Collected প্রতারণা যখন পারিবারিক শিক্ষা

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
445
Messages
7,081
Reaction score
5,071
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
প্রতারণা যখন পারিবারিক শিক্ষা

(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)






অফিসে আজ সাজিদ সাহেবের শেষ দিন, অফিসের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তার চাকরিটা চলে গেছে । অথচ তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণিত হবার আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন অফিসের মধ্যমণি, সবার প্রিয়। ক্রিয়েটিভিটির জন্য বস তাকে সবসময় একটু আলাদা নজরে দেখতেন।

মাথানিচু করে সাজিদ সাহেব শেষবারের মত বসের রুমে গেলেন। তাকে দেখে খুব স্বাভাবিকভাবে বস বললেন, "সাজিদ সাহেব বসুন, চা খাবেন?" 'না স্যার খাবোনা, বলুন কেন ডেকেছেন'- কাঁপা কাঁপা কন্ঠে সাজিদ সাহেব উত্তর দিলেন।

"কেন ডেকেছি জানেন না নাকি? টার্মিনেশন লেটার না নিয়েই চলে যাবেন? সাজিদ সাহেব আপনি আমাকে শুধু হতাশই করেননি, কস্টও দিয়েছেন।আমি না কোন সমীকরণ মেলাতে পারছিনা! আপনি ভালো পরিবারের ছেলে, পড়েছেন ক্যাডেট কলেজে। ভালো ইউনিভার্সিটি , ভালো রেজাল্ট, সবই ভালো -- এমনকি একটা সিগারেটও খাননা। কিন্তু কথায় আর কাজে এত নয়-ছয় কেন ?? কত মেধাবী আপনি, ঠিকমত মন দিয়ে কাজ করলে দু'দিন বাদে আমার জায়গায় আপনি আসতেন! অথচ........
দেখুন আমি জানি, আপনি ভালো পরিবারের ছেলে, ভালো পরিবেশে বড় হয়েছেন। তো এতসব ছলচাতুরী শিখলেন কোথা থেকে? ক্লায়েন্টেরদের সাথে এত মিস-কনডাক্ট, ঠিকমত কাজ ডেলিভার না করা, বারবার আশ্বাস দিয়ে পরে আশাহত করা, কলিগদের সাথে বিভিন্ন লেনদেনে জড়িয়ে পরে সময়মত সেগুলো সোর্ট-আউট না করা→এ বিষয়গুলো আপনার সাথে যায়? আপনার পরিবার কি এই শিক্ষা দিয়েছে আপনাকে??"

-- বসের কথা পুরোটা শেষ না হতেই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে টেবিল চাপড়ে সাজিদ বলতে লাগলো, "হ্যাঁ স্যার আমার পরিবারই আমাকে এসব শিখিয়েছে। আপনার কোন সমস্যা? এতসব লেকচার বাদ দিয়ে ডিসমিসাল লেটারটা আমাকে দিন, আমি চলে যাবো।"

এবার একটু নরমস্বরে বস বললেন, "আহা সাজিদ কুলডাউন! আপনাকে আমি ছোট ভাইয়ের মত স্নেহ করি, আমি জানি আপনার যোগ্যতা বলে আপনি আবার কোন একটা চাকরি পেয়ে যাবেন ।এর আগেও দু'বার আপনার চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আমি নিজে আপনাকে 'ব্যাক' করেছি।কিন্তু বারবার তো সম্ভব না....আচ্ছা যাইহোক কি যেন বলছিলেন, আপনার পরিবার থেকে আপনি এগুলো...…...."

এবার সাজিদ হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন--" স্যার আমি নিজেও জানিনা আমি কেন এমন করি, কিন্তু আমার বেড়ে ওঠা আর সাবসিস্টেমটাই এমন ছিল। যখন আমি ক্লাস ফাইভে উঠলাম আমাকে বলা হয়েছিল আমি যদি বৃত্তি পাই আমাকে সাইকেল কিনে দেয়া হবে। কিন্তু বৃত্তি পাওয়ার পরে আমাকে বলা হয় কিছুদিন পর কিনে দিবে, বাবার নাকি কি সমস্যা! এরমধ্যে কিছুদিন পর বলা হলো, যদি ক্যাডেট কলেজে চান্স পাই তবে কম্পিউটার কিনে দেয়া হবে। কিন্তু চান্স পাওয়ার পর বলা হলো, 'থাকবে তো ক্যাডেটের হোস্টেলে, বছরে ২/১ বার বাসা আসবে...খামোখা এত টাকা দিয়ে কম্পিউটার কিনে ফেলে রেখে লাভ কি? ' --আমিও পরিস্থিতি বুঝে সব মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু বিষয়গুলো ওখানে শেষ হয়নি,আজও চলছে।এস,এস,সি দেয়ার পর বলেছিলাম আমার সাইন্সে পড়তে ভালো লাগছেনা, আমি আর্টস নিয়ে পড়তে চাই। তখন আমার বাবা আমাকে বলেছিল, 'উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সাইন্স থাকলে ফাউন্ডেশন ভালো থাকে, পরে চাকরি পাওয়া সহজ হয়ে যায়।তুমি যদি আর্টসের কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়তে চাও তো পরে অনার্স লেভেলে গিয়ে সে চিন্তা করিও। মা-বাবার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে সাইন্স নিয়েই পড়লাম এবং খুব ভালো রেজাল্ট করলাম। এরপর আবার তাদের দ্বিচারিতার স্বাক্ষী হলাম।আমাকে কড়া ভাষায় বলা হলো, 'সারাজীবন আবেগের পিছনে ছুটলে, আবেগ দিয়ে কি পেট ভরে? আর্টসের সাবজেক্টে পড়ে কি কবি হবে নাকি?কবিদের ভাত আছে? এত কস্ট করে এত টাকা খরচ করিয়ে এ অব্দি ক্যাডেট কলেজে পড়িয়েছি কি কবি/চিত্রকর হওয়ার জন্য? শোনো ছেলে তোমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়েই পড়তে হবে, আর যদি না পারো তো যাও গিয়ে গ্রামে গিয়ে কাকাদের সাথে ক্ষেতে কাজ করো '

