। তুমি দু সপ্তাহ পরে ছুটি নাও। শুধু এটুকু বলাতেই তুমি চলে গেলে কেন?'

'কেন গেলাম জানেনই খালাম্মা। সুমাইয়া আসার সময় হয়েছিলো।'

'আমি বলেছিলাম সুমাইয়াকে দু তিন সপ্তাহ পরে আসতে বলো।'

'না খালাম্মা। দুই তিন সপ্তাহ পরে আসতে পারবো না। সুমাইয়া এই সময়ই আসবো।'

আমি বুয়ার দিকে তাকাই। 'নকুলের মা তোমাকে নিয়ে একটা কথা বলেছে, জানো তো তুমি?'
'কি কথা খালাম্মা?'
'তোমার মেয়ে সুমাইয়া কখনো বাড়ি আসে না। এইসময়টায় তুমি শুধু মিথ্যা কথা বলে ছুটি নাও।'

বুয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, 'আসে খালাম্মা, আসে। না আসলে ওরে আমি দেখতে আসি কেন?'

বুয়ার মেয়ে সুমাইয়ার বিয়ে হয়েছিলো পাশের গ্রামে, জানতাম। শুধু বছরের এই সময়টাতেই কেন সে শ্বশুড়বাড়ি থেকে বাপের বাড়ি আসে, তা জানা হয় নাই কখনো। সেটাই জিজ্ঞেস করলাম।

বুয়া তাকায় আমার দিকে, 'এই সময়টাতেই তো ওর আসার পারমিশন হয় খালাম্মা।'
'মানে?'

বুয়া গল্প বলে চলে। হারিকেনের আলোয় বুয়ার চোখটা জ্বলজ্বল করছিলো সোনালি কাঁচপোকার মতো।

বুয়ার বিয়েটা হয়েছিলো খুব কম বয়সে, প্রথম বাচ্চা হবার পরই জামাই মা'রা যায়। এরপর বুয়াকে এবং তার মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। বুয়া নিরুপায় হয়ে বাপের বাড়িতে এসে উঠে।

বাবার বাড়ির অবস্থাও তখন ভালো না। বাবার শরীর খারাপ। সবকিছুই ভাইয়েরা দেখাশোনা করে। বোনের এই উটকো ঝামেলা ভাইয়েরা নিতে চাচ্ছিলো না। এসময় বাবাও মা'রা গেলেন। বুয়া পড়লেন অকূল পাথারে।

ভাইয়েরা তাদের বোনটিকে বাড়ি থেকে আবার তাড়িয়েই দিচ্ছিলো। কিন্তু শেষমেশ কার পরামর্শে জানি না, এইখানে একটা ঘর করে দেওয়া হয় তাকে। মেয়েকে নিয়ে এইখানেই থাকতে পারবে বুয়া। কিন্তু কথা দিতে হয়, বাবার সম্পত্তির আর কিছু সে চাইতে পারবে না ভাইয়েদের কাছ থেকে।

বুয়া থাকে এই বাড়িতে, তার মেয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে।

নানারকম কাজ করে বুয়া। নিজে চলে, মেয়েকেও বড় করে। মেয়েটা তার হয় অসম্ভব সুন্দর, শিশির ছোঁয়া জলপদ্মের মতো। একটার পর একটা বিয়ের সম্বন্ধ আসে মেয়েটার একটু বড় হবার পর থেকেই। বুয়াও মনে মনে পাত্র খুঁজতে থাকেন। একসময় পেয়ে যান অমন একটা পাত্র। পাশের গ্রামেই বাড়ি, অবস্থা ভালো। ত্রিশ বিঘা জমির মালিকের ছেলে। আগের বউটা মা'রা গিয়েছিলো। নতুন বিয়ে করবে। সুমাইয়াকে পছন্দ হয়েছে ওদের।

বুয়া খোঁজ খবর নিচ্ছিলো। যখনই লোকজন শুনছিলো খাঁ বাড়ির ছেলে, একবাক্যে বলে দিচ্ছিলো সবাই, 'এতো বড় বাড়িতে বিয়ের সম্বন্ধ এতো দেখাশোনার কি আছে? চোখ কান বুজে বিয়ে দিয়ে দাও।'

বুয়া মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন। যেদিন সুমাইয়াকে নিয়ে যাচ্ছিলো ওরা, সুমাইয়া ওর গলাটি ধরে কাঁদছিলো, ওর মায়ের তখন মনে হচ্ছিলো কে যেন তার বুকের ভেতরটা খাবলে ধরে হৃদপিন্ডটা বের করে নিয়ে যাচ্ছে। এতো যন্ত্রণা হচ্ছিলো তার বুকে। সুমাইয়ার বাবা মা'রা যাবার সময়ও এতো যন্ত্রণা হয়নি তার।

মেয়ে গেলো শ্বশুরবাড়ি। তিনি পরে রইলেন এখানে। মেয়েটাকে দেখার কত শখ। যেতে পারেন না। বারবার দেখতে গেলে শ্বশুরবাড়ির লোক কি মনে করে, এই ভয়ে।

বিয়ের তিনমাস পর বাড়ি এলো সুমাইয়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কেমন আছিস মা?' সুমাইয়া বললো ভালো। ভালো বললো শুকনো মুখে। তার মুখে একফোঁটা হাসি নেই, তিনি দেখেই বুঝতে পারলেন।

