- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 415
- Messages
- 6,023
- Reaction score
- 2,753
- Points
- 3,963
- Age
- 40
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
পিপাসা
মূল লেখকঃ রাশেদুল হাসান
মূল লেখকঃ রাশেদুল হাসান
শহরের শেষ মাথায় যেখানে ইলেকট্রিক খুঁটিগুলো শেষ হয়েছে, তার পরেই শুরু বিশাল এক পতিত জমি। স্থানীয়রা বলে 'মরা-মাঠ'। সেই মাঠের একপ্রান্তে টিনের চাল দেওয়া আধপাকা বাড়িটায় রেহানা থাকে তার দুই সন্তান—টুনু আর বিল্লুকে নিয়ে। স্বামী রফিক চাকরির সুবাদে শহরে থাকে, মাসে একবার আসে।
দিনটা ছিল মাঘের শেষ। হাড়কাঁপানো শীত। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই চারপাশটা যেন নীলচে কুয়াশায় মুড়ে গেল। জানলার ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসে হ্যারিকেনের শিখাটা ধপধপ করছে। রেহানা বাচ্চাদের খাইয়েদাইয়ে শুইয়ে দেওয়ার আয়োজন করছিল। টুনু আর বিল্লু লেপের নিচে খুনসুটি করছে।
ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হলো।
খট... খট... খট...
খুব ধীর, কিন্তু স্পষ্ট আওয়াজ।
রেহানার বুকটা ধক করে উঠল। এই অসময়ে কে? রফিকের তো আসার কথা নয়। আর এই নির্জন এলাকায় চোর-ডাকাতের ভয়ও কম নয়।
সে ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করল, "কে?"
ওপাশ থেকে এক ভাঙা, জরাজীর্ণ গলার স্বর ভেসে এল, "মা জননী... দয়া করেন। একটু দরজাটা খুলেন।"
গলাটা এতই করুণ যে রেহানার ভয়টা একটু কমল। সে সাবধানে দরজার খিলটা নামিয়ে একটু ফাঁক করল।
কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ। গায়ের চামড়া ঝুলে পড়েছে, পিঠটা ধনুকের মতো বাঁকা। পরনে একটা মলিন চাদর, যা দিয়ে সে আপাদমস্তক ঢেকে রেখেছে। তার হাতে একটা লাঠি, আর কাঁধে ঝোলানো চটের এক পোঁটলা।
বৃদ্ধ কাঁপতে কাঁপতে বলল, "মা, আমি বহুদূর যাব। পথ হারাইয়া ফেলছি। এই শীতে আর হাঁটতে পারতাছি না। আইজ রাইতটা যদি একটু বারান্দায় থাকতে দিতেন..."
রেহানার মায়া হলো। এই কনকনে শীতে মানুষটা বাইরে থাকলে জমে বরফ হয়ে যাবে। তাছাড়া লোকটাকে দেখে নিতান্তই দুর্বল আর নিরীহ মনে হলো।
রেহানা বলল, "ভেতরে আসেন চাচা। বারান্দায় অনেক বাতাস। আপনি বাইরের ঘরটায় থাকেন। আমি চাটাই পেতে দিচ্ছি।"
বৃদ্ধ কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ল। "আল্লাহ তোমার ভালো করুক মা, আল্লাহ তোমার ভালো করুক।"
বৃদ্ধ ঘরে ঢুকল। হ্যারিকেনের আলোয় রেহানা দেখল, লোকটার চোখ দুটো অদ্ভুত রকমের ঘোলাটে, যেন চোখের মণিগুলো স্থির। সে যখন হাঁটে, তার পায়ের কোনো শব্দ হয় না।
রেহানা বলল, "চাচা, কিছু খাবেন? ভাত আছে।"
বৃদ্ধ হাত নেড়ে না করল। "না মা, খিদা নাই। শুধু তৃষ্ণা... বড় তৃষ্ণা। একটু পানি দিও।"
রেহানা পানি এনে দিল। বৃদ্ধ এক নিঃশ্বাসে গ্লাসটা খালি করে ফেলল। তারপর চাদর মুড়ি দিয়ে বাইরের ঘরের কোণায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল।
রেহানা শোবার ঘরে এসে দরজা ভেজিয়ে দিল। টুনু আর বিল্লু ততক্ষণে ঘুমিয়ে কাদা। তাদের গালগুলো শীতে আর ঘুমের আরামে আপেলের মতো লাল হয়ে আছে। রেহানা তাদের লেপটা ভালো করে টেনে দিয়ে নিজেও শুয়ে পড়ল।
বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝে মাঝে শেয়ালের হুক্কাহুয়া। অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা।
রাত তখন কতটা হবে রেহানা জানে না। ঘুমের ঘোরে তার মনে হলো ঘরে কোনো শব্দ হচ্ছে।
খুব পরিচিত, অথচ অদ্ভুত একটা শব্দ।
চক... চক... চক...