এরপর দেখুন স্যার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়লাম ঠিকই, কিন্তু চাকরি করতে হলো কনসালটেন্সি ফার্মে!"

এবার বস বললেন, "ঠিকই তো সাজিদ এ বিষয়টি আমিও ভেবেছি, ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ার পর কেন আপনি ট্র্যাক বদলিয়ে MBA করলেন আর এই ফার্মে ঢুকলেন?’

"হা হা! স্যার - সেটাও পরিস্থিতির শিকার হয়েই। আমাকে বলা হয়েছিল ভালো গ্রেড পেয়ে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করতে পারলে আমার পরিবার আমাকে উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য বিদেশে পাঠাবে, আমি যদি কোন স্কলারশিপ নাও পাই - তবুও তারা নিজের অর্থায়নে আমাকে বিদেশে পাঠাবে। এদিকে আমার একজন সমবয়সী বান্ধবী ছিল, যার কথা আমার মা-বাবা জানতো।গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর আমাকে বলা হলো, 'দেখ বাবা , তুই এখন বিদেশ যাওয়ার চিন্তা করা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল।তার চেয়ে দেশেই একটা চাকরি খুঁজে বিয়েটা করে ফেল।দেখা যাচ্ছে, তুই বিদেশে চলে গেলি এদিকে যদি ওর(আমার বান্ধবী) অন্য কোথাও বিয়ে যায়?'

'বিশ্বাস করুন স্যার সেদিন আমার মায়ের এমন মানসিকতা দেখে খুবই ভালো লেগেছে, তাদের কোন 'প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে' যেন প্রথমবার এত খুশি হয়েছি।এরপরই এখানে জয়েন করলাম স্যার, পাশাপাশি MBA টাও শেষ করলাম। চাকরি পাওয়ার পর আমাকে আমার বাবা আমাকে বললেন, 'সবেমাত্র চাকরিটা হলো, এতে আহামরি এমন কিছু হয়ে যায়নি। সারাজীবন তোকে খাইয়েছি, পড়িয়েছি... পরিবারের প্রতি কি তোর কোন দায়িত্ব নেই? আর তাছাড়া তোর বড় ভাই-ই তো এখনও বিয়ে করেনি।' এদিকে অপেক্ষা করতে করতে আমার বান্ধবীর বিয়ে হয়ে যায়।তার শেষ মেসেজে সে আমাকে 'প্রতারক' বলেছিল।এখন আপনিই বলুন স্যার আমি কি ভুল কিছু বলেছি?ছলচাতুরী করা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এগুলোতো আমার পরিবারই আমাকে শিখেয়েছে।"

সাজিদ সাহেবের মুখে এ কথাগুলো শোনার পর বস একেবারে নির্বাক হয়ে গেলেন।আশেপাশে তাকিয়ে কি যেন ভাবতে লাগলেন!

শেষ পর্যন্ত সাজিদ সাহেবের চাকরিটা রক্ষা পেয়েছিল কিনা তা জানা নেই! তবে এতটুকু জানি, যে চিরন্তন ট্রমার মধ্যে সাজিদ সাহেব আছেন তা থেকে হয়তো তিনি আর বের হতে পারবেন না। আর তার আশেপাশের মানুষগুলোও তার কাছ থেকে প্রতারণা, কপটতা ছাড়া হয়তো ভালো কিছু পাবেনা!

সন্তানের মা-বাবারা একটু নড়েচড়ে বসুন, সাজিদের জীবনের এই গল্প থেকে শিক্ষা নিন। নিজের সন্তানকে কখনো এমন কোন প্রতিশ্রুতি দিবেন না, যা আপনি হয়তো রক্ষা করতে পারবেন না। সাময়িকভাবে হয়তো আপনি বাচ্চাকে দিয়ে আপনার স্বার্থ আদায় করে নিতে ঠিকই পারবেন, কিন্তু আপনার সন্তান সারাজীবন সেই ক্ষত বয়ে নিয়ে বেড়াবে। আমার মতে, বাচ্চাকে কোন কমিটমেন্ট দেয়াই ঠিক না। বরং অ্যাচিভমেন্টে সারপ্রাইজ রিওয়ার্ড দেয়া উচিত। আর যদি কখনো কোন কমিটমেন্ট দিতেই হয়, তবে সবকিছুর বিনিময়ে নিজের কথা রাখুন। ভুলে গেলে চলবেনা→ আমাদের 'ছোট-ছোট মিথ্যা ', 'ওয়াদা ভঙ্গ করা' আর টুকটাক 'ছলচাতুরী' বাচ্চাদের মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়। পরবর্তীতে এ বিষয়গুলোই তাদের চরিত্রের একেকটি অংশ হয়ে ওঠে।
 
Back
Top