মেয়েটার চোখের নীচে কালো জলপাইয়ের মতো কালি পড়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, রাতে ঘুমাস তো ঠিকঠাক? মেয়ে মাথা নাড়ে। মুখে কিছু বলে না।

রাতে শোবার সময় মেয়ের কাঁধটা দেখলেন তিনি। অনাবৃত কাঁধের ওপর লাল লাল ছোপ ছোপ দাগ। গরম খুন্তিতে ছ্যাঁকা লাগার মতো। তিনি আঁতকে উঠলেন। মেয়ের কাঁধে হাত দিলেন। মেয়ে হাতটা সরিয়ে নিলো।

পরদিন চলে গেলো মেয়ে। যাবার সময় এতো আকুল হয়ে কাঁদলো, বিয়ের দিনও ওভাবে কাঁদেনি। তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, 'যাই হোক মা, সবকিছুর ওপর মেয়েদের স্বামীর সংসার। মানিয়ে নিও। নাইলে মায়ের জীবন কেমন কেটেছে, দেখতেই তো পেরেছো।'

মেয়ে মাথা কাত করলো। চলে গেলো। আর কোনো কথাটি হলো না।

এক রাতে হঠাৎ তার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। পাশের বাড়ির সবুর এসে ডাক দিয়েছে, 'খালাম্মা, চলেন, আমাদের সুমাইয়ার যেন কি হইসে।'

তিনি সবুরের সাথে ছুটে গিয়েছিলেন। মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ঢুকেছিলেন কতো সংকোচে। বাড়ি ভর্তি লোক। উঠানে গোল করে সবাই দাঁড়ানো। সবার মাঝখানে একজনকে শুইয়ে রাখা। তিনি দেখলেন সেই শুয়ে থাকা মানুষটাকে। সাদা চাদর দিয়ে পা থেকে কাঁধটা পর্যন্ত ঢাকা। শুধু মুখটা অনাবৃত। সেই খোলা মুখ দেখে মেয়েকে চিনতে পারলেন না তিনি। তার মেয়ে তো এমন ছিলো না। তার মেয়ের মুখ তো এমন আগুনে পোড়া ঝলসানো ছিলো না। তার মেয়ের মুখ তো ছিলো জলপদ্মের মতো সুন্দর।

মেয়ে নিজের শরীরে আগুন দিয়ে ম'রেছে, এই কথাটা শুনে বাড়ি এলেন তিনি। কিন্তু বিশ্বাস করতে পারলেন না। তার মেয়ে ওটা হতে পারে না। তার মেয়ে বেঁচে আছে, এখনো বেঁচে আছে। যেকোনো দিন, যেকোনো সময় দেখা হবে তার মেয়ের সাথে।

তার বিশ্বাসই ঠিক ছিলো। সুমাইয়া এলো দেখা করতে। এভাবে প্রতিবছর এই সময়টায় এসে মাকে দেখা দিয়ে যায়।

সুমাইয়ার মা তার গল্প শেষ করলেন। কাঁদছেন তিনি। আমার চোখটাও অজান্তে ভিজে আসছিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'সুমাইয়া আসবে না আজ?'
সুমাইয়ার মা চোখ মুছলেন, 'আসবো খালাম্মা, অবশ্যই আসবো।'

আমি ডিলিউশনে ভোগা এক মাকে দেখতে লাগলাম, যিনি ভাবেন তার মৃতা মেয়ে প্রতিবছর এইসময় তাকে দেখতে আসে, যে সময়টায় সে চলে গিয়েছিলো এই নিষ্ঠুর দুনিয়া ছেড়ে।

বাইরে গাড়ির শব্দ হলো। আমার ছেলে চলে এসেছে। আমি বললাম, 'যাই সুমাইয়ার মা।'

সুমাইয়ার মা চোখের পানি মুছলো, 'আচ্ছা খালাম্মা। আমি আবার যামু ঢাকায়। গেলে দেখা করবো আপনার লগে।'

আমি বের হয়ে এলাম। আকাশে অবাক করা পূর্ণিমা। সেই পূর্ণিমার আলোয় দূর চরাচর ভেসে যায়।

গাড়িতে উঠলাম আমরা। গাড়ি ছেড়ে দিলো। মোড়টা পেরোনোর আগে হেডলাইটের আলোয় একটা মেয়েকে এগিয়ে আসতে দেখলাম আমি। সারা শরীর সাদা কাপড়ে মোড়া, মুখটা ঢাকা। মুখের অনাবৃত অংশ কেমন পোড় খাওয়া কালো। আমি বললাম, 'ওটা কে?'

ড্রাইভার বললো, 'কাউকে দেখসেন খালাম্মা?'
'একটা মেয়েকে হেঁটে যেতে দেখোনি?'
'না তো। রাস্তা তো একদম ফাঁকা।'

আমি পেছন ফিরে তাকালাম না। আমি চাচ্ছিলাম না এক ডিলিউশনে ভোগা মায়ের ভ্রান্তি আমাকেও স্পর্শ করুক। আমি শুধু সামনে তাকিয়ে ছিলাম। পূর্ণিমায় ভেসে যাওয়া সাদা চরাচর দেখছিলাম। গাড়ির রেডিওতে তখন বাজছিলো, 'নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে...'

সমাপ্ত
 
Back
Top