যেন বিড়াল দুধ খাচ্ছে। একটানা, লোলুপ ভঙ্গিতে চেটে খাওয়ার শব্দ।
রেহানার তন্দ্রাটা পুরোপুরি কাটল না। সে ভাবল, রান্নাঘরে হয়তো বিড়াল ঢুকেছে। দুধের পাতিলটা কি ঢাকা ছিল না?
শীতের আলসেমিতে সে আর উঠল না। তাছাড়া শরীরটা কেমন যেন অবশ লাগছে, নড়তে ইচ্ছে করছে না।
শব্দটা থামছে না। চক... চক... চক...
শব্দটা রান্নাঘর থেকে আসছে না। মনে হচ্ছে শব্দটা খুব কাছে... পাশের ঘর থেকে, কিংবা তার নিজের ঘরেরই কোনো অন্ধকার কোণ থেকে।
রেহানা বিড়বিড় করে বলল, "ধুর, বিড়ালটা জ্বালালো..." তারপর আবার পাশ ফিরে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখন রোদ উঠে গেছে। কিন্তু রোদের তেজ নেই, কেমন মরা মরা আলো।
রেহানা ধড়ফড় করে উঠল। অনেক বেলা হয়ে গেছে। বাচ্চারা এখনো উঠছে না কেন?
সে বাইরের ঘরে গেল। দরজা খোলা। সেই বৃদ্ধ নেই। চাদর নেই, পোঁটলা নেই। লোকটা কখন উঠে চলে গেছে কেউ জানে না।
রেহানা স্বস্তি পেল। যাক, আপদ বিদায় হয়েছে।
সে বাচ্চাদের ডাকতে গেল। "টুনু! বিল্লু! ওঠ, স্কুল নাই?"
বাচ্চারা লেপের নিচে শুয়ে আছে। একদম চুপচাপ।
রেহানা কাছে গিয়ে লেপটা সরাল।
মুহূর্তের মধ্যে তার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। গলার ভেতর থেকে একটা আর্তচিৎকার দলা পাকিয়ে উঠে এল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
বিছানায় টুনু আর বিল্লু শুয়ে আছে ঠিকই। কিন্তু তাদের সেই ফোলা ফোলা লাল গাল নেই। তাদের শরীরটা কেমন যেন চ্যাপ্টা হয়ে বিছানার সাথে মিশে আছে।
রেহানা কাঁপা হাতে বিল্লুর হাতটা ধরল।
হাতটা কাগজের মতো হালকা। সে একটু টান দিতেই বুঝতে পারল, ভেতরে কিছু নেই।
রক্ত নেই, মাংস নেই, হাড় নেই।
বিছানায় পড়ে আছে শুধু দুটো শিশুর শরীরের চামড়ার খোলস। যেন কেউ একটা ফলের ভেতর থেকে সব শাস আর রস শুষে নিয়ে শুধু খোসা ফেলে রেখে গেছে। গলার কাছে ছোট্ট দুটো ফুটো, যেখান দিয়ে বিন্দু বিন্দু কালচে দাগ শুকিয়ে আছে।
রেহানা বুঝল, কাল রাতে সে যে শব্দটা শুনেছিল, সেটা বিড়ালের দুধ খাওয়ার শব্দ ছিল না। সেটা ছিল তার সন্তানদের ধমনী থেকে শেষ বিন্দু রক্ত শুষে নেওয়ার শব্দ। সেই বৃদ্ধ কোনো পথিক ছিল না। সে ছিল এক আদিম শিকারি, যে শীতের রাতে উষ্ণ রক্তের গন্ধে পথ চিনে এসেছিল।
বাইরে তখনো কুয়াশা। দূরে কোথাও একটা কাক কর্কশ গলায় ডেকে উঠল। রেহানা তার দুই সন্তানের সেই শূন্য খোলস বুকে জড়িয়ে পাথরের মতো বসে রইল। তার মনে পড়ল বৃদ্ধের সেই কথা—"বড় তৃষ্ণা মা... বড় তৃষ্ণা।"